|
পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নঃ রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতা
সত্যদর্শী
মুলিম-ম্যা
পার্বত্য
চুক্তি
স্বাক্ষরিত
হয়েছিল ১৯৯৭
সালের ২ ডিসেম্বর। পার্বত্য জনগণের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি
জ্যেতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে চীফ হুইপ আবুল হাসনাত
আবদুল্লাহ এ-চুক্তি স্বাক্ষর করেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট,
জুম্ম
জনগণের সশস্ত্র সংগ্রাম ও স্বাধিকার আন্দোলনের একটা সমঝোতা-স্মারক হিসেবে পার্বত্য
চুক্তির একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
চুক্তির মাধ্যমে কতোটুকু অধিকার জুম্ম জনগণ পেয়েছে, তা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে।
সে-বিতর্কে অংশগ্রহণ করা এ-রচনার প্রতিপাদ্য নয়।
রচনার শিরোনাম রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতা নিয়ে।
দেশের একটি
জনগোষ্ঠীর সাথে সরকার আনুষ্ঠানিক চুক্তি
স্বাক্ষর
করার পর তা
বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর বর্তায়।
সরকারের পালাবদল হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র তার দায়িত্ব থেকে রেহাই পেতে পারে না।
চুক্তি বাস্তবায়ন একটা চলমান প্রক্রিয়া।
চুক্তি স্বাক্ষরের অনেকগুলো বছর অতিবাহিত হয়েছে।
১৯৯৭
থেকে ২০০৮ সময় কম দীর্ঘ তা বলা যাবে না।
সময়
যতোই এগিয়েছে, ততোই চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধীর হয়ে পড়ছে।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এজেণ্ডা বাস্তবায়নের তালিকা থেকে পার্বত্য চুক্তি
হারিয়ে যেতে শুরু করেছে।
চুক্তির অপর পক্ষ জনসংহতি সমিতি অস্ত্র-সমপর্ণের মধ্য দিয়ে চুক্তি বাস্তবায়নে তাদের
দায়িত্ব পালন করেছে।
কাজেই তাদের প্রতি রাষ্ট্র কোনোরূপ দোষ চাপাতে পারে না।
অনেকেই বলতে পারেন, চুক্তি বাস্তবায়ন না করাটাই রাষ্ট্রের আসল চরিত্র।
তবে
এ-চরিত্র রাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
রাষ্ট্র হয়তো আত্মতৃপ্তি পেতে পারে এ-ভেবে যে, ১৯৯৭ সালের চুক্তি
স্বাক্ষরের
মধ্য দিয়ে
একটি সশস্ত্র সংগ্রামের তারা অবসান ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।
বিষয়টা হয়ত
আংশিক সত্য।
কিন্তু এই বিষয়টাও সত্য,
যে-বিষয়গুলি
নিষ্পত্তি করার জন্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো, সে-সব বিষয় সুরাহা করতে ব্যর্থ হলে
চুক্তি অসফল হিসেবে বিবেচিত হতে বাধ্য।
সে-কারণে সশস্ত্র সংগ্রাম নিষ্পত্তির তৃপ্তি তুললেও রাষ্ট্র তার নিজস্ব স্বার্থকেই
বিঘ্নিত করবে।
এর
সাথে রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা,
ঐ
জনগোষ্ঠীর কাছে তার আস্থাভাজন হবার বিষয়টি অন্যতম প্রধান বিবেচ্য।
পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গ আসলে রাষ্ট্রের হর্তা-কর্তারা প্রায়ই অখণ্ডতার আওয়াজ
তোলেন।
যারা
অখণ্ডতার বুলি আওড়ান, তারাই পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে
যাচ্ছে।
পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য জুম্ম জনগণ অনন্তকাল অপেক্ষা করবে সেটা প্রত্যাশা
করাটা নিশ্চয় বোকামির পরিচয় হবে।
চুক্তি যদি বাস্তবায়ন না হয়, তা হলে অনন্তকাল তার কার্যকারিতা থাকবে না।
কারণ
সময়ের সাথে মানুষের চাহিদা,
দাবী-দাওযার মাত্রা পরিবর্তিত হয়ে যায়।
আমরা
ধরে নিলাম চুক্তি আর ১০ বছর পর বাস্তবায়ন হবে।
কিন্তু যে পরিস্থিতিতে চুক্তি করা হয়েছিলো, ২০ বছর পর কি আর তার উপযোগিতা থাকবে?
পার্বত্য জনগণ কি তখন ২০ বছর আগে সম্পাদিত চুক্তির অধিকার নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে?
আর একটি
প্রশ্ন সঙ্গত কারণে চলে আসে, তা হলো রাষ্ট্রের কাছে যে-চুক্তির কোন গুরুত্ব নেই,
চুক্তি স্বাক্ষরকারী অপর পক্ষ জনসংহতি সমিতির কি এতো দায় পড়েছে যে, তারা চুক্তির
ঘানি টেনে যাবে?
জনসংহতি
সমিতিকে তার নিজস্ব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সার্থে চুক্তি অকার্যকর হিসেবে ঘোষণা
করতে হবে।
এভাবে যদি চুক্তির মৃত্যু ঘটে, তাহলে তার সকল দায়-দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর বর্তাবে।
কারণ
চুক্তি বাস্তবায়নের সকল ক্ষমতা রাষ্ট্রের কাছে গচ্ছিত আছে।
জনসংহতি সমিতিকে দুর্বল করে চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা যদি রাষ্ট্রের
লক্ষ্য হয়, তাহলে রাষ্ট্রকে আরেকটি অনিবার্য সশস্ত্র সংগ্রাম মোকাবেলা করতে হবে।
রাষ্ট্র যে-দিকে এগুচ্ছে, তাতে ধারণা করে নেয়া সহজ যে, তারা জনসংহতি সমিতিকে দুর্বল
করে দিয়ে চুক্তি বাস্তবায়ন না করে তারা পার পেয়ে যাবার রাস্তা ধরেছে।
আমরা
ধরে নিলাম রাষ্ট্র সেটা করতে সমর্থ হলো।
কিন্তু তার পরে কি রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্ণধারেরা তাদের মতো করে জুম্ম জনগণকে পরিচালিত
করতে পারবে?
চুক্তি
বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করতে সেখানে রাষ্ট্রশক্তির প্রত্যক্ষ মদদে সম-অধিকার নামক
উগ্র-মৌলবাদী অপশক্তির উত্থান ঘটানো হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে।
রাষ্ট্রশক্তির নিয়ামকরা এটাই
দেখাতে চায় চুক্তি বাস্তবায়ন করলে পার্বত্য
এলাকায় অভিবাসী হওয়া বাঙালীরা তার বিরোধিতা করবে।
এতেকরে, সেখানে একটা অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরী হবে।
অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে চুক্তির বিরুদ্ধে উস্কে দিয়ে রাষ্ট্র একটি বিরাট জুয়া খেলছে।
তার
সাথে জুম্ম জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে
সুবিধাবাজ
একটি অংশকে রাষ্ট্রীয় শক্তি আস্কারা দিয়ে চলেছে।
লক্ষ্যটা সুনির্দিষ্ট।
চুক্তি বাস্তবায়ন করার চেয়ে চুক্তিকে অচল ও অকার্যকর করে রাখার কার্যক্রমে রাষ্ট্র
খুবই উৎসাহী।
তবে
এ-উৎসাহী তৎপরতা বুমেরাং হয়ে তাদের কাছে ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রচুর।
চুক্তি করার পর তা বাস্তবায়ন না করার এ-প্রতারণা জুম্ম জনগোষ্ঠীর কাছে রাষ্ট্রের
বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
রাষ্ট্রের
উচিত দায়িত্বশীল হওয়া।
রাষ্ট্রের অখণ্ডতা যারা বিশ্বাস করেন তারা নিজ-বক্তব্যের স্বার্থে পার্বত্য চুক্তি
বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন,
এটাই
হচ্ছে দায়িত্বশীলতা।
তা
না হলে রাখাল বালকের গল্পটি আরেকবার সত্য হবে।
চুক্তি বাস্তবায়ন হলে সার্বভৌমত্ব,
রাষ্ট্রের অখণ্ডতা বিনষ্ট হবে বলে যারা জুজুর ভয় দেখাচ্ছে,
সত্যি সত্যি যখন তা হবে তখন আর এগিয়ে আসার মতো কাউকে পাওয়া যাবে না।
তাই
পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের সাথে প্রতারণা করার মানসিকতা যতো তাড়াতাড়ি
রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা পরিত্যাগ করবে, ততোই তাদের জন্য সেটা মঙ্গলজনক হবে।
১৯৯৭
সালের স্বাক্ষরিত চুক্তির বাস্তবায়নের মেয়াদ-কাল হয়তো কাগজে কলমে নির্ধারণ করা হয়নি,
তবে
সে-সময় অসীম নয়।
আপলৌডঃ ৩০ জুলাই ২০০৮ |