London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

সাধু সাবধান!

চিররঞ্জন সরকার

আমাদের সবার আপত্তি, নিষেধ, আহাজারি, প্রতিবাদক্ষোভ - সবকিছুকে অগ্রাহ্য করে নিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্রের দাম বেড়েই চলেছেএ-দাম বেড়ে যাওয়ার কোনো উপলক্ষ্য নেই, নেই কোনো বিশেষ ঋতুবন্যা-খরায় জিনিসপত্রের দাম বাড়ে; আবার স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও বাড়ে ভরা মৌসুমে দাম বাড়ে, মৌসুম যখন শেষ হয়ে যায়, তখনও বাড়েহরতালের কারণে বাড়ে, হরতাল না হলেও বাড়েবাজেটের আগে একবার বাড়ে, বাজেটের পরে আরেকবার বাড়েবাণিজ্যমন্ত্রী বদল হলে দাম বাড়ে, মন্ত্রী বদল না হলেও দাম বাড়েনির্বাচিত সরকারের সময় বাড়ে, অনির্বাচিত সরকারের সময়ও বাড়েআন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বাড়ে, তা না হলেও বাড়েজিনিস-পত্রের দাম অনেকটা মানুষের আকাঙ্ক্ষার মতো - শুধু বাড়তেই থাকেকোনো চেষ্টাতেই তা কমানো যায় না বিডিআর, যৌথবাহিনী, টাস্কফোর্স - কোনোকিছুই দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না

বাঁচার জন্য মানুষকে খেতে হয়, বিভিন্ন জিনিস-পত্রও লাগে; কাজেই দাম যত বেশিই হোক, ওগুলো আমাদের সংগ্রহ করতেই হবেসুতরাং মূল্যবৃদ্ধিকে এড়াতে হলে খাওয়া-পরা বাদ দেয়ার কোনো বিকল্প নেইকিন্তু তা কি সম্ভব? না খেয়ে কি বাঁচা যায়? মানুষ বাঁচার জন্য খায়, নাকি খাওয়ার জন্য বাঁচে - এটা একটা জটিল বিতর্ক অলস বুদ্ধিজীবীরা এই উভয় প্রস্তাবের পক্ষেই অকাট্য সব যুক্তি উপস্থাপন করার ক্ষমতা রাখেন আমরা তেমন বিতর্কে যাব নাআমরা সরল যুক্তিতে বিষয়টিকে দেখার চেষ্টা করবমানুষ বাঁচার জন্য খায় এটা যেমন ঠিক; আবার খাওয়ার জন্য বাঁচে এটাও অসত্য নয়তবে বাঁচার জন্য খাওয়া অনিবার্য বাঁচতে হলে খেতে হবেইকম হোক, বেশি হোক, আমিষ হোক আর নিরামিষ হোক, সাপ-ব্যাঙ-কুকুরই হোক, আর মরা মুরগি, রাসায়নিক মিশ্রিত সব্জিই হোক - খেতে হবেই না খেয়ে মানুষ বাঁচে নাবাঁচতে পারে না

গত কয়েক বছর ধরে জিনিসপত্রের দাম কেনো বাড়ছে, কী পরিমাণ বাড়ছে, এতে সরকারের ভূমিকা কতোটুকু, আর ব্যবসায়ীদের কারসাজি কতোটুকু, এই দাম বাড়ার ফলে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হলো, দাম কমানোর ক্ষেত্রে সরকারের কতটুকু কী করার ছিলো, কতোটুকু কী করেছে, এর পরিণামই বা কি-এসব বিষয়ে নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, এখনও হচ্ছে, আশা করা যায় ভবিষ্যতে আরও অনেক হবে কিন্তু তাতে পরিস্থিতি বদলায়নি; হয়তো বদলাবেও না বাজার-দর এখনও চড়াচাল-ডাল, তরি-তরকারি, মাছ-মাংস, ডিম, দুধ-সহ প্রায় সব রকমের জিনিস-পত্রের দামই বেশিনিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনা করে কোনো লাভ নেইদাম তাতে কমবে বলে মনে হয় না কাজেই দাম বা মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে আলাপ-বিলাপ-প্রলাপ প্রয়োজনীয় হলেও নিরর্থক

বর্তমানে অবিশ্বাস্য সব ঘটনা ঘটছেএর অন্যতম হচ্ছে, মানুষের দাম ভীষণভাবে কমে যাওয়া আর নিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সীমাহীন বেড়ে যাওয়াদামের এ-তারতম্য অবশ্য হতেই পারে একটু ঐতিহাসিক আলোচনায় যাওয়া যাক ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ওয়ালপোল বলতেন, সব মানুষেরই একটা দাম আছ, সব মানুষকেই ইচ্ছে করলে কেনা যায়এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, একথা তিনি বলেছিলেন আড়াইশো বছরেরও আগেওয়ালপোলের সেই মন্তব্য নিয়েও পক্ষ-বিপক্ষে অনেক কথা বলা যায়তবে শেষ বিচারে তার কথার সত্যতাই বেশি মানুষের দাম আছে এটা ঠিক; তবে ইচ্ছে করলেই হয়তো যে-কোনো মানুষকে কেনা যায় না, আবার অনেককেই কেনা যায় - একথাও সত্যি আমাদের দেশে অবশ্য টাকা দিয়ে কেনা যায় না এমন লোকের সংখ্যা খুব কমএর পেছনে নীতি-আদর্শ-মূল্যবোধের সঙ্গে-সঙ্গে পেট বা ক্ষুধা নিবৃত্তির বিষয়টিও যুক্তআবার বিনা প্রয়োজনে এবং খুব অল্প দামে বিক্রি হয়েছেন বা হচ্ছেন এমন ব্যক্তির সংখ্যা আমাদের দেশে একেবারে কম নেই সামান্য একটু ক্ষমতা, একটু পদ-পদবী, সুযোগ-সুবিধার জন্য আমাদের দেশের জ্ঞানী-গুণী-বুদ্ধিজীবীরা পর্যন্ত যেভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়েন অমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে, অন্য কোনো সমাজে খুব একটা আছে বলে মনে হয় না

তত্ত্বকথা থেকে দাম-দরের দৈনন্দিনতায় যাওয়া যাকদ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর মুদ্রাস্ফীতির জগতে নাকি একটি চমকপ্রদ কথা চালু হয়েছিলোকথাটার চমক আছে কিন্তু ব্যাপারটা সোজা আগে পকেটে কয়েকটা টাকা নিয়ে বাজার থেকে ব্যাগ ভর্তি জিনিস কেনা যেতোএখন ব্যাগভর্তি বাজার করতে গেলে পকেট-ভর্তি টাকা লাগেআর কিছুদিন পরে ব্যাগ-ভর্তি টাকা নিয়ে বাজারে যেতে হবে পকেট-ভর্তি জিনিস কিনে আনার জন্যবর্তমানে আমরা পকেট-ভর্তি পণ্য কিনতে ব্যাগ-ভর্তি টাকা ব্যয়ের যুগে প্রায় পৌঁছে গেছিমোটা চালের দামও বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দুয়েক পদ ছাড়া ২০ টাকা কেজির নিচে তরকারি পাওয়া যায় নামাছের বাজারে তো রীতিমত আগুন মলা-ঢেলা জাতীয় ছোট মাছের দামই ১৬০ টাকা কেজি লবণ-মরিচ, পেঁয়াজ-তেল সব ক্ষেত্রেই একই পরিস্থিতিএককালে কথা ছিল মুড়ি-মিছরির দাম সমান হলে দেশে বিপর্যয় ঘটেলোক কাহিনীতে উপদেশ দেয়া আছে - যদি কোনো দেশে দেখতে পাও যে মুড়ি-মিছরির সমান দাম, তাহলে সে-জায়গা ত্যাগ করে চলে আসবে, কারণ সে-জায়গা অত্যন্ত বিপজ্জনকএখন বাজারে মিছরি পাওয়া যায় না, মানুষ মিছরি খায়ও নাতার পরিবর্তে মানুষ চিনি খায় বাজারে বর্তমানে চিনি আর মুড়ির দাম প্রায় সমান কেউ আর এ-বিষয়ে মাথা ঘামায় নাসবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো, বর্তমানে বাজারে চালের চেয়ে আটার দাম বেশি!

অথচ আটা আমাদের দেশে যুগ-যুগ ধরে গরিবের খাদ্য হিসেবেই পরিচিতযারা টাকার অভাবে তিনবেলা চাল কিনে ভাত খেতে পায় না, তারা কম দামে আটা কিনে ভাতের পরিবর্তে রুটি খায়যুগ-যুগ ধরে আমাদের দেশে চালের চেয়ে অনেক কম দামে আটা বিক্রি হয়ে আসছেকিন্তু বর্তমানে চালের দাম আটার চেয়ে কমে গেছেএরপর সরকার গল্পের সেই 'ভাত খেতে পায় না তো পোলাও খাক' স্টাইলে দেশবাসীকে 'রুটি খেতে পায় না তো ভাত খাক' উপদেশ দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে নাসরকারের উপদেষ্টারা অবশ্য ইনিয়ে-বিনিয়ে তেমন কথা বলার চেষ্টাও করছেনএর আগে যেমন এক উপদেষ্টা বলেছিলেন, জিনিসপত্রের দাম কমাতে সরকারের আর কিছুই করার নেই! এ-উপদেষ্টা মহোদয়কে অবশ্য শেষ পর্যন্ত বিদায় নিতে হয়েছেঅন্যদের পরিণতি কী হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়

যা হোক, দামদর নিয়ে কথা আর না বাড়ানোই ভালতবে মনে রাখা দরকার যে, কারণ ছাড়া কোনো কিছুই ঘটে নাদাম বাড়া বা দাম বাড়ানোর পেছনেও নিশ্চয়ই যুক্তিসঙ্গত অনেক কারণ আছেদাম বাড়ার পক্ষে অনেক যুক্তি আছে দাম বাড়ানোর পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো, জিনিসপত্রের দাম কম হলে বা সস্তায় পাওয়া গেলে তার মর্যাদা থাকে নাভালমন্দ গুণাগুণের চেয়ে মানুষ আজকাল দামি জিনিসই বেশি পছন্দ করেদামী জিনিসের মর্যাদা ও কদর সবসময়ই বেশি কোরবানীর হাটে যে-গরুটির সবচেয়ে বেশি দাম, সেই গরুর কদর বা 'সম্মান' হয় সর্বাধিকসস্তা জিনিস দিয়ে কখনও আভিজাত্য হয় না যে-জিনিসের যত বেশি দাম, সেটা ততো অভিজাতের ঘরে স্থান পায়সম্ভবত এ-মনস্তত্ত্ব থেকেই মানুষ বা জীবনের দাম ছাড়া প্রতিটি পণ্যেরই দাম বাড়ানো হচ্ছেজিনিস-পত্রের সীমাহীন দাম বাড়িয়ে অনেকের ব্যয় বা খরচা কমিয়ে দেয়া হয়েছেজিনিসপত্রের যা দাম, তাতে খরচ করার সাধ্যই বা ক'জনের আছে?

স্কটল্যান্ডের একটি প্রবাদ আছে, গরীবদের আর যতো কষ্টই থাক না কেন একটা বড়ো সুবিধা আছে, গরীব থাকার জন্য কোনো খরচ লাগে নাসরকার হয়তো স্কটিশদের এই প্রবাদটিকে বিবেচনায় নিয়ে 'গরিবদের স্বার্থে'ই জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো অব্যাহত রেখেছে!

কিন্তু সমস্যা হলো, মানুষকে তো শেষপর্যন্ত কিছু না কিছু খেতেই হয়তথাকথিত সংস্কার আর প্রতিশ্রুতি খেয়ে তো আর মানুষের পেট ভরে নাআশঙ্কা হচ্ছে, ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির চাপে দিশেহারা মানুষ সস্তায় অন্য কিছু না পেয়ে শেষমেষ না আবার উপদেষ্টাদের ধরে-ধরে খেতে শুরু করে! এ-দুর্মূল্যের বাজারে তাদের চেয়ে সস্তা-যে আপাততঃ কিছু আর নেই! কাজেই সাধু সাবধান!

১৫ জানুয়ারী, ২০০৮ 

অন্যান্য কলাম 8

 
 

© 2007 Confidence Services Ltd.