|
লন্ডনের
দুই বারার
দুই বাঙালী মেয়রের
সাথে একান্ত সাক্ষাতকার
লন্ডন
বিশ্বের অন্যতম সেরা এক শহর।
বহু জাতিসত্তার ও বহু ভাষাভাষী সাত থেকে সাড়ে সাত মিলিয়ন
মানুষের বাস এ-লন্ডনে। সুবিশাল
লন্ডন শহর মোট ৩২টি কাউন্সিল নিয়ে গঠিত। প্রতিটি কাউন্সিলে
১ জন মেয়র এবং ১ জন ডেপুটি মেয়র এবং বেশ ক’জন কাউন্সিলর
থাকেন। প্রথা অনুযায়ী সাধারণতঃ
কেউ ১ বারের বেশি মেয়র হতে পারেন না। মেয়র এর মেয়াদকাল ১
বছর।
বৃটেনের বাইরের বাঙালীরা
শুনলে হয়তো অবাক হবেন এই জেনে যে লন্ডনের দুটি কাউন্সিল-
টাওয়ার হ্যামলেটস ও ক্যামডেন-এ,
বর্তমানে মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন দুইজন বাঙালী।
এরা হলেন কাউন্সিলর মোহাম্মদ আব্দুস ছালিক ও কাউন্সিলর নুরুল ইসলাম।
ইউকেবেঙ্গলি থেকে তাসনীম জাহান ও জিএমএম ফখরুজ্জামান গত ১৬ ও ১৭ই জুলাই
গিয়েছিলেন এই দুই মেয়রের সাথে আলাপচারিতার জন্য।
নিচে মেয়রদ্বয়ের
সাক্ষাতকার
পড়ুন।
মেয়র
মোহাম্মদ আব্দুস ছালিক,
লন্ডন বারা অফ টাওয়ার হ্যামলেটস
পূর্ব-নির্ধারিত
সময় মোতাবেক ১৬ জুলাই বেলা আড়াইটায় মেয়র’স পার্লার
মালবেরী প্লেইসে-আমরা
দেখা করতে যাই টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র মোহাম্মদ আব্দুস ছালিকের সাথে।
সামনা-সামনি পরিচিতি-পর্বের পর শুরু হয়
আমাদের কথাবার্তা। কাউন্সিলর
হিসেবে মোহাম্মদ আব্দুস ছালিক ২০০২ এবং ২০০৬ সালে যথাক্রমে মাইল এন্ড ইষ্ট ও বেথনাল
গ্রীন নর্থ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। চলতি বছরের ২১শে মে থেকে
তিনি টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বাঙালী বংশোদ্ভূত মোহাম্মদ আব্দুস ছালিক লন্ডন টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র হিসেবে কী
অনুভূতি অনুভব করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আই ফিল গ্রেইট।
আমি এই কাউন্সিলে প্রথম শ্রেনীর নাগরিক হিসেবে রানীর প্রতিনিধি।
আমার আগেও অনেক মেয়র ছিলেন বাঙালী। মেয়র হওয়াতে আমি
অহংকার বোধ করছি না, কিন্তু আমার অনুভুতি বেশ ভালো। মেয়র
হিসেবে আমাকে বারার
ইতিহাস রিপ্রেজেন্ট করতে হয়। কাউন্সিলের অনেক ধরণের
আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করতে হয়।
বাঙালীদের জন্য অনেক কিছু করার ইচ্ছা আছে টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়রের
। বিশেষ করে ক্যাপাসিটি বিল্ডিং এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরী করা এবং
শিক্ষার বিষয়ে তিনি জোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তাছাড়া বাড়ী-ঘরের
সুবিধা-সহ অন্যান্য বিষয়তো আছেই।
মেয়র জানান, টাওয়ার হ্যামলেটস-এ
বাঙালী সাধারণের
অবস্থান দু’রকমের। কিছু বাঙালী
খুব ভালো অবস্থানে আছেন। তাদের ঘর-বাড়ী ও শিক্ষা-চাকরী সব
আছে। অন্যদিকে কেউ-কেউ
বেনেফিটের উপর জীবন
কাটাচ্ছেন। তবে সামগ্রিকভাবে বাঙালীদের অবস্থান
বেশ ভালো।
বিশেষ করে শিক্ষায় অনেক উন্নতি করেছে
বাঙালীরা।
টাওয়ার
হ্যামলেটস কাউন্সিল থেকে বাংলাদেশের সাথে যৌথ কর্মকান্ড প্রসংঙ্গে তিনি বলেন,
'বর্তমানে বাংলাদেশের সাথে কাউন্সিলের কোনো ধরণের যৌথ কর্মকাণ্ড নেই
। তবে পূর্বে এসিয়া আর্বস্
নামের একটি প্রজেক্ট ছিলো।
এ-প্রজেক্টটি হয়েছিলো সিলেটে। প্রজেক্টে ডেনমার্ক ইউরৌপের
প্রতিনিধিত্ব করেছিলো, আর টাওয়ার হ্যামলেটস সাপৌর্ট
দিয়েছিলো। এর কাজ ছিলো স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে - বিশেষতঃ
বস্তিবাসী ছিন্নমূলদের মধ্যে। টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়রের
ভাষ্য-মতে এ-প্রজেক্টের জন্য বাংলাদেশ থেকে আশানুরূপ
সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে শাহজ়ালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের
সাথে সেলফ জেনেরাটিং
কম্পৌস্টের আরেকটি প্রজেক্ট ছিলো, যা স্বল্প সময়ে সফল
হয়েছিলো, তবে যথাযথঃ সহযোগিতার অভাবে পুরোপুরি সফলতার মুখ দেখেনি।
মেয়র মহোদয়ের মতে, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে বর্তমানে কাউন্সিল থেকে
বাংলাদেশের সাথে কোনো ধরনের যৌথ কর্মকান্ডের পরিকল্পনা নেই।
বাঙালী তরুণরা
বিভিন্ন অনাকাঙ্খিত কার্যক্রমের সাথে জড়িয়ে পড়ছে বলে শোনা যায়,
এ-ব্যাপারে মেয়রের বক্তব্য কী জানতে চাওয়া হলে
তিনি বলেন, 'এক সমাজে দু'ধরণের লোক থাকে। যারা ভালো তারা
বুঝে কী করা উচিত। আবার অনেক তরুণ
আছে যারা স্বাধীনতা পেয়ে বিপথে চলে গেছে।' এ-প্রসঙ্গে মেয়র জানান,
টাওয়ার হ্যামলেটসে অসামাজিক কার্যকলাপ
রোধের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কাউন্সিল স্কুলগুলোর সাথে পার্টনারশিপে কাজ করছে -
যেখানে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ড্রাগসের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়া হচ্ছে।
বর্তমানে এ-ধরণের সমস্যা
কমে আসছে বলে তিনি
জানান।
আলাপচারিতার শেষের দিকে মেয়র মোহাম্মদ আব্দুস ছালিকের জানান,
লন্ডনের পূর্বের পরিস্থিতি এখনকার মতো
ছিলো না। টাওয়ার হ্যামলেটস
বর্তমানে বাংলাদেশকে রিপ্রেজ়েন্ট করছে, যা বড়ো একটি
অর্জন। ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে
তার বক্তব্য হলো
'মানুষের আশার শেষ নেই; যদি পাবলিক সাপৌর্ট থাকে, তাহলে আই
উইল পুট মাই নেইম ইন জিলএ ইলেকশান।'
মোহাম্মদ আব্দুস ছালিক ১০ বছর বয়সে বাংলাদেশ থেকে লন্ডনে এসেছিলেন।
তার আদি নিবাস বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার
জগ্ননাথপুর উপজেলায়।
লন্ডনে এসে কমিউনিটি এন্ড
ইয়থ ওয়ার্ক,
সৌশ্যাল ওয়ার্ক পড়েছেন।
এলএলবিতেও পড়াশোনা করেছেন।
বর্তমানে তিনি
বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত আছেন। তাছাড়া টাওয়ার
হ্যামলেটস কলেজে লেকচারার হিসেবেও
৭ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। ৫
সন্তানের জনক মোহাম্মদ আব্দুস ছালিক বাংলাদেশকে প্রচন্ড মিস করেন।
তিনি বলেন, 'যতোকিছুই হোক, আমি বাঙালী।' মেয়র জানান, তিনি
প্রতি-বছর সপরিবারে বাংলাদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
তিনি মনে করেন ব্রিটেনের আবহাওয়া 'আনপ্রেডিক্টেবল', কিন্তু
বাংলাদেশে 'মর্নিং শৌস দ্য ড্যে।' বাংলাদেশের
আবহাওয়া 'এডাপ্টেবল' বলেও মন্তব্য করেন। সময়ে-সময়ে
ঋতুর পরিবর্তন তার খুব ভালো লাগে। অবসর গ্রহন করার পরে
বাংলাদেশে সেটল্ড্ হওয়ার চিন্তা আছে মেয়রের। মোহাম্মদ
আব্দুস
ছালিক
বলেন,
'বাংলাদেশ আমার জন্মস্থান এবং বাংলাদেশ আমাকে টানে।'
মেয়র নুরুল ইসলাম (পুতুল),
লন্ডন বারা অফ
ক্যামডেন
ক্যামডেন
মেয়র নুরুল ইসলাম বেশি পরিচিত তার ডাক নাম পুতুল হিসেবে। তার সাথে কথা বলার জন্য
জুড স্ট্রিটের মেয়র’স
পার্লারে যাই আমরা দুজনে ১৭ জুলাই।
মেয়েরের
সাথে সাক্ষাতের সময় ছিলো বিকেল সাড়ে চারটায়।
আমরা পৌছঁলাম চারটার দিকে। অভ্যর্থনা রুমে বসার
কিছুক্ষনের মধ্যেই তিনি
এলেন এবং আমাদেরকে পুরো ভবন ঘুরিয়ে দেখালেন।
এরপরে গেলাম মেয়রের রুমে। শুরু হলো আলাপ।
সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে উঠা নুরুল ইসলামের সামাজিক বোধের গভীরে তার
রাজনীতি আর সংস্কৃতির চর্চার নির্যাস। ২০০৮ সাল পর্যন্ত
ক্যামডেন
দু'জন বাঙালী মেয়রের মধ্যে নুরুল ইসলাম একজন।
তার জন্ম
সিলেটের মৌলভীবাজারে। নুরুল ইসলাম ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা,
নাটক ও রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন।
তিনি ছাত্র-জীবনে
ছাত্র ইউনিয়ন রাজনীতি করতেন।
নুরুল
ইসলামের মেয়র
হওয়ার কাহিনীও অবাক করার মতো। ১৯৭৯ সালে লন্ডনে এসে পিতার
রেষ্টুরেন্ট ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। সাথে-সাথে
নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন।
২০০০ সাল থেকে লেবার দলের সাথে সরাসরি জড়িত হন। ২০০৬ সালের
মে মাসে সেইন্ট প্যানক্রাস ও সমার্স টাউন ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর
হিসেবে
নির্বাচিত হন।
২০০৭ সালে ডেপুটী মেয়র পদে নিযুক্ত হন।
পেশাগত দিক থেকে নূরুল
ইসলাম ক্যামডেন আইটিইসিতে বহুদিন ধরে এডমিনিষ্ট্রেটরের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
বর্তমানে তিনি হাউজিং এসৌসিয়েশনের শেলটারড্ স্কিম ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব
পালন করছেন।
ক্যামডেনের বর্তমান মেয়র বাংলাদেশে থাকতে
উদীচী শিল্প গোষ্ঠী,
খেলাঘর
ও
থিয়েটার
গ্রুপ-সহ অনেক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি একাধারে
অভিনেতা,
নাট্যকার ও পরিচালক। তার লেখা অনেক
নাটক লন্ডনে মঞ্চায়িত হয়। নুরুল ইসলাম লন্ডনে রিদম পারফরমিং
আর্টস নামক একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন।
ক্যামডেন
বাঙালীদের নিয়ে নুরুল ইসলামের আশা অনেক। মেয়র বলেন,
'কাউন্সিলে বাঙালীরা শিক্ষা,কর্মসংস্থান-সহ সবদিকেই
এগিয়ে যাচ্ছে। নিজের কমিউনিটিকে প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা
দেওয়ার জন্য তিনি সদা প্রস্তুত। কথা প্রসঙ্গে নুরুল ইসলাম
জানালেন ওয়ার্কিং মেনস কলেজ়ে অভিবাসী বাঙালীরা ইংরেজী ভাষার উপর ফ্রী কৌর্স করার
সুবিধা পাচ্ছে, যার ফান্ডের ব্যবস্থা করেছে কাউন্সিল।
তরুণ
প্রজন্ম প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, মেয়র অফিস বিভিন্ন
পার্টনারশিপের মাধ্যমে তরুণদের জন্য কাজ করছে।
স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের জন্য বিভিন্ন ফান্ডের ব্যবস্থা করে থাকে কাউন্সিল।
তিনি জানান, এলাকায় কিছু সংখ্যক বাঙালী তরুণ ড্রাগের দিকে ধাবিত হলেও,
সৌশ্যাল বিহেইভিয়ারের উপর নানা পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে এ-সমস্যা
মোকাবেলার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
ক্যমডেন কাউন্সিল থেকে বাংলাদেশের সাথে কোনো ধরণের যৌথ
কর্মকাণ্ড চলছে কি-না জানতে চাওয়া হলে মেয়র বলেন, 'আপাতত
কোনো কর্মকাণ্ড নেই। বিশেষ করে বাঙালী কমিউনিটির দলাদলির
কারণে কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে ইনভেষ্ট করছে না। তবে বাংলাদেশ
থেকে যদি কেউ কোনো প্রস্তাব নিয়ে আসে, তাহলে অবশ্যই কাউন্সিল সাহায্য করবে।
কথা প্রসঙ্গে তিনি জানান, বাংলাদেশে নার্সারী
স্কুলে শিক্ষাদানের জন্য লন্ডনের সাথে কাজ করা যায়। লন্ডনে
খেলার ছলে বাচ্চাদেরকে পড়ানো হয়ে থাকে। বাংলাদেশে এ-ধরণের
অভিজ্ঞতার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন নুরুল ইসলাম।
ভবিষ্যত পরিকল্পনা
বিশেষ করে নির্বাচনে অংশগ্রহন করার ইচ্ছা আছে কি-না জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,
'পার্লামেন্ট নির্বাচন খুবই কঠিন। আমার লৌক্যাল কমিউনিটির
সাথে কাজ করার ইচ্ছা।'
ব্যস্ততার কারণে নুরুল
ইসলামের প্রতিবছর বাংলাদেশে যাওয়া হয় না। দু' সন্তানের জনক
নুরুল ইসলামের বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা আপাতত না থাকলেও,
নিজ এলাকা মৌলভীবাজার রাজনগরে ভকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার খোলার ইচ্ছা আছে।
নুরুল ইসলাম মনে বলেন, 'এমন কিছু একটা করা গেলে বিভিন্ন টেকনিক্যাল বিষয়ে
জনগণ প্রশিক্ষণ নিতে পারবে, যা কর্মসংস্থানের পথ খুলে
দিবে।'
আপলৌডঃ ৯ই আগষ্ট ২০০৮ |