|
বিদায়
স্বায়ত্তশাসন
ও সরকারী প্রাথমিক শিক্ষা?
ইমতিয়ার
শামীম
গত ৫ জুন ২০০৮-এ বাংলাদেশের
প্রধান সারির সংবাদপত্র 'প্রথম
আলো'তে
কামাল হোসেনের একটি লেখা 'একটি
প্রতিষ্ঠানের পুনর্জীবন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩'
ছাপা হয়েছে। লেখাটিতে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, 'আমরা যখন জাতীয় ঐক্য ও ঐকমত্যের
ভিত্তিতে আমাদের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির পুনঃপ্রতিষ্ঠা
চাইছি, আমরা যাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদায় বিশ্বাসী, তাঁদের কি উচিত নয় এর
পুনর্গঠনের জন্য হাতে হাত রেখে ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশ সংশোধন করার ব্যাপারে একমত হওয়া?'
এক-কথায় বলতে গেলে, তাঁর
অভিমত হলো, ১৯৭৩-এর স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশটি জাতীয় স্বার্থে সংশোধন করা হোক।
প্রায় একই সময় অপেক্ষাকৃত কম
প্রচারের আর-একটি দৈনিক সংবাদপত্রে খবর বের হয় যে, বাংলাদেশের ৩০টি উপজেলার
সরকারী-বেসরকারী সব কটি প্রাথমিক বিদ্যালয় দেখ-ভালের দায়িত্ব গোপনে গত মার্চ মাসের
পাঁচ তারিখে বেসরকারী সংস্থা ব্র্যাকের কাছে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এ-ঘটনাটি প্রাথমিক
বিদ্যালয়কে বেসরকারী করে ফেলার প্রাথমিক পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। বিভিন্ন
পত্র-পত্রিকার খবর অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষকরা এ-ব্যাপারে আন্দোলনের প্রস্তুতি
নিচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন
আর সরকারী প্রাথমিক শিক্ষা থাকবে কি থাকবে না? এ-দু'টি বিষয়ই আমাদের কাছে
গুরুত্বপূর্ণ। কামাল হোসেন, যিনি ডক্টর কামাল হোসেন হিসেবেই সাধারণ্যে পরিচিত এবং
নামের আগে ডক্টর পদটি না থাকলে যাঁকে অনেকেই পৃথিবীর তাবৎ সাধারণ কামাল হোসেনের
তালিকায় ফেলে দেন, তাঁর কাছ থেকে লিখিতভাবে, তাও আবার বাংলা ভাষায়, কোনও অভিমত
পাওয়া সত্যিই বিরল সৌভাগ্যের ব্যাপার। বিরল এ-লেখাটি আবার এমন এক বিষয়ে লেখা যেটি
ভীষণ স্পর্শকাতর। কিন্তু তিনি ১৯৮৩ সালে সামরিক শাসন জারী করার পর হুসেইন মুহম্মদ
এরশাদও বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩কে বাতিল করার, কখনও-বা সংস্কারের
নামে অকার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু ছাত্র-শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে শেষ
পর্যন্ত আর সাহস পাননি এ-ব্যাপারে।
অন্যদিকে, প্রাথমিক
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারী করার উদ্যোগও বাংলাদেশে এ-প্রথম নয়। ১৯৮১ সালেও
বিএনপিÕর
শাসনামলে সংসদে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে বেসরকারী করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিলো।
কিন্তু শিক্ষকদের আন্দোলনে সরকার বাধ্য হয় সে সিদ্ধান্ত ত্যাগ করতে।
সঙ্গতকারণেই প্রশ্ন উঠবে, ডঃ
কামাল হোসেন কেনো হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ নিয়ে পুরানো সেই
Ôবাণীচিরন্তণÕ
লিখতে গেলেন? কেনো তিনি মনে করছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩-এর কারণেই
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপরিস্থিতিতে বিপর্যয় নেমে এসেছে? সত্যিই কি সাধারণ
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবনতিশীল পরিস্থিতির জন্যে স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশ ১৯৭৩-ই দায়ী?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে
পাওয়ার জন্যে কামাল হোসেনের এ-বাক্যগুলি আমাদের সাহায্য করতে পারে, 'সাম্প্রতিক
সপ্তাহগুলোতে নতুন ধরণের নীতিবর্জিত সহিংস ঘটনায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে,
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের উৎস থেকে একে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক উপদলের সঙ্গে
বিভিন্ন ছাত্রগোষ্ঠীর মধ্যে সাম্প্রতিক সহিংসতার সঙ্গে জ্ঞান ও সত্যসন্ধানের কোনো
সম্পর্ক নেই।'
একটি নষ্ট উদ্দেশ্যকে সাধন করার
জন্যে আরেকটি নষ্ট ছুঁতো খুঁজে পেতে হয়। কামাল হোসেন সেরকম বিভিন্ন ছুঁতো খুঁজে
পেতে চেয়েছেন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলির নীতিবর্জিত সহিংস ঘটনার মধ্যে।
যতো নষ্টের গোড়া ১৯৭৩-এর ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, এ-রকম একটি সিদ্ধান্ত নিয়েই কামাল হোসেন এ-লেখায় এ-সব
ছুঁতো খুঁজে বের করেছেন। তিনি লিখেছেন, এই অধ্যাদেশটির খসড়া কপি শেখ মুজিবুর
রহমানের হাতে তুলে দেয়ার সময় শেখ মুজিব নাকি তাঁকে বলেছিলেন, 'তোমার কি মনে হয়, এতো
নির্বাচিত প্রতিনিধি ও নির্বাচিত কার্যালয় হজম করার মতো ক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয়ের
আছে?' আমরা জানি না, শেখ মুজিব নিহত হওয়ার এতো বছর পর কেনো কামাল হোসেনের এ-Ôঅমিয়
পাথেয় বাণীÕ
মনে পড়লো। আমরা জানি না, কেনো তাঁর এতোদিন পর মনে হচ্ছে,
'বঙ্গবন্ধু
সঠিক অবস্থানে ছিলেন। এতো-এতো নির্বাচন কেবল বদহজমই ঘটায়নি; বরং স্বার্থপর ক্ষমতার
রাজনীতির মধ্যে দিয়ে তা খাদ্যে বিষক্রিয়ার রূপ নিয়েছে।'
সামরিক জান্তা এরশাদ-বিরোধী ছাত্র-গণআন্দোলনের দীর্ঘ সময় একবারও তাঁর এ-আত্মোপলব্ধি
ঘটেনি, যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদটিকে সবচেয়ে হাস্যকর বস্তুতে পরিণত করার
কাজটি ওই সময়েই সম্পন্ন হয়েছিলো। নব্বইয়ের দশকে তিনি যখন শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের
বিরুদ্ধে গণফৌরামের পক্ষ থেকে এক সমাবেশ করেন এবং এ-সংক্রান্ত একটি সমীক্ষা-সঙ্কলন
ছাপিয়ে ও বিলি করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হানাহানির তত্ত্বতালাশ করেন, তখনও তিনি
১৯৭৩-এর অধ্যাদেশের দোষ খুঁজে পাননি। এতোদিন পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন হানাহানি
অনেকটাই কমে এসেছে, ছাত্র-শিক্ষকরাও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে শিক্ষার
পরিবেশকে দলবাজী থেকে মুক্ত করার ব্যাপারে অনেক সচেতন সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন, তখন
তিনি হঠাৎ অধ্যাদেশটি পরিবর্তনের Ôবাণীচিরন্তণÕ
প্রচার করতে নেমেছেন। এর লক্ষ্য কি শুধুই
'বিদ্যাশিক্ষায়
উৎকর্ষ অর্জনের স্বর্বস্বীকৃত কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় আগে যা শ্রদ্ধা পেত তা
ফিরিয়ে আনা?ÕÕ
না, আসলে তা নয়। এর শেষ লক্ষ্য
হচ্ছে, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের প্রক্রিয়া চালু করার নামে অগণতান্ত্রিক একটি
প্রশাসনিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়া, এ-প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি ছকে-বাঁধা
সৃজন-বিমুখ, প্রশ্নহীন ও আনুগত্যশীল শিক্ষার ধারা সক্রিয় করা; উচ্চ ও মানসম্মত
শিক্ষা সবসময়েই ব্যয়বহুল, এরকম একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত করে উচ্চশিক্ষার পথ সাধারণের
জন্যে সঙ্কুচিত করা; ক্রমান্বয়ে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যক্তিখাতে তুলে
দেয়া; বেসরকারীকরণ করা, কেনো-না বাজার-মৌলবাদ এ-রকমই প্রত্যাশা করে পুঁজিশাসিত
এ-সমাজ-রাষ্ট্রের কাছ থেকে, কেনো-না কর্পোরেইটতন্ত্র এ-রকমই প্রত্যাশা করে আমাদের
রাষ্ট্রের সরকারের কাছে।
কামাল হোসেন লিখেছেন, 'ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশটি ছিলো ষাটের দশকের নেতিবাচক অভিজ্ঞতার
প্রতিক্রিয়া।'
কিন্তু এটি কি কেবলই নেতিবাচক অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়া? না কি বিশ্ববিদ্যালয়ে
জ্ঞানচর্চা বিকাশের ধারাবাহিক ইতিবাচক অভিজ্ঞতাই ছিলো এ-অধ্যাদেশের মূল পাথেয়?
কামাল হোসেন সত্যকে গোপন করতে চেয়েছেন বলে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়ার উদাহরণ
প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চার অতীত ধারাবাহিকতার দিকে
চোখ রাখলে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসিত রাখার চিন্তা শুরু হয়েছে
বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কয়েক দশকের মধ্যেই। এবং এ-চিন্তার শুরু ইতিবাচক বিবেচনা
থেকেই।
ভারত উপমহাদেশে যখন
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চিন্তাভাবনা শুরু হয় এবং পরে ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বে ও
মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়, তখন প্রশ্ন উঠেছিলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের
ডিগ্রি কতটুকু মূল্য পাবে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা প্রচলনের পিছনে বিভিন্ন মহলের
বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ছিলো। কিন্তু তারপরও শিক্ষার সর্বজনীনতা ও
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনই এগুলো প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই মৌলিক বিষয় হয়ে
ওঠে। এ-সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বক্তব্য রাখার সময় একজন ইংরেজ
উপাচার্য এমন এক ভবিষ্যতের প্রত্যাশা করেছিলেন,
'যখন
শিক্ষা এমন ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হবে, তা এমনি সাধারণ অর্জনের বিষয় হয়ে পড়বে যে, এ-আর
অসাধারণ বলে গণ্য হবে না, যার ফলে শিক্ষা কোনো বিশেষ দাবী বা ব্যক্তির কোনো
অভিযোগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে না। বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে উচ্চশিক্ষার তেমন বিস্তারই হবে
আমাদের শান্ত কামনা।'
ব্রিটিশরাজের নিয়োজিত
উপাচার্যের পক্ষ থেকে এরকম শান্ত কামনা জানানোর পরও ব্রিটিশ শাসকচক্র বার-বার
উদ্বিগ্ন হয়েছে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর হস্তক্ষেপ করতে চেয়েছে। কেনো-না তাদের মনে
হয়েছে, স্বাধীন শিক্ষার সংস্পর্শে আসার মধ্যে দিয়ে এমন সব দাবী অনিবার্যভাবেই উঠে
আসছে যেগুলোর চরিত্র রাজনৈতিক। রাজনীতির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক নিয়ে একটি
সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চেয়েছে তারা। আর এ-ব্যাপারেও মুখ খুলতে হয়েছে উপাচার্যদের।
১৮৯৩ সালে একজন ইংরেজ উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারীদের রাজনৈতিক
কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যে জানান,
'বিশ্ববিদ্যালয়ের
সদস্যদের রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে উৎসাহিত করাতে আপত্তি সম্পর্কে আমার
একটি চতুর সন্দেহ আছে, সেটি এই যে, আমরা যেহেতু যাই করি বা না করি না কেনো, তাদেরকে
নিবৃত্ত করতে পারবো না, তাই রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে নিজেদের অভিব্যক্ত করার বৈধ
সুযোগ করে দেওয়াই সকলের জন্য মঙ্গলজনক হবে।'
বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত ভূমিকা এবং স্বায়ত্তশাসন নিয়ে দ্বন্দ্ব-বিরোধ বিকশিত ও
পরিশীলিত হতে হতে ধারাবাহিকভাবে যে-সত্যে উপনীত হয়, সে-সত্যের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে
পণ্ডিত আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে। পর-পর দুবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের
উপাচার্য ছিলেন তিনি। শিক্ষার্থীরা হবে অনুগত, কর্তৃপক্ষের প্রতি দায়বদ্ধ, সরকারের
কাছে অবনত, এ-রকম সব ধারণা পোষণ করতেন তিনি প্রথম দিকে। কিন্তু পর্যায়ক্রমে তিনি
এ-জ্ঞানে উপনীত হন, কর্তৃপক্ষ ও সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকৃত শিক্ষা দিতে পারে না
এবং মুক্ত চিন্তাকে উৎসাহিত করতে পারে না।
১৯০৮
সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্যার
আশুতোষ বলেছিলেন, 'আইনসম্মত
কর্তৃপক্ষের প্রতি সে-আনুগত্যের বোধ প্রদর্শন করো যা সত্যিকারের শিক্ষাগত
শৃঙ্ক্ষলার অপরিহার্য অঙ্গ। ...নিজেদেরকে অনুগত ও মূল্যবান নাগরিক হিসাবে প্রমাণ
করো। পৃথিবীকে দেখিয়ে দাও যে, শিক্ষা ও আনুগত্য কেবল পরস্পর সঙ্গতিপূর্ণ হবে তা নয়,
বরঞ্চ যতই শিক্ষা এগোবে, যতই বিশুদ্ধ হবে সংস্কৃতি, ততই গভীরে হবে শাসকদের সঙ্গে
সম্পর্ক।'
পরের বছর
১৯০৯ সালে সমাবর্তন ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, 'সর্বপ্রকারে, সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা
করতে হবে আমাদের যুবকদেরকে তাদের হাত থেকে বাঁচাতে যারা দায়িত্বজ্ঞানহীন, ছাত্রদের
বিভ্রান্ত করতে চায় এবং আইনসঙ্গত সরকারের বিরুদ্ধে কচি মনকে ক্ষেপিয়ে তুলতে চেষ্টা
করে।'
তারপর
১৯১০ সালের সমাবর্তন ভাষণে তিনি বলেন, 'এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, কোনো-কোনো
শিক্ষক ও অধ্যাপক, ছাত্রদের পড়ানোর মতো প্রস্তুতি ও যোগ্যতা যাঁদের আছে, তাঁরা
তাঁদের ওপর অর্পিত আস্থার অপমান করছেন।'
কিন্তু
স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে ধীরে-ধীরে এই সত্যের
দিকে এগিয়ে গেলেন, অনুগত শিক্ষার্থীরা কখনও সত্য উদ্ঘাটন করতে পারে না, নতুন
চিন্তার জন্ম দিতে পারে না, নিজেদের বিকশিত করতে পারে না এবং প্রকৃত শিক্ষায় অবগাহন
করতে পারে না। তিনি দেখতে পেলেন, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার
মধ্যে এরকম সব অনুগত ডিগ্রিধারীরই জন্ম দিতে চাইছে ব্রিটিশরাজ ও সরকার।
১৯২১
সালে দ্বিতীয় দফায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হলেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়।
অসহযোগ আন্দোলন চলছে তখন। তিনি দেখতে পেলেন, সরকার চায় বিশবিদ্যালয়কে আরও
প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে। ১৯২৩-এর সমাবর্তনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এ-সমস্যার
দিকেই মুখ তুলে কথা বললেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। বললেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য
স্বাধীনতা হলো শোণিত-ধারা, বিকাশের শর্ত, সাফল্যের রহস্য।'
আশুতোষ
মুখোপাধ্যায় আরও বললেন, 'জেনে রাখুন, আমার দেহের শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত আমি
এ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অবমাননায় অংশ নেবো না। এ-বিশ্ববিদ্যালয়কে কিছুতেই গোলাম সৃষ্টির
কারখানায় পরিণত হতে দেওয়া হবে না। আমরা যথার্থরূপে চিন্তা করতে চাই। আমরা স্বাধীনতা
শিক্ষা দিতে চাই।'
এটিই
ছিলো স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের শেষ সমাবর্তন ভাষণ। পরের বছর ১৯২৪ সালে মারা যান
তিনি। কিন্তু মৃত্যুর আগে আরও একটি দৃষ্টান্তজনক ও সুদূরপ্রসারী ঘটনার জন্ম দেন
তিনি। বাংলার তৎকালীন গভর্নর লিটন এ-সময় তাঁকে এক চিঠিতে লেখেন, একটি কাজ করে দিলে
তিনি আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে আবারও উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন। কাজটি হলো,
বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন করার জন্যে ব্রিটিশ সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। লিটনের
এ-চিঠির উত্তরে, এ-প্রস্তাবকে ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
যে-চিঠি লিখেছিলেন, সেটি এখন পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত
ইতিহাসের অন্যতম প্রধান দৃষ্টান্ত।
প্রায়
একশো বছর আগে এ-আত্মোপলব্ধি ঘটেছিলো আশুতোষের জীবনে। কামাল হোসেনের জীবনেও তা ঘটলো,
তবে উল্টোভাবে। যদিও কামাল হোসেন ভালো করেই জানেন, দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী সামরিক
শাসন এদেশের শিক্ষাকাঠামোকেও অন্যায়-অভ্যস্ত, দুর্নীতিগ্রস্ত, অবনত ও বিকৃত করে
ফেলেছে এবং জানেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামধারী দলগুলোও তাদের শাসনামলে আলাদা কোনও
দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি। এ-সব একই চিত্র বার-বার বর্ণনা করার কোনও প্রয়োজন
আছে বলে মনে হয় না। প্রশ্ন হলো, এর সমাধান কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাজনীতি-মুক্ত
করা? এর সমাধান কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্তশাসন-মুক্ত করা? এর সমাধান কি
বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনপদ্ধতি তুলে দেয়া? ছাত্র ও শিক্ষকরাজনীতি কিংবা
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চয়ই কোনও ধর্মগ্রন্থ নয়-যে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা
যাবে না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের যে-নির্বাচনপদ্ধতি স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশে রয়েছে,
তাকে আরও গণতান্ত্রিক করার বদলে অগণতান্ত্রিক করে তোলা কি সমাধানের পথ? কামাল হোসেন
তো দেখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর সমস্ত রকম নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পরও অতীতের
সামরিক জান্তারা, বহুদলীয় শাসনের ছদ্মাবরণে বসবাসরত স্বৈরশাসকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের
এ-অধ্যাদেশকে বাতিল করতে চেয়েছে। কেনো চেয়েছে? নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করার পরও কেনো
তাদের মনে হয়েছে এটি একটি বড়ো হুমকি নিয়ন্ত্রকদের জন্যে? কারণ সামরিক জান্তা ও
স্বৈরশাসকদের ভালো করেই জানা আছে, চূড়ান্ত দলীয়করণের পরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের বেড়াজাল
ভেঙে মুক্তচিন্তার প্রকাশ ঘটাতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশ।
একই কথা
ছাত্র রাজনীতির বেলাতে খাটে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস বন্ধ করার পথ কি ছাত্ররাজনীতি
নিষিদ্ধ করা? নাকি ছাত্ররাজনীতিকে বিকশিত করেই কেবল সম্ভব শিক্ষাঙ্গনকে সুস্থ ও
মুক্তচিন্তা চর্চার উপযোগী করা? গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমরা ছাত্ররাজনীতির
বিরুদ্ধে ডঃ মুহম্মদ জাফর ইকবালের ব্যক্তিগত মত শুনে আসছি। দুঃখজনক হলেও সত্য, তাঁর
এ-অভিমত কর্পোরেটবাদীদের উপকার করা ছাড়া আর কারও কাজে লাগেনি। যে-মানুষটি
ছাত্ররাজনীতির বিরোধিতা করেন, সে-মানুষটি রাজাকার-আলবদরদের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজকে
জাগ্রত করতে চান, এর মতো বৈপরীত্য আর কী হতে পারে? এখন, ধরুন, আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী
রাতের অন্ধকারে উপাচার্যের আসনে আসীন হয়েছিলেন। সেটি কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশের দোষ? নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর রাষ্ট্রযন্ত্রের
হস্তক্ষেপের ফল? এ-কুখ্যাত আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী-যে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন, তার
কারণ কি রাজনৈতিক চেতনা নয়? স্বায়ত্তশাসন ও রাজনীতিকে ত্যাগ করলে কোনও
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষেই সম্ভব হবে না হাসান আজিজুল হকদের মতো মুক্ত চিন্তাবিদ ও
শিক্ষাবিদদের রক্ষা করা; বরং অচিরেই শিক্ষকদের ডঃ তাহের কিংবা ডঃ ইউনূসের পরিণতি
মেনে নিতে হবে। বার-বার শিক্ষকদের কারাগারে যেতে হবে আগস্ট ২০০৭-এর মতো।
আর কামাল
হোসেনের মুখে তো শেখ মুজিবের এসব
'অমিয়বাণী'
মানায় না। তিনি কি দেখেননি, শেখ মুজিবুর রহমান একসময় দেশের যাবতীয় অরাজকতা,
সন্ত্রাস ও দুর্নীতি থেকে উত্তরণের জন্যে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল চালু
করেছিলেন? কামাল হোসেন দাবী করে থাকেন, তিনি এর বিরোধিতা করেছিলেন। তাই যদি হয়,
তিনি তো জানেন, শেখ মুজিবের ওই পদক্ষেপের ফলে বরং বাংলাদেশে সামরিক শাসন এসেছে,
ধর্মজ রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক অধিকার সংবিধানসম্মত হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত আমরা
বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মুখটাও দেখতে পারিনি। শিক্ষাঙ্গনের সন্ত্রাস, অনিয়ম, দুর্নীতি
এবং শিক্ষাব্যবস্থার গলদের জন্যে রাজনীতি ও স্বায়ত্তশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এগুলো
ছেঁটে ফেলতে চাইলেও ফলাফল সে-রকমই হবে। গণতন্ত্রকে ছেঁটে ফেলে শেখ মুজিব
এ-রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করতে পারেননি, রাজনীতি ও স্বায়ত্তশাসনকে ছেঁটে ফেলে কামাল
হোসেনও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থিতিশীল করতে পারবেন না। একদলীয় শাসনব্যবস্থা
প্রতিষ্ঠা করে শেখ মুজিব, তারপর একদলীয় শাসনেরই আরেক রূপ সামরিক শাসন চালিয়ে জিয়া ও
এরশাদ বাংলাদেশকে পবিত্র করতে পারেননি; রাজনীতি নিষিদ্ধ করে কামাল হোসেনরাও পারবেন
না শিক্ষার মানকে উন্নত করতে।
অবশ্য ১১
জানুয়ারীর নীরব সামরিক অভ্যুত্থানকে যারা বৈধ মনে করেন, সর্বরোগহর মনে করেন,
তারা-যে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন অধ্যাদেশের মধ্যেই যাবতীয় দোষ খুঁজে পাবেন
তাতে আর সন্দেহ কি!
বাজার-মৌলবাদের কাছে আমাদের শিক্ষাকে ঠেলে দেয়ার যে-তোড়জোর চলছে, প্রাথমিক
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্র্যাকের তত্ত্বাবধানে তুলে দেয়ার ঘটনাটিও তার একটি
উদাহরণ। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে গ্রাস করার জন্যে ব্র্যাক জাল ফেলেছে অনেক
আগে। তাদের এ-লক্ষ্যের পরিপূরক কর্মসূচি হলো উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা। প্রাথমিক
শিক্ষাকে কুক্ষিগত করার ক্ষেত্রে ব্র্যাকের শক্তিশালী প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো
গণসাহায্য সংস্থা। কিন্তু ব্র্যাকের এনজিও-রাজনীতির চক্রে হাসফাঁস খেতে-খেতে
গণসাহায্য সংস্থা বাধ্য হয়েছে ব্র্যাকের কাছে তাদের দেশব্যাপী শিক্ষা কর্মসূচি তুলে
দিতে। এ-কাজে তারা ব্যবহার করেছিলো যে-এনজিওটিকে, সেই প্রশিকাও এখন মারাত্মক
দুর্দশার শিকার। দুষ্ট লোকে বলে, নেপথ্য থেকে এ-ক্ষেত্রেও ব্র্যাক ভূমিকা রাখছে।
ব্র্যাকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় তাদের শিক্ষা কর্মসূচি সম্পর্কে বলা হয়েছে,
Ôআমরা
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিকল্প কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলিনি। যে-শিক্ষার্থীরা
প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে, তাদের শিক্ষা দেয়াই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।'
কিন্তু বাস্তবতা
হলো, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঝরিয়ে ফেলা হচ্ছে ব্র্যাক স্কুলের বিবিধ
সুযোগসুবিধার হাতছানি দেখিয়ে। কয়েকদিন আগে ফজলে হোসেন আবেদ বর্তমানে উদ্ভূত
পরিস্থিতি সম্পর্কে এক সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, 'এটা পারলে
(উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা) ওটা (প্রাথমিক শিক্ষা) না পারার কি আছে?' তার মানে তিনি
প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর।
সরকার
খুব ভালো করেই জানেন, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সমস্যা কোথায়। তাদের বেতন
সামান্য, পর্যাপ্ত শিক্ষক রয়েছেন এমন স্কুল হাতে গোণা যায়। তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ
দেয়া হয় না। আর শিক্ষকসঙ্কট থাকলে স্কুল ছেড়ে তারা প্রশিক্ষণই বা নেবেন কেমন করে?
সরকারী প্রাথমিক শিক্ষকদের সারা বছর ব্যতিব্যস্ত রাখা হয়, কখনও ভোটারতালিকা তৈরীর
কাজে, কখনও আদমশুমারীর কাজে, কখনও টীকাপ্রদান কর্মসূচিতে, কখনও আবার অমুক-তমুক
জরীপের কাজে। আবার অনেক সময় বিতর্কিত সব শিক্ষাকর্মসূচির মাধ্যমে - যেমন শিক্ষার
বিনিময়ে খাদ্য -তাদের ঠেলে দেয়া হয় স্থানীয় ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে দ্বন্দ্বের
দিকে। সরকার প্রচার করে, স্কুলে গেলেই গরিব ছাত্র-ছাত্রীরা খাদ্য পাবে; কিন্তু নিয়ম
হলো, কেবল অভাবী হলেই চলবে না, নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকে এবং পরীক্ষায় একটি
নির্দিষ্ট মাত্রার নম্বর পায় এমন শিক্ষার্থীদেরই তা দেয়া হবে। গ্রামের ক্ষমতা
কাঠামো শিক্ষকদের ওপর যে অপ্রকাশ্য চাপ সৃষ্টি করে, তার ফলে স্কুলের শিক্ষকরা বাধ্য
হয় ছাত্র বা ছাত্রটিকে অভাবীর সার্টিফিকেট দিতে, বাধ্য হয় কাগজে-কলমে তাকে উপস্থিত
দেখাতে এবং বাধ্য হয় পরীক্ষার সময় ইঙ্গিতময় ভাষায় উত্তর বলে দিতে, যাতে তারা
পরীক্ষার খাতায় নির্দিষ্ট মার্কস পেতে পারে। সরকার নিজে যে-অনৈতিকতার, অশিক্ষার বীজ
বপন করেছেন তা উৎপাটন না করে, প্রাথমিক শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অযোগ্যতা ও অনিয়মের
অভিযোগ এনে জনমনে সরকারী প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে অনাস্থা তৈরী করার অপচেষ্টা চলছে
সবখানে।
আমেরিকার নিউ অরলিয়ান্সের
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনাটুকুকে মনে করুন। এ-প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের তিন মাস পর ৯৩
বছরের থুত্থুরে বুড়ো Ôআঙ্কল
মিলটিÕ
ওরফে মিলটন ফ্রীডম্যান Ôদ্য
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালÕ-এ
লিখলেন, Ôনিউ
অরলিয়ানসের অধিকাংশ বিদ্যালয় ওইসব স্কুলে পড়াশুনা করা শিশুদের বাড়ী-ঘরের মতোই ভেসে
গেছে। এই ছেলেপেলেরা এখন ছড়িয়ে আছে সারা দেশ জুড়ে। এটি একটি ট্র্যাজেডী। আবার এটি
একইসঙ্গে একটি বিরাট সুযোগ, পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে রেডিক্যালী সংস্কার করার বিরাট
সুযোগ!Õ
ফ্রীডম্যানের সেই রেডিক্যাল সংস্কারের ধারণাটি ছিলো এ-রকম, সরকারী স্কুলগুলোতে আর
সরকারের টাকা খরচ করে পুনর্নির্মাণ ও পুনর্গঠন কাজের কোনো দরকার নেই। এ-কাজের জন্যে
তো কর্পোরেটপ্রতিষ্ঠানগুলোই দাঁড়িয়ে আছে। অতএব অচিরেই আমেরিকার প্রাথমিক
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি পরিণত হলো বেসরকারিভাবে পরিচালিত চার্টার বিদ্যালয়ে।
বাংলাদেশেও তাই হতে চলেছে।
এ-সরকার এবং তাদের সুশীলবন্ধুরা চাইছেন, বাজার-মৌলবাদের স্বার্থে সাধারণ
বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে বেসরকারী করে ফেলতে। কিন্তু এ-তো আর
শ্রমিকদের পাটকল নয় যে, সরাসরি কোনো আগাম বার্তা না দিয়েই এসব বন্ধ করে দিয়ে পরে
বেসরকারী খাতে বিক্রি করে দেয়া যাবে। তাই কখনও কামাল হোসেনদের মুখ খুলতে হচ্ছে,
কখনও কর্পোরেইট কলামিস্টদের কলম খুলতে হচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য মহৎ আর তা হলোঃ বাজার
মৌলবাদের প্রতিনিধিত্ব করা এবং শিক্ষাকে বাজারের পণ্যে পরিণত করা। পুরো দেশটিকে
একটি বাজারে পরিণত করা ছাড়া তাদের মুক্তি নেই, শান্তি নেই ও তৃপ্তি নেই, তাতে দেশের
যা-ই হোক না কেনো, কোনো কিছুই আসে-যায় না।
ইমতিয়ার
শামীমঃ গল্পকার ও কলামিস্ট, লন্ডন
আপলৌডঃ ২২
জুন, ২০০৮ |