|
বিজয় দিবস সংখ্যা ২০০৮
জাতিকে ঋণ মুক্ত করার জন্যই যুদ্ধাপরাধীর বিচার হওয়া দরকার
-
জহুরুল হক (বীর প্রতীক)
জহুরুল
হক (বীর প্রতীক)।
১৯৭১ সালে ১১ নং সেক্টরে কর্ণেল
আবু তাহেরের নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছেন।
যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ
অবদানের জন্য বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত হয়েছেন।
স্বাধীনতার সময়
প্রত্যক্ষ করেছেন আল-বদরের কমান্ডার বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেট্যারী
জেনারেল কামারুজ্জামানের নারকীয় তাণ্ডব।
এ-বীর মুক্তিযোদ্ধা
সম্প্রতি ইউকেবেঙ্গলির মুখোমুখি হয়েছিলেন।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন
মোহাম্মদ আরিফুজ্জান।
ইউকেবেঙ্গলিঃ আপনি কীভাবে পাকিস্তানী আর্মীর কাছে ধরা পড়লেন?
জহুরুল
হকঃ ৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে একটি আত্মসমর্পণ প্রস্তাব-পত্র-সহ আমাকে টাঙ্গাইলে
পাকিস্তান আর্মীর ক্যাম্পে পাঠায় যৌথ বাহিনী।
আমি সকাল
১০টার দিকে একটি সাদা ফ্লাগ নিয়ে আর্মীর ক্যাম্পে যাই।
ক্যাম্পে যাবার
সাথে-সাথে পাকিস্তানী বাহিনীর লোকেরা আমাকে চোখ বেঁধে নিয়ে যায়।
ক্যাম্পে
আমাকে দু-ঘন্টা বসিয়ে রাখা হয়।
এরপর আসে কর্নেল সুলতান
খান।
যৌথবাহিনীর চিঠি দিই পাকিস্থানী
আর্মী কর্নেল সুলতান খানের কাছে।
সুলতান খান আমাকে উর্দু
ভাষায় বেশ কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে।
আমি তাকে বলি,
আমি উর্দু ভাষা বুঝি না।
এ-সময় একজন দোভাষী নিয়ে
আসে আর্মি।
দোভাষীটি ছিলেন জামায়াতের
বর্তমান সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল কামারুজ্জামান
।
কামারুজ্জামান আমাকে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আমি তাকে
বলি,
আমি একজন কৃষক।
মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে
জোর করে চিঠি দিয়ে পাঠিয়েছে।
আমি চিঠি না আনলে ওরা
আমাকে হত্যা করতো।
আমি বাধ্য হয়ে এসেছি।
এরপর কামারুজ্জামানের
নির্দেশে শুরু হয় আমার উপর ভয়াবহ নির্যাতন।
নির্যাতনের ফলে আমার
নিচের চারটি আর উপরের তিনটি দাঁত পড়ে যায়।
ওরা আমাকে প্রায় চার
ঘন্টা ঝুলিয়ে রাখে।
অবশেষে রাত ১১টার দিকে
ওরা আমাকে একটি চিঠি দিয়ে ছেড়ে দেয়।
আমি প্রায় ১৩ ঘন্টা পরে
ছাড়া পাই।
আমি চিঠি
নিয়ে চলে আসার পর যৌথ বাহিনী হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়
।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানী বাহিনী
ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
যৌথবাহিনীর আক্রমণে ৫২৫
জন পাক-সেনার মৃত্যু হয়।
১০ ডিসেম্বর সকাল ৬টায়
পাকিস্থানী বাহিনী ৮১০ জন সেনা নিয়ে যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।
ঐ আক্রমণে আমাদের শাহ
মোতাসিম বিল্লা খুররম শহীদ হন
।
১৯৭৩ সালে তাকে মরনোত্তর
বীরপ্রতীক খেতাব প্রদান করা হয়।
ইউকেবেঙ্গলিঃ কামারুজ্জামান-এর ৭১ ভূমিকা সম্পর্কে আপনি আর কী জানেন?
জহুরুল
হকঃ কামারুজ্জামান ছিলেন টাঙ্গাইল,
জামালপুর ও শেরপুরের
আলবদর বাহিনীর কমান্ডার।
আমি ১১ নং সেক্টরের
কর্ণেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের গোয়েন্দা হিসাবে কাজ করতাম।
গোয়েন্দা হিসাবে কাজ
করলেও সম্মুখ-যুদ্ধে অংশ নিয়েছি একাধিকবার।
কামরুজ্জামান যুদ্ধ শুরু
হবার আগে দোকানে-দোকানে মাল ফেরি করে বিক্রি করতেন।
শেরপুর জেলার শহরে সুরেন
স্যারের বাড়িটি দখল করে নেয় রাজাকার বাহিনী।
সুরেন স্যারের বাড়ি
দখলের নেতৃত্ব দেন কামারুজ্জামান।
পরবর্তীতে এ-বাড়িটি হয়ে
উঠে জল্লাদখানা।
এখানে পাকিস্তানী আর্মি মেজর
আইয়ুব আসতেন ।
কামারুজ্জামান মেজর আইয়ুবের
হাতে নারীদের তুলে দিতেন ধর্ষণের জন্য।
শেরপুরের নগলা,
ঝিনাইগাতি,
শ্রীবাট্রি,
বকশিগঞ্জ,
নালিতাবাড়ি এলাকা থেকে
নারীদের ধরে আনা হতো আর্মি ও রাজাকারদের জন্য।
ধর্ষণে
কামারুজ্জামানও অংশগ্রহণ করতেন।
অনেক নারী-পুরুষকে এখানে
হত্যা করা হয়েছে।
হত্যার পরে তাদের লাশ ফেলে দিতো
বাড়ির পেছনে পুকুরে।
বাড়ীর দোতলায় মেয়েদের
আটকে রেখে পাক বাহিনী ও তাদের দোসর কামারুজ্জামানরা অত্যাচার করতেন।
গেলাম
মোস্তফা ও বুলবুলকে কামারুজ্জামান নির্মমভাবে হত্যা করে
।
ইউকেবেঙ্গলিঃ মুক্তিযুদ্ধে আপনার কাজের ক্ষেত্র নিয়ে কিছু বলুন।
জহুরুল
হকঃ আমি মুক্তিবাহিনীর গোয়েন্দা হিসাবে কাজ করতাম।
এর অংশ হিসাবে
গাইবান্ধায় একবার ৩০টি কলা খাইয়ে ২৮জন পাক-সেনাকে হত্যা করেছিলাম।
শেরপুরের সুরেন স্যারের
বাড়ীটি ঘাতক কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে দখল করেছিলো রাজাকাররা।
ঐ বাড়িতে পাক-আর্মীর
মেজর আইয়ুব আসতেন।
মুক্তিযোদ্ধারা আইয়ুবকে
হত্যা করার পরিকল্পনা করে।
মিরকান্দি এলাকায় আমরা
একটা পুল উড়িয়ে দেবার জন্য মাইন বিস্ফোরণ করি।
এরপর এলএমজি দিয়ে গুলি
করে মেজর আইয়ুবকে আমি হত্যা করি।
ইউকেবেঙ্গলিঃ কেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন?
জহুরুল
হকঃ একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী দেশ চেয়েছিলাম
।
অথচ পেলাম কী! এতো বছর পর এসে
আমার শুনতে হচ্ছে দেশে নাকি কোন কালে যুদ্ধাপরাধ হয়নি।
এ-বক্তব্য দেওয়ার সাহস
আমরাই করে দিয়েছি।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার
করাটা দেশের অস্তিত্বের জন্যই প্রয়োজন।
জাতিকে ঋণ মুক্ত করার
জন্যই যুদ্ধাপরাধীর বিচার হওয়া দরকার।
আর তা যদি না হয়, তবে
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ খুব ভালো নয়।
আপলৌডঃ ১৬
ডিসেম্বর ২০০৮ |