London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

রঙ্গ-কলমঃ দ্রব্যমূল্য এবং আমরা

চিররঞ্জন সরকার

আমাদের দেশে সম্প্রতি ভাতের বদলে আলু খাওয়ার একটা স্লৌগান চলছে সরকারের হোমরা-চোমড়া ব্যক্তিরা আলু খাওয়ার পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন ক্ষমতাসীনরা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে কী হবে, উপদেশ বিতরণ কিন্তু ঠিকই অব্যাহত রেখেছেন মানুষের বয়স আর বিগত জোট সরকারের মন্ত্রীদের অপকর্মের মতো চালের দাম কেবলই বাড়ছেমোটা চালও এখন ৩৮/৩৯ টাকা কেজি দরে বিকোচ্ছে সাধারণ মানুষ মোটা চাল কেনার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলেছে চালের ওপর চাপ কমাতে বিকল্প খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে এখন আলু খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে

কিন্তু আলুর বাজারদরও এখন চড়াতবু ভালো যে, কর্তাব্যক্তিরা আমাদের ঘাস কিংবা অন্যকিছু খেতে বলেননি, আলু খেতে বলেছেনআমরা যারা আম-জনতা আছি, তারা তো কলুর বলদ প্রভূরা যা বলবেন, আমাদের জন্য তাই সই প্রভূরা যদি আমাদের প্রতিদিন এক আঁটি করে ঘাস খেতে বলতেন এবং দিনান্তে প্রত্যেককে অন্তত এক কেজি করে দুধ দিতে বলতেন তাহলেই-বা আমাদের কী করার ছিলো? কলুর বলদের কাছে প্রভূর উপদেশ-নির্দেশই তো আইন!

উৎপাদন বাড়ানো কিংবা দাম নিয়ন্ত্রণ না করে আমাদের ভাতের বদলে ঘাস খেতে বলা হবে, ফ্যান খেতে বলা হবে, আস্ত কাঁঠাল কিংবা ফুলকপি ট্যাবলেটের মতো গিলে খেতে বলা হবে, এ আর বিচিত্র কী? এরপর যদি প্রত্যেকের জন্য কাঁঠাল পাতা খাওয়া ও ভ্যাঁ-ভ্যাঁ বাধ্যতামূলক করা হয়, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই আপাততঃ আদেশ-নির্দেশ-উপদেশ ছাড়া অন্য কোনো-কিছু খেয়ে বাঁচার মতো অবস্থা বা ব্যবস্থা আমাদের নেই বক্তৃতা আর উপদেশ ছাড়া কোনো-কিছুই এখন আর সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে না কিন্তু প্রশ্ন হলো, এভাবে বক্তৃতা খেয়ে আমরাই-বা কতোদিন বাঁচবো? আর বক্তৃতা খাইয়ে প্রভূরাই-বা কতোদিন টিকবেন?

না, দেশে এখন কোনো-কিছুই আর সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে না ভাতের বদলে-যে আমরা কাঁঠাল খাবো, তারও জো নেই কাঁঠালও বর্তমানে আমাদের কাছে দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়েছেঅথচ এ-কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল! এর অনেক গুণ রয়েছেএর পুষ্টিমান যেমন উঁচু, তেমন ফলনও হয় প্রচুর।  কাঁঠাল এখন হতাশার নাম, বঞ্চনার নামমানব সমাজে বুদ্ধিজীবীদের যে-বৈশিষ্ট্য, ফল সমাজে কাঁঠালের অবস্থানও অনেকটা সে-রকম বুদ্ধিজীবী যেমন যৌবনের চেয়ে বার্ধক্য পৌঁছে অধিক গুরুত্ব ও মর্যাদা পান, কাঁঠালও ঠিক তেমনি। 'যৌবনে নাহিকো রস রসিক যুবতী, বৃদ্ধকালে হয় সে অতি রসবতী!'

আমাদের জীবনে কাঁঠালের ভূমিকা অপরিসীমযদিও অধিকাংশ পাবলিকই কাঁঠাল খেতে পায় নাএখন ভাত খাওয়ার মতো কাঁঠাল খাওয়াও অনেক ব্যয়-সাপেক্ষআমরা বাঙালীরা কলা খাওয়ার চেয়ে যেমন কলা দেখেছি বেশি, কাঁঠালের ক্ষেত্রেও একই অভিজ্ঞতা গাছের কাঁঠাল গাছেই থেকেছে, অথচ আমরা মিছেমিছে ঢোক গিলেছি, আঠার ভয়ে অস্থির হয়েছিতবে কাঁঠালের চেয়ে এর আঠা অধিক ভয়ানক বা বিপজ্জনকঅধিক ক্ষমতাবানও মন্ত্রীর চেয়ে যেমন আমলা আমলার চেয়ে যেমন সেনা নেতার চেয়ে যেমন নেতার-হাতা কাঁঠালের আঠা যদি একবার শরীরে, কাপড়ে বা গোঁফে লেগে যায়, তাহলে সহজে তা ছাড়ানো যায় না (কিশোর-কিশোরীর নাছোর বান্দা প্রেমকে তাই বুঝি কাঁঠালের আঠার সাথে তুলনা করা হয়)এটি অনেকটা ক্ষমতার সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মতো কিংবা বড়ো রাজনৈতিক দলের ভিতরে কোন্দলের মতো একটির সঙ্গে অন্যটিকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না একবার লাগলেই খেল্‌ খতমযা সুপারগ্লুর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়

এ-আঠার কারণে কাঁঠাল নিয়ে অনেক বিপত্তি ঘটে গোঁফে একবার যদি আঠা লেগে যায় তাহলেই মহা-সর্বনাশ সাবধানীরা তাই কাঁঠাল খাওয়ার আগে গোঁফে ভালমতো তেল মেখে নেন কেনো-না, তৈলাক্ত গোঁফে আঠা খুব একটা সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় না কিন্তু তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাও এখন মুস্কিলের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের দেশের মানুষ অবশ্য খুব একটা সাবধানী নয় তারপরও কেনো-জানি অনেকে গাছে কাঁঠাল দেখলেই গোঁফে তেল মাখতে শুরু করে দেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হাতে বা মুখে এসে পৌঁছায় নাতেল মাখাই সার হয়অল্প কিছু লোক সব কাঁঠাল মজা করে খায় তাদের তৈলাক্ত শরীরে আঠাও কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না এদেশের বঞ্চিত মানুষগুলো ভাগ্য বদলের জন্য কাঁঠালের স্বাদ পাওয়ার জন্য শুধু গোঁফে তেলই মেখে গেছে; কিন্তু কাঙ্খিত কাঁঠাল গাছ থেকে, মুষ্টিমেয়র হাত থেকে কখনোই তাদের নাগালের মধ্যে আসেনিযেমন আসেনি গণতন্ত্র

ক্ষমতায় যেই গেছে, তারাই মহানন্দে মনের সাধ মিটিয়ে জনগণের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেয়েছে নির্বোধ জনগণ উচ্ছিষ্টও ভাগে পায়নি তারপরও তারা আশা ছাড়েনি গোঁফে তেল মেখেই যাচ্ছেএবার না হয় গাছের কাঁঠালগুলো হাতছাড়া হলো, আগামীবার নিশ্চয়ই মিলবে কিন্তু হায়সেই আগামী আর আসে না

লেখকঃ উন্নয়ন কর্মী

আপলৌডঃ ৩০ জুলাই, ২০০৮

     

অন্যান্য কলাম 8

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.