|
বাংলাদেশে সেনা-সম্পাদক বৈঠক প্রসঙ্গে
আবদুল
গাফ্ফার চৌধুরী
[বাংলাদেশের
সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সাথে সে-দেশের সেনাপ্রধান সম্প্রতি
এক বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। লন্ডনে বসবাসরত কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাপারে সর্বদা
ওয়াকিবহাল প্রখ্যাত কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এ-প্রসঙ্গে একটি কলাম
লিখেছিলেন, যা বোধগম্য কারণেই বাংলাদেশের কোনো পত্রিকাই প্রকাশ করার দুঃসাহস করেনি।
সৌভাগ্যবশতঃ বৃটেইনে জরুরী আইন নেই বলে ইউকেবেঙ্গলির পক্ষে এটি প্রকাশ করা সম্ভব
হলো। - সম্পাদক]
সম্প্রতি ঢাকায়
বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমদ দেশের সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে এক
সৌজন্য সাক্ষাতকারে মিলিত হয়েছিলেন। সেনাপ্রধান হিসেবে চাকুরীর মেয়াদ আরও এক বছর
বেড়ে যাওয়ার পর সম্পাদকদের সঙ্গে তার এই বৈঠক তাৎপর্যহীন নয়। কোনো দেশের
সেনাপ্রধানই চাকুরীর মেয়াদ বাড়লে বা শেষ হলে সম্পাদক বা সিভিল সোসাইটীর কোনো অংশের
সঙ্গে সাধারণতঃ মিলিত হন না। এটা সার্ভিস রুলের মধ্যে পড়ে
না। ব্যতিক্রম নেই তা নয়। সেনাপ্রধান যেখানে পরোক্ষ বা
প্রত্যক্ষভাবে দেশ শাসনের সঙ্গে জড়িত, সেখানে তিনি সমাজের সিভিল অংশের সঙ্গেও
মর্জিমতো কথাবার্তা বলেন, নানা রকম প্রতিশ্রুতি ও নির্দেশ
দেন। যেমনটা করতেন তুরস্কের এক সময়কার সেনাপ্রধান কারমেল।
তিনি বেশ কিছুকাল ক্ষমতার নেপথ্যে থাকার পর মেন্দেরেসের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে
ক্ষমতা দখল করেছিলেন।
বাংলাদেশে তেমনটা
হয়েছে বা হবে এমন আশঙ্কা কেউ করেন কি? মনে হয় মূলতঃ জনমন থেকে এ-আশঙ্কাটা
দূর করার জন্যই জেনারেল মইন সম্পাদকদের সাথে বৈঠকে বসেছিলেন। বৈঠকে তিনি অবশ্য
বলেছেন, তিনি এ-বৈঠক করার জন্য সরকারের প্রধান উপদেষ্টার অনুমতি নিয়েছেন। এর আগে
তিনি যখন আরেক বার সম্পাদকদের সাথে বৈঠকে বসেছিলেন, তখনও বলেছিলেন, তিনি প্রধান
উপদেষ্টার অনুমতি নিয়ে বৈঠক করছেন। আমি তখন অনির্বাচিত এবং সেনা-সমর্থিত সরকার বলে
পরিচিত একটি সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছ থেকে সেনাপ্রধানকে অনুমতি নিতে হয় জেনে
খুশি হয়েছিলাম। সন্দেহপ্রবণ লোকদের বলেছি, তোমরা অযথা সন্দেহ পোষণ করো না।
সেবার সেনাপ্রধানের
সঙ্গে বৈঠকটির আয়োজন করেছিলেন প্রধান সাংবাদিক এবিএম মূসা। তার নেপথ্যে নাকি ছিলেন
ডেইলী স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। সেবারে বেঠকে নিউজপ্রিন্টের উপর শুল্ক
বৃদ্ধির সমস্যা থেকে শুরু করে যে-সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সে-সব বিষয় নিয়ে
সম্পাদকদের আলোচনা করার কথা প্রধান উপদেষ্টা ডঃ ফখরুদ্দীন আহমদের সঙ্গে। তার সঙ্গে
বৈঠক না করে কেনো সেনাপ্রধানের কাছে ছুটেছিলেন, সে-রহস্যটি কোনো সম্পাদকই পরবর্তীকালে
খোলাসা করেননি।
এবারের বৈঠকের
পেছনের প্রধান উদ্যোগটি নাকি ছিলো কারাবন্দি ব্যাবসায়ী সালমান রহমানের পত্রিকা
ডেইলী ইন্ডিপেন্ডেন্টের সম্পাদক মাহবুব আলমের। তিনি আবার ইয়াজউদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক
সরকারের তথ্য উপদেষ্টা ছিলেন। ৭১ সাল থেকেই তিনি নানারকম ভূমিকার অধিকারী সাংবাদিক।
এবারে যে-সব বিষয় নিয়ে সেনাপ্রধানের সঙ্গে সম্পাদকদের আলাপ হয়েছে, তার অধিকাংশ বিষয়
নিয়েই আলোচনায় বসার দায়িত্ব প্রধান উপদেষ্টার। এ-কথা
সেনাপ্রধান তার বক্তব্যে অনেকটাই স্পষ্ট করে দিয়েছেন। বলেছেন 'সেনাবাহিনী শাসন
ক্ষমতায় নেই। শাসন ক্ষমতা উপদেষ্টা সরকারের হাতে। তারাই সকল ব্যাপারে সিদ্ধান্ত
নেন। সেনাবাহিনী তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহায়তা দিয়েই খালাস।' এ-যখন অবস্থা,
তখন দেশের একজন সম্পাদক কেনো প্রধান উপদেষ্টার বদলে সেনাপ্রধানের সাথে বৈঠক করার
উদ্যোগ নেন এবং তাতে দু-দু'বার সেনাপ্রধানের আমন্ত্রণে সম্পাদকেরা ছুটে যেতে
উৎসাহিত হন, সেটাও এক প্রশ্ন।
সবচাইতে বড়ো কথা,
বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা যদি দেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর মতো সকল ক্ষমতার
অধিকারী হয়ে থাকেন, তাহলে নির্বাচন অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে দেশের সকল সমস্যা
সম্পর্কে সরকারী চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত নিয়ে সম্পাদকদের সঙ্গে কথা বলার প্রধান ও
প্রথম দায়িত্ব তো তারই। এক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা কেনো দু-দু'বার নিজের দায়িত্ব
এড়িয়ে সেনাপ্রধানকে সে-দায়িত্ব বহনের জন্য সামনে এগিয়ে দিলেন? দেশের মানুষকে ভাতের
বদলে আলু খাওয়ানোর পরামর্শ অর্থাৎ দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মতো
সিদ্ধান্তমূলক পরামর্শ দেয়ার এখতিয়ারও কোনো দেশের সেনাপ্রধানের নেই। বাংলাদেশের
প্রধান উপদেষ্টার মুখ থেকেই একথাটা বের হলে তার অর্থ বুঝা যেতো। সেনাপ্রধান
আগবাড়িয়ে কথাটা বলায় তার অর্থ জনসাধারণ কীভাবে নেবে? (চলবে...)
সেনাপ্রধানের চাকরির মেয়াদ-যে এক বছর বেড়ে গেলো, তাতে আমি খুশি। এজন্যে তাকে
অভিনন্দনও জানাই। কিন্তু তার চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর সরকারী বিজ্ঞপ্তিতে 'জনস্বার্থে'
তার অবসর গ্রহণের মেয়াদ বাড়ানোর কথা বলাতে একটু বিস্মিত হয়েছি। বিশ্বের যে-কোনো
সেনাপ্রধান চাকরির মেয়াদ তখনই বাড়ে, ক্ষমতাসীন সরকার যখন তার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে
আরও কিছুকাল সেনাবাহিনী পরিচালনায় প্রয়োজনীয় মনে করেন। 'জনস্বার্থ' কথাটির ব্যবহার
কস্মিনকালেও কখনও দেখিনি।
ভারতের
সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল অরোরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে (বাংলাদেশের
মুক্তিযুদ্ধে) অসীম নৈপুন্যের পরিচয় দেবার পর অনেকেই মনে করেছিলেন, ইন্দিরা গান্ধীর
সরকার তাকে চাকরিতে এক্সটেনশন দেবেন। তার চাকরির মেয়াদ একদিনও বাড়ানো হয়নি।
বাংলাদেশে জেনারেল মইনের চাকরির মেয়াদ কী-ধরণের 'জনস্বার্থে' বাড়ানো হলো, তা আমি
জানি না। সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠকে জেনারেল মইন বলেছেন, তিনি এ-ব্যাপারে কোনো তদবির
করেননি, অর্থাৎ কোনো প্রভাব খাটাননি। তাহলে বর্তমান উপদেষ্টা সরকারই কি বর্তমান
সেনাপ্রধানের প্রতি কৃতজ্ঞতা বশতঃ তার চাকরির মেয়াদ বাড়িয়েছেন এবং 'জনস্বার্থে' তার
মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে বলে দেশবাসীকে জানাচ্ছেন? এ-সিদ্ধান্তটি যদি উপদেষ্টা সরকার
নিজেই গ্রহণ করে থাকে, তাহলে প্রধান উপদেষ্টা নিজেই সিদ্ধান্তটি সম্পাদকদের কাছে
ব্যাখ্যা করলে হয়তো প্রমাণ করা যেতো সেনাবাহিনীর প্রধান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের
ক্ষমতাও সত্য-সত্যই এ-সরকারের আছে এবং সেনাবাহিনী বা সেনাকম্যান্ড নিজেরাই
এ-সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেনি।
বর্তমান
উপদেষ্টা সরকার ক্ষমতায় আছেন প্রায় ষোলো মাস হতে চললো। এ-ষোলো মাসে এ-সরকারের
ক্ষমতা, উদ্দেশ্য, দক্ষতা ও যোগ্যতা সম্পর্কে নানা সন্দেহ জন্ম নিয়েছে। নির্বাচন
কবে এবং কীভাবে হবে, আদৌ হবে কি-না, বাংলাদেশে এভাবে মাসের পর মাস জরুরী আইন বহাল
রেখে দেশটার নাম গিনিস বুক অফ রেকর্ডস-এ তোলা হবে কি-না, বর্তমান সরকার ও সামরিক
বাহিনীর মধ্যে আসল সম্পর্কটা কী, বর্তমান সরকারের সকল ব্যর্থতার দায়িত্বের ভাগ
সামরিক বাহিনী গ্রহণ করবে কি-না এবং সত্য-সত্যই বর্তমান সরকার তাদের ভার বহনে
অনিচ্ছুক জাতির কাঁধ থেকে অবতরণ করবেন কি-না, এসব প্রশ্নই খাদ্যমূল্যে পীড়িত দেশের
অসহায় মানুষের মনে ধিকি-ধিকি জ্বলছে। জনগণের মনের এ-ক্রমবর্ধিষ্ণু ক্ষোভ ও জিজ্ঞাসা
সম্পর্কে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও সেনাপ্রধান-যে সচেতন, তার প্রমাণ পাওয়া যায়
মাঝে-মাঝেই নির্বাচন ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে এবং ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই
বর্তমান সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পর্কে দু'জনেরই আশ্বাসবাক্য উচ্চরণে।
জনসাধারণের মনে সরকারের উদ্দেশ্যে সম্পর্কে সন্দেহ ও অনাস্থা দেখা না দিলে সরকার
প্রধান ও সেনাপ্রধান-যে বারবার একই আশ্বাসবাণী উচ্চারণ করতেন না, তাও স্পষ্টভাবেই
বুঝা যায়। সম্পদকদের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকেও সেনাপ্রধান ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে
নির্বাচন-যে অনুষ্ঠিত হবেই, তার উপর জোর দিয়েছেন।
শুধু
প্রতিশ্রুত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পর্কে নয়, দেশে নতুন চেহারায় দূর্নীতি ও
সন্ত্রাসের পুনরাবির্ভাব, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের নিদারুণ ব্যর্থতা, দুই
নেত্রীর বিচারে দণ্ডলাভের আগেই তাদের অবৈধভাবে আটকে রাখা এবং তাদের সঙ্গে
প্রকাশ্যেই নানা ধরণের রাজনৈতিক দরকষাকষি, ভারত থেকে কয়েকজন সাবেক জেনারেলকে আনা ও
কয়েটি ঘোড়া আমদানির কূটনীতিতে সাফল্য ছাড়া চাল আমাদানিতে কার্যতঃ ব্যর্থতা, ইত্যাদি
নানা প্রশ্নে জনমন আজ আলোড়িত। প্রধান উপদেষ্টার উচিত এ-ব্যাপারে জনমনের অস্বস্তি,
সংশয় ও ক্ষোভ দূর করার জন্য সংযোগ বৃদ্ধি করা এবং দেশে পার্লামেন্টের অনুপস্থিতিতে
সংবাদপত্র-সম্পাদক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘন-ঘন বৈঠকে বসে দেশের সঙ্কট ও সমস্যা
সমাধানে সরকারের নির্দিষ্ট ও ইতিবাচক কোনো কর্মসূচি থাকলে, তা তাদের কাছে ব্যাখ্যা
করা।
দেশের সকল
স্তরের মানুষের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর বদলে কেবল বিভিন্ন সরকারী অনুষ্ঠানে গিয়ে
লালফিতা কাটা বা জনগণকে নানা হিতোপদেশ শোনালে কোনো কাজ হবে না। সম্পাদক,
বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিকদের সঙ্গে দেশের সমস্যা সম্পর্কে ঘন-ঘন
আলাপ-আলোচনায় না বসে এবং তাদের পরামর্শ না নিয়ে, কেবল রহস্যাবৃত নির্বাচনী
রৌডম্যাপের কথা বলা হলেই এ-সরকার দেশের কোনো সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। ষোলো
মাসে তারা যা পারেনি, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আটমাসে তারা তা পারবে, তা বিশ্বাস
করার কোনো সঙ্গত কারণ নেই।
আমি ডঃ
ফখরুদ্দিন আহমদের একান্ত শুভাকাঙ্খী বলেই তাকে এ-কথাটা বলছি যে, ইতিহাস তাকে
সম্পূর্ণ অভাবনীয় ও বিরাট একটা সুযোগ এনে দিয়েছিলো। বিশ্বব্যাঙ্কের একজন অখ্যাত
কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের অসংখ্য সাবেক গভর্নরদের একজন হিসেবে যার অবসর
জীবনের বিস্মৃতিতে চলে যাওয়ার কথা, তাকে প্রাচীন কালের বাংলায় হাতীর মতো ইতিহাস
যেনো শুঁড়ে তুলে রাজপথ থেকে একেবারে সিংহাসনে এনে বসিয়েছে। তার কাছে ইতিহাসের
সম্ভবতঃ প্রত্যাশা ছিলো, তিনি বাংলার হতদরিদ্র মানুষের সকল সমস্যার সমাধান হয়তো
করতে না পারেন, অন্ততঃ তাদের জীবনে তার সব উপদেষ্টাকে নিয়ে স্বস্তি ভাবটুকু এনে
দিতে পারবেন। জাতির সমানে এগুবার রাস্তা নির্মাণের মাটি কাটার কাজটুকু অন্ততঃ শুরু
করে যাবেন। যে-আলাদীনের দৈত্যকে তিনি তার সব অসম্ভব দায়িত্ব সম্ভব করার সহায়ক শক্তি
হিসেবে পেয়েছিলেন, তাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে কাজে লাগাবেন। সেই দৈত্যকেই কাঁধে
জাঁকিয়ে বসতে দেবেন না। তার হুকুম মেনে চলবেন না।
ইতিহাস ও
জাতির এ-প্রত্যাশাটুকু প্রধান উপদেষ্টা এবং তার মনোনীত(?) একজন সহকর্মীও পূরণ করতে
পারেননি। আমি আমার সাংবাদিক জীবনে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মতো আর একটাও
অনির্বাচিত সরকার দেখিনি, যারা জাতির এতোটা আস্থা, প্রত্যাশা ও সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায়
বসেছেন। আর সেই আস্থা, সমর্থন ও প্রত্যাশা যেনো ষোলো মাসের মধ্যেই কর্পুরের মতো উবে
গেলো। আর যে-রাজনীতিকদের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে আনা হয়েছে এবং যাদের ঘাড়ে দেশের সব
সঙ্কটের দোষ চাপানো চেষ্টা চলছে, তারাই দেশবাসীর কাছে আবার পরিত্রাতা হিসেবে সম্মান
ও সমর্থন লাভ করছেন এবং হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পাচ্ছেন। আজ না হয় কাল এ-রাজনীতিকদের
হাতেই বর্তমান ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে হবে। (চলবে)
বর্তমান উপদেষ্টা
পরিষদ যখন ক্ষমতা নেয় (মাঝখানে আবার পাঁচজনের মতো উপদেষ্টা বিদায় নিয়ে নতুন পাঁচজন
আসেন। এই রদবদলের সিদ্ধান্ত কি প্রধান উপদেষ্টার ছিলো?) তখন থেকেই আমার প্রত্যাশা
ছিলো, দেশে পার্লামেন্টের অনুপস্থিতি আপাততঃ পূরণ করবে স্বাধীন মিডিয়া। প্রতি মাসেই
এই মিডিয়া-সহ ক্রস-সেকশন পিওপলের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বৈঠকে বসবেন, দেশের নাড়ির
খবর জানবেন এবং সে-অনুযায়ী দেশ পরিচালনার রৌডম্যাপ তৈরী এবং অনুসরণ করবেন। অন্যের
দ্বারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে তৈরীকরা কোনো রৌডম্যাপ অনুসরণ করবেন না। কিন্তু বাস্তবে
দেখা গেলো, প্রথাগত সরকারী অনুষ্ঠানের বাইরে প্রধান উপদেষ্টার জনসংযোগ খুবই সীমিত।
গত ষোলো মাসে দেশের প্রকৃত জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিকদের সঙ্গে (একমাত্র ডঃ কামাল
হোসেন ছাড়া) তিনি কোনো বৈঠকে বসেননি। দেশের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা
মঞ্চে পাশাপাশি দাঁড়ানোর পরিবর্তে তিনি বিদেশে গিয়ে কারজাই ও মোশাররফের মতো দু'জন
মার্কিন পাপেটের সঙ্গে মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাত মিলিয়ে হাসি মুখে যে-ফোটৌ সেশন করেছেন,
তাতে দেশের এবং নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়নি।
লক্ষ্য করলে মনে
হবে, প্রধান উপদেষ্টার চাইতে সেনাপ্রধানের ভাবমূর্তি অনেক বেশি প্রখর। তিনি অনেক
বেশি দৃশ্যমান এবং তার জনসংযোগ বেশি। ষোলো মাসে তিনি দুবার জাতীয় সংবাদপত্রে
সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, সংবাদপত্র শিল্পের সমস্যা সমাধানে সহায়তার হাত
বাড়িয়েছেন। তিনি লন্ডনে ও নিউয়র্কে গিয়ে ব্যাপক জনসংযোগ করেছেন। যাদের উদ্যোগেই
হোক, 'জাগো বাংলাদেশ' নামে একটি সরকার-সমর্থক সংগঠন খাড়া করা হয়েছে এবং তারা বিদেশে
সেনাপ্রধানকে নাগরিক (অসামরিক) সংবর্ধনা জানাতে বিপুল আয়োজন ও অর্থব্যয় করেছেন।
তাদের আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলোতে সেনাপ্রধান প্রায় সরকার প্রধানের মতোই প্রবাসী সাধারণ
বাঙালীদের সাথে কথা বলেছেন এবং সরকারের নীতি নির্ধারণী অনেক বক্তব্য রেখেছেন।
সেনাপ্রধানের
বক্তব্য শুনে অনেক সময় আমারও ভ্রম হয়েছে যে, হয়তো দেশ পরিচালনা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত
গ্রহণ করছে সেনা কম্যান্ডই এবং উপদেষ্টা পরিষদ তা মেনে চলছেন মাত্র। উপদেষ্টা পরিষদ
তাদের স্বাধীন ইচ্ছায় সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং সেক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর ভূমিকা হচ্ছে
তা বাস্তবায়নে শুধু সাহায্য দান, এ-কথাটা আমার কখনও মনে হয়নি। আমার এ-ধারণাটা যদি
ভুল হয়ে থাকে, তাহলে আমার মনে ভুল ধারণা জন্মানোর জন্যেও দায়ী বর্তমান উপদেষ্টা
সরকার - বিশেষতঃ প্রধান উপদেষ্টার গত ষোলো মাসের ভূমিকাই।
সংবাদপত্রের
সম্পাদকদের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকেও সেনাপ্রধান জেনারেল মইন যে-সব কথা বলেছেন, তা
বলারও প্রধান দায়িত্ব প্রধান উপদেষ্টার। সেনাপ্রধানের
নয়। অথচ সেনাপ্রধানকেই দেশবাসীকে আশ্বাস দিয়ে বলতে হলো, আগামী ৩১ ডিসেম্বরের
মধ্যে-যে নির্বাচন হবে, সে-সম্পর্কে কেউ যেনো সন্দেহ পোষণ না করেন। তিনি দেশবাসীর
মনের ধারণা পাল্টানোর জন্য বলেছেন, সেনাবাহিনী কোনোভাবেই দেশ শাসনের সঙ্গে জড়িত নয়
এবং ক্ষমতা গ্রহণের কোনো অভিলাষ তাদের নেই। উপদেষ্টা সরকারই স্বাধীনভাবে সরকার
পরিচালনায় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সেনাবাহিনী তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহায়তা দিচ্ছে
মাত্র। তিনি জোরের সঙ্গে বলেছেন, 'দেশের সিভিল সমাজকে সামরিকীকরণের কোনো ইচ্ছা
সামরিক বাহিনীর নেই এবং তারা সে-চেষ্টা করছেন না।
উপদেষ্টা সরকারের
প্রধানেরই উচিত ছিলো জাতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদকদের ডেকে অথবা বেতার ও টেলিভিশনে
একটি নীতি নির্ধারণী ভাষণ দিয়ে দেশবাসীর মনের এ-সন্দেহ দূর করা। সেনাপ্রধান হিসেবে
জেনারেল মইনের চাকরির মেয়াদ-যে বাড়বে, বাজারে সে-গুজব বহুদিন যাবত ছিলো। আগামী জুন
মাসে তার চাকরির মেয়াদ শেষ বহু আগেই তার সেই মেয়াদ বেড়ে যাওয়ার গুজব সত্য হওয়ায়
সংশ্লিষ্ট আরও অনেক গুজব সত্য হতে যাচ্ছে বলে অনেকেরই মনে ধারণা জন্মাতে পারে। আর
এসব গুজবের পালে হাওয়া লাগানোর জন্য দুটি কি তিনটি হলুদ সাংবাদিকতার পত্রিকাতো এই
জরুরী অবস্থার মধ্যেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে খবর ছেপে চলেছে। এ-ধরণের খবরের মধ্যে একটি
খবর ছিলো, বর্তমান সেনাপ্রধান জুন মাসে তার চাকরির মেয়াদ শেষ হলে হয়তো রাষ্ট্রপতির
দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
জেনারেল মইন বহু
আগেই এ-সম্ভাবনাটি নাকচ করে দিয়েছেন। বলেছেন, সামরিক বাহিনীর যেমন ক্ষমতা গ্রহণের
ইচ্ছে নেই, তেমনি তার রাষ্ট্রপতি হবারও খায়েশ নেই। তিনি রাষ্ট্রপতি হতে চাইলে ওয়ান
ইলেভেনেই হতে পারতেন। কথাটা সত্য। সন্দেহবাদীরা বলেছেন, তিনি-যে তখন রাষ্ট্রপতি
হননি, সেটা তার মহানুভবতা নয়, তার স্ট্রাটেজী। সন্দেহবাদীদের মনের এ-সন্দেহ দূর
করার জন্যেই বর্তমান উপদেষ্টা সরকারের উচিত ছিলো তাদের তরফ থেকে সেনাপ্রধানের
চাকরির মেয়াদ বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গেই সংশিষ্ট অন্যান্য গুজবগুলো-যে সত্য নয়, তা দেশের
মানুষকে জানানো এবং বঙ্গবভনে কোনো রদবলের ব্যাপারে এ-মূহুর্তে তাদের যে-কোনো ইচ্ছা
বা পরিকল্পনা নেই, বা এ-ব্যাপারে তাদের হাতেই সিদ্ধান্ত
গ্রহণের ক্ষমতা, তাও দেশবাসীকে জানিয়ে দেয়া। সেনাপ্রধান তার চাকরির মেয়াদ বাড়ার
সঙ্গে-সঙ্গে জাতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদকদের ডেকে এনে এসব কথা বললে এসব কথার অন্য
অর্থ দাঁড়াতে পারে।
যাহোক, সম্পাদকদের
সাথে বৈঠকে সেনাপ্রধান তিনটি কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলে অনেকের কাছেই প্রশংসার্হ
হয়েছেন। তিনি বলেছেন, (ক) সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় আসতে চায় না এবং ক্ষমতা নেবে না,
(খ) দেশ ও সরকার পরিচালনায় সকল সিদ্ধান্তই বর্তমান উপদেষ্টা সরকার নিচ্ছেন এবং
সামরিক বাহিনী সরকারকে সমর্থন ও সহায়তা দিচ্ছে মাত্র এবং (গ) সিভিল সমাজের সকল
স্তরকে সামরিকীকরণের কোনো ইচ্ছা সেনা-কর্মকর্তাদের নেই। আমার মনে হয়, সেনাপ্রধানের
এ-কথাগুলো জাতিকে আরও আশ্বস্ত করবে, যদি আরও একটু স্পষ্টভাবে বিশ্লেষিত হয় এবং
উপদেষ্টা সরকারের প্রধানই সেই বিশ্লেষণ অথবা ব্যাখ্যাটা জাতির সামনে তুলে ধরেন।
প্রথম কথা, বর্তমান
সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই বলা হচ্ছে, এটা সেনা-সমর্থিত সরকার। কথাটা খুবই
অস্পষ্ট। দেশের যেকোনো বৈধ ও নির্বাচিত সরকারকেই সমর্থন দান সেনাবাহিনীর সাংবিধানিক
ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। সেদিক থেকে বর্তমান সরকারকে সরাসরি ক্ষমতায় বসানোর কাজে
সাহায্য করার দরুণ বলা যেতে পারে এই সরকার সেনা-মনোনীত সরকার এবং জনসমর্থনের চাইতেও
সেনাসমর্থনের উপরই তাদের অস্তিত্ব টিকে আছে। এ-জন্যেই কোনো-কোনো মহলে প্রশ্ন উঠেছে,
এই সরকারের মনোনয়নকারী এবং মনোনয়নগ্রহণকারী দু'পক্ষের মধ্যে দেশ পরিচালনার ব্যাপারে
ক্ষমতার প্রকাশ্য অথবা অপ্রকাশ্য কোনো ভাগাভাগি আছে কি-না এবং দেশের বর্তমান শাসন
দ্বৈত শাসন (ডুয়েল এডমিনস্ট্রেশন)
কি-না!
প্রশ্নটি
বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় উচ্চারিত না হলেও বিদেশের পত্রপত্রিকায় উচ্চারিত হচ্ছে।
নিউ ইয়র্কের একটি বহুল প্রচারিত সাপ্তাহিক 'বাংলা পত্রিকা'র সাম্প্রতিক সংখ্যায়
'মন্তব্য প্রতিবেদনে' বলা হয়েছে, 'সরকার [প্রধান] হিসেবে ডঃ ফখরুদ্দীন এবং তার
সঙ্গীদের নাম প্রচার করা হলেও, সবাই জানেন দেশ চালাচ্ছে এখন আর্মী। জেনারেল মইন
সরকারের মূল পরিচালক, রিটায়ার্ড আরেক জেনারেল দুদক চালাচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় আরেক অবঃ জেনারেলের হাতে। বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বিডিআর,
যৌথবাহিনী, টাস্কফৌর্স, ইত্যাদির। রাজনীতি, আইন ও আদালতও তাদের ইঙ্গিতে পরিচালিত।
কারা-ফটকের দুই চাবিও দুই আর্মী অফিসারের হাতে। সুতরাং দেশে কার্যতঃ কাদের শাসন
চলছে, তা কাউকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে না' (প্রতিবেদক সাঈদ তারেক, বাংলা
পত্রিকা, নিউ ইয়র্ক, ২৯ চৈত্র, ১৪১৪)।
একটি বিদেশী
সংস্থার জরীপে দেখা যায়, বাংলাদেশের শুধু লিভিল প্রশাসন নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য,
ব্যাঙ্ক, বীমা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও আর্মীর এক ধরণের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত
হয়েছে। এরশাদের আমলে কূটনৈতিক সার্ভিসও অবঃ সেনাকর্তাদের দ্বারা এমনভাবে গড়ে তোলা
হয়েছিলো যে, বিদেশে বাংলাদেশের অনেক দূতাবাসকেই বলা হতো মিনি
ক্যান্টনমেন্ট।
বাংলাদেশের আর্মীর প্রাকৃতিক
দূর্যোগে ত্রাণকার্য পরিচালনায় সুনাম আছে। গত প্রলয়ঙ্করী
ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময়ে এ-ত্রাণকার্যে সেনাবাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণ সকলে আশা করেছিলো
এবং তারা অংশগ্রহণ করেছেনও।
কিন্তু তখনই
পত্রিকায় অভিযোগ উঠেছিলো, দেশে সিভিল
প্রশাসন
তখন কার্য্যতঃ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলো এবং এখনও এ-অবস্থাটা জেলা ও থানা পর্যায়ে বহাল
আছে। জেলা প্রশাসক ও থানা নির্বাহী অফিসার কর্নেল, মেজর ও ক্যাপ্টেইনদের নির্দেশের
অপেক্ষায় বসে থাকেন। নিজেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। প্রৌটোকল অনুযায়ী যেখানে
একজন সিভিল অফিসারের পদ আর্মী অফিসারের পদের ঊর্ধ্বে অবস্থান, সেখানেও সিভিল অফিসার
নিম্ন-অবস্থানের আর্মী অফিসারের আজ্ঞা পালন করেন। এ-অভিযোগগুলো কতোটা সঠিক, তা আমি
জানি না। কিন্তু অভিযোগগুলো স্বদেশ থেকে ফিরে এসে প্রবাসী বাংলাদেশীরাও প্রকাশ্যে
বলাবলি করেন।
সুতরাং বাংলাদেশে
প্রত্যক্ষ আর্মী শাসন না থাকলেও পরোক্ষ (এবং আরও এফেক্টিভ) আর্মী শাসন চলছে কি-না,
সে-বিষয়টি দেশবাসীর কাছে আরও পরিষ্কার করে তোলা প্রয়োজন এবং এ-ধরণের আর্মী
নিয়ন্ত্রণ থেকে সিভিল প্রশাসন ও সিভিল প্রশাসনের ইনস্টিটিউশনগুলোকে আবার কীভাবে
মুক্ত ও স্বনির্ভর করে তোলা যায়, সে-বিষয়ে বর্তমান উপদেষ্টা সরকারকেই সাহসী
সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অবশ্য, সে-সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা যদি তাদের থাকে। দেশ
শাসনের সিভিল ইনস্টিটিউশনগুলোকে পুনরুজ্জীবিত ও প্রকৃত অর্থে কার্য্যকর না করা
গেলে, কেবল নির্বাচন অনুষ্ঠান দ্বারা দেশে অর্থবহ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়ে এসে যদি দেখেন, তাদের হাতে কোনো ক্ষমতাই নেই, তাহলে
তারা কী করবেন এবং করতে পারবেন?
সম্পাদকদের সাথে
বৈঠকে সেনাপ্রধান-যে বলেছেন, 'সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সেনাবাহিনীর কোনো ভূমিকাই
নেই, তারা শুধু সরকারকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহায়তা দেয়', সে-সম্পর্কে বিবিসি
কর্তৃক আয়োজিত এক আলোচনা-চক্রে ঢাকার নিউ এইজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবির একটি
তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, 'সেনাপ্রধান-যে এখন বলছেন, সরকারের কোনো
সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনেই সেনাবাহিনী নেই, তার অর্থ কি এই যে, গত ষোলো মাসে বর্তমান
সরকার সকল কাজে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়াতে সেনাবাহিনী এখন সে-ব্যর্থতার দায়িত্ব গ্রহণ
অথবা তাতে অংশীদার হতে চাচ্ছে না?'
ব্যাপারটা যদি তাই
হয়ে থাকে, তাহলে এটাতো বর্তমান উপদেষ্টা সরকারের জন্য একটি বিপজ্জনক অশনি সংকেত। গত
ষোলো মাস যাবত দেশে যতো উল্টোপাল্টা কাজ হয়েছে, যেমন রাজনীতি সংস্কারের নামে প্রধান
দু'টি রাজনৈতিক দলে দলাদলি ও ভাঙ্গন সৃষ্টির চেষ্টা, ইউনূস-কামাল-কোরেশী-ইব্রাহীম
গংদের রাজনীতির মাঠে নামিয়ে রাজনীতি আরও ঘোলাটে করার চেষ্টা, সোয়া বছরেও ভৌটার
তালিকা প্রণয়নে ধীর গতি এবং নির্বাচনের তারিখ ঘোষণায় অক্ষমতা, লাগামহীন দ্রব্যমূল্য
এবং দেশে দূর্ভিক্ষাবস্থা, দুটি বড়ো দলের নেত্রীকেই বিচার শেষ না হবার আগেই তুচ্ছ
ছূতোয় জেলে আটকে রাখা, শেখ হাসিনার সঙ্গে অশোভন ব্যবহার, তাকে অসুস্থ শরীরে কৌর্টে
টানা হ্যাঁচড়া করে জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করা, অব্যাহত জরুরী অবস্থা বহাল রেখে বিশ্ব
রেকর্ড সৃষ্টি করা, ইত্যাদি কাজের জন্য কি একমাত্র বর্তমান উপদেষ্টা সরকারকেই সকল
দায়দায়িত্ব বহন করতে হবে এবং ভবিষ্যতে জবাবদিহিতার মুখোমুখী হতে হবে?
সত্যি যদি তাই হয়,
তাহলে, দেশী-বিদেশী যে-সব মুরুব্বীর মনোনয়নে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় বসেছেন, তারা
দায়িত্ব এড়াতে চাইলে সরকারের পায়ের তলায় মাটি থাকবে কি? দেশে আরেকটি অস্থিতিশীল
অবস্থা চাই না বলেই আমরা অনেকেই 'নিউ এইজের' সম্পাদকের মতো নানা সন্দেহ ও প্রশ্নের
দোলায় দুলছি।
বর্তমান উপদেষ্টা
সরকারের - বিশেষতঃ প্রধান উপদেষ্টার - প্রধান কাজ হচ্ছে, দেশবাসীর মন থেকে এ-সন্দেহ
ও সংশয় দূর করে তার সরকারের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা
সম্পর্কে সকলকে স্পষ্ট ধারণা দেয়া। সেনাপ্রধান বলেছেন, দেশে সেনাশাসন আসবে না। খুব
ভালো কথা। কিন্তু দেশে বর্তমানে যে-শাসন চলছে, তার চরিত্র কী এবং দেশে-যে দ্বৈতশাসন
চলছে না ও চলবে না, সে-সম্পর্কে দেশের মানুষকে সময় থাকতে নিঃসংশয় ও আস্থাশীল করা
প্রয়োজন। সম্পাদকদের কাছে সেনাপ্রধান সম্প্রতি যে-বক্তব্য রেখেছেন, তারপর দেশবাসীর
মনের সকল সংশয় ও সন্দেহ দূর করার প্রধান দায়িত্ব বর্তমান উপদেষ্টা সরকার এবং প্রধান
উপদেষ্টার উপরেই বর্তেছে।
আপলৌডঃ ১৩ থেকে
১৫
এপ্রিল, ২০০৮
|