|
কল্পনার জন্য
উদিসা ইসলাম
হিল
উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করা হয় ১৯৯৬ সালে।
অপহরণের খবর প্রথম জানতে
পাই পত্রিকা মারফত।
১৯৯৬ এর জুনের
১২ তারিখ গভীর রাত।
নিজ বাড়ী থেকে
এ-সংগ্রামী নেত্রীকে তুলে নিয়ে যায় সাদা পোশাকধারী কিছু লোক।
পরিবারের মানুষদের সামনে
দিয়ে।
তারপর ১২ বছর কাটলো।
কল্পনাকে ফিরে পায়নি তার
পরিবার,
সহযোদ্ধারা ও
আমরা।
আমাদের দূর্ভাগ্য,
আকালের দিনে একজন
সংগঠককে হারাতে হয়েছে।
আমাদের লজ্জাঃ নিজেদের
অপরাধ লুকাতে,
দায়িত্ব এড়াতে আমরা নারীদের
নিয়ে কেচ্ছা রটানোকে পদ্ধতি হিসেবে নিয়ে থাকি।
নিরাপত্তার দায়িত্বে
নিয়োজিত সেনা কর্তৃপক্ষ তেমনই দায়িত্ব নেয়নি এ-অপহরণের।
বরং অনেক যুক্তি দাঁড়
করিয়ে,
গল্প ফেঁদে আমাদেরকে ভিন্নপথে
ভাবাতে অনেক চেষ্টা করেছে।
কল্পনা
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালো,
অধিকার আদায়ে সরব হলো,
অন্যদের সক্রিয় করে
তুলতে চাইলো এবং সেনা অফিসারের সাথে তার তর্ক হলো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে।
তারপর এ-রাতে তাকে অপহরণ
করা হলো।
এরপর?
এরপরের কিছু আমরা জানি
না।
শুধু দেখছি,
একটা করে বছর পার হয়ে
যাচ্ছে, কিন্তু কল্পনা চাকমাকে আমাদের মাঝে ফিরে পাচ্ছি না।
আর দেখছি রাষ্ট্র তার
নাগরিকের বিষয়ে কখনও কখনও কতোটা নির্বিকার থাকতে পারে।
অপহরণের
প্রত্যক্ষদর্শী কল্পনার ভাই দাবী করেন,
কল্পনাকে সেনা সদস্য
তুলে নিয়ে গেছে।
কিন্তু সেটাকে স্টেইটমেন্ট
আকারেও গ্রহণ করা হয়নি।
বরং,
তুলে নিয়ে যাওয়ার এক
মাসের বেশি সময় পর,
২৪ জুলাই ১৯৯৬,
সেনা কর্তৃপক্ষ একটি
প্রেস-বিজ্ঞপ্তি হাজির করে এ-অপহরণ প্রসঙ্গে।
সেখানে বলা হয়, 'স্থানীয়
সূত্রে জানা যায়,
কল্পনা চাকমার বাড়ী গিয়ে তার
নিত্য ব্যবহার্য কোনো সামগ্রী খুঁজে পাওয়া যায়নি।
কাজেরই স্বাভাবিকভাবেই
প্রশ্ন আসে,
তিনি অপহৃতা হয়েছে,
না-কি স্বেচ্ছায়
আত্মগোপন করে শান্তিবাহিনীর অপপ্রয়াসকে সমর্থন দিচ্ছেন?
(কল্পনা চাকমার ডাইয়েরী,
হিল উইমেন্স ফেডারেশন
কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত,
২০০১;
পৃ-১১৩)।
এটুকু বলেও যুক্তিটা ঠিক
প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন কি-না নিশ্চিত হতে পারেননি।
প্রেস-বিজ্ঞপ্তিতে আরো
বলা হয়,
অপহরণের আগে কল্পনা আন্তর্জাতিক
ধরিত্রি সম্মেলনে যাওয়ার চেষ্টা করছিলো, সেহেতু নিশ্চয়ই তার আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট
ছিলো অতএব তিনি গোপনে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন।
যাতে পাবর্ত্য ইস্যুকে
আন্তর্জাতিক ফৌরামে নতুন করে উপস্থাপন করা যায়।
(প্রাগুক্ত)
এসব
খোঁড়া যুক্তির বিপরীতে পাল্টা প্রশ্ন তোলার মতো যথেষ্ট সময় আজ পার হয়েছে।
দিনে দিনে ১২টা বছর কম
কি? কল্পনা আজও ফিরলো না কেনো? এখনও কি সে শান্তিবাহিনীকে সহায়তা করার জন্য
আত্মগোপন করে রয়েছে? একজন বিপ্লবী রণকৌশল হিসেবে
স্বেচ্ছায় এমন ক্ষেত্র
কোথাও কোনোদিন তৈরী করেছে কি? যে কি-না পার্বত্য প্রসঙ্গকে আন্তর্জাতিক ফৌরামে নতুন
আঙ্গিকে উপস্থাপনের জন্য এধরণের একটা নাটক সাজাতে পারে, সে কি বর্তমান পরিস্থিতিতে
আরেকটি নাটক সাজিয়ে তার পরিবার-সহযোদ্ধাদের কাছে ফিরতে পারে না? যারা উল্লিখিত
যুক্তিগুলো আমাদের সামনে হাজির করেছিলেন, এ-প্রশ্নের উত্তর তারাই ভালো দিতে পারবেন।
কি
অন্যায় করেছিলো কল্পনা চাকমা? তার অন্যায়, সে একটি দেশে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর একজন
নারী,
যে কি-না আবার বিপ্লবের
স্বপ্ন দেখতে চেয়েছে।
নিজেদের অধিকার কীভাবে
বুঝে নিতে হবে, সে-বিষয়ে সে সরব ছিলো।
এটাই তার অন্যায়।
একজন সংগঠক হয়ে
দাঁড়িয়েছিলো সে; এটা অন্যায়।
অন্যায়-অনাচার-নিপীড়ন
প্রশ্নে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে তর্কে নামার দুঃসাহস দেখিয়েছে; সেটা অন্যায়।
অতএব তাকে শাস্তি পেতে
হবে; পেতে হবে উচিত সাজা।
এবং তাকে সরিয়ে দিয়ে
অন্যদের হুমকি ধামকি দিতে হবে।
যাতে আর কেউ মুখ খোলার
সাহস না করে।
কল্পনা চাকমা সন্ত্রাসী ছিলেন
না বলেই আমরা তার হদিস খুঁজে পাইনি।
কল্পনা ক্ষুদ্র
জাতিসত্তার প্রতিনিধি নারী বলেই চাপা পড়ে যায়।
তদন্ত কমিটি হয় কিন্তু
কোনদিন তার
রিপৌর্ট প্রকাশ হয় না। থানায়
মামলা নিলেও কার্যক্রম শুরু হয় না।
অপহরণের
১২ বছর পর এখানে দাঁড়িয়ে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর উত্তর দাবী করছি।
দাবী করছি সুষ্ঠু
তদন্তেও এবং তা প্রকাশের।
দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের
হয়ে এ-দায় বয়ে নেয়ার ভার সইতে হবে আমাদেরই।
এ-ভার বহন কি সহজ?
লেখকঃ
গণমাধ্যমকর্মী
আপলৌডঃ ১২
জুন, ২০০৮ |