London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

সেলিম রেজা নিউটনের কলামঃ দুই

আদর্শ দাসত্ব মহাগ্রাম

[গত আগস্টে সেনাবাহিনীর হাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলনে যুক্ত হবার কারণে কয়েকজন সহকর্মী-সহ জেইলে যেতে হয়েছিলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং প্রাক্তন চেয়ারপার্সন সেলিম রেজা নিউটনকেকয়েক মাস কারাভোগের পরে নানা-ধরণের রাষ্ট্রিক সন্ত্রাসের ঝক্কি পেরিয়ে সহকর্মীদের সাথে মুক্তি লাভ করেন তিনি ক্যামপাসে ফিরে এসে জেইল-জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে নিজের ভাবনাকে মিলিয়ে লিখতে শুরু করেন সেলিম রেজা নিউটন।  ইউকেবেঙ্গলি প্রকাশ করতে শুরু করেছে সেলিম রেজা নিউটনের জেইল থেকে বেরিয়ে আসার পরবর্তী পর্যায়ের লেখাগুলো। - সম্পাদক ]

আপনি যদি একুশ শতকের আধুনিক প্রত্যক্ষ দাসপ্রথা না-দেখে থাকেন, তাহলে কারাগারে যেতে পারেন দাসদের গ্রাম এটা, বন্দীদের গ্রাম আদর্শ দাসত্ব মহাগ্রামআস্ত একটা নির্যাতনমূলক শ্রমশিবির বটে জেইলখানা, বাধ্যতামূলক শ্রমশিবির এখানে ইচ্ছার বিরুদ্ধে মানুষকে দিয়ে সর্বপ্রকার কাজ করানো হয় জুলুম করে এবং জুলুমের ভয় দেখিয়েকাজ নিজেও একটা জুলুম এখানে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক কর্মশ্রম জুলুম ছাড়া আর কী?

দাসত্ব মহাগ্রামের যাবতীয় কাজ কয়েদীরা করেপুরোনো কালের বৃহৎ একটা গ্রামের মতো এখানে আছে আলাদা-আলাদা পেশা-জীবিকার আলাদা আলাদা পাড়াতবে, গ্রাম বা পাড়া বললে যে-রকম মানবিক একটা ব্যাপার মনে হয়, এটা সে-রকম নয়এটা খুবই অমানবিকতবু পাড়া-পাড়া বা গ্রাম-গ্রাম মনে হয় এখানে থাকা মানুষদের পারস্পরিক সম্পর্কের জন্যঃ মোটের ওপর সবাই সবাইকে চিনে, এক সাথে কাজ করে, যাবতীয় দুঃখকষ্টের মধ্যেও সহজভাবে মেলামেশা করে, আড্ডা মারে, কালেভদ্রে ঝগড়াঝাঁটিও করে, আবার মিলেমিশে যায়হঠাৎ ভুল ভাঙবে, যখন দেখবেন সকলের একই পোশাক, হাসিটা মলিন, উঁকি দিচ্ছে আড়ালের দুঃখ, আর কোথাও কোনো নারী নাই নারীরা আছেন, আলাদা ঘেরাটোপে, দেখতে পাইনি শ্রমের দিক দিয়ে দেখলে এটা একটা সুবিশাল কারখানার মতো, বন্দী শ্রমিকরা যেখানে উদয়াস্ত পরিশ্রম করেন, শুষ্ক অনিচ্ছুক প্রাণান্তকর পরিশ্রমছোটবেলায় সৈয়দপুরের রেলওয়ে কারখানায় দেখেছিলাম ওয়াগনশপ, লৌকোশেইড, আরও সব আলাদা আলাদা শেইডআর এখানে জেইলখানায় সব আলাদা আলাদা চালি

শীত নাই, গ্রীষ্ম নাই, কোন্‌ সকাল থেকে বিশাল বিশাল কম্বল আছড়ে ধুচ্ছেন ধোপা-চালির কয়েদীরাপ্রতিদিন দশ হাজার রুটি বানাচ্ছেন রুটি-চালির লোকেরানাপিত-চালির নাপিত-কয়েদীদের কাঁচি কচকচ-কচকচ চলছেই সকাল থেকে সন্ধ্যাকৃষিকাজ যাঁদের ঘাড়ে পড়েছে, তারা নিজের কাঁধে করে জোঁয়াল টানছেন গরুর বদলেঃ কয়েদী থাকতে আবার গরু কেন? আগে-পিছে দুই কয়েদী বাঁশে ঝুলিয়ে ছোটবড় ড্রামের মতো বালতি টানছেনকোনো-কোনো বালতিতে জলসারা জেইলে যেখানে যেখানে জল লাগে গণ-গোসলের বিরাটকায় চৌবাচ্চা ভরার, কাপড় কাচারকয়েদী থাকতে কর্পোরেশনের পানির লাইনের কী দরকার? কয়েদীদের সশ্রম কারাদণ্ড উশুল করতে হবে নাআবার কোনো কোনো বালতিতে মল-মূত্র-গুয়ের পানিঃ মলবাহী নালা থেকে ভরে আনা, ফুলবাগানের বা মূলাক্ষেতের আদম-সারগোটা জেইল গুয়ের গন্ধে ম-ম করছে একেবারে বৃদ্ধ লোকেরা ঝাঁট দিচ্ছেন সার বেঁধেবিস্তৃত আমতলার উঠান লেপছেন মাথায় করে জং-ধরা পুরাতন টিনের তোরঙ্গে করে ভাত নিয়ে যাচ্ছেন আরেক দল লোকঃ কয়েদীদের খাদ্যগিয়ে ঢালছেন ওয়ার্ডের বারান্দায় সিমেন্টের মেঝেতেঅবিকল ফকির লালনের মতো বা কনফুসিয়াসের মতো দেখতে অলৌকিক বৃদ্ধেরা বসে-বসে মাছি মারছেন সারা সারা দিনমেরে-মেরে জমা করছেন ছোটো- ছোটো কৌটায় ডিভিশনের স্যারদের ঘরে যেন ভনভন না-করে কোনো মাছিমুচি-চালির লোকেরা জুতা সেলাই করেই চলেছেনওদিকে উৎপাদন-বিভাগের (এমডি) দেয়ালের ভেতরে তাঁত-চালির লোকরা মাকু টেনেই চলেছেনমোড়া-চালির কয়েদীরা বাঁশের-দড়ির মোড়া বানিয়েই যাচ্ছেনআরও আছে লোহার কাজ, ছাপাখানার কাজ, (ভিতরে গিয়ে রতন মিয়াকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে, রতন, আরও যেনো কী কী কাজ?) 'রাইটার' বন্দীরা অফিসের কতো রকম কাজ করছেনমুক্তার মতো তাঁদের হস্তাক্ষর পাঠাগারের বন্দীরা সাড়ে চার হাজার বই লেনদেনের বন্দোবস্ত সামলাচ্ছেন প্রতিদিনকারা-হাসপাতালে কয়েদীরাই ড্রেসিং করছেন কয়েদীদের, প্রেশার মাপছেন, ইঞ্জেকশন দিয়ে দিচ্ছেন, স্যালাইনের সিরিঞ্জ-ব্যাগ-স্ট্যান্ড সামাল দিচ্ছেন কলেরার-ডায়রিয়ার রোগীদেরগণটয়লেটের-নালাড্রেনের মল-মূত্র পরিষ্কার করছেন 'বাবু' চালির কয়েদীরা

এ-রীতিমতো নিবর্তনমূলক এ-শ্রমশিবিরের বন্দীদের বাধ্যতামূলক শ্রমের বিনিময়ে রীতিমতো কারখানভিত্তিক উৎপাদন-যজ্ঞ পরিচালিত হয় ম্যানুফ্যাকচারিং ডিপার্টমেন্ট এমডিতেএটা কারাগারের ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা, কারাগারের কারখানাজেইলের ভেতরে একটা বড়ো অংশ চারপাশে উঁচু দেওয়াল দিয়ে ঘেরাজেইলের ভিতরে জেইলঅন্য অংশের কোনো কয়েদী সেখানে ঢুকতে পারেন নাএমডিতে সবচেয়ে কঠোর পরিশ্রম এমডিতে কাজ পাশ হওয়াটা কয়েদীদের কাছে ভয়ের এখানে শতো শতো গজ উৎপন্ন হয় চাদর, কয়েদীদের পোশাক, লুঙ্গি, শাড়ি, গামছা ইত্যাদি হিসেবেপ্রচুর মোড়া, বাঁশের চেয়ার তৈরী হয় মাত্রই বলেছিজেইলের বাইরের বিক্রয়কেন্দ্রে এসব জিনিস দেদারসে বিক্রি হয়, কর্তৃপক্ষ সরবরাহ করে কূল পান নাএখানে মুদ্রণ হয় জেইলের জন্য দরকারী যতো রকমের খাতা, কাগজপত্র, ফরম, পার্সোনাল টিকেট, মেডিক্যাল কার্ড ইত্যাদি যাবতীয় কিছুরাজশাহী জেইলের চাহিদা মিটিয়ে সেসব যায় আরো সব অন্য অন্য জেইলেকয়েদীদের বদ্ধমূল বিশ্বাস, এমডি কারাগারের অত্যন্ত লাভজনক প্রকল্প, কিন্তু কর্তৃপক্ষ এটাতে লোকসান দেখায়, আর টাকা মেরে খায়এটা এমন একটা উৎপাদন-কারবার যেখানে শ্রম পাওয়া যায় বিনামূল্যেশ্রমের জন্য কয়েদীদেরকে কোনো টাকা-পয়সা দেওয়া হয় নাদশ-বিশ-তিরিশ-চল্লিশ বছর জেইল খেটে একটা মানুষ যখন কারাগার থেকে মুক্তি পায় তখন তাঁর হাতে ফুটা পয়সাও থাকে না

কাজ, কাজ আর কাজঃ বিনা পারিশ্রমিকে তো বটেই, প্রায় না-খেয়ে এবং নিপীড়ন আর লাগাতার দুর্ব্যবহারের বিনিময়েওদিকে, বাবু-জমাদাররা সারাক্ষণই ছোঁক-ছোঁক করছেন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেজেইলের আইনে বিধিবিধানের তো আর শেষ নেই, আলমগীরের বয়ানেঃ 'আকাশে যতো তারা, জেইলকোডে ততো ধারা'রিপৌর্ট খাওয়ানোর ভয় দেখিয়ে কীভাবে পাঁচ টাকা দশ টাকা পকেটে ভরা যাবে, কীভাবে কয়েদীর সিগারেটটা নিজে খাওয়া যাবে। কয়েদীর নামে বাইরে থেকে পাঠানো শুকনা খাবারের ভাগ মারা যাবে, পাঠানো সিগারেটের প্যাকেট সরানো যাবে, ছুঁতানাতার শেষ নাই, অত্যাচারের শেষ নাইএমনকি ঈদের দিনেও ডিভিশনের 'কাজের লোক' বা 'ফালতু'র কাছ থেকে ২০ টাকা পরবী নিয়েছেন এক জমাদারএতোসব কাজ আর অত্যাচারের সংসারে তিন বেলা ভাত খেতে পর্যন্ত পান না এ-বন্দীরাসকালে একটা রুটি, সাথে গুড় দুপুরে দু'টো রুটি, সাথে গুড়রাতের জন্য শুধু ভাত-তরকারী কিন্তু সে-ভাত তো এসে যায় বিকালের আগেই প্রায়, সন্ধ্যার আগেই দাসদেরকে খাঁচায় ঢুকতে হবে যেসত্যিকারের রাতে খেতে বসলে দেখা যাবে নষ্ট হয়ে গেছে সে-ভাত, এমনই ভালো তার চালভাত তাই সন্ধ্যার আগে-আগেই খেয়ে ফেলতে হয়তারপর সারারাত উপোসনইলে রেখে দিতে হবে পানি দিয়ে এবং খেয়ে ফেলতে হবে সন্ধ্যা-রাতেই, না-হলে নির্ঘাৎ পঁচতে শুরু করবেখাবারের মান নিয়ে কিছু না-বলাটাই সবচেয়ে ভালোডিভিশন পাওয়ার আগে তিন দিন সেলে ছিলাম, নিজমুখে খেয়ে দেখেছিমানুষকে কষ্ট দেওয়ার কি সহজ উপায় তবু এখন যা দেয়, সেটাই নাকি ক-বছর আগের তুলনায় অনেক ভালো, কয়েদীরা বারবার মনে করিয়ে দেয় সে-কথা

সকাল থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত অমানুষিক পরিশ্রম, অত্যাচার, আর প্রায়-অনাহারের পরও রাতের চেয়ে দিবসই সুন্দরদিনে আকাশ দেখা যায়, মাটিতে হাঁটা যায়, গণ্ডির ভেতরে হলেও একটু চলাফেরা হয়রাতে আরও বেশি বন্দীআসলে রাত তো অনেক দূর, সন্ধ্যা হওয়ার আগেই লক-আপনিজ-নিজ ওয়ার্ডের খাঁচার মধ্যে লোহার গরাদের গেটে তালাচাবিতখনও সন্ধ্যা হয়নিতখনও হাঁস-মুরগি খুপরিতে ঢোকেনি তখনও মাঠে চরছে গরু-ছাগলকয়েদীদের মুখে তখন গোধূলি-ঘনানো বিষন্নতাপ্রতিটা সন্ধ্যায় তাঁরা হাঁস-মুরগি-গবাদিপশুর প্রতি ঈর্ষা অনুভব করতে-করতে খাঁচায় ঢোকেনআত্মার একেবারে গভীরে আলাদা করে আরেকবার অনুবাদ করেন বন্দিত্বের অর্থবিছানা হয় দেড় হাত চওড়াবিছানা বলতে ভাঁজ-করা একটা কম্বল, মাথায় ভাঁজ-করা কম্বলের একটা বালিশদুই বিছানার মাঝখানে এক আঙ্গুলও ফাঁক নাইশীত হলে গায়ে আর-একটা কম্বল, জানলা-দরজা খোলা, আগেই বলেছি গরম হলে ভাপ ওঠে ও-রকম ঘেঁষাঘেঁষি করে বিশাল একটা মেঝেতে কোথাও একশো কোথাও-বা দুইশো তিনশো চারশো মানুষ, রাজশাহীর কুখ্যাত দম-ফাটানো ৪০-৪২ ডিগ্রির গরমেকি গরমে, কি শীতে সেলগুলোর অবস্থা আরও সঙ্গীনঐভাবে শীতে-গ্রীষ্মে শুয়ে-শুয়ে সারা রাত অপেক্ষা, কখন সকাল হবে, কখন খুলবে গরাদলক-আপ যখন খুলবে, লোহার ঘটাং ঘটরং শব্দ শুনতে কতো ভালোই না-লাগবেঃ এ-কথা ভাবতে-ভাবতেই হয়তো ঘুম আসবে, অথবা আসবে না, দাঁড়িয়ে থাকবে জানালার বাইরেএভাবে আয়ু ক্ষয় করতে-করতে যাবে একটা দিনবন্দী জানবেন, তাঁর মুক্তির ক্ষণ আরও একদিন এগিয়ে এসেছেএ-ও একটা বিরাট অর্জনঃ আরও একটা দিন তিনি পার করে দিয়েছেন জেইলে এবং তারপরও বেঁচে আছেন

এতো-যে দাসের মতো কাজ, সে-কাজেরও নিশ্চয়তা নাইআজকে আপনার ফুলবাগানে কাজ, কাল-যে আবার উৎপাদন-বিভাগের উঁচু দেওয়াল ঘেরা পৃথক জেইলের ভেতর বসে-বসে আপনাকে মোড়া বানাতে হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নাইকর্তৃপক্ষের খেয়াল হলেই হলো আপনার কাজ অন্যত্র পাশ করে দিতে পারেন তাঁরাআইন হচ্ছে, প্রতি মাসে কাজ-পাশ করাতে হয়একই কাজই যদি বহালও থাকে, তবুও সেটা নতুন করে পাশ করাতে হবেআর, প্রতিবার পাশ করানোর জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হবে জেইল-কর্তাদেরকে। (আকাশে যত তারা, জেইলইকৌডে তত ধারা; জেইলকৌডে যত ধারা, তত বেশি 'মাসোহারা'।) টাকা দিতে না-পারলে আপনার কাজ অন্যত্র পাশ হয়ে যাবেতাতে হয়ত বেশি পরিশ্রম, তাতে হয়তো আপনার বর্তমান কর্ম-এলাকার বন্ধু-হয়ে-যাওয়া কয়েদীদেরকে হারাতে হবে, দেখা হবে না আর প্রতিদিন কিংবা নতুন কাজটা হয়তো আপনার ভালো লাগে না স্রেফসুতরাং প্রতি মাসে টাকা তৈরী রাখতে হবে টাকা পাবেন কোথায়? বাসার লোকেরা খেয়ে-না-খেয়ে দিয়ে যাবেআপনার সে-রকম টাকা পাঠানোর লোক না-থাকলে আপনি হয়ত আপনার বরাদ্দ মাছের টুকরাটা বেচে দেবেন দুই টাকা দিয়ে, টাকা জমাবেন

ঐ-যে সামান্য খাদ্য, একটু রুটি আর একটু ভাত, সেটুকু নিয়েও অনেক ব্যবসা হয়ঠিকাদার কাঁচামাল সাপ্লাই দেবেন ঠিকাদার নির্বাচনে টাকা লেনদেন হবে গেট দিয়ে জিনিস ঢুকবেগেটে নয়-ছয় হবেরান্না-চালি গোপন 'নিলামে' বিক্রি হবে, যিনি 'কিনে' নেবেন (তিনি একজন কয়েদী) তিনি সেখান থেকে স্পেশাল হিসেবে চোরা খাবার বেচবেনএমনকি আপনি যে-দেড়হাত জায়গায় শুয়ে থাকেন, ঐ জায়গাটা ঐখানেই বহাল রাখার জন্যেও আপনাকে মাসোহারা দিতে হবেএকটু আরামে থাকার জন্য, আলাদা একটু লোহার বেডের বালিশ-তোষক-মশারির বিছানায় ঘুমানোর জন্য, আর একটু ভালো খাওয়ার জন্য আপনাকে থাকতে হবে মেডিক্যালে, যার একটা ওয়ার্ড থেকে প্রায় ৭০ জন বন্দীকে সরিয়ে আমাদের তিন জনের থাকার ডিভিশন ওয়ার্ড বানানো হয়েছিলো, আর সেই মেডিক্যালে থাকতে হলে ডাক্তারকে আপনি প্রতি মাসে এক দেড় দুই বা তিন হাজার টাকা দেবেন টাকা না-থাকলে আর সত্যিসত্যি অসুখ হলেও মেডিক্যালে আপনার এক-আধ দিনের বেশি সিট জুটবে না, আর টাকা থাকলে দিব্যি সুস্থ মানুষ আপনি মাসের পর মাস মেডিক্যালে থাকবেন

এমন একটা কাজ জেইলখানায় নাই, যার জন্য টাকা দিতে হয় নাঅথচ ঐ দাসদের গ্রামে প্রায় প্রত্যেকেই গরীব মানুষগরীবের জেইল, আর বড়লোকের আইন-আদালত অনেকদিন জেইল খাটা হয়েছেযে-মামলায় আপনি আছেন তাতে, হাইকোর্টে মোটের ওপর একটা উকিল ঠিকমতো দাঁড়ালে আপনার জামিন নিশ্চিত, সেই উকিলটুকু ধরার মতো টাকা বেশিরভাগ কয়েদীর নাই বলে তাঁকে পঁচে মরতে হবে জেইলে আরও কত কাল জামিনটুকু পাওয়ার জন্য আপনার পরিবার হয়তো সহায়-সম্বল সব বেচে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে দালালকে, টাকাটা দালাল নিজেই খেয়ে বসে আছে, আর আপনি সেই জেইলেই পঁচে মরছেনকারারক্ষীরাও নিতান্ত গরীব অতি সামান্য বেতন পানসংসার চলে না, মাস চলে না কিছুতেই নাডিউটি প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টাবসার হুকুম নাইজমাদার দেখলে রিপৌর্ট করে দেবেন আর সেই ভয় দেখিয়ে জমাদারও তার কাছ থেকে টাকা খাবেনজমাদারের কাছ থেকে আবার টাকা খাবেন হয়ত সুবাদার, তারপর জেইলার, তারপর সুপারএরই মধ্যে কত রকম হাজারো মানবিক বৈশিষ্ট্য আর পরিস্থিতির জন্য জেইলকর্তাদের কেউ কেউ দয়ালু, কেউ-কেউ বদমাইশকয়েদীরা সারাক্ষণই বলছেনঃ এই জেলার ভালো, ঐ সুপার খারাপ, তার আগের জেলার ছিলেন চামার, আর ওমুক সুপার হারামির বাচ্চা, আর তমুক সুবাদার অত্যন্ত সদাশয় লোকএসব পার্থক্য জেইলের ভেতরে বাঁচা-মরার সাথে জরুরীভাবে সংশ্লিষ্ট বটে

আর, আমরা? ডিভিশনের কয়েদীরা? আমরা রাষ্ট্র-কর্তাদের কমবেশি নিজেদের শ্রেণীর লোক বলে রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হয়েও প্রথম শ্রেণীর বন্দীর মর্যাদা পাবো, 'রাজার হালে' জেইলে থাকবোআর সব গরীব মানুষেরা জেইলের বাইরে যেমন মর্যাদাহীন, জেইলের ভেতরে তেমনি অধিকতর মর্যাদাহীন বন্দী, পশুর মতো, দাসের মতো সারাদেশ আমাদের মুক্তির জন্যে চিন্তিত থাকবে, মুক্তি দাবী করে এটা-সেটা করবে, আর এদের মুক্তির কথা কেউ কোনোদিন বলবে না জেইলখানা থাকলে তাতে গরীব মানুষেরা আর ভিন্নমতের ভিন্নশক্তির লোকেরা তো বন্দী থাকবেই৬৪টা জেলা শহর থাকবে, আর ৬৪টা জেইলখানা থাকবে না! সাতটা বিভাগ থাকবে, সাতটা কেন্দ্রীয় কারাগার থাকবে না? এই হচ্ছে আমাদের মাথার মধ্যকার 'স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক' ধারণাগুচ্ছ পরিবার রাষ্ট্র ইস্কুল-কলেজ সাহিত্য-শাস্ত্র ধর্ম-শাস্ত্র আর সাংবাদিকতা-শাস্ত্রের মাধ্যমে কতোদিনের প্রশিক্ষণের ফল এইসব 'স্বাভাবিক-প্রাকৃতিক' ধারণা তা আমাদের ভেবে দেখার সময় কোথায়ফলে ডিভিশনের প্রথম শ্রেণীর বন্দীদের কাছে একদিন দুপুরে মর্যাদাহীন এক বন্দী এসে লুকিয়ে-লুকিয়ে একটু ভাত খেতে চাইবে, বাবু-জমাদার কিংবা ম্যাট-পাহারারা যেনো দেখে না-ফেলে, এটাই তো স্বাভাবিক তারপর একদিন আমরা মুক্তি পেয়ে চলে যাবো আর জেইলখানা যেমন ছিলো, তেমনই থেকে যাবে, এটাই তো স্বাভাবিক। স্বাভাবিকতার এই স্বর্ণচিন্তার শৃঙ্খলই কারাগার নামক আদর্শ দাসত্ব মহাগ্রামের আসল নিরাপত্তা

(রচনাটি লেখকের প্রকাশিতব্য 'কারাগার স্বাধীনতা সৃজনশীলতা' গ্রন্থের একটি অংশ।)

আপলৌডঃ ১৯ এপ্রিল, ২০০৮

অন্যান্য কলাম 8

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.