|
জেল-জীবন গতানুগতিক ছিলো নাঃ সাক্ষাতকারে ওবায়দুল
কাদের
ওবায়দুল
কাদের।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ
সম্পাদক।
বাংলাদেশে সেনা নিয়ন্ত্রিত
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতায় আসার পরে,
গত বছরের ৯ মার্চ তাকে
গ্রেফতার করা হয়।
দীর্ঘদিন কারা-অভ্যন্তরের থাকার
পরে এ-মাসের ৬ তারিখে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন ওবায়দুল কাদের।
কারাবাস অবশ্য কাদেরের
জন্য নতুন কিছু নয়।
প্রথম ফৌজী-শাসক জিয়াউর
রহমানের সময়ও একত্রিশ মাস জেইলে ছিলেন তিনি।
এবারের
জেইল-জীবনকে কাদের বলেছেন 'আত্মশুদ্ধির'
জেইল।
কেনো এ-উপলব্ধি?
ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাবিন ব্লকের ৩১৮ নং রুমে শুয়ে এ-ব্যাপারে
সম্প্রতি তিনি কথা বলেছেন ইউকেবেঙ্গলির সাথে।
এছাড়াও জানিয়েছেন অদৃশ্য
এক 'উপরের'
নির্দেশে
কারা-অভ্যন্তরের থাকা অবস্থায় চিকিৎসা-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবার কথা।
পড়ুন মোহাম্মদ
আরিফুজ্জামানের নেয়া সাক্ষাতকারটি
।
ইউকেবেঙ্গলিঃ কেমন আছেন?
ওবায়দুল
কাদেরঃ আমার অবস্থা খুব খারাপ।
মেডিক্যাল বৌর্ডের
পরামর্শ হলো, দ্রুত বিদেশে যাওয়ার।
যেখানে আমি আগে চিকিৎসা
নিতাম,
সেই ভারতের
এাপৌলোতে।
২০০৪-এর ২১ আগস্ট
আওয়ামীলীগের জনসভায় গ্রেনেইড হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে সেখানে প্রফেসর জৈন আমার
চিকিৎসা করেছেন।
চিকিৎসার পর আমার শরীর থেকে
অর্ধশতাধিক স্প্লিন্টার বের করতে সক্ষম হয়
এাপৌলো।
কিন্তু আরও ৪১টি
স্প্লিন্টার রয়ে গেছে আমার শরীরে।
এর মধ্যে মেইজর একটি
অপারেশন হয় লৌয়ার
এাবডৌমেনে।
ওখানে বড়ো একটি দাগ
রয়েছে।
যদি আমার চিকিৎসা নিতে দেরী হয়,
তাহলে আমার কিডনী নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকেরা।
ইউকেবেঙ্গলিঃ কারাগারে কেমন ছিলেন?
কাদেরঃ
এবারের জেইল-জীবনটা আসলে গতানুগতিক ছিলো না।
অনেক বিষয় আছে, যা এখন
আমি বলতে পারছি না।
রবীন্দ্রনাথের কথাই বলতে
হয়,
'কেনো এসব কথা,
এরচেয়ে অনেক ভালো চুপ করে থাকা।'
এসব কথা বলে কাউকে
বিব্রত করতে চাই না।
আমার এখন সুস্থ হওয়া
দরকার।
জেইলে আমি লেখাপড়া করেছি।
জেইলে এই আলো,
এই অন্ধকার।
ইউকেবেঙ্গলিঃ কারাগারে আপনার চিকিৎসা কেমন চলেছে?
কাদেরঃ
কাশিমপুর জেলখানার ডাক্তাররা আমাকে বলেছিলেন,
আপনাকে প্রতিদিন হাঁটতে
হবে।
কারাগারের মধ্যে সেটা সম্ভব
ছিলো না।
তখন কারা কর্তৃপক্ষ
জানিয়েছিলেন,
একদিন পর
পর আমাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আনবেন ফিজিওথেরাপী ও
প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়ার জন্য।
অথচ ওরা আমাকে ১৫ দিন,
২ মাস আবার কখনো ৬ মাসের
ব্যবধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এনেছে।
আমি-তো বন্দী।
কারা কর্তৃপক্ষের কাছে
জিজ্ঞেস করলে তারা বলে,
ওপরের নিষেধ আছে।
এত বেশি সুযোগ যাওয়া
যাবে না।
এখন
এখানে,
কী বলবো,
দুর্নীতি দমন অভিযানের
বিষয়টি আসলে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে।
এখানে অনেক সুস্থ লোকও
হাসপাতালে আছে।
ইউকেবেঙ্গলিঃ কারাবাস,
ফ্ল্যাট জব্দ ও চিকিৎসা,
সবকিছু মিলিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
কাদেরঃ
আমার এখন একটাই প্রশ্ন,
তা হচ্ছে আমার আড়াই
রুমের একটা ঘর, যার দাম ১৩ লাখ টাকা।
এখন সে-ঘর সরকারের দখলে।
জেলখানা থেকে বের হলাম,
আমার ছাদ তো এখন খোলা
আকাশ।
আমার ঘর তো এখন আমার কাছে নেই।
আমি এখন যাবো কোথায়?
প্রশ্নটা কার কাছে করবো?
এ-কারণেই বললাম,
শুধু-শুধু কেনো এসব কথা,
এর চেয়ে অনেক ভালো চুপ
করে থাকা।
এখন চুপ করেই থাকতে চাই।
আমার এখন অবস্থা খারাপ।
ইউকেবেঙ্গলিঃ আপনি সম্প্রতি বলেছেন,
এবারের কারাবাস ছিলো
রাজনীতিবিদদের জন্য অন্যরকম,
আত্মশুদ্ধির।
এটা কি একটু ব্যাখ্যা
করবেন?
কাদেরঃ
এ-বক্তব্য দেয়ার পেছনে কারণ রয়েছে।
আমার কাছে মনে হয়েছে,
কারাগার আমাদের
রাজনীতিবিদদের জন্য পাঠশালা।
আমি সেখানে অনেক কিছু
শিখেছি।
বিভিন্ন ধরণের লোক সেখানে।
বড়ো দলগুলোর নেতাদের
সাধারণত সামাজিক অনুষ্ঠানেও একের সঙ্গে অন্যের দেখা হয় না।
এক পার্টি এলে,
অন্য পার্টি আসতো না।
কিন্তু আমরা কারাগারে
একে অপরকে কাছে থেকে দেখেছি।
কারাগারের ভিতরের চিত্র
একদমই ভিন্ন।
কারাগারে থেকে আমার মনে হয়েছে,
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে
পারস্পরিক
সৌজন্যবোধটা থাকবে না কেনো?
আমি মনে করি, রাজনীতিতে
একজন আরেকজনের প্রতিপক্ষ হতে পারে,
শত্রু নয়।
বিএনপির একজন লোককে আমি
আমার প্রতিপক্ষ ভাবি কিন্তু শত্রু ভাবি না।
আমার কাছে বিষয়টি এ-রকমই।
আমাদের অনেক কিছু শেখার
আছে।
আর তাই আমার কাছে মনে হয়েছে
কারাগার আমাদের জন্য পাঠশালা।
ইউকেবেঙ্গলিঃ কারাবাসের এই দীর্ঘ সময়টাতে কী-কী করলেন?
কাদেরঃ
জেল-জীবনে আমি আমার একটা আত্মজীবনী লিখেছি।
মামলা-মোকদ্দমার জন্য
নিয়মিত লিখতে পারিনি।
মাঝখানে একটা মামলা
স্থগিত হয়েছিলো অনেকদিনের জন্য।
ঐ সময় লিখেছি।
জেলখানার অলস সময় আমি বই
পড়ে আর লেখা-লেখি করে কাটিয়েছি।
এ-দেশের অনেক নেতা মরে
গেছেন;
বিশাল একটা ইতিহাস তাদের সঙ্গে
ছিলো।
তাদের অনেকেই কিছু লিখে রেখে
যাননি।
মৃত্যুর সময় সমাধিতে সব নিয়ে
গেছেন।
এসব কারণে আমি লিখতে উদ্বুদ্ধ
হয়েছি।
আমি সামান্য মানুষ।
কিন্তু আমার রাজনৈতিক
জীবন,
ছাত্র-রাজনীতির সময়টা তো কম নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের
ছাত্র-রাজনীতি,
আন্দোলন-সংগ্রাম কত কিছু।
আমি ছাত্রলীগের সভাপতি
ছিলাম।
এসব অভিজ্ঞতা নিয়েই লিখেছি।
ইউকেবেঙ্গলিঃ আপনি আত্মজীবনী সম্পর্কে
ejwQ‡jb...
কাদেরঃ
আমি আত্মজীবনীটা এ রকমভাবে লিখেছি,
Glimpses from window of a passing Train’
একটা চলন্ত ট্রেন থেকে
জানালা পথ দিয়ে কয়েক নজর।
খুব বেশি বিষয় আমি
অবতারণা করিনি।
সামনের একুশে বইমেলায় বের করবো
লেখাটি।
এখন সম্পাদনার কাজটি করে রাখব।
ইউকেবেঙ্গলিঃ তারেক রহমানের গ্রেফতার ও জামিন,
আর আপনাকে গ্রেফতার ও
জামিন কাছাকাছি সময়ে ঘটেছে।
আপনার এবং তারেক রহমানের
রাজনৈতিক দলীয় পদও কাছাকাছি।
এটাকে কীভাবে দেখছেন?
কাদেরঃ
আমি এখন রাজনৈতিক মন্তব্য করবো না।
তবে মানবিক দিক যেটা,
সেখানে কিন্তু আমাদের
সংবেদনশীল হতে হবে।
একজন দাগী আসামীরও
মানবিক দিকটা না দেখার কোনো অধিকার আমাদের নেই।
আমার সামনে একজন মানুষ
মরে যাচ্ছে,
তাকে বাঁচানো আমার প্রথম
কর্তব্য।
আমি মনে করি যে,
কোনো মানুষের মানবিক
দিকটা প্রথমে বিবেচনায় আনতে হবে।
সে আসামী হতে পারে।
ন্যায় এবং নিরপেক্ষ
বিচারে তার যা হবে, সেটা তো তাকে ভোগ করতেই হবে।
তার বিচার হবে প্রচলিত
নিয়মে।
এরপর যারা সত্যিকার অর্থেই
দুর্নীতিবাজ ও
খারাপ লোক, তাদের অবশ্যই সাজা
পেতে হবে।
কিন্তু আমি মরে যাচ্ছি, এর
মধ্যে আমাকে আগে না বাঁচিয়ে বিচার করা, এটার সঙ্গে ন্যায়-বিচারের কোনো সম্পর্ক নেই।
ইউকেবেঙ্গলিঃ রাজনৈতিক প্রসঙ্গে আসি?
কাদেরঃ
না,
আমি এখন কোনো রাজনৈতিক মন্তব্য
করবো না।
আপলৌড ২৪ সেপ্টেম্বর ২০০৮ |