|
বাংলাদেশে
এক-এগারো'র বর্ষপূর্তি
বাংলদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পঞ্জিকায় সর্বশেষ সেনা-হস্তক্ষেপের লজ্জার
দিন তথা কথিত এক-এগারোর
বর্ষপূতি শুক্রবার।
২০০৬ সালের এগারোই
জানুয়ারী তারিখে নির্বাচন-ভিত্তিক গণতন্ত্র আরও একবার অস্তমিত হয় গণ প্রজাতন্ত্রী
বাংলাদেশে।
আরও একবার সম্মতি-ভিত্তিক
সরকার-ব্যবস্থার উপরে চড়াও হয় সেনাবাহিনী।
নির্বাচিত সরকারের তুমুল
অরাজকতার সুযোগে প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও সংস্থার আর্শীবাদ-ধন্য সেনা-নিয়ন্ত্রিত একটি
সরকার প্রতিষ্ঠা হয় বাংলাদেশে।
কোন
সন্দেহ নেই যে, এক-এগারোর পূর্বে ক্ষমতাসীন জাতীয়তাবাদী ও ধর্মবাদীরা মিলে
বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থেই ধ্বংসের দ্বার-প্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলেন।
আরও এক মেয়াদ ক্ষমতায়
থাকার জন্য রাষ্ট্রপ্রধান-সহ হেন কোন পদের চূড়ান্ত অপব্যবহারে তারা পিছ-পা হননি।
বিরোধী পক্ষের
সরকার-বিরোধী আন্দোলন আর সরকারী জোটের বিরোধী-দমন নীতির সুযোগে সৃষ্টি হয় এক-এগারো।
চিহ্নিত সংবিধান
বিশেষজ্ঞ তথাকথিত এলিট সুশীল সমাজ ও তাঁদের বিদেশী-বন্ধুরা জানিয়েছেন, এক-এগারো
অপরিহার্য হয়ে পড়েছিলো।
এছাড়াও সংবিধানের
শাস্ত্র-মাফিক ব্যাখ্যা দিয়ে তাঁরা বুঝিয়ে থাকেন যে, জরুরী অবস্থা জারী করাটা সঠিক
ছিলো।
উপরোক্ত
ব্যাখ্যা-বয়ান সঠিক বলে ধরে নিলে রাষ্ট্র-পরিচালনার নিগূঢ় একটি পূর্ব-শর্ত অবান্তর
হয়ে যায়।
প্রশ্নটি সম্মতির।
যারা দেশ চালাচ্ছেন,
তাঁদের প্রতি জনগণের সরাসরি ম্যান্ডেট আছে কি নেই? জরুরী অবস্থা কতোদিন পর্যন্ত
বলবৎ থাকাটা সাংবিধানিক? উন্নততর কোন শাসন-পদ্ধতির কথা বাদ থাকুক, চলনসই
পশ্চিমা-উদারনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেও এ-প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাবার
কোন উপায় নেই।
শাসকদলগুলোর সর্বগ্রাসী স্বেচ্ছাচারের যতোই সমালোচনা করা হোক না কেনো, দুঃখজনক হলেও
এটাইতো সত্য যে, এরা নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন।
অনেকে অবশ্য ২০০১ সালে
'ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং' হয়েছিলো বলে গভীরভাবে বিশ্বাস করেন - যা ভিন্ন প্রসঙ্গ।
সোজা-চোখে দেখলে
সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সম্মতির ভিত্তিতে ক্ষমতায় এসেছিলো জামাত-বিএনপির নেতৃত্বাধীন
চার-দলীয় জোট।
ক্ষমতায় এসে তারা যা করেছেন বা
ক্ষমতার শেষ-পর্বে যা করার চেষ্টা করছিলেন, সে-সবের নিন্দা শতমুখে জানাতে হয়।
কিন্তু এক-এগারোতে যা
হয়েছে, তা কি সমর্থনযোগ্য? সাদ্দাম হোসেন ব্যাপকহারে দেশের মানুষ মেরেছিলেন - এটা
সত্য কথা।
কিন্তু বুশ-ব্লেয়ার কি
সাদ্দামকে বিতাড়নের বৈধ কর্তৃপক্ষ হতে পারেন? এখানেই বৈধতার প্রশ্ন।
রাষ্ট্রক্ষেত্রে বৈধতার
প্রশ্নটি অগ্রাহ্য করার পরিণতি সব-সময় ভয়াবহ হয়, এর প্রমাণ আছে ইতিহাসের পরতে-পরতে।
এক-এগারোর পর থেকে বাংলাদেশে যে-সব পরিবর্তন হয়েছে, সেগুলোর দিকে একবার চোখ ফেরানো
যেতে পারে।
১৯৭১ ও ১৯৯০ সাল পেরিয়ে আসা জাতি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করছে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র
নিয়ে সবক দিচ্ছেন প্রধান সেনাপতি! কখনো-কখনো দ্বিতীয়-তৃতীয় বা চতুর্থ সেনাপতি।
সরকারী চাকুরীতে থেকেই
তাঁরা এসব করছেন।
মোহাম্মদ এরশাদের পতনের পরে এমন
দৃশ্য আর দেখা যায়নি।
থেমে নেই
রাষ্ট্রিক-সন্ত্রাস।
গত এক বছরে সেনা-পুলিশ-রাবের
হাতে কতো লোক প্রাণ হারিয়েছেন, তার হিসাব দিয়েছে
একাধিক মানবাধিকার সংগঠন।
বাংলাদেশকে রাজনীতি-শূন্য করে ফেলার প্রত্যক্ষ-প্ররোক্ষ প্রক্রিয়া চলছে দীর্ঘদিন
থেকে।
এক-এগারোর পর থেকে উলঙ্গভাবে
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
প্রতিরোধ-পর্বের
সূতিকাগার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের চক্ষুশূল।
সেনা কর্তৃক শিক্ষার্থী
নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় এখনও বেশ কয়জন শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে জেলে পুরে রাখা হয়েছে।
হলে-ক্যাম্পাসে চলছে
গোয়েন্দা সংস্থার অবারিত নজরদারী।
এক-এগারোর বর্ষ-পূর্তির
প্রাক্কালে নিরুপায় সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তুলেছেন, সেনাবাহিনী জাতীয়
সম্পদ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাহলে কী? সেনাবাহিনী বেতন-ভিত্তিক চাকুরী করেও
দেশপ্রেমিক, আর বাকীরা কি? নাকি সেনাবাহিনীর চাকুরীটাই দেশপ্রেমিকের চাকুরী? প্রশ্ন
উঠেছে, দেশগড়ার কারিগর কারা? বিশ্ববিদ্যালয় না ক্যান্টনমেন্ট?
পাবলিক
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আসা এসব প্রশ্নের উত্তর নিজে-খুঁজে নিতে হবে।
সন্ত্রাসী-দুর্নীতিবাজ-গণবিরোধী রাজনীতিককে ঘৃণা করা যায়।
কিন্তু তাই বলে রাজনীতির
বাইরে যাবার কি উপায় আছে? যে-যে অর্থে রাষ্ট্রের বাইরে যাওয়া যায় না, সে-সে অর্থে
রাজনীতির বাইরেও যাওয়া যায় না - এক মুহূর্তের জন্যও না। কু-রাজনীতিকে সু-রাজনীতির
মাধ্যমে প্রতিহত ও প্রতিস্থাপিত করতে হবে।
এতে সময় লাগবেই।
কিন্তু প্রত্যক্ষ বা
প্রচ্ছন্ন সেনা-শাসন কোনভাবেই রাজনীতির বিকল্প হতে পারে না।
বাংলাদেশে ষাটোর্ধ্ব একজন নাগরিক পাকিস্তান-পর্বে ইস্কান্দর মীর্জা, আইয়ুব খান ও
ইয়াহিয়া খানকে এবং বাংলাদেশ পর্বে জিয়া ও এরশাদকে দেখেছেন।
ধ্বংস-হত্যা-নির্যাতন ছাড়া সামরিক বাহিনী আর কী করতে পারে?
যারা এক-এগারো'র পক্ষে কথা
বলেন, তাদের দেখাতে হবে সেনা-শাসকরা কবে-কখন-কোথায়-কীভাবে দেশের ভালো করেছেন।
এক-এগারো
পরবর্তী তিনশো পঁয়ষট্টি দিনে সাধারণ মানুষের জীবনের দুর্বিপাক নিয়ে কী-ইবা বলা
যায়? বিএনপি-জামাতের লুটতরাজের সময় শুরু হওয়া মূল্য-বৃদ্ধির প্রবণতা এ-সরকারের আমলে
এসে যেখানে পৌঁছেছে, তা সমালোচনারও অযোগ্য।
চালের মূল্য বৃদ্ধি রোধে
সরকারের আর কিছুই করার নেই - এমন একটি মন্তব্যের ভেতর দিয়ে সদ্য-সাবেক হওয়া খাদ্য
উপদেষ্টাটি বুঝিয়ে দিয়েছেন বর্তমান সরকার জনগণকে কতটা পরোয়া করে।
আশার
ব্যাপার যে, মানুষ বুঝতে শুরু করেছে। এক বছরের আগের আজকের দিনটিতে মানুষের মধ্যে
যে-বিভ্রান্তি তৈরী করা গিয়েছিলো, তা নিশ্চয় আজ আর নেই। যে-মোহ তৈরী করা গিয়েছিলো,
এক বছরে সে-মোহের অবসান ঘটেছে।
১০ জানুয়ারী, ২০০৮
|