|
বিজয় দিবস সংখ্যা ২০০৮
পরাজিত শক্তি আমাদের স্বপ্ন-পূরণে ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে
-
মেঃজেঃ
(অবঃ) কেএম সফিউল্লাহ্ (বীর উত্তম)
মেজর
জেনারেল (অবঃ) কেএম সফিউল্লাহ্ (বীর উত্তম)
।
২৫ মার্চের কালো রাতে বিদ্রোহ
ঘোষণা করেছিলেন পাকিস্তানী সরকারের বিরুদ্ধে।
ছিলেন ইস্ট বেঙ্গল
রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড।
মুক্তিযুদ্ধে এস-ফোর্সের
চীফ,
৩নং
সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে
দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের
সামরিক বাহিনীর চীফ অব স্টাফ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
স্বাধীনতা-যুদ্ধে
সাহসিকতার স্বীকৃতি-স্বরূপ পেয়েছেন বীর উত্তম উপাধি।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের
দাবীতে গড়ে তুলেছেন সেক্টর কমান্ডার্স ফৌরাম।
স্বাধীনতা সংগ্রাম ও
যুদ্ধাপরাধী বিষয়ে গত ২ ডিসেম্বর ঢাকায় ইউকেবেঙ্গলির মুখোমুখি হয়েছিলেন কেএম সফিউল্লাহ্। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন
সৌরভ রহমান।
ইউকেবেঙ্গলিঃ ১৯৭১-এ
যে-স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন আজকের বাংলাদেশ কি সে-স্বপ্ন পূরণ করতে পারছে
?
কেএম সফিউল্লাহঃ যে-স্বপ্ন নিয়ে
আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, আজকের বাংলাদেশ সে-স্বপ্ন পূরণ করতে পারছে না।
আমাদের সবার
ভুলভ্রান্তিই এর জন্য দায়ী।
আমরা যুদ্ধ করেছিলাম
পাকিস্তানী সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে।
ক্ষমতাবান শাসক গোষ্ঠীর
বিরুদ্ধে।
মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লক্ষ মানুষের
শহীদ হওয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য আজও কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি।
হয়নি, কারণ আমরা বোধহয়
একটু বেশি মহানুভব হয়ে গিয়েছিলাম।
আমরা ভেবেছিলাম রাজাকার,
আল-বদর-সহ
স্বাধীনতা-বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল অংশ সংশোধিত হয়ে যাবে।
কিন্তু পরাজিত শক্তি তা
মনে করেনি।
পরাজিত শক্তি আমাদের
স্বপ্ন-পূরণের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউকেবেঙ্গলিঃ
মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নগুলো কেনো ব্যর্থ হয়েছে
?
কেএম সফিউল্লাহঃ আসলে পরাজিত
শক্তি কখনও হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেনি।
একাত্তরে যারা আমাদের
বিরুদ্ধে গিয়েছিলো পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।
কিন্তু তারা পরাজয়ের
অপমান ভুলে যায়নি।
গোপনে শক্তি সংগ্রহ
করেছে।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ঢুকে
পড়েছে।
২০০১-এর নির্বাচনে তারা রাষ্ট্র
ক্ষমতায়ও ঢুকে পড়েছে।
এসবই তারা করছে
বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য।
এখন তারা এতটাই
প্রতিষ্ঠিত যে-জনসমুক্ষে মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে।
২০০১-এ যখন বিএনপির সাথে
মিলে যুদ্ধাপরাধীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলো তখন থেকে কোন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমি
অংশগ্রহণ করি না।
কারণ, যুদ্ধাপরাধীদের সাথে হাত
মেলাতে আমি চাই না।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের
মুখোমুখি করার জন্য আমরা এ-সরকারের কাছে দাবী জানিয়েছিলাম, কিন্তু সরকার আমাদের
কথায় কর্ণপাত করেনি।
কেনো করেনি, তার নেপথ্য
কারণ আমরা জানি না।
হয়তো তারা ভাবছে
অন্তবর্তী সময়ের মধ্যে তারা বিচার প্রক্রিয়া শেষ করতে পারবে না, অথবা এ-সরকার হয়তো
অদৃশ্য কোনো চাপে ছিলো।
যাহোক, আমাদেরকে ৩৭
বছরের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার
করতে হবে।
তারা এমন কিছু অপরাধ করেছে যার
কোন ক্ষমা হয় না।
গণ-হত্যাকারীদের বিচার না করলে
মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন সফল হবে না।
ইউকেবেঙ্গলিঃ সামনে তো
নির্বাচন,
রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আপনারা
কী আশা করছেন?
কেএম সফিউল্লাহঃ শুধু আশা নয়
আমরা দাবী করছি।
আমরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের
সাথে মত বিনিময় করেছি।
আমাদের দাবীগুলো
সুস্পষ্ট ভাবে জানিয়েছি।
আমাদের প্রথম দাবী হলো -
যে-দলই ক্ষমতায় আসুক, তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যেনো সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকে যে, তারা
ক্ষমতায় এলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবেন।
কোন স্বাধীনতা-বিরোধী
শক্তির সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য করবেন না।
কোনো যুদ্ধাপরাধীকে
নির্বাচনে প্রাথী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া যাবে না।
এ-দাবী গুলো নিয়ে আমরা
আওয়ামীলীগ সহ সব দলের সঙ্গে কথা বলেছি।
বিএনপিকেও চিঠি দিয়েছি।
চিঠির উত্তর পেলে তাদের
সাথে কথা বলবো।
জামায়াতের সাথে কথা বলার কোন
প্রশ্ন আসে না।
তারা তো যুদ্ধাপরাধীদের দল।
ভৌটের রাজনীতিতে জামায়াতে
ইসলামীর গুরুত্ব প্রসঙ্গে কেএম সফিউল্লাহ জানান, ১৯৭৫ এর ১৫ অগাষ্টের পর
যে-সরকারগুলো বাংলাদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে, তারা আংশিকভাবে হলেও জামায়াতের
সমর্থন নিয়েছে।
সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেতে-পেতে
জামায়াত দেশের রাজনীতিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জামায়াত কিন্তু জানে
তারা স্বাধীনতা-যুদ্ধের পরাজিত শক্তি।
কোনো-না-কোনো দিন
১৯৭১-এর ভূমিকার জন্য তাদের জবাবদিহি করতে হবে।
নিজেদের বাঁচাতে তারা
দেশের রাজনীতিতে গ্রাউন্ড তৈরী করছিলো।
আমরা এটা বুঝিনি।
তারা যখন তরুণদের মাথায়
মৌলবাদের বিষ ঢোকাচ্ছিলো,
আমরা তখন চুপ করে বসে
থেকেছি।
তাদের মনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা
জাগাতে পারিনি।
শিবিরের তরুণ কর্মীদের বুঝাতে
হবে,
তারা কেনো তাদের নেতাদের
যুদ্ধাপরাধের দায় নিবে?
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবীর
আন্দোলনে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি করে সম্পৃক্ত করা প্রসঙ্গে কেএম সফিউল্লাহ বলেন,
মোট ১১ জন সেক্টর কমান্ডারের মধ্যে বেঁচে আছি আমরা ৫ জন।
আমরা সেক্টর কমান্ডার্স
ফৌরাম তৈরী করেছি।
আমাদের কাজ হলো বর্তমান
প্রজন্মকে এটা বুঝানো যে, স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তি ক্ষমতা সংহত করে আমাদের দেশকে
ব্যর্থ করে দিতে চায়।
ওই যুদ্ধাপরাধীদের
বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
ক্ষমা করা যাবে না।
আমরা তো দাবী তুলে
দিয়েছি নতুন প্রজন্মকে সে-দাবী এক কন্ঠ থেকে হাজার কন্ঠে ছড়িয়ে দিতে হবে।
ইউকেবেঙ্গলিঃ যে-চেতনা
থেকে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন তাতে কি ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে উপহার দেয়া যেতো না?
কেএম সফিউল্লাহঃ অবশ্যই যেত।
১৯৭২-এর সংবিধান ছিলো
ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সংবিধান।
ধর্মনিরপেক্ষতা মুছে
দিয়ে মূল জায়গাতেই প্রথম আঘাত করা হয়েছে।
সব রাজনৈতিক দলের কাছে
আমাদের দাবী পুনরায় ১৯৭২ এর সংবিধান ফিরিয়ে আনতে হবে।
আপলৌডঃ ১৬
ডিসেম্বর
২০০৮ |