|
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংলাপে
সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব কাঙ্খিত নয়, গণতান্ত্রিকও নয়
বাংলাদেশে
গত এক সপ্তাহ ধরে রাজনৈতিক
সংলাপে সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি থাকা না-থাকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে-কথাবার্তা
চলছে, তা দেশটির সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও নেতিবাচকতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
কেনো-না,
প্রথমতঃ এ-অপ্রাসঙ্গিক ইস্যুটি রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের
মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির মতো স্পর্শকাতর এবং জরুরী ইস্যুগুলিকে আড়াল
করে ফেলছে।
আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, জরুরী
আইন উঠে গেলেও যাতে দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার সঙ্কুচিত হয়, নির্বাচন কমিশনের
মাধ্যমে সেরকম বিভিন্ন নিয়ম সাংবিধানিকভাবে বিধিবদ্ধ করার প্রচেষ্টা চলছে।
যেমন রাজনৈতিক দল,
গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপের পর নির্বাচন
কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্যে রাজনৈতিক দলগুলির নিবন্ধন
বাধ্যতামূলক।
কমিশন এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব
চূড়ান্তও করে ফেলেছে প্রায়।
অথচ কমিশনের এ-সিদ্ধান্ত
সংবিধানের ১৫২(১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত রাজনৈতিক দলের অধিকারের পরিপন্থী।
এমনকি এটি জনপ্রতিনিধি
অধ্যাদেশেরও পরিপন্থী।
সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে
নির্বাচনে অংশ নেয়ার যে-যোগ্যতার উল্লেখ রয়েছে, তারও পরিপন্থী এ-উদ্যোগ।
এর ফলে গণতন্ত্রের
ছদ্মাবরণে দুই রাজনৈতিক দল-নির্ভর অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাংলাদেশের জনগণের কাঁধে
আরও নির্মমভাবে জেঁকে বসবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচণ্ড খাদ্যসঙ্কট চলছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য এবং
সেইসূত্রে জীবনযাত্রার ব্যয়ও অসম্ভব বেড়ে গেছে।
দেশটিতে সাধারণ মানুষের
আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ৭০ শতাংশ পার্থক্য তৈরী হয়েছে, যা অবিশ্বাস্য ও ভয়াবহ।
তত্ত্বাবধায়ক
সরকার-শাসিত ১৫ মাসে এখানে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে ৭৫ শতাংশ, কিন্তু মানুষজনের আয়
বেড়েছে মাত্র পাঁচ শতাংশ।
এই সময়ে দেশটিতে নতুন
করে গরীব হয়েছেন আরও চার কোটি মানুষ এবং মোট গরীবের সংখ্যা উন্নীত হয়েছে ১০ কোটিতে!
বিডিআরের মাধ্যমে একশটি দোকান চালু করে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের কাছে
ন্যায্যমূল্যে খাদ্য বিক্রি করে জনঅসন্তোষ স্তিমিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে
সরকারের পক্ষ থেকে।
কিন্তু এ-একশোটি দোকানে
চালের আশায় প্রতিদিন লাইনে দাঁড়ানো ৩০ হাজার মানুষের মধ্যে চাল পাচ্ছেন মাত্র ১০
হাজার মানুষ! সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিত্বসংক্রান্ত অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের ফলে এসব জরুরী
প্রসঙ্গ ধামাচাপা পড়ছে এবং নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার কাজও পিছিয়ে পড়ছে।
দ্বিতীয়তঃ বাংলাদেশী জনগণের এ-জরুরী ইস্যুগুলিকে ধামাচাপা দেয়ার ক্ষেত্রে প্রধান
ভূমিকা রাখছে দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলগুলোরই বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতা।
যেমন, 'হাতির বাইরের
দাঁতের চেয়ে ভেতরের দাঁত অনেক বেশী শক্তিশালী'
এ-যুক্তি দিয়ে গত তেসোরা
মে বিবিসি-বাংলা বিভাগের সংলাপে আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রাজনৈতিক সংলাপে
সেনাপ্রতিনিধিদের উপস্থিতির দাবী জানিয়েছেন।
বলেছেন,
'ক্ষমতায় যারা রয়েছেন,
আওয়ামী তাদের সঙ্গেই আলোচনা করবে, কর্মচারীদের সঙ্গে নয়।
আওয়ামী লীগ মহাজনের
সঙ্গেই কথা বলবে।
কেনো-না, সরকারের মধ্যে
সেনাবাহিনী আছে, কিন্তু সেনাবাহিনীর মধ্যে সরকার নেই।'
ওই
সংলাপে একই সুরে কথা বলেছেন বিএনপির সংস্কারপন্থী নেতা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল
অবসরপ্রাপ্ত হান্নান শাহ।
মনে হয়েছে, তারা যুক্তি
করেই উপস্থিত হয়েছিলেন বিবিসি'র
সংলাপে।
হান্নান শাহ বলেছেন,
উপদেষ্টাদের কাছে কোনোও
প্রশ্ন করা হলে তারা নাকি বলেন, তারা ওপরের সঙ্গে আলোচনা করে এ-ব্যাপারে মন্তব্য
জানাবেন।
ওপরে কারা আছেন, সেটা সবাই
জানেন।
তাই তিনি সংলাপে সেনাবাহিনীর
প্রতিনিধি রাখার পক্ষপাতী।
এর মধ্যে
বিভিন্ন ইস্যুতে আওয়ামী লীগ ও সিপিবি'র মতো রাজনৈতিক দলগুলো সকাল নয়টা থেকে বিকেল
চারটা পর্যন্ত গণঅনশন কর্মসূচি পালন করেছেন।
বাংলাদেশের একজন সাধারণ
মানুষও বুঝেন, সকাল নয়টায় বাড়ী থেকে পেট ভরে খেয়ে এসে বিকেল চারটা পর্যন্ত বসে
থাকলে সেটাকে অনশন বলে না।
কিন্তু এরকম সব রাজনৈতিক
কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলকেও বাংলাদেশে হাস্যকর করে তোলা হচ্ছে।
বিকল্প কোনও রাজনৈতিক
শক্তি সংঘবদ্ধ হয়ে না ওঠায় রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর সাধারণ মানুষের অনাস্থা
তাই আরও বেড়ে চলেছে।
অথচ সাধারণ মানুষের
এ-ইস্যুগুলো পুরোপুরি রাজনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবেই কেবল এ-সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার
প্রতি আস্থাহীনতা এ-সঙ্কটকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
তৃতীয়তঃ
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো বড়ো বড়ো রাজনৈতিক দলগুলোর এ-সামরিকতন্ত্র-নির্ভরতা ও
জনগণের রাজনীতিবিমুখতার ওপর ভর করে সামরিকতন্ত্র চাইছে শক্তিশালী হয়ে উঠতে।
ইতিমধ্যে তারা রাজনৈতিক
সংলাপে তাদের প্রতিনিধি উপস্থিতির প্রসঙ্গ নাকচ করে দিয়েছে।
কেনো-না, এটি এখন সামরিক
বাহিনীর প্রমাণ করা খুবই জরুরী যে, গণতন্ত্রে উত্তরণের ক্ষেত্রে তাদের সদিচ্ছার
কোনোও অভাব নেই এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তারা কোনোও ভূমিকা রাখবে না।
বস্তুতঃ এর মধ্যে দিয়ে
তারা নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াচ্ছে, যাতে জনগণ তাদের যে-কোনোও মুহূর্তে স্বাগত
জানানোর জন্যে প্রস্তত থাকে।
বাংলাদেশের সেনাবাহিনী-যে এখনও সরাসরি রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বভার নেয়নি, বরং একটি
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে দেশ চালাচ্ছে, তার একটি অন্যতম প্রধান কারণ,
আন্তর্জাতিক শক্তিগুলি বিভিন্ন দেশে অন্ততপক্ষে নির্বাচন-নির্ভর গণতান্ত্রিক আবহ
দেখতে চায়।
এ-ক'দিন আগেই বাংলাদেশ থেকে
বিদায় নেয়ার আগে বিদায়ী ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের
রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ ব্রিটিশ সরকার সমর্থন করবে না।
অন্যদিকে নবনিযুক্ত
মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি তার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন,
তিনি এসেছে থ্রি ডি
(ডেমোক্র্যাসি, ডেভেলপমেন্ট, ডিনাইয়্যাল অফ স্পেইস টু টেরোরিজম) মিশন নিয়ে।
অতএব তারাও চান না
সেনা-শাসন।
সেনাবাহিনীর সরাসরি
রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব না নেয়ার আরেকটি কারণ, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা
বাহিনীতে সেনাসদস্যদের লোভনীয় বেতনের চাকুরির হাতছানি।
কিন্তু
পেছনে ও আড়ালে থেকে রাষ্ট্রপরিচালনা করলেও নীতিনির্ধারক ক্ষেত্রগুলিতে
সেনাকর্মকর্তাদের সরব উপস্থিতি জনমনে জন্ম দিচ্ছে সেনা-বিরোধী অসন্তোষের।
সম্প্রতি দেশটির
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎবন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি জানিয়েছেন, দিনাজপুরের
ফুলবাড়ী কয়লাখনি প্রকল্প এলাকা থেকে জনবসতি তুলে দিতে সেনা-সদস্যরা নানারকম তৎপরতা
চালাচ্ছে।
দেশে এখন কৃত্রিম গ্যাসসঙ্কট
চলছে আর তার মূলে রয়েছে দেশের কয়লাখনিগুলো বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার চক্রান্ত,
এটিও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কিছুদিন আগেও জানিয়েছে, রাজনৈতিক সংলাপে জামায়াতে
ইসলামীর মতো রাজনৈতিক দলের উপস্থিতিকে তারা অবাঞ্ছিত মনে করেন।
অথচ এসব দলেরই
কোনো-কোনোটির পক্ষ থেকে এখন আবার বলা হচ্ছে, সংলাপে সেনাবাহিনীর প্রতিনিধির
উপস্থিতি বাঞ্ছনীয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক
ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে চোখ বুজেও বলা সম্ভব, সামরিকতন্ত্র ও ধর্মতন্ত্রের সম্পর্ক
এখানে গাটছড়া বেঁধে আছে এবং এ-দুই তন্ত্রকে আলাদা করে দেখা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যে
শুভ ফল বয়ে আনতে পারে না।
তা ছাড়া গণতন্ত্রের
সঙ্গে সামরিকতন্ত্র ও ধর্মতন্ত্রের বিরোধও সুস্পষ্ট।
এ-দুটির কোনওটিকে দিয়েই
গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
এ-কয়েক বছর আগেও যারা
সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন করেছেন, আজ যখন তারা হাতির পেছনের দাঁত খুঁজে বেড়ান, তখন
এও বুঝা যায়, সর্ষেতেই ভূত রয়েছে এবং সে-ভূতও তাড়ানো দরকার।
তা না হলে, একটি অর্থবহ
রাজনৈতিক সংলাপ বাংলাদেশে সম্ভব হবে না।
বরং সামরিকতন্ত্রের
অনাকাঙ্খিত ভূমিকার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে এবং বাংলাদেশ আরও দীর্ঘমেয়াদী
গণতন্ত্রহীনতার শিকার হবে।
৮ মে, ২০০৮
|