|
ইউকেবেঙ্গলির সাথে ঢাবির কারা নির্যাতিত চার ছাত্র
২০
আগষ্ট ২০০৭ খেলার মাঠে
সেনা-সদস্যদের হাতে ছাত্র
ও শিক্ষক লাঞ্চনায় বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছিল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ঢাবি অঙ্গনের
বিক্ষোভ অতি-দ্রুত
ছড়িয়ে
পড়েছিল সারা বাংলাদেশে।
এর পরিণতিতে
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপরে নেমে আসে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও
জেল-জুলুম।
ঢাকাসহ দেশের
বিভিন্ন স্থানে লাঞ্ছনার
শিকার হন
শিক্ষক- শিক্ষার্থীরা।
সরকার-পক্ষ বেশ
কজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করে জেলে পুরে দেয়।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাঁচ মাসেরও বেশি
কারাবাসের পর মুক্তি পায় ২২ জানুয়ারী।
কারামুক্ত এই
শিক্ষার্থীদের
চারজনের সঙ্গে গ্রেপ্তার ও
নির্যাতন প্রসঙ্গে কথা হয়েছ ইউকেবেঙ্গলির।
গত ১ ফেব্রুয়ারী
ইউকেবেঙ্গলির হয়ে এদের সাথে কথা বলেছেন ফারুক হুসেন।
গ্রেফতার
ও পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ বর্ণনাকালে ব্যাবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র জাহিদুল ইসলাম
বিপ্লব জানান, বাসা থেকে তাদের দুই ভাইকে চোখ-হাত-পা বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়।
কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়
তারা জানতেন না।
পরে শুনেছেন তাদেরকে জয়েন্ট
ইন্টারোগেশন সেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।
স্বীকারোক্তি আদায়ের
জন্য নির্যাতনের সকল পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় বিপ্লবের উপরে, যে কারণে এখনও তার
কাজে-কর্মে সাংঘাতিক অসুবিধা হয়।
'আন্দোলনের সাথে আমার,
অন্যান্যদের ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকের সম্পৃক্ততার বিষয়ে নির্যাতনকালে জিজ্ঞাসাবাদ
করা হতো' বলেন বিপ্লব।
চোখ বাঁধা থাকায় কারা
নির্যাতন করে তা বোঝা সম্ভব ছিলো না বিপ্লবের পক্ষে
।
মুক্তি
পাওয়া সত্ত্বেও প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে আছেন বিপ্লব।
কেনো-না, সরকার একান্ন
নাম্বার মামলাটি চালিয়ে যাবার কথা বলছেন।
যদি তাই হয়, তাহলে
শিক্ষাজীবন-সহ ভবিষ্যৎ অনিশ্চিয়তার মধ্যে পড়ে যাবার আশঙ্কা করছেন তিনি।
ছাত্র-শিক্ষকদের মুক্তির
দাবীতে সাম্প্রতিক অহিংস আন্দোলনের কার্যকারিতায় আশাবাদী বিপ্লব জানান, এটা সারা
দেশের জন্য অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
তিনি আরও মনে করেন,
অহিংস আন্দোলনের স্বার্থে ছাত্র-সংসদ নির্বাচন হওয়াটা জরুরী।
সামনের দিনগুলোতে
ডাকসু-সহ সারাদেশের ছাত্র-সংসদ নির্বাচনের দাবীর সাথে যথাযথ প্ল্যাটফর্ম থেকে যুক্ত
থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন জাহিদুল ইসলাম বিপ্লব
।
আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র মানবেন্দ্র দেব ইউকেবেঙ্গলিকে জানিয়েছেন,
যৌথবাহিনীর লোকেরা এসে তাকে বাসা থেকে চোখ বেঁধে উঠিয়ে নিয়ে যায়।
সম্ভবতঃ একরাত তাকে
ক্যান্টনমেন্টে রাখা হয়।
পরে নিজেকে শাহবাগ থানায়
আবিস্কার করেন মানবেন্দ্র।
এরপর তাকে রিমান্ডে নিয়ে
জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলের সামনে হাজির করা হয়।
মানবেন্দ্রর মতে,
আন্দোলনটা ছিলো স্বতঃস্ফূর্ত, কিন্তু প্রশাসন ধরে নিয়েছে এটা ছিলো পরিকল্পিত।
মানবেন্দ্র বলেন, 'যদিও কোন তথ্য আমার জানা ছিল না, তবু জিজ্ঞাসাবাদ-কালে আন্দোলনের
পরিকল্পনা, অন্যান্যদের
সংশ্লিষ্টতা এবং অর্থ যোগান সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।'
বন্দীথাকা অবস্থায়
শারীরিক লাঞ্চনার চেয়ে মানসিক নির্যাতনে অধিক বিপর্যস্ত হয়েছিলেন তিনি।
সতীর্থ, পরিবার ও প্রিয়
ক্যাম্পাসে ফেরার অনুভূতি ভাষায় ব্যক্ত করা কঠিন বলে মন্তব্য করলেন মানবেন্দ্র দেব।
গ্রেফতার
হওয়া অপর ছাত্র নৃবিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষের মনিরুজ্জামান সরদাররের জবানীতে
জানা যায়, গভীর রাতে আটক করে তাকে রাত দুটোরদিকে চাদপুর থানায় আনা হয়।
৩ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার
করা হলেও, দাপ্তরিকভাবে তা ৫ তারিখ দেখানো হয়।
মাঝের দুইদিন
জিজ্ঞাসাবাদের নামে ভয়ানক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।
সম্ভবতঃ ডিবির লোকেরা
মনিরজ্জমানকে ঢাকা নিয়ে আসে।
জিজ্ঞাসাবাদের নামে কোন
রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত কিনা, অন্দোলনে নেমে কতো টাকা পেয়েছেন এমনকি কতো টাকা
দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন, এমনসব আপত্তিকর প্রশ্ন করা হয়।
জেল-জীবন
প্রসঙ্গ তিনি বলেন, 'জেলের ভেতরে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন সব-সময় সাহস জুগিয়েছেন, তাঁর
প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।'
ঢাবির এই ছাত্রের
অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের জন্য কিছুই করেনি।
কর্তৃপক্ষের ব্যাপারে হতাশ মনিরুজ্জামান মনে করেন কারাবন্দীদের মুক্তির জন্য এগিয়ে
এসেছিলেন ছাত্র-ছাত্রী আর কিছু শিক্ষক।
সকল শিক্ষক এগিয়ে আসেননি
বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মনিরুজ্জামান ইউকেবেঙ্গলিকে বলেন, 'আমি নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে
ওঠা আন্দোলনে অংশ নিয়েছি, আমি কোনো অন্যায় করিনি, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি মাত্র।'
সাতজন
ছাত্রের বিরুদ্ধে ঝুলে থাকা একান্ন নম্বর মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য সরকারের প্রতি
আহবান জানিয়েছেন মনিরুজ্জামান।
এছাড়া ঢাবিতে সুষ্ঠু
পরিবেশ বজায় রাখার ব্যাপারে সহযোগিতার অঙ্গীকারও করেছেন তিনি।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র দ্বীন ইসলাম এঞ্জেল জানান, তার
খোঁজ বের করার জন্য ভাই-বোন-সহ আত্মীয়-স্বজনের উপরে বিভিন্ন কায়দায় টর্চার চালানো
হয়।
এঞ্জেল
কোথায় আছেন, সে-খবর বের করার জন্য এসব করা হয়।
এক-পর্যায়ের বাধ্য হয়ে
তার খবর জানাতে বাধ্য হন স্বজনরা।
সেপ্টেম্বরের আট তারিখে
আটক করে তিনদিন চোখ বাঁধা অবস্থায় অজ্ঞাত স্থানে রাখা হয়।
এই তিনদিনের কোন হিসাব
দেখানো হয়নি।
এ-সময় এঞ্জেলের রাজনৈতিক
সংশ্লিষ্টতা, রাজনৈতিক মোটিফ নিয়ে প্রশ্ন করা হতো।
এঞ্জেল বলেন, 'কৌর্ট
থেকে পাঁচ দিনের রিমান্ড এনে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জবানবন্দি আদায় করা হয়।'
প্রথম দফার রিমান্ড শেষে
আবারও একদিনের রিমান্ডে নেয়া হয় তাকে।
রিমান্ডে থাকা অবস্থায়
চোখ বেঁধে রেখে শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হবার অভিযোগ করেন দ্বীন ইসলাম
এঞ্জেল ।
জিঞ্জাসাবাদকারীদের এঞ্জেল
জানিয়েছিলেন, অন্যায়ের প্রতিবাদে তৈরী হওয়া স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে অংশ নেয়াটা তিনি
অন্যায় বলে মনে করেন না।
কারা-জীবনের কাহিনী বর্ণনা করে এঞ্জেল জানান, ৮০ জনের ধারণক্ষম একটি কক্ষে দুইশো
বন্দীর সাথে তাকে থাকতে হয়েছে।
বন্দী-দশায় মানসিক
সমর্থন প্রদানের জন্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি।
অন্যান্যদের মতো
এঞ্জেলও একান্ন নাম্বার মামলা প্রত্যাহারের আহবান জানিয়েছেন এঞ্জেল।
সাংবাদিকতা বিভাগের এই
ছাত্র আরো বলেন, 'যে অপ্রীতিকর ঘটনায় ছাত্রদের নামে মামলা হলো, সে ঘটনায় কেনো
সেনা-সদস্যদের নামে মামলা হলো না তা আমার বোধগম্য নয়।'
৪
ফেব্রুয়ারী, ২০০৮
|