|
বিজয় দিবস সংখ্যা ২০০৮
রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন সময়ে মৌলবাদীদের মদদ দিয়েছে
-
ডঃ আকবর আলি খান
ডঃ
আকবর আলি খান।
১৯৭১-এ মুজিবনগর সরকারের
প্রতিরক্ষা দপ্তরে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন তিনি।
তত্বাবধায়ক সরকারের
উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।
বর্তমানে তিনি সরকার
গঠিত রেগুলেটরী রিফর্মস কমিশনের (আরআরসি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।
ঢাকায় তার সাক্ষাৎকারটি
নিয়েছেন আবদুর রহিম হারমাছি।
ইউকেবেঙ্গলিঃ কেনো মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন?
আকবর আলি
খানঃ পাকিস্তানীরা আমাদের ওপর যে-বর্বর অত্যাচার-নির্যাচন চালিয়েছিলো, তা সহ্য করতে
না পেরে বিবেকের তাড়নায় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম।
যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া
আমাদের সামনে আর কোনো পথ ছিলো না।
আমাদের স্বপ্ন ছিলো একটি
স্বাধীন দেশের ও
একটি পতাকার।
অনেক রক্তের বিনিময়ে
পাকিস্তানীদের কাছ থেকে সে-স্বপ্ন আমরা ছিনিয়ে এনেছিলাম।
দীর্ঘ ৩৭ বছরে
সে-স্বপ্নের পুরোটা হয়তো বাস্তবায়ন হয়নি।
কিন্তু পরাধীনতা থেকে
মুক্ত হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে-স্বপ্ন বাঙালী বুকে ধারণ করেছিলো,
সে-স্বপ্ন পূরণও কিন্তু কম পাওয়া নয়।
ইউকেবেঙ্গলিঃ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করবেন কি?
আকবর আলি
খানঃ মুজিবনগর সরকারের প্রতিরক্ষা দপ্তরে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে সক্রিয়ভাবে
মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিই।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল
মেহেরপুরের আম বাগানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়।
এ-সরকার পরিচিত হয়
মুজিবনগর সরকার হিসেবে।
মুক্তিযুদ্ধের পুরো
সময়টা এ-সরকার দায়িত্ব পালন করে।
মুজিবনগর সরকারের শেষ
দিকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়।
প্রথম দিকে
এ-মন্ত্রণালয়ের তেমন প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি।
তাছাড়া সে-সময় সচিব
মর্যাদার কর্মকর্তারও অভাব ছিলো।
সিলেটের ডিসি আব্দুস
সামাদের নেতৃত্বে আমরা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজ শুরু করি।
সেনাবাহিনীর বাইরে থেকে
আলাদাভাবে আমরা আমাদের কাজ পরিচালনা করতাম।
মুক্তিবাহিনীর জন্য
কম্বল,
খাদ্য,
ওষুধ-সহ প্রয়োজনীয় সব
কিছু পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতাম।
আর সবচেয়ে বড়ো যে-কাজটি
করতাম সেটা হলো,
মুক্তিবাহিনীর খবর স্বাধীন
বাংলা বেতার কেন্দ্রে পৌঁছে দেয়ার কাজ।
বেতারে সে-সব সাহসী খবর
প্রচার দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করতো।
ইউকেবেঙ্গলিঃ সে-সময়ের বিশেষ কোনও স্মৃতি মনে পড়ে কি?
আকবর আলি
খানঃ সে-সময়ের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে।
বয়সের কারণে আবার অনেক
স্মৃতি ভুলে গেছি।
এ-মূহুর্তে ১৬
ডিসেম্বরের কথাই মনে পড়ছে।
১৬ ডিসেম্বর যখন
পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর আসে,
তখন একটা সমস্যা দেখা
দেয়।
মুক্তিবাহিনীর প্রধান জেনারেল
এমএজি ওসমানী তখন কলকাতায় ছিলেন না।
শেষে গ্রুপ ক্যাপ্টেন
একে খন্দকারকে ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
একই অফিসে একসঙ্গে আমরা
অনেকে কাজ করতাম।
এনিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি কখনও।
আসলে তখন আমরা সবাই
ভাবতাম,
দেশের জন্য কাজ করছি।
অন্য কোনো চিন্তা কারো
মাথায়ই ছিলো না।
সব কিছুই ছিলো দেশকে ঘিরে।
ইউকেবেঙ্গলিঃ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি এখন বেশ জোরে-শোরে আলোচিত হচ্ছে,
এ-ব্যাপারে আপনার
মন্তব্য কি?
আকবল আলি
খানঃ যুদ্ধাপরাধীদের অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত।
এতোদিন কোনো যে-তাদের
বিচার হয়নি, সেটাই আমাদের দুর্ভাগ্যের বিষয়।
যদি আমরা যুদ্ধাপরাধীদের
চিহ্নিত করে তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারি, তাহলে জাতি হিসেবে আমাদের
যে-বিভক্তি আছে-তা দূর হয়ে যাবে।
আমরা সবাই একত্রিত হয়ে
আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ
গড়ে তুলতে পারবো,
যে-স্বপ্ন আমরা ১৯৭১ সালে দেখেছিলাম।
যুদ্ধাপরাধীরা ঘৃণ্য
অপরাধ করেছে।
তাদের বিচার অবশ্যই বাংলার
মাটিতে হওয়া উচিত।
গণহত্যার বিচার হতেই হবে।
আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার
প্রচলিত আইনেই করা সম্ভব।
যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে
আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম একসঙ্গে থাকবে,
এটা হতে পারে না।
যারা অপরাধ করেছে তাদের
বিচার করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের কোনোদিনই ক্ষমা করবে না।
জাতি হিসেবে আমরা কোনো
দিনই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো না।
ইউকেবেঙ্গলিঃ নির্বাচিত নতুন সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
আকবর আলি
খানঃ বিজয়ের মাসে নতুন সরকারের কাছে আমার একটাই প্রত্যাশা, যাতে তারা ক্ষমতায়
যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের কাজটি আন্তরিকতার সঙ্গে শুরু
করে।
১৯৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা
করবে।
যে-সরকারই ক্ষমতায় আসুক না
কেনো-যুদ্ধাপরাধীরা যাতে কোনো অবস্থাতেই ক্ষমতার ধারে কাছে না আসতে পারে
সে-ব্যবস্থা করবে আমি আশা করি।
দেশের সাধারণ মানুষকে
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবী আরও জোরালোভাবে উত্থাপন করতে হবে,
যাতে নির্বাচিত সরকার
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে বাধ্য হয়।
ইউকেবেঙ্গলিঃ দেশে মৌলবাদের উত্থানের পিছনে কারণগুলো কী?
আকবর আলি
খানঃ বিভিন্ন সময়ে যে-রাজনৈতিক দলগুলো দেশ পরিচালনা করেছে, তাদের ব্যর্থতার কারণেই
দেশে মৌলবাদ-জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটেছে।
রাজনৈতিক দলগুলো
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মনে-প্রাণে ধারণ করে দেশ চালালে কোনো অবস্থাতেই দেশে এ-
অপশক্তির জায়গা হতো না।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা
ভুলে গিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন সময়ে মৌলবাদীদের মদদ দিয়েছে।
আর এ-সুযোগে তারা
অবস্থান সুসংহত করেছে।
এ-ব্যর্থতার দায়-দায়িত্ব
রাজনৈতিক সরকারগুলোকে অবশ্যই নিতে হবে।
ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করে
না।
ইউকেবেঙ্গলিঃ আসন্ন নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী বা মৌলবাদীদের কিভাবে মোকাবিলা করা যায়
বলে আপনি মনে করেন?
আকবর আলি
খানঃ মৌলবাদী বা যুদ্ধাপরাধীরা যাতে কোনো অবস্থাতেই নির্বাচিত হতে না পারে, সে-জন্য
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তাদের আসল চেহারা
দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে।
সম্মিলিতভাবে এদের বয়কট
করতে হবে।
তারা যাতে কোনোভাবেই নির্বাচিত
হতে না পারে সেজন্য ব্যাপক গণ-সংযোগ করতে হবে।
মিডিয়ারও এক্ষেত্রে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
দেশের মানুষকে সচেতন
করতে পারলে নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী,
রাজাকার,
সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে
পরাজিত করা সম্ভব।
আপলৌডঃ
১৬ ডিসেম্বর ২০০৮ |