|
বিজয় দিবস সংখ্যা ২০০৮
স্মৃতিচারণের চেয়ে শহীদের আরদ্ধ কাজ সম্পাদনের নতুন অঙ্গীকার এখন জরুরী
-
খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া
খালেকুজ্জামান
ভূঁইয়া বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর আহ্বায়ক হিসাবে দীর্ঘদিন বামপন্থী
আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
১৯৭১
সালের মুক্তিযুদ্ধে কুমিল্লা জেলার এফএফ বাহিনীর অধিনায়ক হিসাবে দায়িত্ব পালন
করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে সামনের সারিতে
থেকে কাজ করছেন।
স্বাধীনতার সংগ্রাম ও যুদ্ধাপরাধী বিষয় নিয়ে ১ ডিসেম্বর ইউকেবেঙ্গলির সাথে
কথা বলেছেন খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া।
সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান।
ইউকেবেঙ্গলিঃ
যে-স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন সে-স্বপ্ন থেকে বাংলাদেশ এখন কত দূরে?
খালেকুজ্জামানঃ
পাকিস্তানী উপনিবেশিকতা-বিরোধী ২৩ বছরের সংগ্রাম এবং তার পরিণতিতে ১৯৭১ সালের
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য থেকে গড়ে উঠা গণ-আকাঙ্খা,
চেতনা ও স্বপ্নকে স্বাধীন দেশে ৩৭ বছরের শাসক-শ্রেণী পদদলিত ও নস্যাৎ করেছে।
সে-
অর্থে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন থেকে আমরা ৩৭ বছর দূরে বা পেছনে পড়ে আছি।
ইউকেবেঙ্গলিঃ
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে একজন
মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আপনার কেমন লেগেছে?
খালেকুজ্জামানঃ
জামায়াত নিজের গুণে রাষ্ট্র-ক্ষমতার শরীক হয়নি।
স্বাধীন
দেশের মুক্তিযুদ্ধের ধারক ও ঘোষক দাবীদার শাসক-শ্রেণীর মদদে এবং পৃষ্ঠপোষকতায় তারা
এ-সুযোগ পেয়েছে।
জনগণ
তাদের পরাসত্ম করেছিল আর শাসক-শ্রেণী তাদের পুনর্বাসিত করেছে।
কারণ
'৭১
সালে তারা ছিল পাকিস্তানী উপনিবেশিক শক্তির দালাল।
সে-অর্থে বাঙালী উঠতি ধনিক শ্রেণীর সাথে ছিল এদের
'মারো
কিংবা মরো'
সম্পর্ক।
কিন্তু
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে যে-পুঁজিবাদী শোষণ-লুণ্ঠনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হয়েছে
জামায়াত সে-ব্যবস্থার দক্ষ শরীকে পরিণত হয়েছিলো।
সে-
অর্থে তারা এখন শাসক বুর্জোয়া শ্রেণীর সহচর।
যতোটুকু
বিরোধ এখনও দৃশ্যমান হচ্ছে,
তা ধনবাদী ব্যবস্থার লুণ্ঠন ও ভাগ-বাঁটোয়ারার দ্বন্দ্ব এবং প্রতিযোগিতা মাত্র।
স্বাধীনতা-বিরোধী
এ-ঘাতক-শক্তির বিরুদ্ধে যে জ্বলন্ত ঘৃণা জন-মনে রয়েছে,
কথিত জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া-শক্তি তাকে ব্যবহার করে এসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কিংবা
তাদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-আদর্শিক উচ্ছেদের জন্য নয়।
বরং
বিপ্লববাদী,
প্রগতিবাদী শক্তি ও গণ-আন্দোলন বিকাশের বিরুদ্ধে কাজে লাগানো,
দ্বি-দলীয় মেরুকরণের কোনো এক মেরুর শক্তি বৃদ্ধি ইত্যাদি কাজে ব্যবহারের জন্য এই
শক্তিকে চাপে ফেলে।
সেটাই
আমরা দেখছি ৩৭ বছর ধরে।
খালেকুজ্জামান
ভূঁইয়া মনে করেন বাংলাদেশে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অক্ষত রেখে এবং বুর্জোয়া শ্রেণীর উপর
নির্ভর করে কিংবা তাদের সহযোগিতায়
hy×vcivax
ও স্বাধীনতা-বিরোধী চক্রকে উচ্ছেদ করা
সম্ভব নয়।
তবে
জামায়াত ক্ষমতার যতো কাছাকাছি আসছে,
ততই তার স্বরূপএবং চরিত্র আরো বেশি করে উন্মোচিত হচ্ছে।
৫ বছর
জোট সরকারের শরীক থেকে জামায়াত তার নৈতিক অবস্থান হারিয়েছে।
১৭ জন
এমপির মধ্যে ১২ জনই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলো।
সে-অর্থে এবং সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড়ো দুর্নীতিবাজ দল হিসাবে তারা আবির্ভূত
হয়েছিলো।
ইউকেবেঙ্গলিঃ
১/১১ পরে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এনজিও সিভিল সমাজের প্রতিনিধিরা রাষ্ট্র চালাচ্ছে।
এর
মধ্যে দুর্নীতিবাজদের গ্রেফতার করা হয়েছে আবার ছেড়েও দেয়া হয়েছে।
সমানে
একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখও ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
আপনার
কী মনে হয় দেশের রাজনীতিতে কোন গুনগত পরিবর্তন আসবে?
দুর্নীতিবাজ,
কালো টাকা আর পেশী শক্তিমুক্ত নির্বাচন কী সম্ভব?
খালেকুজ্জামানঃ
৩৭ বছর ধরে বুর্জোয়া শ্রেণীর বিভিন্ন গোষ্ঠীর গায়ে যে ময়লা তথা কলঙ্কের দাগ পড়েছিলো,
১/১১ এর পর্দা ঝুলিয়ে সেগুলোকে পরিষ্কার করে আবার সেই দুর্নীতিগ্রস্ত দুর্বৃত্তায়িত
রাজনীতিকেই পুনর্বাসিত করা হচ্ছে।
এর জন্য
সেনা-প্রহরায় সুশীলদের এবং তাদের আত্মীয়দের গ্রন্থনা ও পরিচালনায়
'ধরো
ছাড়ো'
নাটক মঞ্চস্থ করতে হয়েছে।
বিদ্যমান শোষণমূলক পুঁজিবাদী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা অর্থাৎ দুর্নীতির উৎস বহাল রেখে
দেশের রাজনীতিতে যে গুণগত কোন পরিবর্তন সম্ভব নয় তা এখন অনেক পরিস্কার হয়ে আসছে।
এটাও
বুঝা যাচ্ছে বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরোর মত কালো টাকা ও পেশী শক্তি মুক্ত নির্বাচন
বাসত্মবে সম্ভব হচ্ছে না।
নির্বাচনের স্বাচ্ছতা এবং গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখোমুখী হবে।
বিশ্বব্যাপী
বামপন্থার এক-ধরণের হাওয়া দেখা দিলেও বাংলাদেশের বামপনী্থ আন্দোলনের নাজুক অবস্থা
বিরাজ করার কারণ সমপর্কে বাসদ আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া জানান বাংলাদেশের
রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে এমন কোন গণ-আন্দোলন নেই যা বামপন্থীদের উদ্যোগ এবং
আত্মত্যাগ ছাড়া গড়ে উঠেছে।
অথচ
একটি সঠিক মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও সত্যিকারের বিপস্নবী দলের নেতৃত্ব এসব
আন্দোলনের উপর প্রতিষ্ঠিত না থাকার কারণে বারে-বারে তা ব্যর্থ ও বিপথগামী হয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই তা বামপন্থী শক্তিকে দুর্বল ও গণবিচ্ছিন্ন করেছে।
তবে
অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয়েছে।
১০/ ১৫
বছর সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের বামপন্থী আন্দোলন এ-দুর্বলতা কাটিয়ে উঠবে বলে ধারণা
খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া।
ইউকেবেঙ্গলিঃ
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সমস্যা কোথায়?
খালেকুজ্জামানঃ
শাসক শ্রেণীর সদিচ্ছার অভাব এবং শ্রেণীগত অবস্থান মূল সমস্যা।
বামপন্থীদের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী গণ-আন্দোলন ছাড়া এ-সমস্যা অতিক্রম করা কঠিন।
ইউকেবেঙ্গলিঃ
আপনার মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতি সম্পর্কে কিছু বলুন।
খালেকুজ্জামানঃ
আমি ১৯৭১ সালে সাবেক কুমিল্লা জেলার এফএফ বাহিনীর অধিনায়ক হিসাবে দায়িত্ব পালনের
চেষ্টা করেছি।
আমাদের
স্মৃতিচারণের চেয়ে লক্ষ্য শহীদের আরদ্ধ কাজ সম্পাদনের নতুন অঙ্গীকার এখন জরুরী।
এটা
ছাড়া স্মৃতি একটা দুঃসহ বোঝা হয়ে থাকবে।
আপলৌড ১৬
ডিসেম্বর ২০০৮ |