London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

শাসকরা চায় না জনতা নিজেদের মধ্যে একতাবদ্ধ থাকুকঃ মহাশ্বেতা দেবী

সাক্ষাতকার গ্রহণেঃ চিত্রা পাল, সুইডেন থেকে

দিনটি ছিলো অন্যান্য দিনের চেয়ে কিছুটা আলাদা। প্রবাস জীবনের একঘেয়েমী আর শরতের সুধা মাখা মায়াবী এক পশলা প্রশান্তির বৃষ্টি। স্বচ্ছতোয়ার সুধা স্নানে সিক্ত। এক অপূর্ব সংযোগ আর নাড়ীর গভীর টানে দিনের কাজ শেষে বাস ধরে ছুটছি স্লুশেনের দিকে। সাথে সুইডেনের নারীবাদী লেখিকা পিয়া ইসাকসন। গন্তব্যস্থল ভারতীয় পাঠাগারে ভারতীয় সাহিত্য সন্ধ্যা। আনুষ্ঠানিক কবি-সাহিত্যিক পরিচিতি সন্ধ্যা। হলরুম বেশ ছিমছাম সাজানো ভারতীয় আদলে। দেয়ালের গায়ে কিছু শাড়ী ঝোলানো, জানালার কার্নিশে নিভু-নিভু আলোর প্রদীপ, টেবিলে টবে রাখা থোকা-থোকা ফুল। আস্তে-আস্তে বাড়ছে লোকের সমাগম।

একটু পরেই সদর দরজায় কনিষ্ঠ সহোদরার হাত ধরে ঢুকলেন ভারতের পশ্চিম বাংলার সৃজনশীল সাহিত্যিক ও মানবাধিকার নেত্রী মহাশ্বেতা দেবী, যিনি ২০০৮ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কারের জন্য প্রস্তাবিত ছিলেন।

প্রতি বছরের মতো এবারো সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে হয়ে গেল সুইডেনের সবচেয়ে বড়ো বইমেলা। বহুদেশের আলোচিত সাহিত্যিকদের সাথে ভারত থেকে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। সাথে এসেছেন আরো দু-জন, ভারতের কেরালা থেকে আনিতা নায়ের এবং দিল্লী থেকে আম্বাই। ভারত থেকে আগত সাহিত্যিকদের সুইডেনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার লক্ষ্যেই এই অনুষ্ঠান। ইউকেবেঙ্গলির পক্ষ থেকে সাক্ষাতকারের জন্য সময় আগে থেকেই নির্ধারিত ছিলো। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর চা-পর্বে মহাশ্বেতা দেবীর কাছ থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় স্টকহোমের বিশ্ব পাঠাগারে এই সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেন ইউকেবেঙ্গলির চিত্রা পাল

ইউকেবেঙ্গলিঃ আপনি কি এখনও লিখছেন?

মহাশ্বেতাঃ লিখি (একটু দম নিয়ে উত্তর দেন) । কাজের ফাঁকে-ফাঁকে লিখি। আমার চারপাশে যখনই কোনো অন্যায় দেখি আমি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি। আর প্রতিবাদ করতে গিয়েই লেখা হয়ে যায়। কারন লেখাই আমার প্রতিবাদের ভাষা ও হাতিয়ার।

ইউকেবেঙ্গলিঃ আপনি একাধারে সাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং একসময় অধ্যাপক ছিলেন। এ-পর্যন্ত ১০০ এর উপর বই লিখেছেন। ১৮টি বই সুইডিশ ভাষাতে অনুবাদ হয়েছে। আপনি ধর্মীয় কু-প্রথা, বর্ণ ও দলিত সমস্যা নিয়ে লিখেছেন। আপনার এ-ধরণের লেখায় সমাজের তথা রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার স্বরূপ কী?

মহাশ্বেতাঃ দু-মাস আগে একটা গল্প লিখেছি হিন্দু সমাজের ধর্মীয় কু-প্রথার উপর ভিত্তি করে। ভারতের পশ্চিম বাংলায় হিন্দু সমাজে নিম্ন এবং উচ্চ বর্ণের মধ্যে যে-আত্মঘাতী বৈষম্য, তাতে সমাজের সকল স্তর জর্জরিত। এ-সমস্যার শিকার সব চেয়ে বেশি মেয়েরা এবং তারা কোনো-না-কোনোভাবে এ-বৈষম্যের দ্বারা নির্যাতনের শিকার। ধর্মের নামে প্রতিনিয়ত চলছে নারী নির্যাতন। এটি এক ভয়াবহ মহামারী! সমাজে ও রাষ্ট্রে হাটে-ঘাটে প্রতিনিয়ত যা ঘটে চলেছে, তার প্রত্যক্ষদর্শী আমি। চার পাশে ঘটে যাওয়া ঘটনার সাক্ষী আমি। যা দেখছি তাই হয়ে উঠছে, আমার লেখার বিষয় ও উৎস । জনমতের সাথে সমাজকে সম্পৃক্ত করা এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিদ্রোহী ও প্রতিবাদী চিন্তার প্রবাহ বইয়ে দেয়া আমার কাজ।

ইউকেবেঙ্গলিঃ আপনি বিশেষ একটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের অর্থাৎ 'ডি-নোটিফাইড' আদিবাসীদের মৌলিক মানবিক অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। আপনার এ-কাজের প্রেরণার উৎস কী?

মহাশ্বেতাঃ এখানে প্রেরণার কোনো ব্যাপার ছিলো না । স্বাভাবিকভাবেই হয়েছে। কাজ করতে করতেই এর সাথে জড়িয়ে গেছি। ব্রিটিশ সরকার ১৮৭১ সালে ভারতের অরণ্যবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়কে অন্যায় ভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে। ভারতে এ-ধরণের অনেক ক্রিমিন্যাল ট্রাইবুন্যাল আছে, যার আওতায় যে-কোনো সময় নিরীহ সরল-সহজ মানুষকে বিনা অপরাধে গুলি করে মেরে ফেলতে পারেন। গত ৩০ বছর ধরে এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছি। একবার আমারই এলাকার একজন আদিবাসীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিলো। আমি তার হয়ে আদালতে মামলা করি এবং আইনের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত আমরা জয়ী হই। মৃত ব্যক্তির স্ত্রী ১ লাখ রুপী ক্ষতি-পূরণ পায়। এভাবে আদিবাসীদের প্রতিবাদ, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নাগরিক অধিকারের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সাংগঠনিক ভাবে জনগণের সাথে সম্পৃক্ত হই। আমাদের জনমত গঠন করতে হয়েছে। গোটা ভারতে ২ কোটি মানুষ আমাদের আন্দোলনের সাথে শরীক হয়েছে। আমরা সরকারের কাছে গেছি এবং প্রস্তাবনামা পেশ করেছি। আমাদের সাথে আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকেরাও থাকে। এভাবে কাজ করতে করতে এক ধরণের সম্পৃক্ততার সেতু তৈরী হয়ে গিয়েছে। এভাবেই আমি কাজ করে যাচ্ছি।

আলাপের এ-পর্যায়ে হাল্‌কা বিরতি। সঙ্গী ছোটো-বোন কানের কাছে ঝুঁকে বললো,' দিদি তুমি কিছু খাইব্যা?' হাতে একটা প্লেইটে সুইডিশ পনির, কালো আঙ্গুর, মচ্‌মচে বিস্কিট। কাছে গিয়ে বললাম,' দিদি, আমার কথা কিন্তু শেষ হয়নি।' মহাশ্বেতা দেবী হেসে বললেন,' জিজ্ঞেস করো। আমি উত্তর দেবো!'

ইউকেবেঙ্গলিঃ আপনি যাদের নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের কি নিজস্ব কোনো ভাষাগত প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে তারা নিজের ভাষা এবং অন্য ভাষা দুটোতেই সমানভাবে শিক্ষা-লাভ করতে পারে। ভারতীয় সরকার এ-ব্যাপারে কি কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে?

মহাশ্বেতাঃ পুঁথিগতভাবে কিছু নেই। সাঁওতালীদের নিজস্ব ভাষা রেখেছে বাংলা স্ক্রীপ্টে। বাংলাদেশেও আছে। বর্তমান বাংলাদেশেও আদিবাসী আছে এবং বহু-বছর থেকে এ-সম্প্রদায় বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন অল্প-বিস্তর কিছু কথা বলছে ওদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অধিকার নিয়ে।

ইউকেবেঙ্গলিঃ বাংলাদেশের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে কিছু করছেন কি?

মহাশ্বেতাঃ না, তেমন কিছু হয়ে ওঠেনি। তবে মনে হয় তারা (বাংলাদেশ) কিছু একটা করবে। একটা প্রজেক্ট তো কয়েক বছর থেকে ঝুলে আছে। তবে সেখানকার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্ম-কাণ্ড সম্পর্কে আমার ধারণা আছে।

ইউকেবেঙ্গলিঃ ভারতের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের রাজনীতির অনুরূপ পরিস্থিতি বাংলাদেশেও বিরাজমান। আপনার দৃষ্টিতে মূল সমস্যাটা আসলে কোথায় এবং এর উত্তরণের পথ কী?

মহাশ্বেতাঃ শুধু ধর্মীয় বলাটা ভুল হবে আমার মতে। সমাজের ও রাষ্ট্রের শাসক ও শোষকরা চায় না আম-জনতা নিজেদের মধ্যে একতাবদ্ধ থাকুক। মূল সমস্যাগুলো হচ্ছে ক্ষমতা, জমির মালিকানা, অশিক্ষা, অসম-বন্টন, ধর্মীয়-অনুশাসন, সামাজিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতি, পারিবারিক বৈষম্য ইত্যাদি। তবে আমরা মনে করবো না মুসলমানদের জন্য বা হিন্দুর জন্য আলাদা-আলাদা কোনো রাষ্ট্র হলেই ভালো। এতে করে কোনো ভালো হয় না। সামাজিক পরিবর্তন ঘটেছে অনেক। পৃথিবীর মানচিত্রের হয়েছে অদল-বদল। অখণ্ড ভারত বিভক্ত হয়েছে। আবার বড়ো দেশ অন্য দেশকে গ্রাস করছে। একই সাথে বিলুপ্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য। সারা পৃথিবীতে যে-আতঙ্কবাদী সন্ত্রাস-আক্রমণ চলছে, এটাকে আমি অন্তর থেকে ঘৃণা করি। এটা মানব সভ্যতা বিরোধী কাজ।

ইউকেবেঙ্গলিঃ ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাসলিমা নাসরীন ইস্যুতে যে-ভূমিকা নিয়েছে, সে-ব্যাপারে কিছু বলবেন কি?

মহাশ্বেতাঃ সত্যি কথা কি, ভারত ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার তসলিমাকে অনেকটা জোর করেই মুসলমান বানিয়েছে। আমরা হিন্দু-মুসলমান সমেত অনেকেই দিল্লিতে গিয়েছি। তসলিমার ভারতে থাকার ব্যাপারে সরকারকে চাপ দিয়েছি। আমরাতো আসলে কিছু করতে পারি না, শুধু দাবী করতে পারি। পশ্চিমবঙ্গ সরকার কারও কথা শুনছে বলেতো মনে হচ্ছে না। এ-সরকার আসলে জনগণের ভালো চায় না। লেখো লেখো, যতো পারো লেখো, চাপ সৃষ্টি করো, জনগণের চেতনাকে জাগাও।

ইউকেবেঙ্গলিঃ আপনার জন্ম ঢাকাতে। দেশ স্বাধীন হবার পর আপনি কি বাংলাদেশে গিয়েছেন কখনও? গিয়ে থাকলে কেমন লেগেছে? মিল-অমিল খুঁজে পেয়েছেন কিছু?

মহাশ্বেতাঃ বাবা চাকুরির সুবাদে ঢাকাতে ছিলেন। তখন আমার জন্ম হয়। আমার মামা এবং পিসীর বাড়ীও ঢাকাতে। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে যাই সাহিত্য একাডেমীর একটা টীম নিয়ে। তখন আখতারুজ্জমান ইলিয়াস বেঁচে ছিলেন। আরেকবার গিয়েছিলাম নজরুলের জন্মশতো-বার্ষিকীতে। এ-পার আর ও-পারের কোনো পার্থক্য খুঁজে পাইনি আমি; যেটুকু অমিল আছে, তা শুধু রাজনৈতিক কারণে।

ইউকেবেঙ্গলিঃ আমার শেষ প্রশ্ন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। ২০০১ সালে নির্বাচনের পর জোট সরকারের সময় বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিধন, মন্দির ও গীর্জা ভাঙ্গা-সহ নারী ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়। অনেক সংখ্যালঘু জন্মভূমি বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে বলে জানা যায়। এদের বেশির ভাগ পশ্চিমবঙ্গেই আশ্রয় নিয়েছেন বলে শোনা যায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ব্যাপারটা কীভাবে দেখছে বলে আপনার মনে হয়? বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনার বর্তমান ধারণার কথা বলুন।

মহাশ্বেতাঃ যে-কোনো দেশের মৌলবাদীদের আমি ঘৃণা করি। জঘন্য! বাংলাদেশে এ-ধরণের ঘটনা ঘটবে এমন ধারণা আমার ছিলো না। পশ্চিম বঙ্গের পত্র-পত্রিকায় এসব খবর সেভাবে ছাপেনি। এ-সবই চালবাজী। সত্যি কথা কি, বর্তমানের পশ্চিমবঙ্গ সরকার কখনও কোনো ভালো কাজ করেনি। এমন কি ভবিষ্যতে করবে বলে আমি বিশ্বাস করি না। আমি তো কাজ করে যাচ্ছি, এখনও অনেক কিছু করার আছে।

ইউকেবেঙ্গলিঃ আমাকে সময় দেবার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।

মহাশ্বেতাঃ ধন্যবাদ তোমাকেও।

আপলৌড ২৭ অক্টোবর, ২০০৮

 

আজকের প্রধান খবর8

জুলাই আর্কাইভ 8

আর্কাইভ8

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.