|
শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারঃ সামান্য মুখবন্ধ
ইমতিয়ার শামীম
অভয় দিচ্ছি
শুন্ছ না যে? ধরব না কি ঠ্যাং দুটা?
বস্লে তোমার
মুণ্ডু চেপে বুঝবে তখন কাণ্ডটা।
আমি আছি,
গিন্নি আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে
সবাই মিলে
কাম্ড়ে দেব মিথ্যে অমন ভয় পেলে।
-
সুকুমার রায়
আমাদের অনেকেরই
মনে আছে, ২০ আগস্ট ১৯৭৫ সালে সামরিক শাসন জারী হওয়ার পর কালক্রমে বাংলাদেশের
সোভিয়েতপন্থী বামপন্থীরা জিয়াউর রহমানের মধ্যে অসমাপ্ত জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব
সম্পন্ন করার মতো আর চৈনিক বামপন্থীরা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার মতো
অসাধারণ নেতৃত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত
অবশ্য জিয়াউর রহমান অসমাপ্ত জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করেননি, কিংবা
জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের উপযোগী কোনও পথও তৈরী করেননি।
উল্টো
তিনি মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে অর্জিত ১৯৭২-এর সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে হত্যা
করেছিলেন, ধর্মজ রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনৈতিক দল গঠন করার অধিকার দিয়েছিলেন, ধর্মজ
রাজনীতির অনুসারী যেসব নেতা-কর্মীরা যুদ্ধাপরাধজনিত অপরাধে বিচারের জন্যে কারাগারে
ছিলেন, কলমের এক খোঁচায় তাদের মুক্তি ও নিষ্কৃতি দিয়েছিলেন, মুক্তবাজার গঠন ও
বেসরকারীকরণের কাজ জোরদার করেছিলেন।
আর
এসবের বিরুদ্ধে জিয়াউর রহমান ও তার সহযোগীদের মোক্ষম যুক্তিটি ছিলোঃ একদলীয় বাকশাল
প্রতিষ্ঠা করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হত্যা করা হয়েছে;
আমরা
চাই বহুদলীয় গণতন্ত্র।
শুধুমাত্র চতূর্থ সংশোধনীটি অকার্যকর ও বাতিল করেই এ-গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে
দেয়া সম্ভব ছিলো।
কিন্তু
জিয়াউর রহমান ও তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা তা করতে উৎসাহী হননি।
কেনো-না, তাদের বিশেষ কর্মসূচি নির্ধারণ করা ছিলো ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের আগে থেকেই।
মাত্র বছরখানেক
আগে ১১ জানুয়ারী ২০০৭-এ আমাদের দেশে আবারও একটি নীরব সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে।
এ-নীরব
সামরিক অভ্যুত্থানের যোগান দিতে দেশের কথিত নাগরিক সমাজ বা ইউনূস-অনুসারীরা ব্যাপক
ভূমিকা রাখেন।
তাদের
সে-ভূমিকার ঘাড়ে সওয়ার হয়ে এগিয়ে আসে সামরিক বাহিনী।
দেশ
জুড়ে মাতম তোলা হয়ঃ আমরা আর ১১ জানুয়ারীর আগে ফিরে যেতে চাই না; বাংলাদেশ এবার
'ইউনূস-যুগে' প্রবেশ করেছে, এবার দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে, দেশ
দুর্নীতিমুক্ত হবে, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ হবে, বিচার বিভাগ
স্বাধীন
হবে,
তথ্যঅধিকার পাওয়া যাবে, নারীর সমানাধিকার পাওয়া যাবে, সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, প্রবাসী
বাংলাদেশীরা তাদের যথাযোগ্য মর্যাদা পাবে... ইত্যাদি, ইত্যাদি।
দেশের মানুষ
এসব কথায় আশ্বস্ত হোক বা না হোক, দেশের কয়েকটি মিডিয়া অবশ্য এরকম সংবাদই পৌঁছে
দিচ্ছিলো দেশবাসীর কাছে।
আর
সে-সব মিডিয়ার ওপর আস্থাশীল শহুরে মধ্যবিত্তের একটি বড়ো অংশও খুব আশাবাদী হয়ে
উঠেছিলেন।
এসব মধ্যবিত্ত
এখন ক্লান্ত ও অবসন্ন।
কেনো-না, ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের গর্ভে সুশীল নাগরিকদের জান্তব প্রগতিশীলতা কোনোও
স্বস্তির জন্ম দিতে পারেনি।
দেশে
ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হয়নি, বরং আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি আর ঘুষ নিয়ে
গবেষণাকারীরা, যাদের গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই সামরিক-তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনীতিক ও
রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভ তৈরী করার চেষ্টা করে চলেছেন এবং দুর্নীতির
বিরুদ্ধে 'জিহাদ' ঘোষণা করেছেন।
এরকম এক
'জিহাদের' ফল এই যে, সম্প্রতি 'ইকনোমিস্ট' পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের
রংপুরে ন্যায্যমূল্যের চালের সারিতে দাঁড়ানো নিঃস্ব দিনমজুরকে এখন বলতে শোনা
যাচ্ছে, 'আমাদের রাজনীতিকরা দুর্নীতিবাজ ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাদের সময়ে আমাদের হাতে
চাল কিনার মতো টাকাও ছিলো।'
বছর
শেষে বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক যে-প্রতিবেদন উপস্থাপন
করেছেন, তা থেকেও দেখা যাচ্ছে হত্যা-সন্ত্রাসও সে-আতঙ্ককর চারদলীয় জোট সরকারের
সময়ের মতোই আছে।
অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য এতো বেড়ে গেছে যে, একদা এ-সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ মধ্যবিত্ত
পুরুষরা মুখ চুন করে তাদের বউদের পাঠাচ্ছেন মুখে শাড়ির আঁচল জড়িয়ে বিডিআর পরিচালিত
ন্যায্যমূল্যের দোকানের সারিতে দাঁড়ানোর জন্যে।
আর এসব
মিডিয়া, যেগুলো আগ-বাড়িয়ে কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পার্লামেন্ট হয়ে উঠেছিলো এবং
সে-পার্লামেন্ট হিসেবে টিকে থাকার জন্যে এক ব্যারিস্টার ও প্রাক্তন উপদেষ্টা এবং
বর্তমানে মৃত এক খতিবকে মধ্যস্থতাকারী মেনে মৌলবাদীদের সামনে নতজানু হয়ে মাফ চাইতে
গিয়েছিলো, তারাও এখন বিভিন্ন প্রতিবেদন লিখে যুদ্ধাপরাধী বিচার ও নারীনীতির সপক্ষে
দাঁড়িয়ে চেষ্টা চালাচ্ছেন হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের।
বিখ্যাত লেখক
এদুয়ার্দো গালিয়ানো ১৯৮৩ সালে লিখেছিলেন, 'মিলটন ফ্রীডম্যানের তত্ত্বসমূহ তাঁকে
দিয়েছিলো নৌবেল পুরস্কার, আর চিলির জনগণকে দিয়েছিলো জেনারেল পিনোচেট।'
বাংলাদেশেও একজন মানুষ ২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কার পান এবং তারপরই দাবী তোলেন
চট্টগ্রাম বন্দর বেসরকারীকরণ করার।
আর
এ-দাবী তোলার মধ্যে দিয়ে তিনি ইঙ্গিত দেন ফ্রীডম্যানের বিশ্বস্ত এক অনুসারী এবার
দানবীয় শক্তি নিয়ে হাজির হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে।
তবে
এ-দানব আসছে বেসামরিক পথ ধরে, যাতে সামরিক শাসনবিরোধিতায় অভ্যস্ত এদেশের জনগণকে
বিভ্রান্ত করা যায়।
কেনো-না, অর্থনীতিতে মুক্তবাজার-উপযোগী সংস্কার আনার জন্যে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে
সামরিক শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা করার পরিচিত পথটি আর কিছুতেই অনুসরণ করা সম্ভব হচ্ছে না
যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের পক্ষে।
অতএব
জন্ম নিলো একজন সামাজিক বাণিজ্যবাদী
এবং জন্ম নিলো সামাজিক বাণিজ্যতত্ত্ব।
তিনি
এমনকি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও কথা বললেন।
কিন্তু
মুর্খ আমরা বুঝতে পারলাম না। ফ্রীডম্যানও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর ঘোরতর বিরোধী এবং
শিকাগো স্কুলপন্থী অর্থনীতিবিদদের কাছে কম্যুনিস্টদের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর হলো
কেইন্সপন্থী পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদরা।
নৌবেল-বিজয়ীর
পাশাপাশি একজন পূর্ণাঙ্গ জেনারেল পেতে অবশ্য আমাদের একটু দেরী হলো। কেনো-না,
পূর্ণাঙ্গ কোনও জেনারেলই ছিলেন না বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে।
অতএব ১১
জানুয়ারীর পর প্রথম সুযোগেই এ-পদটি সৃষ্টি করা হলো।
এবং
আমরা একজন পূর্ণাঙ্গ জেনারেলের মুখ দেখলাম।
সুশীল
নাগরিকরাও এতে প্রীত হলেন, পদায়নের শক্তি তাদের মধ্যেও সঞ্চারিত হলো।
একজন
সম্পাদক দূরদর্শনে গলা তুলে ঘোষণা করলেন, এ-সরকারকে আমরাই এনেছি।
এ-সরকারকে ব্যর্থ হতে দেয়া যায় না।
বিরোধী
দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাও একই স্বরে কথা বলতে শুরু করলেন।
মিডিয়া
এবং রাজনীতিকদের প্রচণ্ড হাততালির মধ্যে দিয়ে 'ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, আমি তোমায়
মারব না' বলতে-বলতে আমাদের প্রতিটি আপদে-বিপদে পাশে এসে দাঁড়াতে লাগল সামরিক বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যারোলিনায় যেমন ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ সেখানকার কর্পোরেটবাদীদের
সামনে নতুন করে কর্পোরেইট স্বার্থ বিন্যস্ত করার সুযোগ এনে দিয়েছিলো, ঠিক তেমনি
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোও সামরিকতন্ত্রকে একের পর এক নতুনভাবে বিন্যস্ত
হওয়ার সুযোগ এনে দিলো।
সামরিকতন্ত্র বিশ্বসাম্রাজ্যবাদীদের দাওয়াই অনুযায়ী অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কর্পোরেটদের
স্বার্থ
সংরক্ষণ করতে
থাকলো, অন্যদিকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এগিয়ে চললো পূর্ব-ঐতিহ্যিক পথে, ধর্মজ রাজনৈতিক
শক্তি সংঘবদ্ধ করার পথে, যে-পথের দিশারী ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সামরিক জান্তা
জিয়াউর রহমান।
মঈন উ আহমেদ
রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতিতে তাঁর প্রথম প্রবন্ধ পাঠের সময়েই জানিয়ে দিলেন, ধর্মের
নৈতিকতা দিয়ে রাজনীতির কলুষ দূর করতে হবে।
চতুর্দশ
শতাব্দীতে আধুনিক রাষ্ট্রবাদীরা যে-ধারণাকে বাতিল করে দিয়েছিলেন, সে-ধারণা
প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে চললো সামরিক বাহিনী পরিচালিত শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক
সরকার।
কিন্তু
এ-দিকটি আমাদের নাগরিক ও রাজনীতিকদের চোখেই পড়ল না।
কেনো-না, তারা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মঈন উ আহমেদ কথিত মুক্তিযুদ্ধ তত্ত্ব নিয়ে।
তারা
মনে করলেন, এবার দেয়ালে শেখ মুজিবুর রহমানের পাশ থেকে জিয়াউর রহমানের ছবি খসে পড়বে
এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে।
বাস্তবে
দেয়ালে আরও অনেকের ছবি উঠলো।
যদিও
সে-ছবির ভিড়ে এমনকি তাজউদ্দিনের মতো মুক্তিনায়কও কল্কে পেলেন না।
এমনকি
এখনও সুশীল নাগরিক ও মধ্যবিত্তদের অনেকে বুঝতে চাইছেন না, জিয়াউর রহমান যেমন
সোভিয়েত ও চৈনিক রাজনীতিকদের সঙ্গে নিয়েও শেষ পর্যন্ত
স্বার্থ-সংরক্ষণ
করেছিলেন
মৌলবাদী ধর্মজ রাজনীতিকদের, তেমনি এ-সামরিক বাহিনী পরিচালিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও
প্রতিটি কথিত প্রগতিশীল কাজ সম্পন্ন করার নামে সামরিকতন্ত্র ও প্রতিক্রিয়াশীলতাকে
রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠার কাজ সম্পন্ন করে চলেছেন।
প্রচণ্ড
সাফল্যও অর্জন করেছেন তারা তাদের এজেন্ডাগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে।
একেবারেই গর্হিত ও দৃষ্টিকটূ দেখায় বলে (তা ছাড়া সামরিক শাসন বৈধ করার শেষ আশ্রয়ও
বটে!) প্রধান বিচারপতি হিসেবে কোনোও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া
সম্ভব না হলেও দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে একজন সাবেক
সেনাপ্রধানকে।
সম্ভব
হয়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ
স্বরাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়ের
দায়িত্বে একজন সেনা-কর্মকর্তাকে অধিষ্ঠিত করা, যিনি দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস
সম্পর্কেই ভিন্নমত পোষণ করেন।
নির্বাচন কমিশনের মতো স্পর্শকাতর জায়গাটিতেও সেনা-কর্মকর্তা কাউকে প্রধান নির্বাচন
কমিশনার করা না গেলেও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োজিত হয়েছেন, এমন
একজন সেনা-কমর্কর্তাকে যিনি চাকুরী-জীবনে গমচুরির দায়ে সামরিক বাহিনী থেকে পদত্যাগ
করেছিলেন এবং সারা দেশে একযোগে বোমা বিস্ফোরণের পর জোট সরকারকে
জঙ্গীদের সাধারণ
ক্ষমা ঘোষণার মধ্যে দিয়ে সৎপথে ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
তার
গমচুরির কাহিনী প্রকাশিত হয় দৈনিক সমকালে, কিন্তু এ-কাহিনীকে ঢাকবার জন্যে দৈনিক
প্রথম আলো ত্বরিৎগতিতে খবর ছাপে, 'দায়িত্ব নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি তার সম্পত্তির
হিসেব দিয়েছেন'। দেশের কারাগারগুলোর মূল দায়িত্বেও এখন সেনা-কর্মকর্তারা।
প্রশাসনের সবখানে এখন অঞ্চলপ্রতিনিধি বিভিন্ন সামরিক কর্মকর্তাদের তুমুল দাপট।
আর
'জনস্বার্থে'
সামরিক বাহিনীর
প্রধানের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে আরও এক বছর।
প্রতিটি
আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়েছে প্রশাসনিক
শিক্ষক ও সামরিক প্রতিনিধিদের মতবিনিময় কেন্দ্রে, প্রতিবাদকারী ছাত্র-শিক্ষকদের
সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পঙ্গু করে দেয়ার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে অব্যাহতগতিতে।
প্রগতিশীল হিসেবে বিবেচিত অনেকেই তাদের সারা জীবনের গৌরব এ-অপচেষ্টার
পিছনে ব্যয়
করতে ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন।
যেমন,
শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী ডঃ আনিসুজ্জামান গত আগস্টে ছাত্র-নির্যাতনের প্রতিবাদকারী
শিক্ষক ও ছাত্রসমাজকে বিপথগামী করতে প্রথম আলোর প্রথম পাতায় কলম ধরেন। তিনি লেখেনঃ
এ-পরিস্থিতিতে শিক্ষক সমিতির প্রতিবাদ সঙ্গত হয়েছে।
তবে
সমিতির বক্তব্য ঘটনার প্রতিবাদ অতিক্রম করে রাজনৈতিক অবস্থান সূচিত করেছে।
এর
দায়দায়িত্ব সমিতিকেই বহন করতে হবে।
সমিতির
পক্ষে এরকম রাজনৈতিক অবস্থান অবশ্য নতুন নয়, অতীতেও এমন হয়েছে।
তবে
সান্ধ্য আইন জারীর পর ছাত্র-ছাত্রীদের হলত্যাগের নির্দেশ অমান্য করতে যদি শিক্ষক
সমিতি আহ্বান জানিয়ে থাকে, তবে তা যথার্থ হয়নি।
ছাত্র-ছাত্রীরা যদি নির্দেশ অগ্রাহ্য করে থেকে যেতো এবং পরিণামে আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর হয়রানির সম্মুখীন হতো, তার দায়িত্ব কে বহন করতো? ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে এমন হয়রানির ঘটনা যে-ঘটছে, তা তো আমরা জানতেই পারছি।'
কী
চমৎকার ব্যাপার! সেনা-সদস্যদের নির্যাতনকে নির্যাতন বলার মতো সাহসই হলো না ডঃ
আনিসুজ্জামানের। তিনি বরং মোলায়েমভাবে সামরিক সেনাদের গায়ে তেল-মলম মালিশ করে
সেটাকে 'হয়রানি' বানিয়ে দিলেন (অথবা আদর্শিক ও নৈতিকভাবে তিনি সে-রকমই মনে করেন)।
'যদি'
শব্দটির ওপর নির্ভর করে শিক্ষক সমিতির বিরুদ্ধে ডঃ আনিসুজ্জামান তাঁর ক্ষোভ উগড়ে
প্রতিনিধিত্ব করলেন নির্যাতক সামরিক কর্মকর্তাদের।
ধরা
যাক, ছাত্র-ছাত্রীরা হলে সেদিন রাতে অবস্থান নিলো।
কী হতো?
আরও একটি ২৫ মার্চ ১৯৭১? তার মানে আমাদের সামরিক শাসকদের সে-যোগ্যতা রয়েছে, যেমন
ছিলো পাক-সামরিক বাহিনীর? সোজাভাবে আনিসুজ্জামান সেটি আমাদের জানিয়ে দিলেই পারতেন,
এতো ঘুরিয়ে বলার দরকার কী বলুন? নাকি মঈন উ আহমেদের মতো তিনিও দুঃখ পান পাকিস্তানী
সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করতে? আমাদের জানা নেই।
তবে
আমরা আরও কিছুদিন পর দেখতে পেলাম, শিক্ষক-ছাত্র ও সচেতন মহল যখন জবাবদিহিতা ও
স্বচ্ছতা
ছাড়াই ফ্রান্সে
প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ পাঠানোর বিরোধিতা করছেন তখন ডঃ আনিসুজ্জামান আবারও আবির্ভূত
হয়েছেন, সংবাদসম্মেলনে সাফাই গাইছেন, গিমে জাদুঘরের প্রদর্শনীতে প্রত্নতত্ত্ব
পাঠানো উচিত!
আগস্ট ২০০৭ এই
শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনেক ভড়ংই উন্মোচন করে দিয়েছে।
তারা
সেনাক্যাম্প রাখতে চেয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
প্রকারান্তরে বনবন করে মুগুর ঘুরাতে ঘুরাতে তারা বলছিলো, 'হাতে আমার মুগুর আছে, তাই
কি হেথায় থাক্বে না?/ মুগুর আমার হালকা এমন মারলে তোমার লাগবে না।'
কিন্তু তাদের সে-অভয়ে কাজ হয়নি বলে তারা সত্যিই আমাদের ঠ্যাং চেপে ধরেছিলো, মুণ্ডু
চেপে বসেছিলো।
তারপর
'তিনি, তার গিন্নি এবং তাদের নয় ছেলে' অর্থাৎ সামরিক শাসক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের
উপদেষ্টারা সবাই মিলে কামড়াতে শুরু করেছিলো, শাহবাগের আজিজ মার্কেট থেকে শুরু করে
সেদিনের গোটা বাংলাদেশই তার সাক্ষী।
এ-সামরিকতন্ত্র
পরিচালিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই আমার সুযোগ হয়েছিলো ফেব্রুয়ারী
২০০৭-এর মাঝামাঝি একুশ উপলক্ষ্যে একটি রাজনৈতিক দল আয়োজিত সেমিনারে বিভিন্ন বাম-নেতা
ও কর্মীদের উপস্থিতিতে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপনের (পরে যা ছাপা হয়েছিলো দৈনিক সমকাল,
সাপ্তাহিক একতা ও সাপ্তাহিক নতুন দিনে)।
তাতে
আমি এরকম লিখেছিলাম, একটি দেশে কোনোও বিশেষ পরিস্থিতিতে জরুরী শাসন এলে সেখানকার
সাধারণ মানুষ উল্লসিত হলেও হতে পারে, কিন্তু দেশের সচেতন বুদ্ধিজীবী ও নাগরিকরাও
যখন উল্লসিত হন, তখন সত্যিই আমাদের জন্যে দুর্দিন অপেক্ষা করছে।
আমি
লিখেছিলাম, দেশে এবার ব্যক্তি দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বদলে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও
সন্ত্রাসের পথ আরও খুলে দেয়া হবে, রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি-সন্ত্রাস আরও প্রাতিষ্ঠানিকতা
পাবে। দেশকে কর্পোরেইট সামাজিক বাণিজ্যবাদীদের রাজত্বে পরিণত করার চক্রান্ত শুরু
হয়েছে।
কিন্তু
কিছু সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক গ্রেফতার হওয়ার আনন্দে আমাদের অনেকেই তখন
ছিলেন আত্মহারা।
তারা
ইতিহাস-বিস্মৃত হয়েছিলেন, ভুলে গিয়েছিলেন
প্রতিটি সামরিকতন্ত্রই ক্ষমতা দখলের পর দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করার
মধ্যে দিয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা তৈরী করে
এবং পরে আবার এ-দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীদেরই আত্তীভূত করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে।
তারা
ভুলে গিয়েছিলেন, প্রতিটি সামরিকতন্ত্রই ক্ষমতা দখলের পর 'প্রথমে জানোয়ারটার গায়ে
দুর্গন্ধ লাগিয়ে দাও, তারপর ওটাকে গুলি করে মারো তত্ত্ব অনুসরণ করে, যাতে আন্দোলন
গড়ে তোলার সম্ভাবনা আছে যেসব কেন্দ্রগুলো থেকে সেগুলোকে তছনছ করে দেয়া যায়।
এভাবেই
সব কিছু তছনছ করা হচ্ছে।
শুধু
রাজনৈতিক দলগুলোকে নয়, আমাদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সামাজিক ধারণাগুলিকেও।
বায়তুল
মোকাররম থেকে যারা 'নারায়ে তকবির' ধ্বনি দিয়ে বেরিয়ে আসছে তাদের জামাই-আদরে রাজপথ
ছেড়ে দেয়া হচ্ছে।
অথচ
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ করায় বামপন্থীদের মুক্তাঙ্গন থেকে মিছিল করার পথে
বাধা দেয়া হচ্ছে, হামলা করা হচ্ছে।
আমাদের
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছিলো।
এ-স্বাধীনতা
কতোটুকু দেয়া
হয়েছে, বিচার বিভাগ অবমাননার ভয়ে কারোরই সাহস নেই তা নিয়ে প্রাণ খুলে আলোচনা করার।
আমাদের
তথ্য-অধিকার আইনের
স্বপ্ন
দেখানো হয়েছিলো।
কিন্তু
সে-তথ্য-অধিকার আইন বাস্তবে কতটুকু তথ্য জানার অধিকার দেবে, তথ্য জানানোর জন্যে
দায়বদ্ধ করবে, সে-সম্পর্কে এর মধ্যেই আমাদের চোখ খুলে গেছে।
বিটিভির
চেহারা দেখলেই
বুঝা যায় তথ্য-স্বচ্ছতার প্রতি এ-সরকারের কতপ দরদ! এ-সরকারের প্রতি
সবচেয়ে সহৃদয় সম্পাদক-সাংবাদিক মতিউর রহমানও এখন বিটিভি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
যুদ্ধাপরাধী শব্দটি জনপ্রিয় করে তোলা হয়েছে, যাতে ধর্মজ রাজনৈতিক শক্তিই যে মূলতঃ
যুদ্ধাপরাধী ছিলো, রাজাকার, আলশাম্স ও আলবদর ছিলো, সেটি আমরা ভুলে যাই
ক্রমান্বয়ে
এবং যাতে
এইভাবে ধর্মীয় রাজনীতির একটি
স্বচ্ছ
গ্রহণযোগ্য অবয়ব তৈরী করা যায়।
সবচেয়ে
কৌতুককর পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে নারীনীতি নিয়ে।
ধর্মজ
রাজনৈতিক শক্তি বলছে, সমানাধিকারের কথা বলা যাবে না, বলতে হবে নারীর ন্যায্য
অধিকারের কথা।
সামরিকতন্ত্র পরিচালিত সরকার এর মধ্যেই ধর্মজ রাজনৈতিক শক্তির উত্থাপিত এরকম সব
দাবী পর্যালোচনা করার জন্যে একটি কমিটিও তৈরী করেছেন।
আমাদের
প্রকারান্তরে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, ন্যায্য অধিকার আর সমানাধিকারে অনেক তফাৎ।
'ন্যায্য'
শব্দটির মধ্যেও শোষণের দিক রয়েছে এবং সে-শোষণমূলক দিকটি বহাল রাখার ব্যাপারে এ
সরকার বদ্ধপরিকর।
আমরা জানি না,
ভবিষ্যতে আমাদের জন্যে আরও কত কী অপেক্ষা করছে।
তবে
এটুকু এর মধ্যেই পরিষ্কার, এদের কাছ থেকে পাওয়ার কোনোও কিছুই নেই।
এ-সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা করা আর ধর্মজ রাজনৈতিক শক্তিকে বিকশিত করা, রাজনীতিতে
সামরিকতন্ত্রের অংশগ্রহণ নিশ্চিত ও সাংবিধানিকভাবে বৈধ করা সমান কথা।
যারা
এতোদিন এদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, এদের উত্থাপিত একেকটি পদক্ষেপ নিয়ে প্রশংসা ও
আলোচনা করেছেন এবং এভাবে সময় নষ্ট করেছেন, নির্বাচনের পরিবেশ তৈরীর পথ রুদ্ধ করেছেন
এবং কথিত 'গোপন ক্ষুধা'র মতো 'গোপন দুর্নীতি' ও 'গোপন সন্ত্রাসে'র রাজত্ব গড়ে তুলতে
সহায়তা করেছেন তাদের সম্পর্কেও সময় এসেছে প্রশ্ন তোলার।
কেনো-না, আমরা
জানি, পৃথিবীতে কিছু-কিছু অপশক্তি বার-বার নতুন করে জন্ম নিতেই থাকে, বার-বার তাদের
বিরুদ্ধে নতুন করে সংগ্রাম করতে হয়।
আমাদেরও
সময় এসেছে নবোদ্যমে ধর্মজ রাজনৈতিক শক্তি ও সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে, কর্পোরেইট
অর্থনীতিবাদীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর।
এর কোনও
বিকল্প নেই।
আপলৌডঃ ৪ মে, ২০০৮
|