History of Jail: Can humans do as the cats do? By Selim Reza Newton
 
 

London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

জেইলের ইতিবৃত্তঃ বিড়ালের মতো কি মানুষও পারে?

সেলিম রেজা নিউটন

[গত আগস্টে সেনাবাহিনীর হাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলনে যুক্ত হবার কারনে কয়েকজন সহকর্মীসহ জেইলে যেতে হয়েছিলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং প্রাক্তন চেয়ারপার্সন সেলিম রেজা নিউটনকেকয়েক মাস কারাভোগের পরে নানা-ধরণের রাষ্ট্রিক সন্ত্রাসের ঝক্কি পেরিয়ে সহকর্মীদের সাথে মুক্তি লাভ করেন তিনি ক্যাম্পাসে ফিরে এসে জেইল-জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে নিজের ভাবনাকে মিলিয়ে লিখতে শুরু করেন সেলিম রেজা নিউটন।  ইউকেবেঙ্গলি প্রকাশ করতে শুরু করেছে সেলিম রেজা নিউটনের জেল থেকে বেরিয়ে আসার পরবর্তী পর্যায়ের লেখাগুলো। - সম্পাদক ]

মানুষের জন্য প্রথম যখন জেলখানা বানানো হলো, কোনো লোক সেই জেলে যেতে চাইলো নাজেলের কর্তারা তখন পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন, মানুষ আদৌ ঐ জেলের ভেতরে থাকতে পারবে কি-নাকুকুরকে বলা হলো কয়েদখানার ভেতরে যেতেকুকুর রাজী হয় নাতখন ভেতরে মাংশ, হাড় ইত্যাদি অনেক ভালো-ভালো খাবার রেখে আসা হলোএবার প্রধান ফটক খুলে দেওয়া হলো, আর কুকুরকে আবার অনুরোধ করা হলোকুকুরেরা ঢুকলোআয়েশ করে খাবার-দাবার খেলো, গোটা জেল ঘুরে-ফিরে দেখলো, তারপর সোজা গেইট দিয়ে বের হয়ে গেলরাজী হলো না থাকতে তারা জেলের ভিতরে কিন্তু হাল ছাড়লেন না কারা-কর্তৃপক্ষ এবার পাঠানো হলো বিড়ালদেরকে, আর ভেতরে রাখা হলো মাছ, দুধ ইত্যাদিবিড়ালেরা ঢুকল, খেলো-দেলো, এবং থেকে গেলো জেলেরই ভেতরেউল্লসিত কয়েদ-কর্তারাঃ বিড়াল যখন থেকে গেলো, মানুষও পারবে

আশ্বিনের আকাশ-ভর্তি উজ্জ্বল আলোর মতো হাসিভরা মুখ নিয়ে এ-গল্প আমাদেরকে বললো আলমগীর আলমগীর ওরফে জাহাঙ্গীর, পিতাঃ জাকির হোসেন, কয়েদী নম্বর ৯৩১৯, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি কয়েদীর হাসি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি কয়েদীর টুপিতে জ্বলজ্বলে লাল-নীল সুতা দিয়ে ফুল-তোলার মতো করে আঁকানো চারটা সংখ্যা ৯৩১৯, আলমগীরের নিজের হাতে করা কারুকাজ, যে-হাত দিয়ে এলজি বহন করার দায়ে আজ ১২ বছর হলো সে কারাগারের রাক্ষসপুরীতে ঘানি টানছে এবং টানতে হবে আরও কয়েক বছর কৌতূহল আর জিজ্ঞাসার সিরিয়াস একটা দ্রবণে আমার চেহারা ভিজিয়ে আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, বিড়াল পারলে মানুষও পারবে, এর মানে কী আলমগীর? আলমগীর হাসে হেঁয়ালি-ভরা, আকাশ-ভরা হাসিওর কাছে, ওর অভিজ্ঞতার কাছে, ওর গল্প-সত্তার কাছে নিজেকে আমার নিছক একটা খেলনা বলে মনে হলোপরে আরও অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু সেই নিরুত্তর হাসি

নিজে আমি ভেবে দেখার চেষ্টা করেছিপোষ-মানা বিড়াল হচ্ছে সেই প্রাণী, যাকে আপনি যতই মারেন যতই ধরেন, সে আপনার বাসায় আবার ফিরে আসবেশারীরিক নিগ্রহ সহ্য করার ক্ষেত্রে বিড়ালের তুলনা মেলা কঠিনপাঁচ-তলার ছাদ থেকে মাটিতে ফেলে দিন, উঠে একটু গা-ঝাড়া দিয়ে হেঁটে চলে যাবেঅতিশয় শক্ত জান বিড়ালেরআবার, গল্পটা হয়তো এ-কথাও বলতে চাইছে যে, জেলখানা-ধারণাটার আড়ালে আছে এ-মনোভাবঃ মানুষ হচ্ছে কুকুর-বিড়ালের মতোই আরেকটা জন্তু মাত্রগল্পটার মধ্যে কি এই আভাসও আছে, জেইলের বন্দিত্ব আর নিগ্রহ সহ্য করতে গেলে বিড়ালের মতো 'অমানবিক' জীবনের অধিকারী হতে হবে? নাকি ইশারাটা এই যে, জেইলে পুরে রাখতে পারলে মানুষ পরিণত হবে বিড়ালে? আমি থৈ পাই না। 

কারণ যা-ই হোক, কারাগারে কুকুর দেখি নিএকটাও নাকিন্তু বিড়াল আছে, ছানাপোনা-সংসার-সহকারে আছেবিশাল জানালার লোহার গরাদে গাল রেখে ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখেছি বিড়ালের মা তার সন্তানকে শেখাচ্ছে কেমন করে লাফ দিয়ে আক্রমণ করতে হয়, কেমন করে আত্মরক্ষা করতে হয়, কেমন ক্ষিপ্রতার সাথে থাবা আর দাঁতের ব্যবহার করতে হয়দেখেছি মধ্যরাতে সন্তানের জন্য খাবার খুঁজতে লক-আপের লোহার ফাঁক গলে আমাদের ওয়ার্ডে ঢুকছে বিড়ালের মা দেহধারণের জন্য ক্ষুধা-নিবারণ, আর নিজের সিদ্ধান্তে চলার জন্য আত্মরক্ষা-আক্রমণঃ বিড়াল তাঁর প্রকৃত প্রজাতি-সত্তা এতটুকু বিসর্জন দেয়নি

সামান্য বিড়ালকেও তার স্বাধীন স্বভাব থেকে বশীভূত করতে পারে না জেলখানাঅথচ কয়েদ আছে মানুষকে পরাভূত-বশীভূত করার খায়েশেআল্লাহ চাইলে আপনি মা-প্রকৃতিও বলতে পারেন। মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জন্মসূত্রে স্বাধীন সত্তা হিসেবেআর, সেই কবে থেকে সমস্ত মানুষকে অল্প কিছু মানুষের দাস বানানোর জন্য শারীরিক ও মানসিক বলপ্রয়োগের একগাদা সশস্ত্র প্রতিষ্ঠান খুলে বসে আছে কতিপয় লোকনিজেদেরকে এরা বলে কর্তৃপক্ষ,  আমি বলি ইবলিস কর্তৃত্ব-কর্তৃপক্ষ-ইবলিস চায় মানুষ তার গোলামী করবেআল্লাহ চান, মানুষ স্বাধীনভাবে মোমিন মানুষ হয়ে উঠবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা তাই মোমিনের ঈমানের অঙ্গঅস্ত্র আর শাস্ত্রের জোরে মানুষকে ইবলিসের দাসে পরিণত করার প্রচেষ্টার ইতিহাস হচ্ছে কারাগারের ইতিহাস

বিড়ালের গল্পটার উৎপত্তি চট্টগ্রাম জেলেচট্টগ্রামের জেলখানাটা বানানোর সময়ই ঐ কুকুর-বিড়াল পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো হয়েছিলো বলে গল্পে প্রকাশগল্পের পেটের মধ্যে এই ইঙ্গিতও আছে বলে আমার বিশ্বাস যে, তুমি যে-জেলখানায় বন্দী ঐটাই পৃথিবীর আদিতম এবং একমাত্র জেল; এর আগে অতীতে কোনো জেলখানা ছিল কি-না, কিংবা বর্তমানে আর-কোথাও কোনো জেলখানা আছে কিনা তাতে তোমার কী আসে-যায়? বন্দীর বিবেচ্য হচ্ছে বন্দিত্ব, বন্দীর বিবেচ্য হচ্ছে স্বাধীনতা। তো, আলমগীর পৃথিবীর ঐ প্রথম জেলখানার লোক, চট্টগ্রামেরই ছেলেপাহাড়ে সুড়সুড়ি খেয়ে নামতে নামতে, আর সমুদ্রে সুতা-বাঁধা বয়া ধরে দূর নীলে ভাসতে-ভাসতে শৈশব পার করেছে সে তারপর কৈশোর ঠিক মতো পেরিয়েছে কি পেরোয়নি, অভাবের ধাওয়া খেয়ে জেলে ঢুকেছিল নব-তরুণসাত সমুদ্র তের জেল ঘুরেফিরে চল্লিশ ছুঁই-ছুঁই এখন সে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারেজেল বিষয়ে তাঁর মতো বিশেষজ্ঞ কমই আছে

আলমগীরই প্রথম জানালো, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার আদতে বৃটিশের তৈরী করা 'সাঁওতাল পানিশমেন্ট জেইল'আস্তে-ধীরে বিভিন্ন কয়েদী এবং 'বাবু'র কাছ থেকে জানা গেলো আরও নানা তথ্য। (সবচেয়ে কম বেতনভোগী গরীব কারা-কর্মচারীদেরকে তথা কারারক্ষীদেরকে কয়েদীরা বলেন 'বাবু'।) সাঁওতালদের বিদ্রোহের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষত তাঁদেরই শায়েস্তা করার জন্য ১৮৪০ সালে এই কারাগারের পত্তন ঘটায় বৃটিশ ঔপনিবেশিক প্রভুরাএ-সুসভ্য প্রভুরা বন্দীদেরকে নির্যাতনের জন্য বানায় ভয়ঙ্কর সব সেল আর অন্য-সব ব্যবস্থাযেমন অন্ধকার নির্জন কবর-সেল। তাতে কোনোমতে শ্বাস নেওয়ার জন্যে সামান্য একটি বাঁকানো পাইপের আউটলেট, যেনো বন্দীকে বুঝানো যায় কবরের 'আজাব' বলে কাকেএখনও আছে এ-সেল, প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই হাতের ডানেঅব্যবহৃতঢোকার দরজা মাটি দিয়ে ভরাট করে বন্ধ করে-দেওয়াছিল জোঁক-সেল, তাতে কখনও জোঁক কখনো শিং মাছ রাখা হতো কয়েদীদেরকে বিশেষ শিক্ষা দেওয়ার জন্যছিলো ঘনকের আকৃতিসম্পন্ন কিউবিক্যাল সেল। এতো ছোট, ঘাড় তুলে যেনো কেউ দাঁড়াতে না-পারেএখনও আছে কণ্টক-সেল। মাথার ওপরে আর ডানে-বাঁয়ের দেয়ালে শত শত লোহার কাঁটা, পেরেক বা গজালের মতো, তারই মধ্যে এক চিলতে জায়গা, কোনোমতে শোয়া যায়, সামান্য নড়া-চড়া করতে গেলেও গা রক্তাক্ত হবে এই কাঁটা-সেলগুলো এমডির ভেতরে (ম্যানুফ্যাকচারিং ডিপার্টমেন্ট), অব্যবহৃত, দরজাগুলো সীল করে দেওয়াছিলো যিশু খ্রিষ্টের ক্রসের মতো করে হাত দুই দিকে ছড়িয়ে বেঁধে মনের সুখ মিটিয়ে চাবুক মারার জন্য হুইপ স্ট্যাণ্ড সে-স্ট্যান্ড এখনও আছে, এখন আর চাবুক মারা হয় নাদেড়শো বছর আগের সবচাইতে 'সভ্য'দের এই ছিলো বন্দীর প্রতি আচরণরাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার এ-রকম 'ঐতিহ্য'বাহী কারাগারঃ নির্যাতনের জীবন্ত জাদুঘর

নির্যাতন এখনও আছে মাত্রা সঙ্কুচিত হয়েছে, ধারা বদলেছে কিন্তু নির্যাতন আছেআছে শীতের কামড়উত্তরবঙ্গের বহুল-আলোচিত শীতে এ-লেখাটা যখন লিখছি, বাঘ-পালানো মাঘের এ-শীতেও, জেইলের দরজা আর দরজার সমান জানালাগুলো এখন খোলাসারা রাত ধরেবিশাল একেকটা ওয়ার্ডচার দেয়ালের কোনোটাতেই দরজা-জানালার অভাব নাইহু হু করে হিম ঢুকছেএদিক দিয়ে ঢুকছে, ওদিক দিয়ে বেরুচ্ছে জমে যাচ্ছে মানুষের বাচ্চারাগায়ে শুধু একটা কম্বলঃ পাতলা, ছেঁড়াখোঁড়া, পুরনো, ধ্যাড়ধ্যাড়াএসব বন্দীর অনেকে শিশু ও অনেকে বৃদ্ধ

আছে পিঁপড়ার কামড় প্রায় তিন-তলা দালানের সমান উঁচু এত্তো বড়ো বকুলগাছের গোড়ার দিককার মূল কাণ্ডে লোহার কড়া পোঁতা আছেতাতে হাত বেঁধে বিষ পিঁপড়ার কামড় খাওয়ানো হয় এক ঘণ্টা দুই ঘণ্টা তিন ঘণ্টাগাছের গোড়ায় মাটিতে অনেক পিঁপড়ার বাসা কয়েদীর গায়ে মেখে দেওয়া হয়েছে গুড় খুঁচিয়ে দেওয়া হয়েছে বাসালাইন ধরে পিঁপড়া বেরুচ্ছে শতো শতো পিঁপড়াউঠে যাচ্ছে কয়েদীর গায়ে, কামড়াচ্ছে

প্রসিদ্ধ ঐ-বকুলতলার বকুল ছাড়াও গাছ আরও আছেআছে মাথার ওপর গাছের ডালের সাথে উঁচু করে হাত বেঁধে একদিন দু'দিন তিন দিন দাঁড় করিয়ে রেখে দেওয়া, ঐ-অবস্থায় পেটানোএগুলো খুব বিরল না।  (কৌর্টে এক নাগাড়ে কয়েক ঘণ্টা করে দাঁড়িয়ে থেকে সামান্য আন্দাজ পেয়েছিলাম দাঁড়িয়ে থাকার সুখ।) আছে দিনের পর দিন লোহার ডাণ্ডাবেড়ী পরিয়ে রাখাঃ নানান ভঙ্গিতে, যেন ঠিকমতো হাঁটতে না-পারে, যেনো দরকারেও নিচু হতে না-পারে, যেনো সারাক্ষণ পিঠ বাঁকা করে থাকতে হয়, সোজা হতে না-পারে, ইয়ত্তা নাই

আর, 'কেইস টেবিলে' লাঠিপেটা তো আছেইএকজন কয়েদীকে কয়েকজন 'দাঙ্গা' মিলে রীতিমতো লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে, তবু সে কয়েদী জেল-কর্তাদেরকে চোখে চোখ রেখে ব্যঙ্গ করে হিন্দি গান গেয়ে নেচে চলেছেন অদ্ভুত ভঙ্গিতে। 'বি-ক্লাস' কয়েদী এঁরা, দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েদীপ্রকৃতপক্ষে, এঁরাই মানবপ্রজাতির স্বাধীন আত্মা-পরম্পরার - সবচাইতে উৎকৃষ্ট প্রতিনিধিনিরীহ ও ভদ্রভাবে বন্দীত্বকে মেনে নেন না এঁরাকিছুতেই বশ মানানো যায় না এঁদের স্বাধীন মানুষকে সকলেই সমীহ করতে বাধ্য হয়জেল-কর্তৃপক্ষও সমীহ করেন এঁদেরকে, সহজে ঘাঁটান নাআমাদের আলমগীর এঁদেরই এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি

নির্যাতনের এসব ঘটনা প্রত্যেক দিন ঘটে নাঢালাওভাবে ঘটে নাসে-বৃটিশ আমল আর নাইতবু এখনও ঘটে নির্যাতনকম ঘটে, কিন্তু প্রায়শঃ ঘটে কোনো কয়েদী বা বাবু-জমাদার অন্য কোনো কয়েদীর নামে 'রিপৌর্ট' দিলে, মানে অভিযোগ দাখিল করলে, কেস টেবিলে তাৎক্ষণিক-বিচারসভা বসেজেল-কর্তারা সেখানে সাক্ষী-সাবুদ দেখে রায় দেনঅভিযুক্তরা সুবিচারও পান বটে, তবে প্রায়-সমস্ত ক্ষেত্রেই পান শাস্তিশাস্তি মানে এ-সব শারীরিক নির্যাতনমূলক ব্যবস্থাগুলোর কোনো একটাআবার, শাস্তি বলতে হতে পারে 'রেমিশন' বা 'রেয়াত' কাটা যাওয়াপ্রায় সকলেরই তো সশ্রম কারাদণ্ড কর্তৃপক্ষ প্রত্যেকের শ্রম বা কাজ ঠিক করে দেন, 'কাজ-পাশ' করে দেনসেই কাজের প্রকৃতি অনুসারে কয়েদীরা প্রতি তিন মাস কারাদণ্ড থেকে নির্দিষ্ট হারে ২০ দিন ২১ দিন ২২ দিন ইত্যাদি রেয়াত পান, ফলে তার মোট সাজা কমে আসে অত্যন্ত বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া এর চেয়ে বড়ো শাস্তি কয়েদীর কাছে আর কিছু নাইধরুন, এক বছর জেল খেটে আপনি তিন মাস 'রেয়াত' অর্জন করেছেন, এখন শাস্তি হলো তার থেকে এক মাস 'রেয়াত' ছেঁটে দেওয়া, এ খুব হৃদয়বিদারক শাস্তিবেশিরভাগ ক্ষেত্রে শারীরিক শাস্তির চেয়ে অনেক বেশি কষ্টকরতিল-তিল করে দেওয়া তাঁর অমানুষিক শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত রেয়াত বাদ গেলএখন তাঁকে আরও বেশি জেল খাটতে হবে, আরও বেশি শ্রম দিতে হবেএকটা দিন বেশি জেল খাটা আর একটা দিন কম জেল খাটার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ আছে যেঃ স্বাধীন মানুষের সাথে বন্দীর যে-তফাৎ। 'রেয়াত' কাটা যাওয়াটাকেই তাই কয়েদীদের ভয় বেশিসেটা কর্তৃপক্ষও জানেন, ফলে তাঁরা শারীরিক শাস্তির চেয়ে রেয়াত কাটার সিদ্ধান্ত নিতেই পছন্দ করেন বেশিযে-কর্তা ব্যক্তিগতভাবে বদ, তিনি শারীরিক নিগ্রহে আনন্দ পান, আর যিনি বিচক্ষণ-দয়ালু তিনি রেয়াত কাটেনআবার মতান্তরে, যে-কর্তা রেয়াত কাটেন তিনিই নিষ্ঠুর বেশিশাস্তির বৈচিত্র্য আর মাত্রার হেরফেরের আর মানুষের দয়ার আর নিষ্ঠুরতার প্রকারভেদের এ-এক নিরন্তর পাপচক্র স্বেচ্ছায় ঢুকেছিলো বিড়াল কারাগারের পাপচক্রে, শুধু একটু খাওয়ার তাগিদে, বাঁচার আশায়অথচ প্রকৃতিতে জেইলখানা নাই বিড়াল অথবা বাঘের জন্য কোনো বন্দীশালা নাই বনানীতেক্যাঙ্গারুর জন্য কোনো কারাগার কুঞ্জবনে নাইপাখিদের জন্য প্রিজন নাইগরুদের জন্য নাই গরাদের বন্দোবস্ত কুকুরের জন্য কোনো কয়েদের কারবার নাই ক্ষুধা লাগলে একটা প্রাণী অন্য প্রাণীকে শিকার করে খায় ঠিকই, কিন্তু বন্দী করে রাখে নাখাঁচায়, খোঁয়াড়ে কিংবা চিড়িয়াখানায় অন্য প্রাণীকে বন্দী করে রাখার ব্যবস্থা প্রাকৃতিক নয়আদিতে মানুষের জন্যেও কোনো জেইলখানা ছিনো নামানুষের জন্য খোদা বানিয়েছেন পাহাড়, নদী আর আকাশমানুষের জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন জিজ্ঞাসা, কৌতূহল, সৃজনশীলতা এবং স্বাধীনত। সৃজন করেছেন মানুষকে তিনি জন্মসূত্রে স্বাধীন হিসেবেমানুষের জন্য তিনি সৃষ্টি করেননি কারাগারমানুষের জন্য তিনি সৃষ্টি করেননি দাসপ্রথা

(রচনাটি লেখকের প্রকাশিতব্য 'কারাগার স্বাধীনতা সৃজনশীলতা' গ্রন্থের একটি অংশ।)

আপলৌডঃ ৪মে, ২০০৮

অন্যান্য কলাম 8

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.