|
সেলিম রেজা
নিউটনের কলামঃ পাঁচ
জনগণের সক্রিয়তাঃ গণমানুষের
গণতন্ত্র
[গত আগস্টে
সেনাবাহিনীর হাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদে গড়ে
ওঠা আন্দোলনে যুক্ত হবার কারণে কয়েকজন সহকর্মী-সহ জেইলে যেতে হয়েছিলো রাজশাহী
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং প্রাক্তন
চেয়ারপার্সন সেলিম রেজা নিউটনকে।
কয়েক
মাস কারাভোগের পরে নানা-ধরণের রাষ্ট্রিক সন্ত্রাসের ঝক্কি পেরিয়ে সহকর্মীদের সাথে
মুক্তি লাভ করেন তিনি।
ক্যাম্পাসে ফিরে এসে জেইল-জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে নিজের ভাবনাকে মিলিয়ে লিখতে শুরু
করেন সেলিম রেজা নিউটন।
ইউকেবেঙ্গলি প্রকাশ করতে
শুরু
করেছে সেলিম রেজা নিউটনের জেল থেকে বেরিয়ে
আসার পরবর্তী পর্যায়ের লেখাগুলো।
-
সম্পাদক।
]
একেবারে
আসল কথাটা বলে ফেলেছেন ডঃ আকবর আলী খানঃ 'আমরা যদি ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে
দেখতে পাবো, গণতন্ত্রের
ব্যর্থতার সমাধান গণতন্ত্রের অপসারণ নয়।
কিংবা গণতন্ত্রের বাইরের
অন্য কোনো ব্যবস্থা নিয়ে আসা নয়।
গণতন্ত্রের ব্যর্থতার
সমাধান হলো আরও গণতন্ত্র এবং আরও গণতন্ত্র।
এ-গণতন্ত্র বাড়াতে
বাড়াতেই একসময় গণতন্ত্রের সমস্যার সমাধান সম্ভব।'
(প্রথম আলো গোলটেবিল বৈঠকঃ ১১ জানুয়ারীঃ
নির্বাচন, গণতন্ত্র ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ, প্রথম আলো, পৃষ্ঠা ২২, ১১ই
জানুয়ারী ২০০৮)।
একটা গোটা বছর পার করে
দেওয়ার পরে হলেও সুশীল সমাজের চিন্তনে এ-উপলব্ধির প্রকৃত তাৎপর্য যদি উদ্ভাসিত হয়,
তাতেই বাংলাদেশের মঙ্গল।
কিন্তু গণতন্ত্র বাড়ানোর
রাস্তাটা কী, তা ডঃ আকবর আলী খানেরা কি ভেবে দেখেছেন? জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠন
করলে কি গণতন্ত্র বাড়ে? নাকি কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রের ঘাড়ে আরো বড়ো কর্তাকে বসিয়ে
রাখা হয়? নির্বাচন কমিশনের কাছে গিয়ে দলের নাম রেজিস্ট্রি করালে কি গণতন্ত্র বাড়ে?
না-কি, জনগণের কাছে জবাবদিহি করার বদলে ক্ষমতাধর একটি আমলাতান্ত্রিক কমিশনের কাছে
দলগুলোর দায়বদ্ধতা বাড়ে? দুর্নীতি দমন কমিশন বড়লোকদের আয়কর পরীক্ষা করে বেড়ালে কী
রাষ্ট্রের আয় বাড়ে? গণতন্ত্র বাড়ে? গরীবের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়? না-কি,
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার নতুন একটা বন্দোবস্ত হয়? পাঁচ বছরে একদিন উৎসব করে
ভৌট দেওয়ার জন্যে পাঁচশো কোটি টাকার ভোটারতালিকা-পরিচয়পত্র বানালে কি গণতন্ত্র
বাড়ে? কথিত জনপ্রতিনিধিরা কি তাদের ভৌটারমণ্ডলীর কাছে দায়বদ্ধ থাকতে শুরু করে?
না-কি, পাঁচ বছরের জন্য ভোটারদেরই ওপর ছড়ি ঘোরানোর বৈধতা অর্জন করে? জরুরী অবস্থা
সত্যি-সত্যি অনেক জরুরী প্রশ্ন তুলে এনেছে, কিন্তু সে-প্রশ্নগুলোকে পুঁজিবাদী
বহুজাতিক বাণিজ্য-সঙ্ঘের চিন্তনকাঠামোর গণ্ডির ভেতর থেকে বিবেচনা করেছে।
সেনাবাহিনীর সত্যিকারের
দেশপ্রেমিক অফিসারেরা এবং সুশীল সমাজের সত্যিকারের দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীরা চাইলে
ফরাসী বিপ্লব, প্যারি কমিউন, রুশ বিপ্লব, স্পেনীয় বিপ্লব-সহ মানবজাতির মুক্তিমুখিন
ও প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের চিন্তন-প্রণালী ও কর্ম-পদ্ধতির ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখতে
পারতেন সত্যিকারের গণতন্ত্র কী জিনিস।
সত্যিকারের
গণতন্ত্র বলতে বুঝায়, নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করবে জনগণ, অর্থাৎ
ভৌটাররা।
আর
আমাদের জরুরী অবস্থার ও শিথিলাবস্থার উভয় প্রকার 'গণতন্ত্রেই' নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো
গ্রহণ করে নির্বাহী বিভাগ।
যেমন, জরুরী অবস্থা জারী করে কে? রাষ্ট্রপতি।
বাজেট প্রণয়ণ করে কে? অর্থ-মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-আমলারা।
আইন
প্রণয়ণ করে কে? আইন-মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-আমলারা।
এক
কথায়, নির্বাহী বিভাগের সচিবালয়সমূহই যাবতীয় নীতি নির্ধারণ করে।
পার্লামেন্ট সেগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে মাত্র, তারপর সেগুলো একেবারে হুবহু বা
যৎসামান্য এদিক-সেদিক করে পাশ করে দেয়।
পার্লামেন্ট এখানে বাদশাহী আমলের রাজসভার নবরত্ন হিসেবে শোভা বর্ধন করে মাত্র।
রাজসভার রত্নগণ অনেক কথা বলতে পারেন, তবে সেটা বাদশাহের মন বুঝে এবং চূড়ান্ত
সিদ্ধান্ত কিন্তু বাদশাহ্ই গ্রহণ করেন।
যদি-বা পার্লামেন্ট কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত কখনও গ্রহণও করে ফেলে, সে-সিদ্ধান্ত দেখা
যায় আদতে এক বা একাধিক আমলাতান্ত্রিক পার্টির (আসলে পার্টির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের
কয়েকজন নেতার) সিদ্ধান্ত।
পার্র্লামেন্টের সদস্যরা তো আসলে নিজ-নিজ দলের নেতাদের কাছেই জবাবদিহি করেন।
সবচেয়ে 'ভালো' পর্টিগুলোতেও (বৃটেন-যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকালেই বুঝা যাবে) ক্ষমতা
থাকে নেতাদের কাছে, প্রেসিডিয়ামের কাছে বা বড়োজোর কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে, একেবারে
নিচের সদস্যদের কাছে নয়।
কর্তৃত্বক্রমতান্ত্রিক এসব পার্টিরও নীতি নির্ধারণ করে বাস্তবে প্রেসিডিয়াম বা
পলিটব্যুরো; সম্মেলন বা কংগ্রেস তা অনেক কথাবার্তার পর অনুমোদন করে মাত্র।
আমাদের নির্বাচন কমিশন যদি মডেল হিসেবে বৃটিশ-মার্কিন 'কতিপয়তান্ত্রিক গণতন্ত্র'কে
অনুসরণ করেন, তাহলে আমরা নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ভৌটারদের কাছে দেব
কীভাবে? এই লক্ষ্যে কি নির্বাচন কমিশন বা সরকার বা সুশীল সমাজ কোনো সংস্কার করার
কথা ভাবছে? 'সংস্কার-সংস্কার'
রবে
তো কর্ণ বিদীর্ণ হওয়ার অবস্থা।
কল্পনা
করা যাক, কোনো-না-কোনোভাবে নির্বাচকমণ্ডলী, তথা ভোটাররা নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা
অর্জন করলেন।
কিন্তু তাঁদের নির্বাচিত
প্রতিনিধিরা যে-নির্বাচকমণ্ডলীর নির্ধারণ-করা নীতি বাস্তবায়ন করবেন, তার নিশ্চয়তা
কী? আমি মালিক, আমি আমার কর্মচারী-প্রতিনিধিকে বড়ো গঞ্জের দোকানে লেনদেনের জন্য
নিয়োগ করেছি;
সে যদি আমার হয়ে আমার নির্ধারিত
নীতি মেনে কাজ না-করে, তাহলে তৎক্ষণাৎ আমি তার প্রতিনিধিত্ব বাতিল করে দিয়ে নতুন
কর্মচারী নিয়োগ দেব, তাই? বুঝা গেলো, ক্ষমতা আমার হাতে, আমি আমার প্রতিনিধি নিয়োগও
দিতে পারি, তাকে ফেরতও নিয়ে আসতে পারি।
আমাদের বিদ্যমান
সংবিধানের অনেক অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও সেখানে কিন্তু বলা আছে, এ-প্রজাতন্ত্রের
মালিক জনগণ। (গণপ্রজাতন্ত্র)
না বলে 'গণসাধারণতন্ত্র' বললে আরও উপযুক্ত হয়, রাজা যেখানে নাই সেখানে প্রজার
প্রশ্ন ওঠে না।
সম্প্রতি প্রথম আলোয়
প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ-কালের মুজিবনগর সরকারের একটি দলিলের আলোকচিত্রে চমৎকার এই
'গণসাধারণতন্ত্র' শব্দটা পাওয়া গেলো।)
সংবিধানেই আরও বলা আছে,
প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন কাজে নানান পদে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ আদতে প্রজাতন্ত্রেরই
কর্মচারী।
জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও
এ-হিসাবে জনগণের কর্মচারী হওয়ারই কথা।
দেশ কীভাবে চলবে তা ঠিক
করার কথা জনগণের, আর সে-মোতাবেক যা-যা করণীয়, তা বাস্তবায়ন করার কথা জনগণের
কর্মচারী-প্রতিনিধিদের।
অর্থাৎ, আইনতঃ দেশ চলার
কথা মালিকের মতে; বাস্তবে চলছে কর্মচারীদের হুকুমে।
এখন তাহলে মালিকের
কর্তব্য হলো এসব প্রতিনিধি-কর্মচারীদের বরখাস্ত করে নতুন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া।
কিন্তু সংবিধানে মালিককে
সেই অধিকার দেওয়া হয়নি।
এ-অধিকারটা দেওয়া হলে
সত্যিকারের জনগণতন্ত্র বা গণসাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পথে বিরাট একটা ধাপ দেওয়া
যায়।
সেই মান্ধাতা আমলের প্যারি
কমিউনেই ভোটারদের এই 'রাইট টু রিকল'
এর বন্দোবস্ত ছিলো।
আমার নির্বাচিত
প্রতিনিধিকে প্রয়োজনে আমি যদি বরখাস্ত করে নতুন প্রতিনিধি নিয়োগ দিতেই না পারি,
কোথায় আমার ক্ষমতা? গণতন্ত্র মানে ক্ষমতা সত্যি-সত্যি জনগণের হাতে।
এর কোনো বিকল্প থাকার
প্রশ্নই ওঠে না।
এ-লক্ষ্যে তাহলে নির্বাচন কমিশন
প্রয়োজনীয় সংস্কার কায়েম করুক।
এ-প্রশ্নে সুশীল সমাজের
চিন্তাশালার দিকপালদের মতামতও প্রকাশিত হওয়া দরকার।
এমন একটা
প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা আমি বলছি, যেখানে রাজনৈতিক দলের কোনো
প্রতিনিধি দরকার নাই।
প্রতিনিধিরা নির্বাচিত
হবেন পাড়া মহল্লা গ্রাম ইউনিয়ন পৌরসভা উপজেলা জেলা বিভাগ প্রভৃতি পর্যায়ের সমস্ত
শ্রমজীবী ও পেশাজীবী মানুষের মধ্য থেকে।
এতক্ষণ আমি
যে-প্রস্তাবগুলোর কথা বলেছি, সেগুলো কিন্তু অতি-অভিনব কোনো প্রস্তাব নয়।
কমপক্ষে গত দু'শো বছর
ধরে ধ্রুপদী উদারনীতিবাদী, মুক্তিপরায়ন ও গণতন্ত্রী চিন্তা-আন্দোলনের ব্যক্তিবর্গ
কমবেশি এ-ধারায় কথা বলছেন।
বাস্তব সমাজেও গণমানুষ
বারবার এসব ধারণা প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছে।
১৯১৭ সালে বৃটিশ চিন্তক
উইলিয়াম পল তাঁর রাষ্ট্রঃ এর উৎপত্তি ও কাজ নামের বইতে
বলেছিলেন, 'এভাবে সামাজিক প্রশাসনের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পরিষদসমূহে তাঁদের
প্রতিনিধিত্ব ঘটবে, যাঁরা সামাজিক কাজকর্মাদি এবং সমাজের শ্রমকর্মসমূহের তথা
শিল্পকলকারখানার দায়িত্ব বহন করেন।
এভাবে, কর্ম-দায়িত্ব
বহনকারী এবং সমাজ সম্প্রদায়ের চাহিদা সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত মানুষজনের কাছ থেকে
উৎসারিত হয়ে এ-ধরনের প্রতিনিধিদের ক্ষমতা প্রবাহিত হবে ওপরের দিকে।
কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক
শিল্পকারখানা-পরিষদ যখন বসবে, সামাজিক কাজকর্মের প্রতিটা পর্যায়কে তারা
প্রতিনিধিত্ব করবে।'
নৌয়াম
চৌমস্কীরই ভাষায় যদি সারসংক্ষেপ করি, 'তাহলে হয়তো আপনি শ্রমিক পরিষদ, গ্রাহক-ভোক্তা
পরিষদ, কমিউন-সভা, আঞ্চলিক ফেডারেশন ইত্যাদি প্রভৃতি নিয়ে গঠিত একটা ব্যবস্থার কথা
কল্পনা করতে পারছেন, যে-ব্যবস্থার মধ্যে থাকছে এমন এক ধরণের প্রতিনিধিত্ব, যা
প্রত্যক্ষ ও প্রত্যাহারযোগ্য এই অর্থে যে, সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত ও সুসংহত
যে-সামাজিক গোষ্ঠীসমূহের পক্ষে এ-প্রতিনিধিরা কোনো একটা উচ্চতর সংস্থায় কথা বলেন,
সে-সব গোষ্ঠীর কাছেই তাঁরা প্রত্যক্ষভাবে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকেন, আর
সে-গোষ্ঠীগুলোর কাছেই তাঁদেরকে প্রত্যক্ষভাবে ফিরে আসতে হয়।
আমাদের
প্রতিনিধিত্ব-ব্যবস্থার চেয়ে যে অনেক আলাদা জিনিস, সেটা এমনিতেই বোঝা যাচ্ছে।'
(নৌয়াম চমস্কী, 'ভবিষ্যতের সরকারঃ নিউ ইয়র্কের যুবক-যুবতীদের হিব্রু সমিতি'র
কবিতা-কেন্দ্রে ১৬ই ফেব্রুয়ারী ১৯৭০ তারিখে অনুষ্ঠিত শ্রুতি-সেমিনারে প্রদত্ত
বক্তৃতা।)
অন্যত্র
বলেছি, অক্টোবর-মহাসঙ্কটের মাৎস্যন্যায়-পর্বের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য ছিলো জনগণের
সতর্ক দূরত্বে অবস্থান করা।
রাজনীতি তথা
ক্ষমতা-ভাগাভাগির পুরো প্রক্রিয়াটি থেকেই তাঁরা নিজেদেরকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন,
বা পুরো প্রক্রিয়াটিকেই তাঁরা রীতিমতো সুস্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
কিন্তু বিকল্প শক্তি
হিসেবে নিজেদেরকে তাঁরা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেননি।
রাজনৈতিক দলগুলোর চক্কর
থেকে বেরিয়ে অনেকে গিয়ে পড়েছেন নগদ টাকা ক্ষুদ্র ঋণ এনজিও সুশীল সমাজের মিষ্টি
কথামালার খপ্পরে।
সামান্য খেয়াল করলেই এর কারণটা
বুঝা যাবে।
সামন্ত-বুর্জোয়াদের আওয়ামী লীগ
মুসলিম লীগ তো বটেই, নিজেদেরকে বামপন্থী বলে বিশ্বাস করা দলগুলোও চিরকাল চেয়েছে
জনগণের সব দায়িত্ব নিয়ে নিতে।
জনগণের নিজেদের
চিন্তা-পর্যালোচনা করার, নিজেরা সংগঠিত হয়ে নিজেদের সমস্যা সমাধান করার তথা নিজেরা
নিজেদেরকে পরিচালনা করার শক্তি-সক্ষমতা বিকশিত হোক, সেটা এঁরা কেউই কোনোদিন চাননি।
ভালো-মন্দ ডান-বাম দল
সকলেই চেয়েছেন জনগণ তাঁদের 'সঠিক' নেতৃত্ব অনুসরণ করুক মাত্র, সেটাই জনগণের পবিত্র
কর্তব্য।
বিদ্যা দিয়ে এবং বেত দিয়ে
জনসাধারণকে এ-প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে হাজার-হাজার বছর ধরে।
এখনও চলছে সেই একই
ট্রেনিং।
স্থানীয় কোনো সমস্যা দেখা দিলে
নিজেদের সমাধান নিজেরা করার চেষ্টা করার দরকার নাই, বরং জমিদার-মাতব্বর-চেয়ারম্যান
টিএনও-এমপি-ডিসি মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীকে গিয়ে বলো, আবেদন-নিবেদন করো, ধর্ণা দাও।
জাতীয় কোনো সমস্যা দেখা
দিলে রাজনৈতিক দলের গুটিকয় নেতার প্রশ্নাতীত নেতৃত্বে সে-দলের নেতানির্ভর কর্মীকূল
সেজে আর নাম-পরিচয়হীন দুর্বল মানুষের দল হয়ে বড়ো-বড়ো সভা-সমিতিতে যাও, বিক্ষোভ করো,
অকাতরে জীবন দাও।
তারপর পরিস্থিতি বদলালে দেখতে
পাবে নতুন দল, নতুন নেতা, নতুন সরকার এমনকি নতুন দেশ কিন্তু সেই পুরোনো
কর্তৃত্বপরায়ণতা, সেই পুরোনো আমলাতন্ত্র, সেই পুরোনো জেলজুলুম-আইন-আদালত, আর সেই
চিরন্তন দুঃখ-দারিদ্র্য-নিপীড়ণ।
এসব করতে-করতে, এসব
দেখতে-দেখতেম মানুষ রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে, যাবতীয় দলের ওপর থেকে
আস্থা হারিয়েছে; অথচ নিজেরা নিজেদের শক্তিতে সংগঠিত হয়নি, প্রয়োজনটুকু বোধ করেনি,
হওয়ার মতো দূরদৃষ্টিও অর্জন করেনি এবং আত্মশক্তি ও আত্মকর্তৃত্বের ওপর আস্থা রাখার
কল্পনাও করতে পারেনি।
ফলে, এখনও তারা মনে করে,
মহান কোনো রাষ্ট্র-অবতার একদিন আকাশ থেকে অবতরণ করে তাদেরকে উন্নত জীবনের ব্যবস্থা
কায়েম করে দেবেন।
এখানেই আবহমান কালের
শাসন-কর্তৃত্বের সফলতা, আর এখানেই সত্যিকারের গণতন্ত্র গড়ে ওঠার পথে প্রধান
প্রতিবন্ধকতা।
অক্টোবর-মহাসঙ্কটের এখানেই আসল
বীজ।
অথচ, আশ্চর্য নয়, স্বাভাবিক যে,
এ-কথাটা এ-যাবৎ কাউকে আমি বলতে শুনলাম না।
বিগত
২০০৬ সালের অক্টোবরে বা তার আগে-আগে আওয়ামী লীগ বিএনপি জামায়াত কেউ চাননি ঘনায়মান
গুরুতর সঙ্কটে জনগণ রাস্তায় নেমে একটা অবস্থান নিক।
তাঁরা বরং নিজ-নিজ
সশস্ত্র বাহিনীসমূহকে রাজপথে মোতায়েন করেছেন।
জনগণকে নিঃশব্দ বার্তায়
জানিয়ে দিয়েছেন তোমরা ঘরে থাকো, তোমাদের তথা দেশের শত্রুদেরকে সাইজ করার জন্য আমরাই
যথেষ্ট (অবশ্য যদি তোমরা দাবা-বৌর্ডের পদাতিক-বড়ে হিসেবে আমাদের দিকে 'যোগ দাও'
তাহলে মোস্ট ওয়েলকাম)।
জনগণ কোনো পক্ষেই যোগ
দেননি।
কিংবা ১১ই জানুয়ারির পর,
সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন সরকারও জনগণকে ডাক দিয়ে বলেননি, সকলে আসুন, ঐতিহাসিক সুযোগ
এসেছে, এবার আপনারা নিজের হাতে আপনাদের নিজেদের সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সংস্থাগুলো
গড়ে তুলুন, যেনো রাজনৈতিক দলগুলোর রাক্ষসেরা আর কোনোদিন ফিরে আসতে না-পারে।
তাঁরা তো বরং জনগণকে
সশব্দ ঘোষণায়, রীতিমতো ;আইন'
প্রণয়ন করে,
মিডিয়া-মাইকিং করে, জানিয়ে দিয়েছেন, খবরদার, কেউ একত্রিত হবে না,
সভা-সমাবেশ-সমিতি-সংগঠন করবে না, কথা-বার্তা-বাদ-প্রতিবাদে লিপ্ত হবে না, যা করার
আমরা করবো,
যা বলার আমরাই বলবো,
তাপরও আরো কিছু বলার
থাকলে মিনমিন করে মিডিয়া বলবে, এতে তোমাদেরই মঙ্গল।
এমনকি সুশীল সমাজের
দণ্ডধারী কর্তা-কত্রীরা এবং তাদের মিডিয়াও জনগণকে সংগঠিত করার বদলে নিজের শক্তির
প্রদর্শন করার পথই গ্রহণ করেছিল।
তাঁদের জোর বলতে অবশ্য
তাঁদের গলার জোর বা প্রচারের জোর তথা পুঁজির জোর, আর নানাবিধ আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক
মুরুব্বিদের ধমকের জোর, যে-ধমকের উৎস সেই আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক সামরিক শক্তিই তো।
রাজনৈতিক
দল, সুশীল সমাজ, বৈদেশিক পরাশক্তিসমূহ ও সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি জনগণের বিপুল অংশও
যদি সংগঠিত স্বাধীন সচেতন শক্তি হিসেবে নিজেরা রাস্তায় অবস্থান নিতেন, তাহলে ২০০৬
সালের ২৮শে অক্টোবরের পরে ১১ই জানুয়ারীর জরুরী অবস্থার দিকে নয়, বাংলাদেশের ইতিহাস
হতো একেবারেই ভিন্নখাতে প্রবাহিত হতো।
শাসকরা তো, চিরকালই চায়
জনগণের নিষ্ক্রিয়তা।
জনগণ সক্রিয় হলেই কেবল
আমরা সত্যিকারের গণতন্ত্রের আসল প্রশ্নগুলোকে জাতীয় আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে
পারব।
সর্বকালেই রাজায়-রাজায় যুদ্ধে
তো উলুখাগড়ারই প্রাণ যায়, নিষ্ক্রিয়-সতর্ক দূরত্ব রচনা করে তাহলে লাভ কী? তার চেয়ে
একবার যদি উলুখাগড়াও যুদ্ধে নামে, উন্নততর গণতান্ত্রিক সংগঠনে সংগঠিত হয়ে অধিকতর
মানবিক নীতিবোধের সুবৃহৎ ঝাণ্ডা তুলে ধরে উচ্ছেদ করে দেশের সকল রাজাকে তাহলেই আমরা
পাব গণসাধারণতন্ত্রী' বাংলাদেশ রাষ্ট্র।
আওয়ামীলীগ-বিএনপির ভয়ের
রাজত্বেও আমরা কানসাট-ফুলবাড়ীতে জনগণের সংগঠিত সক্রিয়তার নমুনা দেখেছি।
জরুরী অবস্থার আতঙ্কের
রাজত্বেও আমরা কৃষক-শ্রমিক, বস্তিবাসী, গার্মেন্টস-কর্মী এবং ছাত্র-শিক্ষকের
সক্রিয়তার উদ্ভাস ঘটতে দেখছি।
পরিবর্তনকামী বৈপ্লবিক
বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা যদি এ-গণসক্রিয়তার সাথে সংহতি স্থাপন করতে পারে, তাহলে
রাষ্ট্র আর সমাজের সত্যিকারের গণতান্ত্রিক কাঠামো বিনির্মাণের পথ আমরা ঠিকই খুঁজে
নিতে পারবো।
মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রের মুক্তিমুখীন সমাজতান্ত্রিক ধারার সক্রিয় কর্মী-বুদ্ধিজীবী নৌয়াম
চৌমস্কী একবার আর্জেন্টিনার আদিবাসীর কাছ থেকে শিখে এসে বলেছিলেন, লড়াইটা হচ্ছে
খাঁচার মেঝেকে ক্রমাগতভাবে প্রসারিত করতে থাকার লড়াই।
খাঁচার ভেতরে থাকা মানুষ
যেমন খাঁচাটাকে ভেঙে ফেলতে চায়, খাঁচার বাইরে থাকা মনুষ্যত্ববিরোধী হিংস্র জন্তুরাও
খাঁচাটাকে ভেঙে ফেলতে চায়।
খাঁচাটা একদিকে যেমন
আমাদেরকে বন্দী করে রাখে, স্বাধীনভাবে বিচরণের এলাকা সঙ্কুচিত করে রাখে, অন্যদিকে
তেমনি ঐ হিংস্র শ্বাপদদের দাঁত-নখ-থাবা থেকে আমাদেরকে রক্ষাও করে।
সুতরাং, বাইরের মারাত্মক
জন্তুগুলোর চেয়ে অনেক শক্তিশালী না-হয়ে ওঠা পর্যন্ত এখনই খাঁচাটাকে আমরা দূর্বল করে
ফেলবো না, ভেঙে তো ফেলবই না, খাঁচার মেঝেটাকে বরং আমরা প্রসারিত করতে থাকব,
খাঁচাটাকে আরও বড় করে তৈরী করতে থাকবো, যেনো আরও প্রসারিত হয় মেঝেটা, সে-সাথে
খাঁচাটাকে শক্তিশালীও রাখব।
এভাবে, একদিকে বাড়াতে
থাকবো স্বাধীনতার
সীমানা, অন্যদিকে প্রস্তুতি
নিতে থাকবপ শেষ-পর্যন্ত খাঁচাটাকেই উপড়ে ফেলতে।
আমাদের দেশে গণতন্ত্র
নামে চালু ব্যবস্থাটা যতো দূর্বল এবং সীমিত ধরণেরই হোক না কেনো, সেটাকে বাঁচিয়ে
রাখা এবং শক্তিশালী করে তোলাটা আমাদের কাজ।
এ-গণতন্ত্রটুকু আছে বলেই
সরকারের সশস্ত্র প্রতিষ্ঠানসমূহ, সরকারের বাইরের অন্ধ-পশ্চাদমুখী অপশক্তিগুলো
আমাদেরকে অন্ধকারের যুগে নিয়ে যেতে পারে না।
এমনকি কখনও-কখনও তারা
চেষ্টা করলেও ঐ গণতন্ত্রটুকুর দোহাই দিয়েই আমরা তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারি,
গণ-লড়াইয়ে লিপ্ত হতে পারি।
আর, আমাদের প্রতিটা লড়াই
গণতন্ত্রের কাঠামোটাকে আরেকটু শক্তিশালী করে, মানুষের
স্বাধীনতার সীমাটা আরও
খানিক বিস্তৃত হয়।
এই করতে করতেই তো এত দূর।
রচনাটি
লেখকের প্রকাশিতব্য 'কারাগার
স্বাধীনতা সৃজনশীলতা'
গ্রন্থের একটি অংশ।
আপলৌডঃ
৪মে, ২০০৮ |