London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

বাংলাদেশের আদিবাসীঃ অধিপতির মনস্তত্ত্ব

দীপায়ন খীসা

বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চৌহদ্দিতে বাংলাভাষী ভিন্ন আরও অনেকগুলি জাতির বসবাসজনসংখ্যার গণনায় বাংলাভাষীদের তুলনায় এ-জাতিগুলোর লোকবল খুবই সামান্যভিন্ন-ভিন্ন জাতির পরিচিতি হিসেবে সংখ্যা নির্ণয় করলে তাদের সংখ্যা ৪৫টির অধিক তবে নিরঙ্কুশ জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে বাঙালী জাতি এ- রাষ্ট্রে একক অধিপতি জাতি হিসেবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে চলেছেবাঙালী ভিন্ন অন্যান্য জাতিসমূহকে অনেকে-অনেক অভিধায় অভিহিত করে থাকেনঅবশ্য এই সকল অভিধা আবার অধিপতি জাতিরই তৈরীঅধিপতির চোখে একমাত্র তারাই জাতি হিসেবে দাবীদার

বাঙালী ভিন্ন অন্যরা অর্থাৎ মুণ্ডা, মান্দি, সান্তাল, মারমা, খাসিয়া এরা সকলেই  উপজাতি অধিপতির মনস্তত্ত্বে বাংলাদেশে বাঙালী ভিন্ন সকল জাতিসমূহ তাদের অধস্তনঅধিপতির কিছু মানবতাবাদী আবার এ-সকল জাতিকে উপজাতি থেকে একটু উঁচুতে স্থান দিতে চানএ-নতুন নামকরণ হচ্ছে আদিবাসী নামকরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে তাদের মনস্তত্ত্বের কী পরিমাণ পরিবর্তন হয়েছে সেটা অনুসন্ধানের বিষয় আদিবাসী নামক শাব্দিক ব্যঞ্জনায় যাদেরকে পরিচিত করা হচ্ছে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি-সহ অন্যান্য অধিকারের বিষয়ে অধিপতির মনস্তত্ত্ব নিছক পোষাকী আয়োজনে নিজেদেরকে ব্যস্ত রেখেছেতাদের এ-দরদ ও ভালোবাসা কতোটুকু নিখাদ এবং কতোটুকু বা সম্মানজনক তা অবশ্য পর্যালোচনার দাবী রাখেবাংলাভাষী ভিন্ন অন্য জাতিসমূহকে আদিবাসী হিসেবে পরিচয় করানোর ক্ষেত্রে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দশকও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেঅবশ্য আদিবাসী অভিধাটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এনজিওদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছেঅনেকের ধারণা, এর সাথে অবশ্য আর্থিক যোগাযোগটি একেবারে মন্দ নয়

দেশ-বিদেশের হরেক রকমের আর্থিক যোগান আদিবাসী উন্নয়নে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ার শুরুর পর থেকে অধিপতি জাতির লোকজন ভোল পাল্টে 'উপজাতি'কে 'আদিবাসী' নামে ডাকতে শুরু করে এ-নতুন নামকরণে আলোচ্য জাতিগুলোর মানুষজন আদৌ সম্মানিত বা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন বলে কিন্তু মনে হচ্ছে না।  অধিপতি জাতির যেসব লোকেরা মহতী কথা বলেন, তারা প্রায়ই বলে থাকেন 'আমরা বাঙালীরা আদিবাসীদের উপর নানা অত্যাচার করে চলেছি।' এ-'আমরা' দিয়েই বুঝাতে চান তারা অধিপতি অন্যদের উপর কর্তৃত্ব করার তাদের একচেটিয়া অধিকারক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়ে তারা জানিয়ে দিতে চান এ-রাষ্ট্রে বাঙালীরাই সবকিছুর অধিকর্তা

আদিবাসী হিসেবে পরিচয় হওয়ার বা পরিচয় করানোর এ-বাণিজ্যিক আয়োজনে অনেকের জাতিগত পরিচয় বিলীন হয়ে যায় একজন মুণ্ডা, এজন চাঙমা, একজন বম, সকলেরই তাদের সকলের ভিন্ন জাতিগত পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য রয়েছেআদিবাসী পরিচয় কীভাবে তাদের সকলের জাতিগত বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে, সেটাও যথেষ্ট প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়আদিবাসী বলতে অধিপতি জাতির মানুষেরা ভাবতে থাকে বন-বনানী-পাহাড়ে বসবাসরত কিছু মনুষ্য প্রজাতির জীবকে, যারা অর্ধ-বস্ত্রে আবৃত থাকে এবং নানান সব জঙ্গী ফুল ও লতা-পাতা দিয়ে নিজেদের সাজিয়ে রাখেএ-আদিবাসীরা জঙ্গলে থাকতে ভালবাসে এবং  পাহাড়-বনে অর্ধ-বস্ত্রে আবৃত অবস্থায় থাকতে পছন্দ করেএ-ডিসকৌর্সকে সত্য করার জন্য অধিপতি জাতির মহান লোকেরা কতো কিছিমের গবেষণা, কতো বাহারি আলোকচিত্র ও 'আরও কতোসব 'জ্ঞানগর্ভ' তথ্যাদি হাজির করেন! নগরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষগুলোতে বসে 'আদিবাসী বিষয়ক জ্ঞানীরা' তাদের জ্ঞানের ডাল-পালার জানান দিতে কতো বিচিত্র সব গবেষণা-কর্ম হাজির করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেন

মূল সত্যটি হচ্ছে অধিপতি আদিবাসী দরদীরা আদিবাসীদেররকে অর্ধ-আদিম হিসেবে দেখতে চানঅর্ধ-আদিমতার এ-ডিসকৌর্সকে অধিপতিরা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেঅধিপতি জাতির এই ডিসকৌর্স তাদের নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতেই তৈরী করাএকজন চাঙমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে কল্পনা করতে, এক মুণ্ডাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ভাবতে, এক মান্দিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভাবতে, এক খাসিয়াকে সেনাপ্রধান ভাবতে অধিপতির 'মহান হৃদয়' ব্যথায় চিন্‌চিন্‌ করে

অধিপতির আদিবাসী দরদীদের সাথে আদিবাসী জীবন-ধারা, দৈনন্দিন জীবন-প্রণালীর কোনো প্রকার যোগাযোগ নেইআদিবাসীদের কেনো, অধিপতি জাতির মধ্যেও তারা যথেষ্ট পরিমাণ সুবিধাভোগীতাদের জীবন-যাপনের মান আম-জনতার অনেক উপরে।  অর্থনীতির এ-বিরাট ব্যবধান নিয়ে কীভাবে অধিপতি জাতির এসব দরদীরা আদিবাসীদের বন্ধু সাজেন, এ-প্রশ্নের উত্তর মীমাংসা করা দরকার।  অর্থনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে থেকে পরস্পরের বন্ধু হওয়া গেলে সমাজ বিজ্ঞান নিয়ে আবার নতুন করে ভাবতে হবে।  

আদিবাসীদের নিয়ে অধিপতিরা যে-ডিসকৌর্স তৈরী করেছে, তা একটা বিরাট ভেল্কীবাজি।  ৯আগষ্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস বাংলাদেশে আমাদের সকলের মধ্যে এ-বোধের সঞ্চার ঘটুক যে, আদিবাসী দিবস মানে একদিন সঙ সেজে আয়োজকদের রঙ্গমঞ্চে অভিনয় করা নয়বিভিন্ন কথিত দাতাসংস্থা সমূহের মনোরঞ্জনের জন্য নাচ-গানও নয়রাজধানীর সড়কে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে উৎসব করার দিন হিসেবে আদিবাসী দিবস পালন করার যথার্থতা তখনই সঠিক হবে, যখন আদিবাসী জনগণ সকল শৃঙ্খল থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে পারবেআরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, আদিবাসী জীবন মানে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে নৃত্য নয়, বাহারী পোশাক পরে রাজপথে ফ্যাশন শৌ করাও নয়আদিবাসী জীবন মানে হচ্ছে নিপীড়িত মানুষের জীবন, রাষ্ট্র ও অধিপতি জাতি কর্তৃক প্রতি পদে-পদে নিগৃহীত হবার জীবনঅধিপতির আদিবাসী দরদীরাও আদিবাসী জীবনের পরিবর্তন আনবে নাকোনো বিশেষ দাতা কিংবা কোনো দানবীরও  অধিকার আদায়ে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হবে নামনে রাখতে হবে, এ-সংগ্রাম নিপীড়িতের নিজস্ব মুক্তির সংগ্রামএ-সংগ্রামের শত্রু-মিত্র নির্ধারণ করা হয়েছে অনেক আগে

পৃথকভাবে আদিবাসী মুক্তি বলে কিছু নেইবাংলাদেশের সকল শ্রমিক-মেহনতি জনতার মুক্তির সংগ্রামের বিজয়ের সাথে আদিবাসী মুক্তির সংগ্রাম একই সুতোয় গাঁথা তাই অধিপতির তৈরী করা আদিবাসী মনস্তত্ত্ব ও ডিসকৌর্স প্রচলিত শোষণ ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করারই কিছু বাজারী আয়োজন এ-মনস্তত্ত্বের ডিসকৌর্সকে পরাজিত করে শ্রমজীবী মেহনতি জনতার ডিসকৌর্সকে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে আদিবাসী জীবন শৃংখল মুক্ত হবে

লেখকঃ মাওরুম পত্রিকার সম্পাদক

আপলৌডঃ ৮ আগস্ট ২০০৮

অন্যান্য কলাম 8

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.