London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

বাংলায় উইকিপিডিয়াঃ ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য রাগিবের স্বপ্ন

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ইন্টারনেটে পৃথিবীর বৃহত্তম জ্ঞানকোষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে উইকিপিডিয়া। ২০০১ সালে প্রথমে ইংরেজি ভাষায় চালু হওয়া এই বিশ্বকোষ আজ ২৫০টি বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে লাখো কর্মীর স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত উইকিপিডিয়াতে এখন মোট নিবন্ধের সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন কোটি-কোটি ইন্টারনেট ইউজার উইকিপিডিয়াতে তথ্য আহরণের জন্য এসে থাকেন। কোনো বিষয়ের উপরে ইন্টারনেটে সার্চ করলে সবার শুরুতে উইকিপিডিয়ার ভুক্তিটি আসে, ফলে সবার কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়াতে উইকিপিডিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। ইন্টারনেটে বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা বিষয়ক তথ্যের সবচেয়ে আধুনিক ও সমৃদ্ধ ভাণ্ডার এখন উইকিপিডিয়াই।

বাংলাদেশের তথ্য সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরার জন্য ইংরেজি উইকিপিডিয়াতে কাজ করে চলেছেন বেশ কিছু তরুণ স্বেচ্ছাসেবী। এদের মধ্যে আবার অনেকেই সক্রিয় বাংলা উইকিপিডিয়াতেও। এই কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে এখন ইন্টারনেটে বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় ওয়েবসাইটে পরিণত হয়েছে বাংলা উইকিপিডিয়া (http://bn.wikipedia.org )। বর্তমানে এখানে নানা বিষয়ের মোট ১৭,৫০০টি ভুক্তি রয়েছে।

বাংলা উইকিপিডিয়া আন্দোলনকে সংগঠিত রূপ দিয়ে এগিয়ে নেয়ার কাজে শুরু থেকেই প্রধান ভূমিকা রাখছেন যিনি, তিনি হলেন রাগিব হাসান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী রাগিব বাংলা উইকিপিডিয়ার প্রশাসক ও একমাত্র ব্যুরোক্র্যাট (নীতিনির্ধারক) এবং একই সাথে ইংরেজি উইকিপিডিয়ারও প্রশাসক। পেশায় কম্পিউটার বিজ্ঞানী এই তরুণ প্রবাস থেকেই বাংলাদেশে সংগঠিত করেছেন এক দল উদ্যমী তরুণ তরুণীদের, যাঁরা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে আগামীর শিশুদের জন্য সারা বিশ্বের সব জ্ঞানকে একত্রিত করেছে উইকিপিডিয়াতে।  চট্টগ্রামের ছেলে রাগিব হাসান পড়াশোনা করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ স্থান লাভের জন্য চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড  পান ২০০৩ সালে। রাগিব বুয়েটের কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন কিছুদিন। এর পর উচ্চশিক্ষার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান, সেখানে ২০০৫ সালে ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয় অ্যাট আরবানা শ্যাম্পেইন থেকে কম্পিউটার সাইন্সে মাস্টার্স ডিগ্রি পান। এখন তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার নিরাপত্তা বিষয়ে পিএইচডি করছেন। এর পাশাপাশি তিনি ২০০৭ সালে গুগল (Google) এ কাজ করেছেন কিছুদিন।

ইউকেবেঙ্গালি ডট কমের পক্ষ থেকে রাগিব হাসানের সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন প্রকৌশলী মোঃ সমীরুজ্জামান।

প্রশ্নঃ প্রথমেই জানতে চাই, উইকিপিডিয়া আসলে কী?

রাগিবঃ উইকিপিডিয়া হলো একটি উন্মুক্ত বিশ্বকোষ, যা হাজার-হাজার মানুষের হাতে গড়া। সহজ কথায় বলতে গেলে, উইকিপিডিয়াতে পৃথিবীর সব জ্ঞানের সম্মিলিত সংকলন গড়ে তোলা হয়েছে, আর এই জ্ঞানকে কপিরাইটের বেড়াজালে আবদ্ধ না করে পুরোপুরি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। অন্য বিশ্বকোষগুলো সব কপিরাইটেড, চাইলেও কেউ সেখানকার তথ্য পুনঃ প্রকাশ করতে পারেনা। পুরো এক সেট বিশ্বকোষ কিনতে গেলে বাংলাদেশের হিসাবে হাজার-হাজার টাকা দাম পড়ে। সেখানে উইকিপিডিয়া পুরোপুরি মুক্ত বিশ্বকোষ।

উইকি প্রযুক্তির মূলে রয়েছে উইকি সফটওয়ার, যার জন্  উইকিপ্রযুক্তি ভিত্তিক ওয়েব পেইজ গুলিকে সম্পাদনা করা যায় পৃথিবীর যেকোনো খান থেকেই। ফলে একই ডকুমেন্টের উপরে কাজ করতে পারেন হাজার হাজার মানুষ, যা অন্য কোনো প্রযুক্তির চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপক। এছাড়া পুরনো যেকোনো সংস্করণে ফেরত যাওয়া যায় খুব সহজেই।  তাই অযাচিত যেকোনো সম্পাদনাকে সহজেই পাল্টে সঠিক সংস্করণে ফেরত যাওয়া যায়।

প্রশ্নঃ উইকিপিডিয়া শুরু হয় কবে?

২০০০ সালের দিকে জিম ওয়েলস নামে এক জন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা একটি বিশ্বকোষ তৈরীর উদ্যোগ নেন। এর নাম দেয়া হয় নুপিডিয়া (NuPedia)। এটা অবশ্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য স্থানের শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় তৈরীর কথা ছিলো। কিন্তু এক বছর অতিবাহিত হলেও দেখা গেলো যে, মাত্র গোটা বিশেকের বেশি নিবন্ধ শুরু করা যায় নি। ২০০১ সালে জিম ওয়েলসের সহযোগী ল্যারি স্যাঙ্গার তাঁকে পরামর্শ দেন যে, উইকি প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি পুরাপুরি উন্মুক্ত বিশ্বকোষ তৈরী করার জন্য। শুরুতে কেউ ভাবতেই পারেনি এটা আসলে সম্ভব। কিন্তু অল্প কিছু দিনের মধ্যেই হাজার কয়েক নিবন্ধ তৈরী হয়ে গেলো। তাই উইকিপিডিয়ার আত্ম প্রকাশ ঘটলো ইংরেজি ভাষায়।

প্রথমে শুধু ইংরেজি ভাষায় উইকিপিডিয়া শুরু করা হয়। পরে একে একে জার্মান, স্প্যানিশ, ফরাসি, জাপানি সহ অন্যান্য অনেক ভাষায় এর সংস্করণ চালু করা হয়। বর্তমানে মোট ২৫০টি বিভিন্ন ভাষায় উইকিপিডিয়ার সংস্করণ আছে।

প্রশ্নঃ আর বাংলা উইকিপিডিয়া কবে শুরু হয়?

রাগিবঃ বাংলা উইকিপিডিয়ার সূচনা হয় ২০০৪ সালেই, কিন্তু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা সহ নানা কারণে এর বিকাশ হয়নি ততটা। বাংলাসহ অন্যান্য ভাষাকে ওয়েবপেইজে লেখার জন্য উইকিপিডিয়ায় ব্যবহার করা হয় ইউনিকোড পদ্ধতি। এই ইউনিকোডে বাংলা প্রদর্শন করা ও লেখার জন্য শুরুতে যথাযথ সফটওয়ারের অভাব ছিলো। আস্তে আস্তে এধরণের সফটওয়ারের বিকাশ ঘটে। তা সত্ত্বেও জনসংযোগের অভাবে থেমে থাকে বাংলা উইকিপিডিয়ার বিকাশ।

২০০৫ সালের মার্চ মাস নাগাদ বাংলা উইকিপিডিয়াতে ছিলো মাত্র ৫০০টি নিবন্ধ। এই সময় জনাব মুনির হাসানের উৎসাহে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের অধীনে গঠন করা হয় বাংলা উইকি নামের সংগঠন। ইন্টারনেট ভিত্তিক ইমেইল-দ্বারা পরিচালিত মেইলিং লিস্টের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয় সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের। এখন বাংলা উইকিপিডিয়া বেশ সমৃদ্ধ, এখানে ১৭৫০০টি ভুক্তি আছে, যার মধ্যে অনেকগুলো বেশ পূর্ণাঙ্গ আকারের নিবন্ধ আছে।

প্রশ্নঃ অন্য বিশ্বকোষ, যেমন ব্রিটানিকা বা বাংলাদেশের এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাপিডিয়ার সাথে উইকিপিডিয়ার পার্থক্য কোথায়?

রাগিবঃ আগেই বলেছি, উইকিপিডিয়া পুরোপুরি মুক্ত, চাইলে যে কেউ যেকোনো ভাবে এটি প্রকাশনা ও বিতরণ করতে পারে। আসলে তথ্য বা জ্ঞানের তো কোনো মালিকানা নেই, জ্ঞান সকলের জন্যেই। তাই জ্ঞানকে কপিরাইট বা মেধাসত্ত্ব লাইসেন্স দিয়ে বেঁধে না রেখে উইকিপিডিয়ার সব কিছুকেই মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। ব্রিটানিকা বা বাংলাপিডিয়া কপিরাইটেড, ফলে তা সংগ্রহ করতে হলে বেশ খরচ পড়ে। বাংলাদেশের এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্যোগে ও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরী হয় বাংলা ভাষার বিশ্বকোষ বাংলাপিডিয়া, যা মূলত বাংলাদেশ ও অখন্ড বাংলার উপরেই জোর দিয়েছে। তবে এতে বিশ্বের অন্যান্য অংশের সম্পর্কে এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার তথ্য নেই। সে তুলনায় উইকিপিডিয়া সব বিষয়ের তথ্য সংকলিত করছে।

আরেকটা বড় পার্থক্য হলো, উইকিপিডিয়ার তথ্যকে খুব সহজেই হালনাগাদ বা সংশোধন করা যায়। ব্রিটানিকা বা এনকার্টার মতো অন্যান্য বিশ্বকোষগুলো পড়তে গিয়ে ভূল তথ্য পেলেও সেটা ঠিক করে অপেক্ষা করতে হয় পরবর্তী সংস্করণের জন্য। আর উইকিপিডিয়ায় সেটা করা যায় সাথে সাথেই। যেমন, ২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরীয় সুনামী সংঘটিত হওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সেটার উপরে তথ্যবহুল নিবন্ধ যোগ করে ফেলেন উৎসাহী উইকিপিডিয়ানেরা। সে তুলনায় ব্রিটানিকা ও এনকার্টার মতো বিশ্বকোষের ইন্টারনেট সংস্করণেও সে তথ্য আসতে সময় লাগে বেশ অনেক দিন। আর ছাপা সংস্করণে তো সেটা আসতে পরের বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

প্রশ্নঃ এবার আসা যাক উইকিপিডিয়াতে আপনার কাজের কথায় ... উইকিপিডিয়ার সাথে জড়িত হলেন কীভাবে? উইকিপিডিয়াতে বাংলাদেশের তথ্য বেশি বেশি করে রাখার চিন্তাটা কীভাবে এলো?

রাগিবঃ উইকিপিডিয়ার সাথে আমি জড়িত হই ২০০৪ সালের গোড়ার দিকে। পড়াশোনা ও গবেষনার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য জোগাড় করতে হতো ইন্টারনেট থেকে, এবং গুগলে সার্চ করতে গিয়ে উইকিপিডিয়া নামের এই তথ্যভাণ্ডারটির খোঁজ মিলতো প্রায়ই। উপলব্ধি করি, উইকিপিডিয়া ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত তথ্যভাণ্ডারে।

কিন্তু, দুঃখের সাথে খেয়াল করি, বাংলাদেশের ঐতিহ্য, জনমানুষ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে এখানে তথ্য রয়েছে খুব অল্পই। আর পুরো ইন্টারনেটেই আমাদের দেশের কথা, বাংলার ডিজিটাল উপস্থিতি কম। আমাদের দেশের ইতিহাস ঐতিহ্যকে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীর সবার কাছে তুলে ধরার কাজটা কিন্তু বিদেশ থেকে এসে কেউ করে দিয়ে যাবে না। এটা করতে হবে আমাদের দেশের মানুষদেরকেই। বিদেশীদের পক্ষে অনেক কিছু জানা ও লেখা সম্ভবও না, যেমন নবান্নের উৎসবের তাৎপর্য বিদেশী কোনো বিশেষজ্ঞের পক্ষেও অনুধাবন করাটা দুষ্কর।

ইন্টারনেটে সেই তথ্য-দৈন্য ঘুচাবার আশায় কাজ শুরু করি ইংরেজি উইকিপিডিয়াতে বাংলাদেশের উপরে একটি দুটি নিবন্ধ দিয়ে। বছর খানেকের মধ্যে বাংলাদেশের উপরে প্রায় ৩০০ এর বেশি নিবন্ধ শুরু করি। ২০০৫ এর মাঝামাঝির দিকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে অপপ্রচার শুরু হয়, সে সময়ে রীতিমত লাইব্রেরীতে গিয়ে বিভিন্ন তথ্যসূত্র ঘেঁটে এই সংক্রান্ত অনেক তথ্য উইকিপিডিয়াতে যুক্ত করি। ভাষা আন্দোলন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এসব বিষয়ের উপরে উইকিপিডিয়ার ভুক্তিগুলো শুরু করি তখনই। আস্তে আস্তে তথ্যযুক্ত হয়ে অনেক কর্মীর হাতে ঘুরে এসব নিবন্ধ এখন যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়েছে।

এই মুহুর্তে ইংরেজি উইকিপিডিয়াতে আমার সম্পাদনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০,০০০ এর অধিক, যার অধিকাংশই বাংলাদেশ সংক্রান্ত নিবন্ধ। আর আমার হাতে শুরু করা নিবন্ধের সংখ্যা এখন প্রায় ৬০০ এর মতো।

প্রশ্নঃ বাংলা উইকি নিয়ে কাজ শুরু করলেন কবে, কীভাবে?

রাগিবঃ ইংরেজি উইকিপিডিয়াতে অনেকদিন কাজ করার পরে আমাদের নিজের ভাষা বাংলাতে মুক্ত জ্ঞানকোষের অভাবটা অনুভব করলাম। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ভূগোল, ইতিহাস, বাংলাদেশ ও বহির্বিশ্ব জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব শাখা নিয়ে বাংলাতে মুক্ত বিশ্বকোষ নেই। যে কয়টি প্রকাশনা রয়েছে, সেগুলোর দামও অনেকেরই নাগালের বাইরে। অথচ তথ্যপ্রযুক্তির এই দুনিয়াতে সব বিষয়ের জ্ঞানকে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌছে দেয়াটা অপরিহার্য। আমাদের আগামী প্রজন্মের কাছে বিশ্বের সব জ্ঞানকে মুক্তভাবে পৌছে দিতে হবে মাতৃভাষা বাংলাতেই, আর তথ্যপ্রযুক্তির সুযোগটা নিয়ে উইকিপিডিয়ার মাধ্যমে সেটা করা সম্ভব। সেজন্য ২০০৬ সাল থেকে বাংলা উইকিপিডিয়াতে কাজ শুরু করেছি। ইংরেজি উইকি থেকে তথ্য অনুবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে নিবন্ধ শুরু ও মানোন্নয়নের কাজ করেছি, এ ছাড়াও উইকিপিডিয়ার উপরে কাজ করার জন্য উৎসাহী তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে থাকি।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশে উইকি আন্দোলন নিয়ে কিছু বলুন। বাংলা উইকি এখন কী পর্যায়ে আছে?

রাগিবঃ শুরুতে কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা ছিলো, যার কারণে বাংলা উইকিপিডিয়ার কাজ সেভাবে শুরু করা যায়নি। এর মধ্যে দেশে বিদেশে থাকা বিভিন্ন পরিচিতি-অপরিচিত মহলে আমি ইমেইল ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে এই ব্যাপারে জনসচেতনতা গড়ে তুলার চেষ্টা করতে থাকি। বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের (বিডিওএসএন) সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান ভাইয়ের সাথে এই ব্যাপারে যোগাযোগ করলে উনি খুব আগ্রহ প্রকাশ করেন, এবং ২০০৬ এর মার্চ মাসে আমরা বাংলাউইকি নামের একটি ইন্টারনেট-ভিত্তিক সংগঠন শুরু করি। এর মূল লক্ষ্য ছিলো বাংলা উইকিপিডিয়াতে সমৃদ্ধ করার কাজে উৎসাহী কর্মীদের সমন্বয় সাধন এবং সাহায্য দেয়া। সেসময় বাংলা উইকিপিডিয়াতে মাত্র ৫০০টি ক্ষুদ্র ভুক্তি ছিলো। গত দুই বছরে বাংলা উইকিপিডিয়ার কর্মীদের নিরলস চেষ্টাতে ভুক্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭০০০ এ,  এর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ আকারের নিবন্ধ রয়েছে প্রচুর। বাংলা উইকিপিডিয়া এখন ইন্টারনেটের বৃহত্তম বাংলা ভাষার ওয়েবসাইট। নিবন্ধিত সদস্য সংখ্যা হাজার দেড়েকের মতো হলেও নিয়মিতভাবে বাংলা উইকিপিডিয়াতে এখন কাজ করছেন ৫০ থেকে ১০০ জন কর্মী, যাঁরা বাংলাদেশ সহ বিশ্বের নানা দেশ থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাংলা উইকিপিডিয়াকে সমৃদ্ধ করছেন।

বিডিওএসএন নিয়মিতভাবে বাংলা উইকিপিডিয়ার উপরে কর্মশালা পরিচালনা করে আসছে। বইমেলা, পলা বৈশাখ এসব উৎসবের সময়ে উইকিপিডিয়া সম্পর্কে জানানো হচ্ছে সবাইকে। বাংলাদেশের ছবি সংগ্রহের জন্য আমাদের আহবানে সাড়া দিয়ে প্রায় ১০০০ ছবি ইতিমধ্যেই আমরা পেয়েছি, এসব ছবি বাংলা ও ইংরেজি উইকিপিডিয়াতে বাংলাদেশের পরিচিতি তুলে ধরছে চমৎকারভাবে।

ইংরেজি উইকিপিডিয়ার একটি সিডি সংস্করণ বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে, এর প্রেক্ষিতে বিডিওএসএন এবং বাংলা উইকিপিডিয়ার কর্মীরা ২০০৮ সালের শেষ নাগাদ বাংলা উইকিপিডিয়া-সিডি সংস্করণ বের করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এতে বাংলাদেশ, বহির্বিশ্ব, বিজ্ঞান/প্রযুক্তি, ইতিহাস, বিনোদন, শিক্ষা ইত্যাদি নানা বিষয়ে প্রায় এক হাজারের মতো তথ্যনির্ভর নিবন্ধ থাকবে।

উইকিপিডিয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে এখন জনসচেতনতা গড়ে উঠেছে, এটা একটা চমৎকার ব্যাপার। আমাদের কর্মী তারিফ এজাজের প্রচেষ্টাতে ভাষা আন্দোলনের নিবন্ধটি ২১শে ফেব্রুয়ারি ইংরেজি উইকিতে প্রথম পাতায় এসেছে, প্রশাসক বেলায়েত উইকিম্যানিয়া নামের আন্তর্জাতিক উইকি-কনফারেন্সে বাংলাদেশের উইকিপিডিয়ানদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, প্রশাসক অর্ণব জাহীন ভাষা বিষয়ক বিপুল তথ্য নিয়ে কাজ করছেন। এভাবেই উদ্যোগী তরুণ-তরুণীরা বাংলা ভাষার মুক্ত বিশ্বকোষ গড়ে তোলার এই মহাপ্রয়াসে যোগ দিয়েছেন।

প্রশ্নঃ আপনি বাংলা ও ইংরেজি উইকিপিডিয়াতে অ্যাডমিন বা প্রশাসক,  এই পদে নির্বাচিত হলেন কবে? অ্যাডমিনদের কাজ কী?

উইকিপিডিয়ার অ্যাডমিন বা প্রশাসকেরা বিভিন্ন নিয়মনীতি নির্ধারণ, এবং বাস্তবায়নের কাজ করে থাকেন। উইকিপিডিয়া যে কেউ সম্পাদনা করতে পারে, তাই মন্দ উদ্দেশ্যে যাতে কেউ উইকিপিডিয়াতে ভুলত তথ্য যোগ করতে না পারে, প্রশাসকেরা তার দিকে নজর রাখেন। এরকম মন্দ উদ্দেশ্যে ধ্বংসাত্মক কাজ চালানো ব্যক্তিদের উইকিপিডিয়াতে সাময়িক বা স্থায়ী ভাবে ব্যান করে রাখার কাজটাও প্রশাসকদের। এছাড়া অনুল্লেখযোগ্য নিবন্ধ, এবং কপিরাইটের সমস্যাযুক্ত ছবি ও লেখা অপসারণের কাজটাও তাঁরা করেন। উইকিপিডিয়াতে কোনো কর্মীর দীর্ঘদিনের অবদান ও ব্যবহার দেখে বেশ দুরুহ একটি নির্বাচনপদ্ধতিতে ভোটাভুটি করে প্রশাসক নির্বাচন করা হয়।

ইংরেজি উইকিপিডিয়াতে ৫ হাজারের বেশি সম্পাদনা করি ২০০৫ সালের জুলাই নাগাদ। তখন উইকিপিডিয়ার প্রশাসক ভারতীয় কর্মী নিকোলাস আমাকে প্রশাসক পদে নির্বাচনের প্রস্তাব রাখেন। দেশ বিদেশের বেশ কিছু কর্মী এক সপ্তাহ ধরে যাচাই বাছাই করে আমাকে এই পদে নির্বাচিত করেন। বাংলা উইকিপিডিয়াতে আমি প্রশাসক হিসাবে কাজ শুরু করি ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। কয়েক মাস পরেই সর্বসম্মতিক্রমে আমি প্রশাসকের পরের ধাপ ব্যুরোক্র্যাট হিসাবে নির্বাচিত হই। বাংলা উইকিপিডিয়াতে এই মুহুর্তে ৫ জন সক্রিয় প্রশাসক কাজ করছেন।

প্রশ্নঃ দেশ নিয়ে কী ভাবেন?

রাগিবঃ দেশকে নিয়ে আমার স্বপ্ন, ভালোবাসা, আকাংক্ষা অনেক। সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, দেশের মানুষের টাকায় বিশ্বমানের কারিগরি শিক্ষা পেয়েছি। আমার দেশের লাখোকোটি কৃষকের শ্রমিকের কাছে এই ঋণ আমি কোনোদিনই শোধ করতে পারবো না। ইন্টারনেটের ডিজিটাল তথ্যমাধ্যমে সাধ্যমত দেশের কথা তুলে ধরা, এবং তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগের দ্বারা আগামী প্রজন্মের কাছে জ্ঞান বিজ্ঞানকে পৌছে দেয়া এ আমার কর্তব্য।

আগামীর বিশ্ব পুরোপুরি তথ্যনির্ভর প্রযুক্তির বিশ্ব আমার দৃঢ় বিশ্বাস জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চর্চার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বাঙ্গনে স্থান করে নিতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময়ে উপলব্ধি করি, আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিশ্বমানের। প্রতিভাবান এই তরুণ-তরুণীদের যথাযথ তত্ত্বাবধান ও সুযোগ করে দিতে পারলেই অনেক কিছু সম্ভব। আমাদের চেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশ মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর আজ সফল হয়েছে প্রযুক্তির চর্চার মাধ্যমেই। শিক্ষা ও বিজ্ঞান চর্চার খাতে প্রয়োজন অধিকতর সরকারী বিনিয়োগ। আরেকটা ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের অনেক প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানী প্রবাসে বেশ সাফল্য অর্জন করেছেন, আমাদের উচিৎ এই সফল সন্তানদের দেশে ফিরে আসার সুযোগ করে দেয়া। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত এরা সবাই বিজ্ঞান চর্চায় এগিয়ে গেছে এভাবেই।

আর বাংলাদেশের জন্য যথোপযুক্ত প্রযুক্তি নিয়ে চিন্তা করতে হবে। আমাদের দেশের দীর্ঘদিনের সমস্যা বন্যা, সাইক্লোন, খাদ্যাভাব এসবের প্রকোপ কমাতে হলে তথ্য প্রযুক্তির আশ্রয় নিতে হবে।

আগামী দিনের বিশ্বকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন রয়েছে, তার মধ্যে একটা হলো, বাংলাদেশের সব গ্রামের সব স্কুলের কিশোর কিশোরীদের কাছে পৌছে গেছে কম্পিউটার প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট। এই প্রযুক্তি তারা ব্যবহার করছে পুরোপুরিই বাংলা ভাষায়। যে কোনো তথ্য জোগাড়ের প্রয়োজন হলেই তারা মুহুর্তের মধ্যে সেটা খুঁজে পাচ্ছে উইকিপিডিয়াতে। আমাদের এই সোনার বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, পুরাকীর্তি সব কিছুর কথা আগামী দিনের প্রজন্ম জানতে পারছে উইকিপিডিয়া ঘেঁটে।

আমার এই স্বপ্ন সফল হতে বেশি দিন লাগবেনা। দরকার শুধু আমাদের একটু চেষ্টা, একটু সময় দেয়া। সোনার বাংলার সোনার মানুষেরা সেটা করেই ছাড়বে।

প্রশ্নঃ এবার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসি, আপনি উইকিপিডিয়াতে এতো সময় দেন, এই ব্যাপারে পারিবারিক ভাবে সাহায্য পান?

রাগিবঃ আমার স্ত্রী ডাঃ জারিয়া আফরিন চৌধুরী উইকিপিডিয়াতে কাজ করার ব্যাপারে আমাকে যথেষ্ট উৎসাহ দিয়ে থাকেন। অনেক সময় হয়তো দিনে কয়েক ঘণ্টা সময় উইকিপিডিয়ার পেছনে দিতে হয়। আমার নিজের গবেষণা, পড়াশোনা, সংসার ও সব কিছুর মাঝেও এটুকু সময় বের করে নেই, যতো কাজই থাকুকনা কেনো। হাজার হলেও, দেশের কাছে আমি অনেক বেশি ঋণী।

প্রশ্নঃ আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?

রাগিবঃ- আমি শিক্ষকতা পছন্দ করি, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সময়টুকু আমার জীবনের সেরা সময়ের মধ্যে পড়ে। পিএইচডি লাভের পরে আমি পেশা হিসাবে শিক্ষকতাকে বেছে নেয়ার পাশাপাশি কম্পিউটার বিজ্ঞানে উচ্চতর গবেষণা করতে চাই। আর তার সাথে সাথে প্রযুক্তি ও জ্ঞানবিজ্ঞানে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।

ইউকেবেঙ্গালি ডট কমের পক্ষ থেকে আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

রাগিব আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

বাংলা ও ইংরেজি উইকিপিডিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে দেখুন নিচের লিংকগুলো

বাংলা উইকিপিডিয়াঃ http://bn.wikipedia.org

ইংরেজি উইকিপিডিয়াঃ http://en.wikipedia.org

উইকিপিডিয়া টিউটোরিয়ালঃ http://www.ragibhasan.com/wikipedia

রাগিব হাসানের সাইটঃ http://www.ragibhasan.com

আপলৌডঃ ২ মে, ২০০৮

   

আর্কাইভ8

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.