|
সাধু সাবধান!
চিররঞ্জন সরকার
আমাদের
সবার আপত্তি, নিষেধ, আহাজারি, প্রতিবাদ
ও ক্ষোভ - সবকিছুকে
অগ্রাহ্য করে নিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্রের দাম বেড়েই চলেছে।
এ-দাম বেড়ে যাওয়ার কোনো
উপলক্ষ্য নেই, নেই কোনো বিশেষ ঋতু।
বন্যা-খরায় জিনিসপত্রের
দাম বাড়ে; আবার স্বাভাবিক
পরিস্থিতিতেও
বাড়ে।
ভরা মৌসুমে দাম বাড়ে, মৌসুম যখন
শেষ হয়ে যায়, তখনও বাড়ে।
হরতালের কারণে বাড়ে,
হরতাল না হলেও বাড়ে।
বাজেটের আগে একবার বাড়ে,
বাজেটের পরে আরেকবার বাড়ে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বদল হলে
দাম বাড়ে, মন্ত্রী বদল না হলেও দাম বাড়ে।
নির্বাচিত সরকারের সময়
বাড়ে, অনির্বাচিত সরকারের সময়ও বাড়ে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম
বাড়লে বাড়ে, তা না হলেও বাড়ে।
জিনিস-পত্রের দাম অনেকটা
মানুষের আকাঙ্ক্ষার মতো - শুধু বাড়তেই থাকে।
কোনো চেষ্টাতেই তা কমানো
যায় না।
বিডিআর, যৌথবাহিনী, টাস্কফোর্স
- কোনোকিছুই দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
বাঁচার
জন্য মানুষকে খেতে হয়, বিভিন্ন জিনিস-পত্রও লাগে; কাজেই দাম যত বেশিই হোক, ওগুলো
আমাদের সংগ্রহ করতেই হবে।
সুতরাং মূল্যবৃদ্ধিকে
এড়াতে হলে খাওয়া-পরা বাদ দেয়ার কোনো বিকল্প নেই।
কিন্তু তা কি সম্ভব? না
খেয়ে কি বাঁচা যায়? মানুষ বাঁচার জন্য খায়, নাকি খাওয়ার জন্য বাঁচে - এটা একটা জটিল
বিতর্ক।
অলস বুদ্ধিজীবীরা এই উভয়
প্রস্তাবের পক্ষেই অকাট্য
সব যুক্তি উপস্থাপন করার ক্ষমতা
রাখেন।
আমরা তেমন বিতর্কে যাব না।
আমরা সরল যুক্তিতে
বিষয়টিকে দেখার চেষ্টা করব।
মানুষ বাঁচার জন্য খায়
এটা যেমন ঠিক; আবার খাওয়ার জন্য বাঁচে এটাও অসত্য নয়।
তবে বাঁচার জন্য খাওয়া
অনিবার্য।
বাঁচতে হলে খেতে হবেই।
কম হোক, বেশি হোক, আমিষ
হোক আর নিরামিষ হোক, সাপ-ব্যাঙ-কুকুরই হোক, আর মরা মুরগি, রাসায়নিক মিশ্রিত সব্জিই
হোক - খেতে হবেই।
না খেয়ে মানুষ বাঁচে না।
বাঁচতে পারে না।
গত কয়েক
বছর ধরে জিনিসপত্রের দাম কেনো বাড়ছে, কী পরিমাণ বাড়ছে, এতে সরকারের ভূমিকা কতোটুকু,
আর ব্যবসায়ীদের কারসাজি কতোটুকু, এই দাম বাড়ার ফলে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হলো, দাম
কমানোর ক্ষেত্রে সরকারের কতটুকু কী করার ছিলো, কতোটুকু কী করেছে, এর পরিণামই বা
কি-এসব বিষয়ে নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, এখনও হচ্ছে, আশা করা যায় ভবিষ্যতে আরও অনেক
হবে।
কিন্তু তাতে পরিস্থিতি বদলায়নি;
হয়তো বদলাবেও না।
বাজার-দর এখনও চড়া।
চাল-ডাল, তরি-তরকারি,
মাছ-মাংস, ডিম, দুধ-সহ প্রায় সব রকমের জিনিস-পত্রের দামই বেশি।
নিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিসের
মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনা করে কোনো লাভ নেই।
দাম তাতে কমবে বলে মনে
হয় না।
কাজেই দাম বা মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে
আলাপ-বিলাপ-প্রলাপ প্রয়োজনীয় হলেও নিরর্থক।
বর্তমানে
অবিশ্বাস্য সব ঘটনা ঘটছে।
এর অন্যতম হচ্ছে,
মানুষের দাম ভীষণভাবে কমে যাওয়া আর নিত্য-প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সীমাহীন বেড়ে যাওয়া।
দামের এ-তারতম্য অবশ্য
হতেই পারে।
একটু ঐতিহাসিক আলোচনায় যাওয়া
যাক।
ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী
রবার্ট ওয়ালপোল বলতেন, সব মানুষেরই একটা দাম আছ, সব মানুষকেই ইচ্ছে করলে কেনা যায়।
এখানে উল্লেখ করা
প্রয়োজন যে, একথা তিনি বলেছিলেন আড়াইশো বছরেরও আগে।
ওয়ালপোলের সেই মন্তব্য
নিয়েও পক্ষ-বিপক্ষে অনেক কথা বলা যায়।
তবে শেষ বিচারে তার কথার
সত্যতাই বেশি।
মানুষের দাম আছে এটা ঠিক; তবে
ইচ্ছে করলেই হয়তো যে-কোনো মানুষকে কেনা যায় না, আবার অনেককেই কেনা যায় - একথাও
সত্যি।
আমাদের দেশে অবশ্য টাকা দিয়ে
কেনা যায় না এমন লোকের সংখ্যা খুব কম।
এর পেছনে
নীতি-আদর্শ-মূল্যবোধের সঙ্গে-সঙ্গে পেট বা ক্ষুধা নিবৃত্তির বিষয়টিও যুক্ত।
আবার বিনা প্রয়োজনে এবং
খুব অল্প দামে বিক্রি হয়েছেন বা হচ্ছেন এমন ব্যক্তির সংখ্যা আমাদের দেশে একেবারে কম
নেই।
সামান্য একটু ক্ষমতা, একটু
পদ-পদবী, সুযোগ-সুবিধার জন্য আমাদের দেশের জ্ঞানী-গুণী-বুদ্ধিজীবীরা পর্যন্ত যেভাবে
হুমড়ি খেয়ে পড়েন অমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে, অন্য কোনো সমাজে খুব একটা
আছে বলে মনে হয় না।
তত্ত্বকথা থেকে দাম-দরের দৈনন্দিনতায় যাওয়া যাক।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর
মুদ্রাস্ফীতির জগতে নাকি একটি চমকপ্রদ কথা চালু হয়েছিলো।
কথাটার চমক আছে কিন্তু
ব্যাপারটা সোজা।
আগে পকেটে কয়েকটা টাকা নিয়ে
বাজার থেকে ব্যাগ ভর্তি জিনিস কেনা যেতো।
এখন ব্যাগভর্তি বাজার
করতে গেলে পকেট-ভর্তি টাকা লাগে।
আর কিছুদিন পরে
ব্যাগ-ভর্তি টাকা নিয়ে বাজারে যেতে হবে পকেট-ভর্তি জিনিস কিনে আনার জন্য।
বর্তমানে আমরা
পকেট-ভর্তি পণ্য কিনতে ব্যাগ-ভর্তি টাকা ব্যয়ের যুগে প্রায় পৌঁছে গেছি।
মোটা চালের দামও
বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি।
দুয়েক পদ ছাড়া ২০ টাকা কেজির নিচে তরকারি পাওয়া যায় না।
মাছের বাজারে তো রীতিমত
আগুন।
মলা-ঢেলা জাতীয় ছোট মাছের দামই
১৬০ টাকা কেজি।
লবণ-মরিচ, পেঁয়াজ-তেল সব
ক্ষেত্রেই একই পরিস্থিতি।
এককালে কথা ছিল
মুড়ি-মিছরির দাম সমান হলে দেশে বিপর্যয় ঘটে।
লোক কাহিনীতে উপদেশ দেয়া
আছে - যদি কোনো দেশে
দেখতে পাও যে মুড়ি-মিছরির সমান দাম, তাহলে সে-জায়গা ত্যাগ করে চলে আসবে, কারণ
সে-জায়গা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
এখন বাজারে মিছরি পাওয়া
যায় না, মানুষ মিছরি খায়ও না।
তার পরিবর্তে মানুষ চিনি
খায়।
বাজারে বর্তমানে চিনি আর মুড়ির
দাম প্রায় সমান।
কেউ আর এ-বিষয়ে মাথা ঘামায় না।
সবচেয়ে অবাক ব্যাপার
হলো, বর্তমানে বাজারে চালের চেয়ে আটার দাম বেশি!
অথচ আটা
আমাদের দেশে যুগ-যুগ ধরে গরিবের খাদ্য হিসেবেই পরিচিত।
যারা টাকার অভাবে
তিনবেলা চাল কিনে ভাত খেতে পায় না, তারা কম দামে আটা কিনে ভাতের পরিবর্তে রুটি খায়।
যুগ-যুগ ধরে আমাদের দেশে
চালের চেয়ে অনেক কম দামে আটা বিক্রি হয়ে আসছে।
কিন্তু বর্তমানে চালের
দাম আটার চেয়ে কমে গেছে।
এরপর সরকার গল্পের সেই
'ভাত খেতে পায় না তো পোলাও খাক' স্টাইলে দেশবাসীকে 'রুটি খেতে পায় না তো ভাত খাক'
উপদেশ দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
সরকারের উপদেষ্টারা
অবশ্য ইনিয়ে-বিনিয়ে তেমন কথা বলার চেষ্টাও করছেন।
এর আগে যেমন এক উপদেষ্টা
বলেছিলেন, জিনিসপত্রের দাম কমাতে সরকারের আর কিছুই করার নেই! এ-উপদেষ্টা মহোদয়কে
অবশ্য শেষ পর্যন্ত বিদায় নিতে হয়েছে।
অন্যদের পরিণতি কী
হয়, এখন সেটাই দেখার
বিষয়।
যা হোক,
দামদর নিয়ে কথা আর না বাড়ানোই ভাল।
তবে মনে রাখা দরকার যে,
কারণ ছাড়া কোনো কিছুই ঘটে না।
দাম বাড়া বা দাম বাড়ানোর
পেছনেও নিশ্চয়ই যুক্তিসঙ্গত অনেক কারণ আছে।
দাম বাড়ার পক্ষে অনেক
যুক্তি আছে।
দাম বাড়ানোর পক্ষে সবচেয়ে বড়
যুক্তি হলো, জিনিসপত্রের দাম কম হলে বা সস্তায় পাওয়া গেলে তার মর্যাদা থাকে না।
ভালমন্দ গুণাগুণের চেয়ে
মানুষ আজকাল দামি জিনিসই বেশি পছন্দ করে।
দামী জিনিসের মর্যাদা ও
কদর সবসময়ই বেশি।
কোরবানীর হাটে যে-গরুটির সবচেয়ে
বেশি দাম, সেই গরুর কদর বা 'সম্মান' হয় সর্বাধিক।
সস্তা জিনিস দিয়ে কখনও
আভিজাত্য হয় না।
যে-জিনিসের যত বেশি দাম, সেটা
ততো অভিজাতের ঘরে স্থান পায়।
সম্ভবত এ-মনস্তত্ত্ব
থেকেই মানুষ বা জীবনের দাম ছাড়া প্রতিটি পণ্যেরই দাম বাড়ানো হচ্ছে।
জিনিস-পত্রের সীমাহীন
দাম বাড়িয়ে অনেকের ব্যয় বা খরচা কমিয়ে দেয়া হয়েছে।
জিনিসপত্রের যা দাম,
তাতে খরচ করার সাধ্যই বা ক'জনের আছে?
স্কটল্যান্ডের একটি প্রবাদ আছে, গরীবদের আর যতো কষ্টই থাক না কেন একটা বড়ো সুবিধা
আছে, গরীব থাকার জন্য কোনো খরচ লাগে না।
সরকার হয়তো স্কটিশদের এই
প্রবাদটিকে বিবেচনায় নিয়ে 'গরিবদের স্বার্থে'ই জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো অব্যাহত
রেখেছে!
কিন্তু
সমস্যা হলো, মানুষকে তো শেষপর্যন্ত কিছু না কিছু খেতেই হয়।
তথাকথিত সংস্কার আর
প্রতিশ্রুতি খেয়ে তো আর মানুষের পেট ভরে না।
আশঙ্কা হচ্ছে, ক্রমাগত
মূল্যবৃদ্ধির চাপে দিশেহারা মানুষ সস্তায় অন্য কিছু না পেয়ে শেষমেষ না আবার
উপদেষ্টাদের ধরে-ধরে খেতে শুরু করে! এ-দুর্মূল্যের বাজারে তাদের চেয়ে সস্তা-যে
আপাততঃ কিছু আর নেই! কাজেই সাধু সাবধান!
১৫
জানুয়ারী, ২০০৮
|