|
যে-নামেই ডাকুন মানুষ না খেয়ে আছে
উদিসা ইসলাম
ছোট-বেলায় দাদা-দাদী
এমনকি মা-বাবার মুখেও গল্প শুনেছি 'একসময় এক আনায় চাল পাওয়া যেতো।
এদেশের পুকুরগুলো ভরা মাছ ছিলো,
কব্জি ডুবিয়ে দুধ খেয়েছি, তোরা তো এক মগ দুধ তাই খেতে পাস না'।
তখন এসব কথা গল্প হলেও ইদানিং সত্য মনে হচ্ছে।
আমরাও বলার জায়গায় চলে এসেছি, 'জানিস, একসময় ১২ টাকায় চাল কিনেছি, ৩৫ টাকায় তেল, ১০
টাকায় আটা।
সে-সময় আটা ছিলো গরীবের খাবার।'
দেশে এখন
আলোচনার বিষয় দ্রব্যমূল্য।
শুধু টেবিল গরম করা আলোচনা না, পেটে তাপ লাগলে ভিতর থেকে যে-তাগিদ বেরিয়ে আসে,
সে-আলোচনা।
বছরে দু-তিনবার বাজার গরম হওয়া সাধারণ মানুষের কাছে
স্বাভাবিক
হয়ে এসেছিলো,
সাংবাদিকদের কাছে সেটা ছিলো বেশ রসিয়ে রিপৌর্টিংয়ের বিষয় - কতোভাবে উপমা দেয়া যায়,
'পিঁয়াজের ঝাঁজ কমেছে (দাম কমেছে); কাঁচা মরিচের ঝাল বেশি (দাম বেশি) এ-ধরণের ভাষার
প্রয়োগ আর কি।
কিন্তু দাম বেড়ে যাওয়া শুধু না মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার পর দীর্ঘ দিন সেই চড়াতেই
থেকে যাওয়ার পরিস্থিতি দেখে আমরা অভ্যস্ত না।
ফলে এখন নড়েচড়ে বসতে হচ্ছে।
আর তাই চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে ক্যাবিনেটে
পর্যন্ত কথা হচ্ছে।
বাণিজ্য
মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সরকারী সংস্থা টিসিবি বলছে, গত একবছরে চাল-সহ নিত্যপ্রয়োজনীয়
জিনিষপত্রের দাম বেড়েছে শতকরা ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ।
কিন্তু কর্তারা জনসম্মুখে পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার
করছেন না।
বাংলাদেশের খাদ্য পরিস্থিতি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশও সরব।
গতমাসে
লণ্ডনের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান এর একটি প্রতিবেদনের
শিরোনামের অর্থ করলে দাঁড়ায় '২০০৮ঃ ক্ষুধা নিয়ে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু।
হায়
বাংলাদেশ।
কোথাও এতোটুকু
শান্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পায় না খেটে খাওয়া জনগোষ্ঠী।
যাদের অনেক আছে, তাদের কথা আলাদা।
তারা উপরেরটাও খাবেন আবার নিচেরটাও কুড়োবেন।
তাদের আয়-উন্নতিও ভিন্ন-ভিন্ন অনেক পথের সুবাদে বেড়ে চলে।
৫
টাকার পণ্য কতো টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে, তাতে তাদের কিছু যায় আসে না।
ঠেকে দরিদ্র জনগোষ্ঠী।
অর্থাৎ যারা দিন-আনে দিন-খায়।
তাদের দিকে এই ' ভাগ্যবানরা' যেমন তাকান না, ভগবানও তাকান না।
'ভাগ্যবানেরা' থাকেন কীভাবে নিজেদের আয় উন্নতি বাড়াবেন সেদিকে ব্যস্ত।
আর ভগবান? ভাগ্যবানদের হিসেব রাখতে ক্লান্ত।
এ-নিজেদের আখের গোছানো গোষ্ঠীকে যখন আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারি, তখন বাজারে
ক্রমেই দাম বাড়তে বাড়কে একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
'অনিয়ন্ত্রিত
দ্রব্যমূল্য' কথাটি একটু ঘুরিয়ে বলা দরকার।
দ্রব্যমূল্যের ওপর কি কারো নিয়ন্ত্রণ নেই? অবশ্যই আছে।
চাবিকাঠি সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর হাতে।
৬
জানুয়ারী ২০০৮ সমকাল এর প্রথম পৃষ্ঠার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অনেক কিছুই
স্পষ্ট হয়ে গেছে।
২২ ব্যবসায়ীর
সমন্বয়ে
গঠিত
'সিণ্ডিকেইট'
কীভাবে মূল্য সন্ত্রাস চালাচ্ছে, সে-চিত্রও
পরিস্কার করে দেয়া হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
নাম-ঠিকানা উল্লেখ পূর্বক সবিস্তারে বর্ণণা দেয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।
বিস্ময়কর হলো, এ-চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি
এবং হচ্ছে না।
এদের অব্যাহত অপতৎপরতা সম্পর্কে সরকার জ্ঞাত।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের টিকিটিও কেনো ছুঁতে পারে না সরকার? ২০০৭ এর জানুয়ারীতে
এ-তত্ত্বাবধায়ক সরকার যে-কয়েকটি এজেণ্ডাকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ শুরু করেন, তার মধ্যে
দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি রোধ এবং সন্ত্রাস দুনীতির মূল উৎপাটনের অঙ্গীকার ছিলো
অন্যতম।
প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার কতোটুকু পূরণে করতে সক্ষম হয়েছেন, সে-বিশ্লেষণে না গিয়েও
বলা যায়, বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে তারা চরমভাবে ব্যর্থ।
মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম প্রধান খাদ্য।
সে-খাদ্যের অত্যাবশ্যকীয় পণ্যটি হলো চাল।
এ-পণ্যটির মূল্য যখন ২০০৭ এর শেষের দিকে আকাশ ছোঁয়ার জন্য ছুটছে, তখন তৎকালীন খাদ্য
উপদেষ্টা তপন চৌধুরীর দেয়া মন্তব্যে জনগণ শুধু হতাশই হয়নি, বরং ক্ষেত্র বিশেষে
ক্ষুব্ধও হয়েছে।
'চালের
সঙ্কট নিরসনে সরকারের কিছুই করণীয় নেই'
এমন বক্তব্য একজন খাদ্য উপদেষ্টার কাছ থেকে অচিন্তনীয় বটে।
তার ওই বহুল আলোচিত উক্তিটি মিডিয়ায় প্রচারের সঙ্গে-সঙ্গে সারাদেশে খুচরা ও পাইকারী
বাজারগুলোতে মাত্র এক ঘন্টা সময়ের ব্যবধানে চাল-আটার মূল্য কেজি প্রতি ৩/৪ টাকা করে
বৃদ্ধি পেলো।
দুর্নীতি কি কেবল টাকা খেলেই হয়? দায়িত্বশীল
পদের অমর্যাদা ঘটিয়ে অদায়িত্বশীল
মন্তব্য কি দুর্নীতি নয়?
চালের সঙ্কট
নিরসনে সরকার আন্তর্জাতিক সাহায্য ও সহযোগিতার প্রতি এখন বিশেষ গুরুত্বারোপ করছে।
কারণ হিসেবে গেলো বছরের দুর্যোগকেও গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে বলছেন।
সেটাও মানছি।
কিন্তু এ-খাদ্য দুর্ভোগ কি না-বলে-কয়ে এসেছে? প্রবল ঘুর্ণিঝড় সিডরের পর দেশে ১০ লাখ
মেট্রিক টন খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কার খবর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছিলো।
তখন তপন চৌধুরী খবরের সত্যতা চ্যালেইঞ্জ করেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন 'দেশে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
এপ্রিল-মে পর্যন্ত মজুত আছে।' তখন উড়িয়ে না দিয়ে সাবধান হওয়াটা জন্য বুদ্ধিমানের
কাজ হতো।
এসব ক্ষেত্রে সাময়িক তুবড়ি ফোটানো মানুষকে কতোটা নাজেহাল পরিস্থিতির ভিতর ফেলে দিতে
পারে, এখন তা আমরা হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছি।
এ-দায়ভার কে নিবে? সরকারের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে অসাধুদের কালো থাবা থেকে
জনগণকে রক্ষা কারার উপায় নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হোক।
পেটে যদি ভাত না থাকে, তবে না খেতে পাওয়া মানুষ কিন্তু দেখবে না রাজনৈতিক দলের সঙ্গে
সরকার কি দেন-দরবার করতে পারলেন, মন্ত্রীদের কার কয় বছর জেল হলো।
অর্থনীতির
মারপ্যাঁচ ছেড়ে আশপাশে তাকিয়ে দেখুন কি হচ্ছে।
পরিবহনের ভাড়া বাড়ছে? শুধু কি তেলের জন্য? না, চালের জন্যও।
খুচরা ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াচ্ছেন।
শুধু কি লাভের জন্য? তাদেরকেও চাল-ডাল-আটা কিনে খেতে হয়।
যাদের হাতে কাজ নেই, টাকা নেই, যারা খেতে পাচ্ছেন না তাদের কথা তো আমরা ভাবছিই না।
যারা কর্পোরেইট হাউসের বাইরের চাকুরে, তারাও কুলিয়ে উঠতে পারছেন না।
বাজার অস্থির, ব্যয় বাড়ছে, আয় স্থির।
আমরা সাধারণ মানুষ।
বৈদেশিক মুদ্রা বুঝি না, সিন্ডিকেইট বুঝি না।
'আমার'
ঘরে চাল কেনার পয়সা থাকতে হবে, পেটে ভাত থাকতে হবে।
রাজশাহী থেকে
আপলৌডঃ ১ মে,
২০০৮
|