|
জাতীয় জীবনের বেহুদা অপচয়
চিররঞ্জন সরকার
নাটকীয়ভাবে পাল্টে যাচ্ছে দেশের
রাজনৈতিক দৃশ্যপট।
সব হিসাব-নিকাশ
অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বদলে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে
সৃষ্ট দূরত্ব কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন।
রৌডম্যাপ
অনুযায়ী
ডিসেম্বরের ১৮ তারিখ জাতীয় নির্বাচনের
তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।
একই মাসের ১৮ ও ২৪ তারিখ
দু-দফায়
উপজেলা নির্বাচনের তারিখও ঘোষণা করা হয়েছে।
কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে
সরকারী মহল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নানা কৌশলে সমঝোতা প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে।
সর্বশেষ, দেশের প্রধান দু-নেত্রীর
মধ্যে বৈঠকের তোড়জোড় চালানো হচ্ছে।
তারই অংশ হিসেবে আওয়ামী
লীগ ও বিএনপির সঙ্গে সরকার রাজনৈতিক সমঝোতা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।
সমঝোতার পথ ধরেই
কারাবন্দী বিএনপি- চেয়ারপর্সন খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমান মুক্তি পেয়েছেন।
নানা নাটকীয়তার পর তারেক
রহমান চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে চলে গেছেন।
গ্রেফতারকৃত অধিকাংশ
সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও ব্যবসায়ী মুক্তি পেয়ে গেছেন।
অন্যদিকে দেশে ফেরার সুযোগ দেয়া
হচ্ছে আওয়ামীলীগ-সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে।
দু-নেত্রীই
নিজেদের বাসভবনে থেকে ঘরোয়া রাজনীতি করার সুযোগ পাবেন বলে জানা গেছে।
এসব কিছুই হচ্ছে সব দলের
অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে।
আওয়ামী লীগের পাশাপাশি
নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে বিএনপিও।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে দু-নেত্রীর
মধ্যে সংলাপ ও একটি জাতীয় পলিসী
সামিটের
যে-ঘোষণা দেয়া হয়েছে,
তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে চাঞ্চল্য
ও সংশয়।
এসবের আড়ালে বর্তমান সরকার
তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের বৈধতা আদায়ের চেষ্টা করছে এবং এ-ব্যাপারে কার্যকর সমঝোতার
ওপরই নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি নির্ভর করছে বলে
পর্যবেক্ষকমহল মনে করছেন।
দুর্নীতি-বিরোধী অভিযান প্রহসনে পরিণত
উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে একে-একে বেরিয়ে আসছে দুর্নীতির রাঘব বোয়ালরা।
অনেক দুর্নীতি মামলার
কার্যক্রম স্থগিত হয়ে গেছে হাইকৌর্টের আদেশে।
ফলে, প্রশ্নের মুখে পড়েছে
সরকারের দুর্নীতি-বিরোধী অভিযান।
প্রশ্ন উঠেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন
(দুদক) এবং বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়েও।
জনমনে প্রশ্ন দেখা
দিয়েছে, তাহলে ১১ জানুয়ারীর পট-পরিবর্তনের
সার্থকতা কোথায়? কথিত দুর্নীতিবাজরা যদি একে-একে
কারাগার থেকে বেরিয়ে আসবে, তাহলে তাদের ধরা হয়েছিলো
কেনো?
১১ জানুয়ারী ২০০৭ পট-পরিবর্তনের
মাধ্যমে ডঃ ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসেই
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের অঙ্গীকারের পাশাপাশি ব্যাপক দুর্নীতি-বিরোধী অভিযানে
নামে।
পুনর্গঠন করা হয় দুর্নীতি দমন
কমিশন (দুদক) এবং দুর্নীতিবাজদের বিচারের লক্ষ্যে
গঠন করা হয় বিশেষ আদালত।
আটক করা হয় দুর্নীতির
রাঘব বোয়ালদের।
সরকারের দুর্নীতি-বিরোধী অভিযান
নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন থাকলেও জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনকারী চিহ্নিত দুর্নীতিবাজরা
সাজা পাব, এ-প্রত্যাশায় দেশবাসী নীরবেই তা মেনে নেয়।
কিন্তু দেড় বছরের মাথায়
এসে দেখা যায়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সরকারের রফা, দুর্নীতিবাজদের আটকে
রাখতে ক্ষেত্র বিশেষে দুর্নীতি-দমন কমিশনের নিস্পৃহতা
এবং মামলা সাজানোয় ত্রুটির
কারণে অভিযুক্তদের মুক্তি অথবা হাইকৌর্টে মামলার কার্যক্রম স্থগিত হওয়া।
সরকারের দুর্নীতি-বিরোধী অভিযান
প্রথম হোঁচট খায় গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় আটক জামাতের আমির মতিউর রহমান নিজামী
জামিনে মুক্তি পাওয়ায়।
এরপর একে-একে মুক্তি
পেতে থাকেন বিএনপি সংস্কারপন্থীদের নেতা ও সাবেক মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া, বিএনপির স্থায়ী কমিটির
সদস্য শামসুল ইসলাম, সহসভাপতি এমকে আনোয়ার, যুগ্ম মহাসচিব আশরাফ
হোসেন, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক
মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল প্রমুখ।
এ ছাড়াও জামিনে মুক্তি
পেয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান, এফবিসিসিআইর সাবেক সভপতি
আব্দুল আউয়াল মিন্টু, ওবায়দুল কাদের প্রমুখ।
এরা সবাই দুর্নীতির দায়ে
অভিযুক্ত হিসেবে আটক হয়েছিলেন।
তাদের মুক্তি পাওয়ার
ঘটনায় দুর্নীতি-বিরোধী অভিযানের ভবিষ্যৎ নিয়ে জনমনে সংশয় দেখা দেয়।
কিন্তু এ- অভিযানের কফিনে
সর্বশেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া হয় দেশের সবচেয়ে বড়ো দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত তারেক
রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে।
বিএনপি চেয়ারপারসন
খালেদা জিয়ার বড়ো ছেলে ও খালেদা জিয়া মনোনীত বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক
রহমান অস্বাভাবিক দ্রুততায় ১৩টি মামলায় জামিন
পেয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর কারামুক্ত হন।
এরই ধারাবাহিকতায় জামিনে
মুক্তি পেয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা দুর্নীতির
বাঘব বোয়াল ও সন্ত্রাসের গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
দুর্নীতির অভিযোগে আটক
ব্যক্তিদের এভাবে ছেড়ে দেয়ায় বর্তমান সরকারের দুর্নীতি বিরোধী অভিযান উপহাস হিসেবেই
বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষ করে তারেক রহমানের
মুক্তির ঘটনায়।
বিএনপি-জামায়াত জোটের পাঁচ
বছরের শাসনামলে যে-ব্যক্তি দুর্নীতির
রৌল-মডেলে
পরিণত হয়েছিলেন,
তার বিরুদ্ধে সরকার কিছুই করতে পারেনি।
বরং তাকে পরিকল্পিতভাবে
একজন ‘ক্লিনম্যান
হিসেবে জেল থেকে বের
করার ব্যবস্থা করেছে।
এর মধ্য দিয়ে এ সরকারের
আরও অনেক উদ্যোগের পাশাপাশি দুর্নীতি-বিরোধী অভিযানের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা জনগণের
কাছে আর অবশিষ্ট নেই।
শুধু তাই নয়,
দুর্নীতিবাজ হিসেবে
চিহ্নিত ব্যক্তিদের মুক্তির মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সততা,
নিষ্ঠা এবং
দুর্নীতিমুক্ত সরকার উপহার দেয়ার ব্যাপারে দেশবাসীর কাছে প্রদত্ত ওয়াদা
মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
যা একইসাথে
দুর্নীতিগ্রস্ত অপরাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থানের পথ প্রশস্ত হয়েছে।
বর্তমান সরকার শুরুতে কিছু ভালো
উদ্যোগ গ্রহণ করলেও পরবর্তী সময়ে তারা সেই ভালো কাজগুলো ফেলে একের পর এক বিতর্কিত
কাজে জড়িয়ে সমাজে নানা সন্দেহ ও সংশয়ের জন্ম দিয়েছে।
গত দু'বছর
সরকার তার এসব রুটিন কাজ ছাড়াও আরও নানা দিকে কাজের ডালপালা ছড়িয়েছে।
সাংবিধানিকভাবে যা করার কথা ছিলো না বা করার এক্তিয়ার
নেই, সে-ধরণের অনেক কাজেও তারা হাত দিয়েছে।
অনির্বাচিত সরকারের এতোসব উদ্যোগকে কোনো-কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক ধৃষ্টতা হিসেবেও
অভিহিত করেছেন।
কেনো-না,
এসব কাজে তাদের কোনো ম্যান্ডেট ছিলো না।
সরকার
শুধু দীর্ঘমেয়াদী জরুরী অবস্থা জারী করেই সংবিধান লঙ্ঘন করেনি, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার
ক্ষেত্রেও তারা একই কাজ করেছে।
কেনো-না, সংবিধান অনুযায়ী
নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের পুরো দায়-দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।
অথচ নির্বাচন কমিশনকে
পাশ কাটিয়ে প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে জাতীয় নির্বাচন ও উপজেলা
নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন।
রাজনৈতিক সংস্কারের নামে আসলে
গত দু-বছরে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এ সময়-কালে অনেককিছু
ঘটলেও দু-বছরের মাথায় এসে এখন আমরা
দেখছি, এই ক্ষেত্রে অর্জন শূন্য।
সে-বিবেচনায় বর্তমান
সরকারের দু-বছরের শাসনকাল আমাদের জাতীয় জীবনে বৃথা কালক্ষেপণ হিসাবেই ইতিহাসে
স্থান পাবে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর হচ্ছে,
যারা দুটি বছর ধরে
নানাভাবে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা-দুর্ভোগকে পোক্ত করেছে,
পুরো জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে
ছিনিমিনি খেলেছে,
জাতীয় জীবনকে এমন বেহুদা অপচয়ের
মুখে ঠেলে দিয়েছে তাদের পরিণতি বা পুরস্কার
কী হওয়া উচিত,
এ বিষয়টি নিয়ে দেশের
কেউই টুঁ শব্দটি করছেন না!
প্রায় প্রতিটি
পদক্ষেপেই বর্তমান শাসক গোষ্ঠীর রাজনৈতিক দূরভিসন্ধি ও উচ্চাভিলাষের বহিঃপ্রকাশ
ঘটেছে।
জরুরী
অবস্থা চলাকালে অনেকের জন্য
বাক-স্বাধীনতা-সহ মৌলিক
মানবাধিকার নিষিদ্ধ থাকলেও কেউ-কেউ বিধি লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন।
এক্ষেত্রে সরকার রহস্যজনকভাবে নীরবতা পালন করেছে।
যুদ্ধাপরাধী ও মৌলবাদীদের ব্যাপারে সরকারের নির্লিপ্ততাও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে
চরম হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে।
সম্প্রতি
মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফেরত আসা দুর্দশাগ্রস্ত বাংলাদেশীদের
ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা নিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
মৌলবাদী
গোষ্ঠীর আস্ফালনের মুখে জাতীয় নারীনীতি নিয়ে সরকারের অবস্থান অস্পষ্টই রয়ে গেছে।
জনগণকে
অন্ধকারে রেখে গুরুত্বপূর্ণ-গুরুত্বহীন নানা ইস্যুতে একের পর এক অধ্যাদেশ জারী করা
হয়েছে।
অন্যায়ের প্রতিবাদকারীদের নির্মম নির্যাতন চালিয়ে দমন করার চেষ্টা চালানো হয়েছে।
এখন
সবকিছু অগোছালো লণ্ডভণ্ড করে
বর্তমান সরকার তার প্রস্থান কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
পরিহাস হলো,
আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোও
এ মহাসন্ধিঃক্ষণে তাদের কাঙ্ক্ষিত দায়িত্ব পালনে ক্ষমাহীন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে
চলেছে।
দ্রব্যমূল্য,
বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানিসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত সাধারণ মানুষের অসন্তোষ ক্রমেই ক্ষোভ
এবং রোষে পরিণত হচ্ছে।
একটা
রাষ্ট্রের সরকারের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা সে দেশের জনগণের সন্তুষ্টি দিয়ে পরিমাপই
সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য উপায়।
অন্য
কোনো বা অন্য কারও
স্বীকৃতি এখানে মুখ্য
বিষয় নয়।
সে
বিবেচনায় বর্তমান সরকার চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
জাতি হিসাবে এটা আমাদের জন্য
খুবই দুর্ভাগ্যজনক।
বর্তমান পরিস্থিতিতে
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী ভূমিকা।
একইসঙ্গে দরকার
রাজনীতিবিদদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং নিজেদের অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ।
আর প্রয়োজন রাজনৈতিক
সংস্কৃতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে
গুণগত পরিবর্তন না এলে আমরা বার বার ওয়ান ইলেভেনের মতো
ওস্বাভাবিক ঘটনার কবলে
পড়বো এবং প্রতিবারই সংঘাতের রাজনীতিতে ফিরে যাবো।
আর এ জন্য প্রধানত দায়ী
থাকবেন আমাদের রাজনীতিকরা।
কারণ,
রাজনীতিকদের দায়িত্বহীন
আচরণের কারণেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসনের প্রাথমিক পটভূমি তৈরী হয়।
লেখকঃ উন্নয়ন কর্মী
আপলৌডঃ ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৮ |