|
বিদায় ২০০৭
স্বাগতম
২০০৮
বিদায় নিলো আরওএকটি বছর।
মহাকালের বিচারে কিছুই
নয়।
কিন্তু
যাপিত জীবনের প্রতিটি
মুহূর্তের বিচারে?
বিশ্বজুড়ে মৃত্যু আর ধ্বংসের
তান্ডবলীলা স্মরণ
করলে, এ-কথাই মনে
হতে বাধ্য যে,
পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় সদ্য-সমাপ্ত বছরটি ছিলো অধিকতর কদর্য।
সার্বিক বিচারে ২০০৭ সালটি
বাংলাদেশের জন্য ছিলো একটি দাহকাল।
এ-বছরের শুরুতে
বাংলাদেশের শাসন-ক্ষমতায় আবারও সেনাবাহিনীর আবির্ভাব ঘটে।
এবার অবশ্য সঙ্গে থাকে
তথাকথিত সুশীল সমাজের একটি অংশ,
মুরুব্বী রাষ্ট্র আর
প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক
সংস্থাগুলো।
জরুরী আইনের সুবাদে গণতন্ত্র
এখন নির্বাসনে বাংলাদেশে।
কবে ফিরবে ঠিক নেই।
জরুরী অবস্থার আওতায়
রাজনীতি বন্ধ।
জনগণের
কন্ঠ রুদ্ধ।
দ্রব্যমূল্যের চাপে
স্বল্প
ও নিম্ম-বিত্তের প্রাণ
ওষ্ঠাগত।
বিত্তহীনের কথা না বলাই
শ্রেয়।
সেনা-পুলিশ আর
রাব
নামের বাহিনীর
হাতে বিনা-বিচারে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ।
রাষ্ট্রীয় আক্রোশের বলি
হয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা
পঁচে মরছেন জেলখানায়।
নির্বাচিত সরকারের অরাজকতার
সময়ে এসব ব্যাপারে অন্ততঃ
কথা বলা যেতো।
এখন জরুরী অবস্থার লঙ্ঘিত
হয়ে যাবার ভয়ে তাও বলা যায় না।
উপমহাদেশজুড়ে ২০০৭ সাল জুড়ে
উলঙ্গ নৃত্য করেছে হত্যা-রক্তপাত।
বছরজুড়ে বেশ কয়েকটি আত্মঘাতী
বোমা হামলা চালানো হয়েছে ভারতে।
রাষ্ট্র ও মৌলবাদীদের
তোপের মুখে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া লেখক তসলিমা
নাসরিনের উপরে এ-বছরে নতুন করে আঘাত
শানানো হয়েছে হায়দ্রাবাদে আর কোলকাতাতে।
আশঙ্কা হয়,
ভারতেও তিনি আর নিরাপদ
নন।
বছরের একেবারে শেষের দিকে
গুজরাটে আর হিমাচল রাজ্যে বিজয়ী হয়ে বিজেপি জানিয়ে দিয়েছে,
তাদের দিন একেবারেই শেষ
হয়ে যায়নি।
পাকিস্তানের
কথা বলাই বাহুল্য।
কতো
রকমে কতো ধরণে কতোবার
যে রক্তপাত হয়েছে,
তার হিসাব রাখাই দুঃসাধ্য।
শেষ পর্যন্ত
বেনজির ভূট্টোকে মেরে ফেলা হয়েছে।
ধর্মীয় উগ্রবাদ নাকি
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ,
কার সরাসরি দখলে যাবে পাকিস্তান?
সার্ক অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর
ভেতরে শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি ছিলো তথৈবচ।
তালিম-সিংহলী দ্বন্দ্বের
পরিণতিতে
অব্যাহত থেকেছে প্রাণহানি।
তুলনায় অনেক বেশি
আশাবাদ জাগিয়েছে হিমালয় দুহিতা নেপাল।
প্রায় আড়াই শতাব্দী
পুরোনো রাজতন্ত্র
উচ্ছেদ করে প্রজাতন্ত্র হিসাবে আবির্ভাব ঘটতে যাচ্ছে দেশটির।
বছরের শেষ দিনটিতে চমক
দেখিয়েছে নেপালের প্রতিবেশী ভূটান।
দেশটির ইতিহাসে
প্রথমবারে মতো
একটি পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে একত্রিশে ডিসেম্বরে।
বাংলাদেশ যখন তার অর্জিত
গণতন্ত্র
হারিয়ে মুক, ঠিক তখন
নেপাল-ভূটানের মতো প্রতিবেশীরা গণতন্ত্রের
সন্ধানে মুখর।
দখিনের প্রতিবেশী
মায়নমারের জেনারেলরা অবশ্য জনগণের
উপরে কয়েক-দশকের প্রাচীন ফাঁসটি আরো জোরদার করেছেন এবার।
বছরের শেষের দিকে গণ-আন্দোলন
গড়ে ওঠার মুখে তা নির্দয়ভাবে দমন করেছে জান্তা-সরকার।
পাশের দেশ থাইল্যান্ডে
অবশ্য ক্ষমতা-দখলের এক-বছর না পেরুতেই দৃশ্যতঃ অগাধ জলে পড়ে গেছে শিশু-জান্তা।
বছরের শেষ সপ্তাহের নির্বাচনে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত দলের
সংস্রবে জন্ম নেয়া দল বিজয়ী হয়েছে।
ক্ষমতাধর-ধনী
একাধিক দেশে ২০০৭
সালে ক্ষমতার পালা-বদল হয়েছে।
ব্রিটেইন,
ফ্রান্স,
জাপান,
অস্ট্রেলিয়াতে নতুন
মুখের আবির্ভাব ঘটেছে ক্ষমতার সর্বোচ্চ পদে।
ব্রিটেইনে টনি ব্লেয়ারের
বহুল আলোচিত-সমালোচিত দশকটি শেষ হয়ে ক্ষমতায় এসেছেন গর্ডন ব্রাউন।
লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী
হিসাবে শুরুতে এক-ধরণের
নির্ভরতার প্রমাণ
দিলেও, শেষের
কয়েক মাস একাধিক অভ্যন্তরীন
সমস্যা মোকাবেলায় ব্যর্থতার কারণে
জনপ্রিয়তার তলানীতে থেকে বছর শেষ করেছেন ব্রাউন।
পক্ষান্তরে
জনপ্রিয়তা বেড়েছে রক্ষণশীল
দল ও দলনেতার।
প্রতিবেশী ফ্রান্সেও নেতৃত্বের
বদল হয়েছে।
জাঁক শিরাকের স্থলে প্রেসিডেন্ট
হয়েছেন রক্ষণশীল
দলের অধিকতর কট্টর ব্যক্তিত্ব নিকোলাস সারকোজি।
সাগরপারের অস্ট্রেলিয়াতে
অবশ্য ঘটেছে উল্টো ঘটনা।
দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল
আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে বছরের শেষ প্রান্তে
ক্ষমতা দখল করেছে লেবার পার্টি।
ক্ষমতায় এসেই ইরাক থেকে
তারা সেনা প্রত্যাহার করেছে এবং
স্বাক্ষর করেছে কিয়েটো
চুক্তিতে।
ঘন-ঘন সরকার পরিবর্তনের
অভ্যাসটি ২০০৭ সালে চালু থেকেছে জাপানে।
সেপ্টেম্বরে আরও
একবার সরকার পাল্টেছে সূর্যোদয়ের দেশে।
উপুর্যপরি ক্ষমতার
পালা-বদলে অভ্যস্ত
আরেক দেশ ইতালীতে রোমানো প্রোদির সরকার অবশ্য পড়ে যেতে-যেতে
বেঁচে
গেছে।
২০০৭ সালে পরাশক্তি রাশিয়ার
ক্ষমতার কেন্দ্রে
চলেছে নানান নাটক।
সামনের মার্চে
সাংবিধানিক কারণে
পদত্যাগ করার পরও ভ্লাদিমির
পুতিনকে কীভাবে
ক্ষমতায় রাখা যায়,
তা নিয়ে চলেছে হরেক প্রচেষ্টা।
পুতিনকে ক্ষমতাধর
প্রধানমন্ত্রী
বানানোর ফর্মূলা দিয়ে রাশিয়ার
বছরটি শেষ হয়েছে।
অপর ক্ষমতাধর রাষ্ট্র চীন সামনে
এগিয়ে চলার ধারা অব্যাহত রেখেছে।
হু জিয়ানতাওর হাতে আরও
এক মেয়াদের জন্য দল ও দেশের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
আফ্রিকার জন্য তেমন কোনো
আলো ছিলো
না ২০০৭ সালে।
দারফুরে নরহত্যা থেমে-থেমে
অব্যাহত থেকেছে।
সোমালিয়া,
সুদান,
মরক্কো-সহ বেশ কিছু দেশে
ধর্মীয় উগ্রবাদীদের থাবা বিস্তৃত
হয়েছে।
গণ-দারিদ্র,
জরা,
মহামারীর হাত থেকে কবে
মুক্তি পাবে আফ্রিকা?
আরও
যারা বাকী থাকলো,
তারা বছর-বছর ধরেই কম-বেশি একই
অবস্থার মধ্য দিয়ে
যাচ্ছে।
ইরাক আর আফগানিস্তানের
কথা নতুন করে কী বলার
আছে?
পাইকারী হারে মানুষ মরছে এসব
দেশে।
ইরাকে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার
নীতি নিয়েছে আগ্রাসনকারীরা।
একদা আগ্রাসন-বিরোধী
সুন্নীরা এখন লড়ছে সুন্নী আল কায়েদার বিরুদ্ধে।
আফগানিস্তানে
আগ্রাসনকারীদের তোড়জোড়ের মধ্যে শক্তিমত্তা প্রদর্শন করেছেন
ধর্মবাদী জঙ্গীরা।
ফিলিস্তিনী
রাষ্ট্র-গঠনের ব্যাপারে বছরের শেষ দিকে বেশ আওয়াজ উঠলেও কতোটুকু
কী হয়,
তা সময় বলে দেবে।
ইরানের ক্ষমতাসীন
মৌলবাদীরা বছরের শেষে সিআইএ রিপৌর্টের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছে।
ডিসেম্বরের সিআইএর
প্রতিবেদনে বলা হয় ইরান পরমাণু
বোমা বানানোর চেষ্টা
করছে না।
সারা বছরের নানান অপ-সংবাদের
মুখে আশার আলো সঞ্চার করে গেছে লাতিন আমেরিকা।
সারাটি বছর-জুড়ে
মহাদেশটিতে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী হাওয়া অব্যাহত থেকেছে।
তবে আর বাকী থাকে কে?
যুক্তরাষ্ট্র।
এই একটি মাত্র দেশ ২০০৭
সালেও সারা পৃথিবীতে ভীতিগ্রস্ত
করে রেখেছে।
জর্জ বুশের যুক্তরাষ্ট্র
২০০৭ সালেও বলতে গেলে পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশের অভ্যন্তরীন
ইস্যুতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ
করেছে।
স্থানে-স্থানে রক্তপাত অব্যাহত
রেখেছে।
২০০৮ সালেও অধুনা-পৃথিবীর
পরম-শক্তিটির ক্ষমতার আস্ফালন থাকবে,
সে-ব্যাপারে সন্দেহের
তেমন কোন অবকাশ নেই।
১ জানুয়ারী,
২০০৭
|