|
সামরিক তত্ত্বাবধানে বেসামরিক সাফল্য-গাঁথাঃ মিডিয়ার অনবদ্য
পার্টনারশিপ
উদিসা ইসলাম
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ এ-যাবত
বেশকিছু
ট্রানজিশনের ভিতর দিয়ে গেছে রাজনৈতিক পরিসরে।
এর কারণ
কী? অল্পবয়সী একটি দেশে
এ-ধরণের অস্থিরতা
তৈরীর কী কারণ, সেসব প্রশ্ন তোলা অবশ্যই জরুরী।
তবে সেটা এখানে
নয়।
এখানে বলবো, ২০০৭ এর
জানুয়ারী থেকে বাংলাদেশে যে-কাঠামো কাজ করছে, তার সাথে মিলে যাওয়ার
চেষ্টারত আমাদের কিছু কথা।
২০০৭ এর জানুয়ারীতে
(পশ্চিমা কায়দায় যা ওয়ান ইলাভেন) এক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভেঙে জরুরী অবস্থার মধ্যে
আরেকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, যারা কি-না
দাবী
করেন যে, দেশকে অরাজক পরিস্থিতি থেকে
রক্ষা করতে এসেছেন।
তারপর থেকে দেশের
পরিস্থিতিকে দু-ভাগে দেখানোর চেষ্টা চলে - ওয়ান ইলিভেন পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী।
মিডিয়া-যে চাইলেই সৃষ্টি
ও ধ্বংস দুই-ই করতে পারে, তা সবাই জানেন।
কিন্তু
মিডিয়া-যে আদতে কিছু
পারে না, তা এই তত্ত্বাবধায়ক আমলজুড়ে
দেখলাম ও শিখলাম।
সরকারের এজেন্ডা পূর্ণতা
দিতে যেটুকু সহায়তা দেয়ার, তা মিডিয়া দিয়ে যাচ্ছে।
মিডিয়া অস্তিত্ব টিকানোর
জন্য শুধু এটুকুই বলে নিজেকে
শান্তনা
দিতে পারে, 'এটা তো আমার
কথা না, এটা সরকারের কথা; আমি কিন্তু একটু ভিন্ন
পথে ভাবি।'
সংবিধান
অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ৩ মাসের ভিতর নির্বাচন করে নির্বাচিত সরকারের কাছে
ক্ষমতা হস্তান্তর করার কথা।
২০০৭ এর জানুয়ারীতে
সাজানো
উপদেষ্টা পরিষদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয় জোট সরকার।
আওয়ামীলীগ নির্বাচন বয়কট
করে।
এ-সময় প্রচার মাধ্যমগুলোর
সবকটিতেই এ-বিষয়গুলো নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ চলেছে।
এরপর কোনো কারণ না দেখিয়ে
১০
জনের ৪
জন উপদেষ্টা একসাথে
পদত্যাগ করেন।
পরে এরা চারজনই বেশ সুবিধা
বাগাতে সক্ষম হয়েছেন। এ-অরাজক পরিস্থিতির
সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হয় ১০
জনের
উপদেষ্টা
পরিষদ।
২০০৭ এর জানুয়ারীর ৯ তারিখ
আবারো চার উপদেষ্টা কারণ না দেখিয়েই পদত্যাগ করেন (করতে বাধ্য হন)।
আবারো কোটা পূরণ করা হয়
এবং এ-দফায় কাঠামো ভেঙে আরো কয়েকজন যুক্ত হন - প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী।
মিডিয়া চুপ!
দু-বছর
থাকার ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনের দিকে না গিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের শুদ্ধিকরণ,
রাজনীতি
সংস্কার, পলিসি পর্যায়ে বড়ো-সড়ো সিদ্ধান্ত
নেয়া, দুটো জাতীয় বাজেট ঘোষণার মতো
কাজগুলো করে যাচ্ছে।
কিন্তু তাদের এ-কার্যকলাপ কেউ সমর্থন করে কি-না, সে-বিষয়ে জানার আগ্রহ তাদের নেই।
মোদ্দা বিষয় হলো, তারা
টিকে আছেন।
গণবিচ্ছিন্ন সরকারকে টিকে থাকতে
কী-কী করা লাগে? জরুরী অবস্থা জারী করে মৌলিক
অধিকার কেড়ে নেয়া; রাজনীতি চেতনা ধ্বংস করা; মিডিয়াকে পুরো মাত্রায়
নিজেদের প্রচারণায় সফলভাবে ব্যবহার করা।
এসবই যারা ঠিকঠাক করতে
পারলে তারা নিজেদের মতো করে যতোদিন খুশি টিকে থাকতে পারে।
আপনি প্রশ্ন করতে পারবেন
না।
এবারের
কাঠামোটি আরেক দিক থেকেও ভিন্ন
ও অনন্য।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের
পাশাপাশি আছেন সামরিক বাহিনী, ছায়ার মতো।
এ-দেশ মুজিব-সরকার
দেখেছে, মুজিব-আমল পরবর্তী একাধিক
সামরিক অভ্যুত্থান, জিয়া ও এরশাদের সামরিক-শাসন
এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা,
এ-সবগুলোর সাথে বাংলাদেশের জনগণ পরিচিত।
এবার নতুন
নাম ব্যবহার
করা হলো 'সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার'।
প্রশ্ন তোলা যায়, সেনাবাহিনীর কার্যক্রমের
এতোদিন বিজ্ঞাপন দেয়া প্রয়োজন হয়নি কেনো? এখন কেনো দেশের প্রথম
সারির শিল্পীদের দিয়ে সেনা-নৌ-বিডিআর দেশকে
কীভাবে রক্ষা করছে তার বিজ্ঞাপন দিয়ে
সরকারী-বেসরকারী টেলিভিশনের প্রাইম টাইম নিয়ে নেয়া হচ্ছে? এসব বুঝে চুপ করে থাকতে
হবে।
চুপ করে
থাকতে হবে আর একটি কারণে। ১৯৭১-এ আর্মি-আতঙ্কের পরে আমাদের দেশের সেনাবাহিনী এমন
কোনকিছু করে দেখাতে পারেনি যা থেকে ভালো কোনো অনুভূতি মানুষের মনে স্থান পাবে।
এবারের পর্বে দেখা যাচ্ছে, সেনাবাহিনীর মন যোগাতে দেশের সব নামী-দামী শিল্পীরাও মাঠে নামলেন।
'দেশ আগলে রাখছে
সেনাবাহিনী' গানের মধ্য দিয়ে তা বলতে থাকলেন।
সাংস্কৃতিক সচেতনতা কয়জন
শিল্পী ধারণে সক্ষম সে-প্রশ্ন তুলে শত্রু বাড়াতে চাই না।
২১ আগস্ট
২০০৭ এর কথা স্মরণ করতে চাই।
সেনা-সদস্যের সাথে ঢাবি
শিক্ষার্থীর তর্ক থেকে বিষয়টা যে-জায়গায় গিয়ে
দাঁড়িয়েছিলো,
তা আমাদের সবার মনে আছে।
সেনা-কর্তৃপক্ষ তখন
বারবার একটি বিষয় বলছিলেন,
'আমরা তো পাকিস্তানী
আর্মি নই।'
তারা বলেছিলেন,
'আমরা অভিযুক্ত সেনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো, তারপরও ছাত্ররা শুনছে না, বাড়াবাড়ি করছে।'
স-অভিযুক্ত সেনার
কী
করা হয়েছে, তা কিন্তু আমরা জানি না।
এটা তাদের নিজেদের
বিষয়
- প্রশ্ন্ব করা যায় না।
মিডিয়ার কাছে এগুলো
কনটেন্ট
না।
২০
এপ্রিল ২০০৮।
রাঙামাটির সাজেকে বাঙালী
সেটলার কর্তৃক পাহাড়ীদের ঘর পুড়িয়ে দেয়ার একটি ঘটনা ঘটে।
আমরা পরিদর্শনে গিয়ে যখন
বাঘাইহাট জৌনে সেকেণ্ড-ইন-কমান্ডের সাথে কথা বলছি,
তখন কোনো অনুমতি ছাড়াই এক
সেনা আমাদের স্টীল ফটো
তুলতে এবং ভিডিও করতে শুরু করে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের
এরচেয়ে বড়ো উদাহরণ
কী হতে পারে?
আপনি চাইলেই ওখানে
দাঁড়িয়ে সেই ক্যাম্পের বা সেই অফিসারের বিনা অনুমতিতে ছবি নিতে পারবেন না।
২১ আগস্ট ২০০৭ এর ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়েও এভাবেই ছাত্র-ছাত্রীদের বিরুদ্ধে
ভিডিও-ক্যামেরা তাক করেছিলো সেনাবাহিনী।
মিডিয়াতে
এসব আলাপ করা যায় কখনও? এসব বিষয় সামনে তুলে
ধরার আগ্রহ দেখাতে পেরেছে আমাদের মিডিয়া? পুরো সময়টাতে এতোগুলো
মিডিয়া সক্রিয় থাকার পরও কি আমরা বলতে পারবো যে, আসল চিত্র ফুটে উঠেছে সে-সময়গুলোর? প্রতিবাদ করার কারণে যারা তাড়া
খেয়ে অপরিচিত কারও বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলো, কারফিউ এর ভিতরেও তাদের খবর কি আমরা
পেয়েছি? ২৩ আগস্ট আজিজ মার্কেটে প্রতিটা
ঘরে ঢুকে-ঢুকে চেক করে যে-ধড়-পাকড় চলেছে, আমরা কি তার খবর জানি?
রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিজিএফআইর
গাড়ী পোড়ানো মামলার বিষয়টা বলা যেতে পারে।
ডিজিএফআই বাদী।
বিষয়ঃ রাবি ক্যাম্পাসে
ছাত্ররা ডিজিএফআইর গাড়ী পুড়িয়েছে।
ডিজিএফআই দাবী করলো, সেটা
হয়েছে দু-জন শিক্ষক এবং একজন কর্মকর্তা
ও এক কর্মচারীর মদদে।
অভিযোগ-একঃ
সেলফৌনে ছাত্রদেরকে ডিজিএফআইর গাড়ীর অবস্থান জানিয়ে দিয়েছিলো দুই শিক্ষক; অভিযোগ-দুইঃ
ছাত্ররা গাড়িতে আগুন দেয়
এবং তাদের সাথে এক কর্মচারী
ছিলেন।
আসল ঘটনা ভিসির বাড়ী
থেকে বের হয়ে গাড়িটি কিছুদূর যাওয়ার পরই ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়।
ততোক্ষণে ছাত্ররা খবর
পেয়েছে, ক্যাম্পাসের ভিতর এক রিক্সাচালক
পুলিসের গুলিতে নিহত হয়েছে।
পুলিসের সাথে ছাত্রদের
তখনও ধাওয়া-পাল্টা-ধাওয়া চলছে।
উত্তেজিত ছাত্ররা সে-সময়
সামনে গাড়ী পেয়ে আগুন দিয়ে দেয়।
অথচ দু-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আটক করা
হলো।
৩ মাস জেলে রাখা হলো।
মামলার রায় হলো।
রায়ে জানা গেলো, দু-শিক্ষক
ফৌনে গাড়ির
অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে বলে যে-অভিযোগ ওঠানো হয়েছিলো, তা ঠিক নয়।
ঘটনার দিন ওই দু-শিক্ষকের
বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত (গাড়ী পুড়েছিলো দুপুর ২টার দিকে) কোনো
ফোন কল আসেনি।
খোলা আদালতে প্রমাণ হয়েছে
শিক্ষকদের কোনো
সংশ্লিষ্টতা ছিলো না।
রায়ে ছাড়া পেলেন তারা।
মিডিয়া এগুলো উচ্চারণ
করতে
ভয় পেলো।
আবার, মৌন-মিছিল করার দায়ে
দু-বছর সশ্রম কারাদণ্ড-প্রাপ্ত রাবির চার শিক্ষককে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা ঘোষণার নাটক
আরও ভয়াবহ।
পরিবারের পক্ষ থেকে কোন মার্সী
পিটিশন করা হয়নি।
সরকার ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
সেটার প্রক্রিয়া শুরু
করতে একটা দরখাস্ত প্রয়োজন।
সেটা পরিবারের লোকদের
দিয়ে করিয়ে নেয়ার জন্য দীর্ঘ সাড়ে ৩ ঘন্টার সভা হয়েছে যেখানে ভিসি, ডিজিএফআইর কর্ণেল
উপস্থিত ছিলেন।
মিডিয়া ঠিক সভাস্থলের বাইরে
দাঁড়িয়ে থেকেও আসল খবর
কি জানাতে পেরেছে? এখানেও সেনাদের
সিদ্ধান্তটাই জরুরী ছিলো।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমায়
শিক্ষকরা বেরিয়ে এলেন ঠিকই,
কিন্তু তাদের মামলাটা এখনো বহাল আছে। এখনো
তারিখ পড়ে এবং হাজিরার জন্য ডাকা হয়।
সেটা কি আমরা জানি? মিডিয়া জানায়?
এবার
ভিন্ন কিছু প্রসঙ্গে যাই।
চালের দাম আকাশ ছোঁয়ার
সাথে-সাথে সাধারণ জনগণ নড়েচড়ে বসতে শুরু করা মাত্র দেশের অঘোষিত রাজা বললেন, কোনো ভয় নাই।
আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে।
বাঙালীকে খাদ্যাভ্যাস
পাল্টাতে হবে।
ভেতো বাঙালী থাকলে চলবে? একবেলা আলু খাওয়া যেতে
পারে। তো এ-ব্যাপারে সাহায্য করতে
পারে কে? কে আবার, মিডিয়া।
আলুর রেসিপি দেখাও।
বস্তির সামনে রান্নার
অনুষ্ঠান।
আলু রেঁধে দেখানো হচ্ছে।
আলুর খিচুড়ি কিভাবে
রাঁধতে হয় তার ডক্যু তৈরী হচ্ছে।
প্রাইম টাইমে মিডিয়া
এগুলো দেখাচ্ছে জন-সচেতনতার নামে।
খুব মজার
কিছু টার্ম ব্যবহার শুরু হয়েছে। যেমন, মেন্টাল ওয়্যার।
আর এটা চালিয়ে যাওয়ার
জন্য মিডিয়া নিজ কবলে নেয়াটা জরুরী।
যেটা জরুরী অবস্থার
দোহাই দিয়ে এ-সরকার ভালোভাবেই করতে পেরেছে।
এ-পর্যন্ত করা
যাবে, আর এ-পর্যন্ত করা যাবে না। লুকিয়ে-লুকিয়ে মিডিয়াকে ঠিকই অর্ডার করা হচ্ছে।
'মিডিয়ার ওপর হস্তক্ষেপ
করছি না, তারা
স্বাধীনভাবে কাজ করছে' এসব 'বাণী' খণ্ডন করার জন্য একুশে
টিভির একুশে রাত-একুশে সময় অনুষ্ঠান এবং প্রিন্ট
মিডিয়ার ক্ষেত্রে যায় যায় দিন পত্রিকা বড় উদাহরণ হতে পারে (সবগুলোর মোটামুটি
একই হাল।
তবে কোনো-কোনোটা
নগ্ন উপস্থাপনের শিকার)।
শফিক রেহমানকে সরিয়ে
দেয়া হলো।
সম্পাদক হলেন শহীদুল হক খান।
যিনি স্পষ্টতঃই একটি সুনির্দিষ্ট
মহলের এজেণ্ডা হাতে নিয়ে বসেছেন।
সম্পাদক হিসেবে যোগদানের
পরের দিন থেকে শুরু হলো প্রথম পাতায় বিশেষ সম্পাদকীয়।
যেখানে কি-না সরকারের
কথাগুলোকে ঠিক সেভাবেই তুলে দেয়া হয় কিন্তু নাম হয় সম্পাদকীয় মতামতের।
এ-হচ্ছে
বাংলাদেশের মিডিয়ার সাম্প্রতিক
অবস্থা।
সাধারণ মানুষ কার দিকে আঙ্গুল
তুলবে?
উদিসা
ইসলামঃ
গণমাধ্যম-কর্মী
আপলৌডঃ
২৬
সেপ্টেম্বর ২০০৮ |