London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের শেষ কথা

আবুল হোসেন খোকন

একটি উন্নত এবং সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে দাঁড়াবার জন্যই বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিলোকিন্তু দীর্ঘ ৩৭ বছরেও সে-লক্ষ্য অর্জন হয়নিবরং পিছু হটতে হয়েছেআগে এ-জাতির কৃষি-সম্পদ, বনজ-সম্পদ, পানি-সম্পদ, পশু-সম্পদ ইত্যাদির প্রাচুর্য্যই ও স্বনির্ভরতাই শুধু ছিলো না, এসব শিল্প থেকে উৎপাদিত সম্পদ বিদেশে রপ্তানি করা হতো এবং তা থেকে ভালো লাভও আসতোএককথায় আগে নিজেদের অভাব পুরণ করে, নিজেদের ভবিষ্যতের মজুত রেখে উদ্বৃত্ত রপ্তানি করার মতো অবস্থা ছিলোকিন্তু আজ পুরো উল্টো অবস্থাআজ চাল, ডাল, গম, চিনি, পেঁয়াজ-রশুন, আম-জাম-কলা-ফলমূল থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, গাছ, কাঠ সবই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়না হলে, বেঁচে থাকার কোন উপায় নেইএকটি উন্নত এবং সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে দাঁড়াবার বদলে হয়েছে এ-উল্টো অবস্থা

বাংলাদেশের জন্ম হবার পর মনে করা হয়েছিলো-একাট্টা জাতির বিশাল জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করা হবেএজন্য জনসংখ্যাকে জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা হবে মহাগর্বের কৃষি-সম্পদ, পশু-সম্পদ, বনজ-সম্পদ ইত্যাদি তো ছিলোই প্রত্যাশা ছিলো জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে দক্ষ মানুষ দিয়ে এগুলোকে আরও উন্নত করা হবেফলে উৎপাদনশীলতায় আসবে তাক লাগানো উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি প্রত্যাশা ছিলো, এরই পাশাপাশি শ্রমঘন ও সাধারণ শিল্প দিয়ে একটি গণশিল্প বিপ্লব ঘটিয়ে আস্তে-আস্তে এ-দেশে বৃহৎ শিল্পায়নের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে করে এদেশ দ্রুত একটি উন্নত দেশে পরিণত হয়আর এসবই হওয়ার কথা ছিলো রাজনৈতিক এজেন্ডায়ঠিক যেভাবে '৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ বা জনযুদ্ধ হয়েছিলো এবং এর মধ্যদিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের সম্ভাবনাময় নতুন দেশের জন্ম হয়েছিলোসে-লক্ষ্যেই নবজন্মের এ-দেশের জন্য তৈরী হয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধের দর্শনভিত্তিক রাজনৈতিক এজেন্ডা, যা সংবিধান হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিলো গণতন্ত্র, বাঙালী জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র হলো যার মূলকিন্তু এ-মূলকে দাঁড়াবার আগেই হত্যা করা হলোহত্যা করা হলো গণতন্ত্রবদলে এলো অগণতান্ত্রিক সামরিক শাসনহত্যা-ক্যু ইত্যাদিখতম করা হলো জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারেহত্যা করা হলো '৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চার জাতীয় নেতৃত্বকে সংবিধানকে অকার্যকর করে মূলত হত্যা করা হলো মুক্তিযুদ্ধের দর্শনভিত্তিক রাজনৈতিক এজেন্ডাকেএভাবে বাঙালী জাতীয়তাবাদের বদলে চালু হলো বাংলাদেশী নামে ইতিহাস-বহির্ভূত এক নতুন সাম্প্রদায়িক জাতীতা ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিল করে করা হলো পুরো উল্টো বিধান - ধর্মীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা সমাজতন্ত্রেরও অপমৃত্যু ঘটানো হলোএভাবে একে-একে হত্যা করা হলো বাংলাদেশ যে-লক্ষ্যের জন্য জন্ম নিয়েছিলো, তার সবকিছুকেফলে এদেশে স্বনির্ভর বৃহৎ শিল্প হলো না, সাধারণ শিল্পেরও বিপ্লব ঘটলো না, দেশের সব উৎপাদন ক্ষেত্রগুলো আস্তে-আস্তে শেষ হয়ে যেতে থাকলোআসলে শেষ করে দেওয়া হলো এবং শেষ করে সবকিছুতে পরনির্ভরতা বা বিদেশ থেকে আমদানি নির্ভরতা তৈরী করা হলোএসব কারা-কেনো করলো, তা বোধহয় বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেইশুধু এইটুকু বললেই যথেষ্ট যে, করলো তারাই, যারা অরাজনৈতিক শক্তি ও লুণ্ঠক, যারা অগণতান্ত্রিক শক্তি এবং যারা মুক্তিযুদ্ধ বা জনযুদ্ধের শত্রু এবং যারা সমরবাদী-মৌলবাদীনেপথ্যে থাকলো এদের প্রভু সাম্রাজ্যবাদঅতএব এদেশের বিশাল জনসংখ্যা জনসম্পদে পরিণত হলো না-জনসম্পদের জন্য যে-জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি শিক্ষার প্রয়োজন ছিলো, তার বদলে চাপিয়ে দেওয়া হলো জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিবিমূখ ধর্মান্ধ শিক্ষা, তথা সর্বাত্মকভাবে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাফলে যা হবার তাই হলো এবং হচ্ছেচারদিকে শুধু ধর্মান্ধ-উন্মাদ জঙ্গী আর জঙ্গীএভাবেই এদেশের বারোটা বাজিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এখনও দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশকে একটি উন্নত এবং সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে দাঁড় করাবার স্বপ্ন ব্যর্থ হবার এ-হলো সার-সংক্ষেপ কথাএখানে দুর্নীতিটাকেও একটা বড়ো বিষয় হিসেবে অনেকে দেখে থাকেনতবে সেটা আসলে ওই শত্রুপক্ষেরই এজেন্ডার অংশএকটা সম্ভাবনাময় দেশের ভবিষ্যতকে ধ্বংস করতে যতোসব পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে, এটাও সেই যতোসব পন্থার একটিএখানে মূল- দুর্নীতি নয়মূল হলো মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক এজেন্ডাকে খতম করার ঘটনা, যেটা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়

এখানে পরিস্কার যে, বাংলাদেশকে বিপর্যয়ে পড়ার মূল কারণ হলো তার সৃষ্টির দর্শন থেকে সরে আসাআর সেই সৃষ্টির দর্শন হলো দেশের মাটি থেকে বিনির্মিত '৭২-এর সংবিধানএখানে চ্যুত হওয়ার কারণেই বিপর্যয় আর বিপর্যয়ের মধ্যদিয়ে আজকের অবস্থানে আসা হয়েছে

আজকের এ-অবস্থান আরও ভয়াবহযে-অবস্থানে রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে মেয়াদউত্তীর্ণ রাষ্ট্রপ্রধানরয়েছে মেয়াদউত্তীর্ণ এবং অনির্বাচিত একটি অরাজনৈতিক সরকার বিতর্কিতভাবে ক্ষমতায়যেখানে রয়েছে সংবিধান বহির্ভূতভাবে সেনাশাসকদের মতো বিতর্কিত খবরদারি ও তৎপরতাআর রয়েছে বিদেশী লুটেরা বহুজাতিক কোম্পানিদের রাম-রাজত্ব, যাদের কাছে কিনা দেশের সহায়-সম্পদ-জায়গা-জমি-বন্দর-প্রতিষ্ঠান-প্রাকৃতিক সম্পদ ইত্যাদি তুলে দেওয়ার মহোৎসব চালানো হচ্ছেএতোসব কিছুর পরেও রয়েছে যুদ্ধাপরাধী-মৌলবাদী বা মুসলিম সন্ত্রাসবাদীদের জন্য 'সাতখুন মাফ' অবস্থাএরা মহা-অপরাধ করেও সাজা পায় না, ক্ষমতায় থাকারা এদের আগলে রাখে রক্ষা করে-হলো এখনকার শেষ অবস্থা

অবস্থা এতোই প্রতিকূল যে, -ভয়াবহ অবস্থায়ও মানুষকে নিশ্চুপ থাকতে হচ্ছেশুধু নীরবে নিভৃতে কষ্ট পেতে হচ্ছেএমনকি দ্রব্যমূল্য-সহ জীবন-যাত্রার দুর্বিসহ অবস্থায় মৃত্যুমুখে দাঁড়িয়েও সিংহভাগ দরিদ্র মানুষ নীরবকারণ, এখানে এখন তাদের কথা বলার প্লাটফর্ম হিসেবে রাজনীতি নেতৃত্ব অনুপস্থিতনেতৃত্ব এবং রাজনীতি না থাকলে, কিংবা নেতৃত্বের বদলে অপ-নেতৃত্ব এবং রাজনীতির বদলে অপ-রাজনীতি থাকলে তো মানুষের স্বার্থরক্ষা হবে নাহতে পারেও নাসুতরাং হচ্ছে নাসে-কারণে মানুষের জন্য এখন মুক্তি সংগ্রামটা কঠিন এবং জটিল

তারপরেও এ-মুক্তি সংগ্রাম অনিবার্যকারণ, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে; এখন রুখে না দাঁড়ালে উপায় নেইযেহেতু জনযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ অর্জন করার পরও যুদ্ধের চাওয়াটা পূরণ হয়নি, সেহেতু তা পূরণের জন্য তো নতুন করে সংগ্রাম করতেই হবেঅতএব নতুন মুক্তি সংগ্রাম এখন দরিদ্র, বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত মানুষের সামনেকিন্তু এ-সংগ্রামের নেতৃত্ব কোন নেতা দেবে না গণনেতৃত্ব দেবে, তা দেখার বিষয়

লেখকঃ সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী, ঢাকা

আপলৌডঃ ২০ জুন, ২০০৮

     

অন্যান্য কলাম 8

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.