London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী-কর্মচারীর মুক্তি এবং তারপর..

মনীষা এনাম

গতবছর ২০ আগষ্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার জের এ-বছরে এসে নতুন মোড় নিয়েছেবিষয়টা একটু ভিন্ন ধরণের বলেই হয়তো শুরু থেকেই মিডিয়া জোরদারভাবেই অবস্থান নিয়েছে - পক্ষেকী ঘটেছিলো, তারপর গত ৫ মাস কী ঘটছে - পিছনের ঘটনা আমাদের সকলের জানাআগষ্টে ঘটে-যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা সবচেয়ে বেশি 'প্রভাবিত' করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কেমোট ৮জন শিক্ষক আর ১৭ জন ছাত্রের ওপর দিয়ে ঝড় গেছে - যাচ্ছেএখানে এখনকার পরিস্থিতি কী, পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে, সে-বিষয়গুলো সামনে আসা জরুরী

ছাত্র বিক্ষোভে 'উস্কানি ও মদদ-দানের' মামলায় ছ'জন শিক্ষক আসামী  ছিলেনমামলার রায়ে দু'জন শিক্ষক বেকসুর খালাস পেলেও ৪ জন শিক্ষকের দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও একহাজার টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও একমাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হনরায়ের মাত্র ছ'দিনের মাথায় রাষ্ট্রপতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলে দণ্ডপ্রাপ্ত চার শিক্ষক কারাজীবন থেকে বেরিয়ে আসেনকিন্তু যে-বিষয়টি তথ্য আকারে হলেও আমাদের সামনে থাকা জরুরী- দণ্ড হওয়ার পর 'বিশেষ ক্ষমা'য় (মার্সি পিটিশন ছাড়া) কারাগার থেকে বেরিয়ে এলেও চার শিক্ষক কিন্তু মুক্ত নন, এখনো তাঁরা মামলা কাঁধে নিয়ে ঘুরছেন কেনো-না, দণ্ড মওকুফ করার এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির (যেটা তিনি করেছেন), কিন্তু আদালত যদি তাদের নির্দোষ ঘোষণা না করে, তাহলে আইনের দৃষ্টিতে তারা পূর্ণভাবে মুক্ত নন

গত ২৭ ডিসেম্বর ছিলো আদালতে কেইসের নির্ধারিত তারিখ। নিয়ম মাফিক শিক্ষকরা সেদিন হাজিরাও দিতে গিয়েছেনকিন্তু আদালত তারিখ পুননির্ধারণ করে ২৮ জানুয়ারী ২০০৮সামনের দিন আদালত কী সিদ্ধান্ত নেন, সে-বিষয়ে আমাদের শঙ্কার যথেষ্ট কারণ রয়েছে২০ আগষ্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ-মামলা ছাড়া রাবিতে আরো দু'টি মামলা হয়একটি ডিজিএফআইয়ের গাড়ী পোড়ানো মামলা আর আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেও দায়ের করা ভাঙচুরের মামলাপ্রথম মামলাটিতে শিক্ষক-ছাত্র-কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে মোট অভিযুক্তের সংখ্যা ছিলো চৌদ্দজন অভিযুক্তদের মধ্যে দু'জন শিক্ষক এবং একজন কর্মকর্তা নিম্ন আদালতের রায়ে বেকসুর খালাস হলেও, দশ ছাত্র এবং এক কর্মচারী তিন বছর করে সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেনগত সোমবার রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় তাঁরা বেরিয়ে এলেনতাঁদের মামলাও উঠিয়ে নেয়া হবে বলে জানানো হয়েছেতাহলে বাকী থাকলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা ভাঙচুর মামলা ছাত্র-ছাত্রীরা সেটা প্রত্যাহারের দাবী নিয়ে ভিসির কাছে গেলে তিনি বলেন, 'সরকার সব মামলা তুলে নেবেন বলেছেন, এটাও অটো উঠে যাবে।' মহামান্য উপাচার্য বোধহয় জানেন না, আদালত-এর কিছু অটো হয়ে যায় নাবাদীর কিছু করণীয় থাকেআমরা আশা করবো, সরকার সব অনুধাবন করে যেভাবে দ্রত পদক্ষেপ নিয়ে চলেছেন, উপাচার্য সে-পথ অনুসরণ করবেন

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়েরকৃত যে-মামলা রয়েছে, সেখানে অভিযুক্তরা সকলে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীযে-ক'জন শিক্ষার্থী অভিযুক্ত-তালিকায় আছেন, তাঁদের দু'জন জামিনে থাকলেও, অন্যরা পলাতকজরুরী অবস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সরকারের অবস্থান মাথায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয়-আন্দোলনের যে-ইতিহাস, তা এবার ভিন্ন রূপ নিয়েছেমনের তাগিদ থেকে তাঁরা অহিংস আন্দোলনকে সাথী করেছেতাঁদের দাবী ছিলো সকল শিক্ষার্থী এবং সাজাপ্রাপ্ত কর্মচারী আতাউর রহমানের মুক্তিনিজেদের বন্ধুদের পাশে পেলেও ঢাকার ৭ ছাত্র এখনও জেলে (যাদের ভিতর কেউ-কেউ ভীষণ অসুস্থ)

সরকার থেকে বলা হয়েছিলো, আগষ্টের ছাত্র-বিক্ষোভ শুরুতে স্বতঃস্ফূর্ত থাকলেও, পরে তা ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্টা করে 'অপশক্তি।' তারা দাবী জানান, বিক্ষোভে রাজনৈতিক দল এবং শিক্ষকদের ইন্ধন-উস্কানি-মদদ আছেকিন্তু রাজশাহীর আদালত যে-রায় দিয়েছে, তাতে স্পষ্ট করে উল্লেখ আছে যে, সাক্ষ্য-প্রমাণে বিক্ষোভের সাথে কোন ধরণের 'মদদ কিংবা অপশক্তি'র সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেনিরাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মামলায় শিক্ষকরা দু'বছর করে সাজাপ্রাপ্ত হলেও আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে উস্কানির অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায়নিআর অপর মামলাটিতে তো শিক্ষকদের বেকসুর ঘোষণাই করা হলোতাহলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরে অন্ততঃ বলতে পারি যে, সে-দিনের সেই ছাত্র-বিক্ষোভ স্বতঃস্ফূর্ত ছিলো

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনুভূতির অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আটক সকল শিক্ষার্থী-কর্মচারীর মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে না এ-বিবেচনায় দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের দাবী প্রকাশে এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েছেমনে রাখতে হবে, এদের সংগঠিত করতে কিন্তু কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব প্রয়োজন পড়েনি।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দণ্ড-দানের পর রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে মুক্তি-দানের ঘটনা দেখে তারা শঙ্কিততাঁদের আশঙ্কা এখন আর হয়তো মামলা আক্রান্ত ছাত্র-কর্মচারীদের জন্য কেউ মাথা ঘামাবে নারাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এ-শঙ্কার যুক্তিযুক্ত কারণ আছে বলেই মনে হয়২০০৫ সালের ৫৪ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা তার সাক্ষীসেবার তাপসী রাবেয়া হলে রাতে চোর ঢোকাকে কেন্দ্র করে কর্তৃপক্ষর কাছে নিরাপত্তার দাবী জানাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী-বাহিনীর হামলার শিকার হয় ছাত্র-ছাত্রীরাসেখানেই শেষ না, আন্দোলনরতদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ মামলাও করেন সে-মামলা আজও চলছেকতো শিক্ষার্থী পড়া শেষ করে রাজশাহী ছেড়েছেকিন্তু এখনও দূর-দূরান্ত থেকে রাজশাহী এসে তাঁদেরকে হাজিরা দিতে হয় কর্তৃপক্ষ চাইলেই মামলা প্রত্যাহার করতে পারে, কিন্তু করেনি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়েরকৃত এবারের মামলাটিতেও এমন অনেককেই জড়িত করা হয়েছে, যারা পড়া শেষ করে রাজশাহী ত্যাগ করেছেন বছর দুয়েক আগেই চার্জশীট দাখিলের আগে এসব প্রাক্তন শিক্ষার্থীর খোঁজে গিয়ে পুলিশ বিভাগগুলোতে জানতে পারে তাঁরা কয়েক বছর আগেই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছেঅতএব শিক্ষার্থীদের বিষয়টি সহসা নিস্পত্তি হচ্ছে না বলে যে-আশঙ্কা তাদের সহপাঠীরা করছেন, তা নিতান্ত অমূলক বলার জায়গা নেই

বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাবার মতো পরিস্থিতি আবারো তৈরী হয়ে যাক, তা শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা চান না।  চান না এমন কোনো কিছু ঘটুক, যা তাঁদেরকে সরকারের প্রতিপক্ষে পরিণত করে এ-পরিস্থিতি নিশ্চিতভাবেই আমাদের কারোরই - সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের - কাম্য নয়সবদিক বিবেচনায়, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সকলের মামলা প্রত্যাহার এবং মুক্তির কোন বিকল্প নেইআর আমরা সত্যিই যদি চাই শিক্ষাঙ্গন স্বাভাবিক থাকবে, তবে মুক্তি-প্রক্রিয়া বিলম্বিত করবার চেষ্টা না করাই শ্রেয় বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হলে, নানা কায়দায় ছাত্রদের দমিয়ে রাখার পদ্ধতি নিলে ঠিক হবে নাআটক শিক্ষকদের ক্লাসে না পাওয়া, নানা সূত্রে সহপাঠীদের ওপর নির্যাতনের খবর, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সহপাঠী ও শিক্ষকদের সাজা, গেলো ক'মাসে ছাত্রদের মনের ভিতর যে-ক্ষোভ জমা হয়েছে, তা এখন সকল কাতারের শিক্ষার্থীদের একজোট করেছেভুলে গেলে চলবে না, কেবল বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো বাঙালী জাতি প্রতিবাদ করাকে কখনও অন্যায় মনে করে না

মনীষা এনামঃ  লেখক ও সাংবাদিক

২২ জানুয়ারী, ২০০৮

অন্যান্য কলাম 8

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.