London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি সমস্যা ও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন

মঙ্গল কুমার চাকমা

গত ৩১ মার্চ বিশিষ্ট নাগরিকদের উদ্যোগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত 'পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা ও সমাধানের উপায়' শীর্ষক আলোচনা সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন পুনর্গঠন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করা হবে বলে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের খাদ্য উপদেষ্টা এএমএম শওকত আলী বলেছেন২০০১ সালে প্রণীত ভূমি কমিশন আইনের বিতর্কিত (পার্বত্য চুক্তির সাথে বিরোধাত্মক) ধারাসমূহের সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হবে বলেও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী রাজা দেবাশীষ বলেছেনউপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর বক্তব্য যদি সত্যিই কার্যে পরিণত হয়েছে, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার একটা বড়ো দিক সমাধানের পথে এগিয়ে যাবে বলে আশা করা যায়গত ২৭ মার্চ রাঙ্গামাটিতে জনপ্রতিনিধি, সরকারী কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময় সভায় প্রধান উপদেষ্টাও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানিয়েছেনসামপ্রতিক এসব ইঙ্গিত নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক বলা যায়

বলাবাহুল্য, ভূ-প্রাকৃতিকগতভাবে বাংলাদেশের অপরাপর পলিমাটিযুক্ত সমতল জেলাগুলো থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির গঠনে ও ধরণে বিস্তর তফাৎ রয়েছেপার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা দুর্গম পাহাড় ও উঁচু ভূমি নিয়ে গঠিত, যা মূল্যবান বনজ বৃক্ষ ও বন্য প্রাণীতে ভরপুরপার্বত্য চট্টগ্রাম মোট ভূমির ৬৬% এলাকা বন এবং সমগ্র বাংলাদেশের মোট বন ভূমির ৫০% এর অধিক বনভূমি পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থিতভূ-প্রকৃতিক বৈশিষ্ট্যের মতো এ-অঞ্চলের অধিবাসীগণের বৈশিষ্ট্য ও বাংলাদেশের অপরাপর অঞ্চল থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বতন্ত্র  সত্তার অধিকারীএ-অঞ্চলের অধিবাসীগণের জাতিগত বৈশিষ্ট্য ও তাদের জীবনধারা বাংলাদেশের অপরাপর অঞ্চলের জনগোষ্ঠী থেকে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমানএ-অঞ্চলে বিভিন্ন ভাষাভাষী ১১টি আদিবাসী জাতিসত্তা যুগ-যুগ ধরে স্বতন্ত্র অর্থনীতি, রাজনীতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি, শাসনব্যবস্থা নিয়ে এ-অঞ্চলে বসবাস করে আসছেএকদা এ-অঞ্চলে কেবলমাত্র আদিবাসী জনগণের বসবাস থাকলেও নানা রাজনীতির উত্থান-পতনের প্রেক্ষাপটে এবং শাসক-শোষক গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের কারণে বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ৫০% নেমে এসেছে এবং এ-সংখ্যা সমগ্র বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী জনসংখ্যার প্রায় ৫০%যুগ-যুগ ধরে বিভিন্ন ভাষাভাষী এ-আদিবাসী জনগণ নিজেদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ ও সোহাদ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করে আসছে এবং নিজস্ব ধাঁচের জীবন-জীবিকা তথা অর্থনীতি কোনো হুমকি ছাড়াই লালন পালন করে আসছে কিন্তু বিগত শতাব্দীর শেষ কয়েক দশক থেকে আদিবাসী জনগণের নিজস্ব অর্থনীতি ও জীবন-জীবিকার উপর নানা চ্যালেইঞ্জ এসে ধাক্কা দিয়েছে

যদিও পার্বত্য চট্রগ্রামের আয়তন সমগ্র বাংলাদেশের এক-দশমাংশ কিন্তু নিবিড় চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ অত্যন্ত কম১৯৬৪-৬৬ সনে কানাডার ফরেষ্টল ফরেষ্ট্রি ান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্টারন্যাশন্যাল লিমিটেডের ভূমি জরিপ রিপৌর্ট অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের চাষযোগ্য ধান্য জমির (এ শ্রেণীভূক্ত) পরিমাণ মাত্র ৩.১% তথা ৭৬,৪৬৬ একরপার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংখ্যা যদি সরকারী উদ্যোগে বসতি প্রদানকারী রাজনৈতিক অভিবাসীদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র আদিবাসী জুম্ম ও পুরোনবস্তি স্থায়ী বাঙ্গালী মিলে একত্রে ৯ লক্ষ স্থায়ী অধিবাসী ধরা হয়, তাহলে তাদের মধ্যে মাথাপিছু ধান্য জমির পরিমাণ দাঁড়ায় মাত্র ০.০৮ একর এছাড়া এর সাথে বি শ্রেণীভূক্ত ঢালু জমিগুলো (মোট ৬৭,৮৭১ একর) যদি একত্র করলে মোট ভূমির পরিমাণ দাড়াঁয় ১৪৪,৩৩৭ একর যা ৯ লক্ষ লোকের মাথাপিছু জমির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ০.১৬ একর (ধানী ও ঢালু জমি মিলে)অথচ সমগ্র বাংলাদেশেও মাথাপিছু জমির পরিমাণ ০.২০ একরঅপরদিকে এই দুই প্রকার জমির সাথে যথাক্রমে আরো উদ্যান চাষোপযোগী 'সি' শ্রেণীভূক্ত জমি (মোট ৩,৬৬,৬২২ একর) ও বন বাগান উপযোগী 'সি'-'ডি' শ্রেণীভূক্ত জমি (মোট ৩২,০২৮ একর) একত্রে ধরা হয়, তাহলে জমির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৫৪২,৯৮৩ একর এবং ৯ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে প্রতি পরিবারে ৫ জন জনসংখ্যা হিসেবে মোট ১৮০,০০০ পরিবারের পরিবার পিছু জমি পড়ছে ৩.০ একর (পাহাড় ও ধান্য জমি মিলে), যা একটি পরিবারের ভরণ-পোষনের জন্য মোটেই পর্যাপ্ত নয়সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামে মাথাপিছু জমির পরিমাণ অত্যন্ত বেশি এটি সত্য নয়অধিকন্তু,পার্বত্য চট্টগ্রামের জমি দেশের সমতল জমির মতো উর্বর ও বহু ফসলী নয়

পার্বত্য চট্টগ্রামে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ এমনিতেই অত্যন্ত কমঅধিকন্তু ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মিত হওয়ার ফলে প্রথম শ্রেণী আবাদী জমির ৪০ শতাংশ (৫৪ হাজার একর জমি) পানিতে তলিয়ে যায়আবাদী জমির স্বল্পতার কারণে পুনর্বাসিত করা সম্ভব হয়নি ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারসমূহকেফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজ করছে শতো-শতো ভূমিহীন পরিবারকিন্তু সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচুর আবাদযোগ্য জমি রয়েছে এই প্রতারণামূলক অজুহাত দেখিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ১৯৭৯ সাল থেকে দেশের সমতল জেলাগুলো হতে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে আসে চার লক্ষাধিক বহিরাগত লোক এবং তাদেরকে বসতি দেয়া হয় জুম্মদের ভোগ দখলীয় ও রেকর্ডীয় জমির উপর পাশাপাশি সেটেলাররা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদতে বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও নাশকতামূলক তৎপরতার মাধ্যমে জুম্মদেরকে উচ্ছেদ করে তাদের জমিগুলো বেদখল করে নেয় পাইকারীভাবেতাই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় একটি জলন্ত অগ্নিকুন্ডপার্বত্য চট্টগ্রামের এই মৌলিক সমস্যাকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুসারে সমাধানের লক্ষ্যে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি ভূমি কমিশন গঠন করার বিধান করা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে

বিগত সরকার ভূমি কমিশন গঠনের জন্য কিছু লোক দেখানো উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকেসরকার প্রথমে ৩ জুন ১৯৯৯ সনে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরীকে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ-দান করে কিন্তু তিনি কার্যভার গ্রহণের আগে ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৯ মৃত্যুবরণ করেনঅতঃপর সরকার ৫ এপ্রিল ২০০০ আরেক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আব্দুল করিমকে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেতিনি ১২ জুন ২০০০ কার্যভার গ্রহণের পর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় একবার ঘুরে যানতারপর তিনিও শারিরীক অসুস্থতার কারণে চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেনএরপর তা রয়ে যায় ঝুলন্ত অবস্থায় ভূমি কমিশনের সচিব হিসেবে একজন সরকারী কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া হলেও অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ প্রদান এবং কমিশনের জন্য কার্যালয় স্থাপন করা ইত্যাদি বিষয়ও রয়ে যায় অবাস্তবায়িতবিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারী ক্ষমতায় আসার পর ২৯ নভেম্বর ২০০১ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মাহমুদুর রহমান নামে জনৈক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে থাকে

ভুমি কমিশন কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির কাজ শুরু করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরী কাজ ছিলো পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক ভূমি কমিশনের একটি আইন প্রণয়ন করা আওয়ামী লীগ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর পৌনে চার বছরের মেয়াদকালে এ-আইন প্রণয়নে গড়িমসি করে থাকে নানাভাবেঅবশেষে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়ার একদিন আগে ১২ জুলাই ২০০১ চুক্তির সাথে বিরোধাত্মকভাবে সে-আইন প্রণয়ন করে যায় অত্যন্ত সঙ্গোপনে আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদসমূহ থেকে কোনো মতামত না নিয়েইঅথচ পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১৯৯৮ এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮ অনুসারে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে কোনো আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করলে আঞ্চলিক পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে এবং আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শ বিবেচনাক্রমে আইন প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিধান রয়েছেএ-আইনে রয়ে যায় চুক্তির সাথে অনেক বিরোধাত্মক বিষয়, যা চুক্তি ও জুম্ম জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির 'ঘ' খন্ডের ৪নং ধারা উল্লেখ আছে যে, 'জায়গা-জমি বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিশন (ল্যান্ড কমিশন) গঠিত হইবে পুনর্বাসির্ত শরণার্থীদের জমি-জমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও এযাবৎ যেইসব জায়গা-জমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হইয়াছে, সেই সমস্ত জমি ও পাহাড়ের মালিকানা স্বত্ব বাতিলকরণের পূর্ণ ক্ষমতা এই কমিশনের থাকিবেএই কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধ কোনো আপিল চলিবে না এবং এই কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া বিবেচিত হইবেফ্রীঞ্জল্যান্ড (জলেভাসা জমি) এর ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য হইবে।' চুক্তির ৫নং ধারায় সংশ্লিষ্ট সার্কেল চীফ, আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান বা তাঁর প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং বিভাগীয় কমিশনার বা তাঁর প্রতিনিধির  সমন্বয়ে কমিশন গঠনের বিধান রয়েছেকমিশনের মেয়াদ তিন বছর হবে তবে আঞ্চলিক পরিষদের সাথে পরামর্শ করে কমিশনের মেয়াদ বৃদ্ধি করা যাবে বলে উল্লেখ রয়েছে 'পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুয়ায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করিবেন' বলে চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছেকিন্তু চুক্তির উল্লেখিত ধারাসমূহের সাথে ২০০১ সালে প্রণীত ভূমি কমিশন আইনের অনেক বিরোধাত্মক বিষয় রয়েছে, যা ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে জটিলতর পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারেবিরোধাত্মক ধারার উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় আলোচনা করা যাক

কমিশনরে কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে আইনের ৭(৫) ধারায় বলা হয়েছে যে, 'চেয়ারম্যান উপস্থিত অন্যান্য সদস্যদের সহিত আলোচনার ভিত্তিতে ধারা ৬(১) ও বর্ণিত বিষয়াদি-সহ উহার এখতিয়ারভূক্ত অন্যান্য বিষয়ে সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবেন, তবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব না হইলে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলিয়া গণ্য হইবে।' এ-বিধান বলে কমিশনের অন্যান্য সদস্যদেরকে রাবার ষ্টাম্পে পরিণত করা হয়েছেপক্ষান্তরে চেয়ারম্যানের হাতে স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে

প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ এর ২(চ) ধারাতে 'পুনর্বাসিত শরণার্থী' অর্থ বলা হয়েছে যে, '৯ই মার্চ ১৯৯৭ইং তারিখে ভারতের আগরতলায় সরকারের সাথে উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের সম্পাদিত চুক্তির আওতায় তালিকাভূক্ত শরণার্থী।' এ-বিধান দ্বারা কেবলমাত্র ২০ দফা প্যাকেজ চুক্তি মোতাবেক ফিরে আসা শরণার্থীদের ভূমি বিরোধগুলো নিষ্পত্তির আওতায় পড়বে১৯৯২ সালে সরকার ও শরণার্থী নেতৃবৃন্দের মধ্যে সম্পাদিত ১৬ দফা চুক্তির আওতায় ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীদের ভূমি বিরোধগুলো নিষ্পত্তির আওতায় পড়বে নাফলে তাদের ভূমি বিরোধগুলো অমীমাংসিতই থেকে যাবে

চুক্তিতে ভারত প্রত্যাগত পাহাড়ী শরণার্থীদের জমিজমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও এযাবৎ যে-সব জায়গা-জমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হয়েছে, সে-সমস্ত ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান করা হলেও আইনের ৬নং ধারায় কমিশনের কার্যাবলীতে (১)(ক) উপ-ধারাতে কেবলমাত্র 'পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি বিরোধ' নিষ্পত্তির বিধান করা হয়েছে ফলে ২০ দফা চুক্তি মোতাবেক প্রত্যাগত শরণার্থী ব্যতীত পার্বত্য চট্টগ্রামের আভ্যন্তরীণ পাহাড়ী উদ্বাস্তুদের জমি বিরোধ-সহ অন্যান্য সকল ভূমি বিরোধ অনিষ্পত্তিই থেকে যাবেআভ্যন্তরীণভাবে উদ্বাস্তু পাহাড়ী পরিবারের সংখ্যা এক লক্ষাধিকতাদের অধিকাংশের জমি সেটেলারদের বেদখলেতাদের জমিগুলো যদি ফেরৎ না পায় কিংবা ভূমি বিরোধগুলো যদি নিষ্পত্তি না হয়, তাহলে ল্যান্ড কমিশনের কার্যাক্রম হয়ে পড়বে অন্তসারশূণ্য

চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত 'আইন, রীতি ও পদ্ধতি' অনুযায়ী ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিকরণের বিধান থাকলেও আইনের ৬(১)(খ) ধারায় কেবলমাত্র 'আইন ও রীতি'র উল্লেখ করা হয়েছে এছাড়া চুক্তিতে 'ফ্রিঞ্জল্যান্ডের (জলেভাসা জমির) বিরোধগুলোর ক্ষেত্রেও কমিশন নিষ্পত্তি করবে বলে উল্লেখ রয়েছে কিন্তু প্রণীত কমিশন আইনে জলেভাসা জমির কথা কোথাও উল্লেখ করা হয়নিঅথচ কাপ্তাই হ্রদের শতো-শতো পরিবারের জমি এখন সেটেলারদের দখলেএ-জমিগুলো বংশ পরম্পরায় পাহাড়ীরা চাষাবাদ করে আসছিলো

কমিশনের সচিব ও অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনের ১৩(১)(২) ধারাতে চুক্তির 'পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সরকারী, আধা-সরকারী, পরিষদীয় ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরের কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মচারী পদে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামেনর স্থায়ী অধিবাসীদের নিয়োগ করা হইবে' এ-ধারা সংযোজন করা হয়নি

উল্লেখিত বিরোধাত্মক ধারাসহ ১৯ (ঊনিশ)টি সংশোধনী প্রস্তাব সম্বলিত সুপারিশমালা পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের তরফ থেকে স্মারক নং পাচআপ/২০০১/১১৩৯ তারিখ ২৩/৮/২০০১ মূলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা-সহ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণলায় এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিকট প্রেরণ করা হয়কিন্তু আজ অবধি এ- বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নিবিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মাহমুদুর রহমানকে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলেও সমস্যার কোনো মৌলিক অগ্রগতি সাধিত হয়নি

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি অত্যন্ত জরুরী একটি বিষয়এ-সমস্যা সমাধানে যতোই কালক্ষেপণ করা হবে, ততোই পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর হবেপার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি না হবার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি হচ্ছে এবং উদ্বেগজনক পর্যায়ে চলে যাচ্ছেঅপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি লঙ্ঘন করে সেটেলার-সহ বহিরাগতদের আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ ও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্তির ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছেএর ফলে ক্রমবর্ধমান হারে বহিরাগত অনুপ্রবেশ ঘটছে এবং তাদের দ্বারা ভূমি বেদখল অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে

তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির সাথে স্বৈরাচারী শাসনামলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিয়ে আসা সেটেলারদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে পুনর্বাসনের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িতএ-সব সেটেলাররা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রেরই শিকারতাদের দারিদ্র ও নদী ভাঙ্গনের ফলে ভাসমান জীবনের অসহায়ত্বকে ব্ল্যাকমেইল করে তৎকালীন স্বৈরশাসক নানা প্রলোভন দেখিয়ে সেনাবাহিনীর মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে আসে এ-ছিন্নমূল অসহায় মানুষদেরকে স্ব-স্ব জেলায় বা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন ব্যতীত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি সমস্যার প্রকৃত সমাধান কঠিন হবে

মঙ্গল কুমার চাকমাঃ লেখক ও আদিবাসী অধিকার কর্মী

আপলৌডঃ ১৪ এপ্রিল, ২০০৮

অন্যান্য কলাম 8

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.