London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

সাঁওতাল বিদ্রোহঃ শ্রমজীবির মুক্তি সংগ্রাম

দীপায়ন খীসা

১৮৫৫ সালের ৩০ জুন ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের ঘটনাপুঞ্জীতে এক অনন্য সাধারণ অধ্যায়ের সংযোজন ঘটেছিলো তৎকালীন বৃটিশ ভারতের দমিনিকো এলাকায় রচিত হয়েছিলো গৌরবজ্জ্বল প্রতিরোধ সংগ্রামেরইতিহাস বিচার করতে আমার প্রচুর পরিমাণ অক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ইতহাসের অনেক ঘটনাক্রম অনেকের মতো আমাকেও আন্দোলিত করে।  তবে ইতিহাসের কথিত মূল ধারা আমাকে তেমন অনুপ্রাণিত করে নাঅধিপতি শ্রেণীর ইতিহাস, রাজন্যবর্গের বংশানুক্রম, শাসক গোষ্ঠীর যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদি নিয়ে যে-ইতিহাস, তার বৃত্ত ভেঙ্গে গণ-মানুষের ইতিহাসের একজন অতি নগণ্য ছাত্র হিসেবে ১৮৫৫ সালের ৩০ জুনকে পাঠ করার চেষ্টা চালাচ্ছি সময়টা খুব বেশি কালের নয়১৮৫৫ সালকে পুঁজি করে এক শ্রেণীর নাগরিকরা যখন রাজধানী ঢাকাতে নানান-সব মহা-আয়োজন করতে লাগলো তাদের বদৌলতে আমি সাঁওতাল বিদ্রোহ নিয়ে এক আধটু পাঠ নেয়া শুরু করিহাল নাগাদ আবির্ভাব হওয়া এ-নাগরিক ইতিহাসবিদরা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস উদযাপন করা শুরু করেছে বেশ কয়েক বছর ধরেসাঁওতাল জন-জীবনের সাথে সম্পর্কহীন এ-নাগরিকগণ ৩০ জুন আসলেই নড়ে-চড়ে বসেননানান সব বৈঠক ডাকেনবিভিন্ন কমিটি, উপ-কমিটি গঠন করেন এবং ঘটা করে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে তাদের মহতী আয়োজনের নানা ফিরিস্তি দেনশুনেছি তাদের মহতী আয়োজন করতে আবার বেশ বেগও পোহাতে হয়কী সব বাজেট করতে হয়। দাতা গোষ্ঠী খুঁজতে গলদগর্ম হতে হয় তারপর দাতারা কাড়ি-কাড়ি টাকার সাহায্য সহযোগিতা-দান করেনআবার ৩০ জুন পার হলে এ- আয়োজকরা অন্য দিবস নিয়ে মেতে থাকেনতাদের ভাবখানা হচ্ছে, যেখানে দেখিবে ছাই ...এভাবে এরা নিজেরা মহান হয়ে যান বাজেট-বৈঠক করতে-করতে নিজেদের স্ব-পেশায় সময় দেয়ার ফুসরৎও বেচারারা পান না এদের আবার নানান সব পেশাকেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ সাংবাদিক, কেউ বা মানবতাবাদী, আবার অনেকে গবেষকতবে সবার এক জায়গায় বেশ মিল, আর তা হচ্ছে বাজেট বানাতে হবে ও দাতা খুঁজতে হবেচলমান লেখার উপজীব্য সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস নিয়ে এদের বহু কিসিমের কসরৎ দেখে-দেখে আমিও হঠাৎ করে  লেখক বনে যাওয়ার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না

১৮৫৫ নিয়ে প্রচলিত ইতিহাসবিদরা তেমন আগ্রহ দেখান নাযেটুকু বলেন, তার সারমর্ম হচ্ছে সাঁওতালরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একটা বিদ্রোহ করেছিলোতাতে সিঁধু-কানু নামের দুই আদিবাসী নেতৃত্ব দিয়েছিলোপরে ব্রিটিশরা এ-বিদ্রোহ সফলভাবে দমন করে চলতি রচনায় শ্রমিক-মেহনতী জনতার মুক্তি সংগ্রামের ধারাবাহিকতারই অংশ হিসেবে ১৮৫৫ সালের ৩০ জুনকে বয়ান করার দিকে মনোনিবেশ করার চেষ্টা চালানো হবে

৩০ জুন ১৮৫৫ দমিনিকোর প্রান্তরে যে-প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনা, তাতে সামিল মানুষগণ জাতিতে সাঁওতাল কিন্তু শ্রেণীতে তারা শ্রমজীবিসামন্ত জমিদারদের অব্যাহত শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সূচনাএ-বিদ্রোহের শ্রেণী-চেতনা, মুক্তির আকাংখা তাই অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।  বিদ্রোহীরা প্রাতিষ্ঠানিক মার্কসীয় সমাজ বিজ্ঞানের উত্তাপ নিতে পারেননিকোনো প্রকার রাজনৈতিক সংগঠনের অধীনও তারা ছিলেন নাতারপরও তাদের শ্রেণী-চেতনা ছিলো খুব প্রখরভারতবর্ষের চিরায়ত প্রথার রাজন্যবর্গ, অভিজাত শ্রেণী কিংবা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এরা কেউ ১৮৫৫ বিদ্রোহের সাথে জড়িত ছিলেন নাবরং দমিনিকোর বনানীতে যখন বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছিলো, তখন কলকাতায় আধা-আধা ইংরেজী বোলের কসরৎরত কথিত ভদ্রসমাজ বিদ্রোহ নিয়ে অপপ্রচারণায় নিয়েজিত ছিলোএকটা নিরেট সত্য আমাদেরকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করবে, আর সেটা হলোঃ ভারত-ভূখণ্ডে সাঁওতালরা শ্রমজীবীদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পত্তন করতে সক্ষম হয়েছিলেন ৩০ জুন বিদ্রোহের পর দমিনিকোতে ব্রিটিশ শাসন কার্যকর ছিলো না; ছিলোনা কোনো দেশীয় রাজন্যবর্গ কিংবা কোন সামন্তপ্রভূসে-সময় দমিনিকো ছিলো পুরোটায় বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণেবিদ্রোহের নায়ক সিঁধু-কানুর নেতৃত্বে চালিত হয়েছিলো দমিনিকোর শাসনকার্যবিট্রিশ শাসনকে পরাজিত করে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো একটি বিপ্লবী সরকারএ-সরকারের আয়ু হয়তো বেশীদিন ছিলো না কিন্তু তার শাসনকালীন সময় দমিনিকোতে কোনরূপ লুঠপাট-অত্যাচার, জুলুম সংগঠিত হয়েছিলো বলে কোন তথ্য ব্রিটিশরাও দিতে পারেনি সামন্তপ্রভূদের হত্যা করা হয়েছিলো এবং ব্রিটিশ পুলিশদের বধ করা হয়েছিলোতাতো স্বাভাবিক এটাইতো বিপ্লবের নিয়ম ও গতিপ্রকৃতি

সাঁওতাল বিদ্রোহ  সে-কারণে শ্রমিক শ্রেণীর বিজয়গাঁথা বয়ান করেপৃথিবীর তাবৎ সমাজ বিপ্লবের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন মানব ইতিহাসে কল্যাণকর দিন হিসেবে বিবেচিত হবে।  ১৮৫৫ থেকে ২০০৮ সময় অনেকদূর হেঁটে এসেছেকিন্তু ৩০ জুন শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির অনুপ্রেরণা হয়ে সাহস যোগাবে।  ব্রিটিশ সাম্রজ্যবাদের বিরুদ্ধে দমিনিকোতে যে-বিজয় সূচিত হয়েছিলো, সে-বিজয়কে আত্মস্থ করা সময়ের দাবীসাম্রাজ্যবাদ এখন আরও ভযয়াবহ চরিত্র নিয়ে আমাদের মাঝে কাজ করছে

জনগণের মুক্তির সংগ্রামকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ছিনতাই করে নেয়ার হরেক রকমের আয়োজন নিয়ে আমাদেরকে বিভ্রান্ত করার দূরভিসন্ধিতে লিপ্ত রয়েছে১৮৫৫ সালের ৩০ জুনের মূল সুর শ্রেণী সংগ্রামকে বাদ দিয়ে কথিত কিছু ইতিহাসবীদদের আবির্ভাব ঘটেছে। 'আদিবাসী' নামক শাব্দিক ব্যঞ্জনায় দেশের নিপীড়িত জতিসমূহকে বন্দী রেখে শ্রেণী চেতনাকে আড়াল করার জন্য একটি মহল উঠে-পড়ে লেগেছেসাম্রাজ্যবাদী শক্তির এ-অনুচরররা সাঁওতাল বিদ্রোহের মূল জমিন থেকে আমাদেরকে ভিন্ন কিছু ধারণা নিতে বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করছেতাদের ভাষায় ৩০ জুন সিঁধু-কানু দিবস,  দিনটি সাঁওতাল আদিবাসীদের একটি বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহের ঘটনা মাত্রএরা সকলে আবার আদিবাসী-বান্ধব সাঁওতাল জনজীবন ও জীবনবোধ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশের অধিপতি জাতির কথিত আদিবাসী-বান্ধবরা বিদ্রোহের মূল সুরকে বধ করে এটাকে ব্যবসার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে যাচ্ছেনগরে বসবাস করে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আর্থিক অনুদানে যারা আদিবাসী-বান্ধব হিসেবে নিজেদেরকে জাহির করছে, তাদের চরিত্র উন্মোচন করতে না পারলে ১৮৫৫ সালের ৩০ জুনের মুল চেতনা ভূলন্ঠিত হয়ে যাবেবিচ্ছিন্নভাবে আদিবাসী মুক্তি বলে কিছু নেইদাতাগোষ্ঠীর যারা ফেরীওয়ালা, তারা যতো আদিবাসী মুক্তি ফেরী করুক না কেনো, তাতে মুক্তি সম্ভব নয়মুক্তি সম্ভব ১৮৫৫ সালের পথ ধরে অধিপতি জাতির সকল অধীনস্থতাকে পরাজিত করতে হলে শ্রমিক শ্রেণী রাষ্ট্রের পত্তন ঘটাতে হবে১৮৫৫ তে দমিনিকো যে-স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলো, তার শাখা-প্রশাখার বিস্তার ঘটানো আমাদের পবিত্র কর্তব্য তার জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংগ্রামের১৮৫৫ বারবার আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় ইতিহাস শ্রমিক শ্রেণীর বিজয়ের ইতিহাসসাম্রাজ্যবাদ যতোই ভেল্কীবাজি দেখাক না কেনো, সাম্রাজ্যবাদের বেতনভূক্ত আদিবাসী-বান্ধবরা যতোই শ্রেণীকে আড়াল করার ষড়যন্ত্র চালাক না কেনো, ইতিহাসের গতিপ্রকৃতির মূল নিয়ামক শ্রমজীবি জনতা সিঁধু-কানুর পথ ধরে, বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দিয়ে ১৮৫৫ সালের বিজয়-গাঁথা রচিত হবে বারবারএটাই হোক ২০০৮ সালের ৩০জুনের মূল শপথ

দীপায়ন খিসাঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ঢাকা

আপলৌডঃ ২২ জুন, ২০০৮

অন্যান্য কলাম 8

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.