|
সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের
বিরুদ্ধে রাষ্ট্র আদৌ কি এগিয়ে আসবে না?
মঙ্গল
কুমার চাকমা
বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠায় তথা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশে অন্যতম
আদর্শিক বাধা হচ্ছে দেশে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় মৌলবাদ।
প্রশ্ন হলো,
সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ শুরু হবে কবে?
স্বাধীনতার পর বিগত ৩৭
বছরে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রচনায় দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলগুলো
নির্ণায়ক ভূমিকা তো পালনই করেনি, বরং দেশে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় মৌলবাদকে নানা
কায়দায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মদদ দিয়ে এসেছে।
ফলে গোটা জাতীয় রাজনৈতিক
সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে।
এমনকি, কতক ক্ষেত্রে এর
প্রতিফলন ঘটেছে রাষ্ট্রীয় নীতিতে।
রাষ্ট্রযন্ত্রের
রন্ধ্রে-রন্ধ্রে এই সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিভৎস রূপ সহজেই চোখে পড়ে বাংলাদেশে
।
জাতিগত
শোষণ-বঞ্চনা, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে মহান
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন
হয়।
তারই ফলশ্রুতিতে
স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে
রচিত সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও
সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ করা হয়েছে।
আক্ষরিক অর্থে তৎকালীন
শাসকগোষ্ঠীর এটা একটা বড়ো ধরণের অর্জন বলা যায়।
কিন্তু পরবর্তীতে সেই
শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক কর্মকান্ড দেখে বদ্ধমূল ধারণা হয় যে, গৃহীত রাষ্ট্রীয়
মূলনীতির উপর তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো না।
সে-সময়ে জাতীয় সংসদের
অধিবেশন থেকে শুরু করে অধিকাংশ রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম কোরান পাঠ দিয়ে শুরু করা, শেখ
মুজিবুর রহমানের ইসলামিক (ওআইসি) সম্মেলনে যোগ দেয়া ও একাত্মতা ঘোষণা করা ইত্যাদি
ঘটনা কখনোই ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচয় বহন করেনি বলে অনেকে মনে করেন।
অন্যদিকে পার্বত্য
চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের জন্য ঐতিহাসিকভাবে
স্বীকৃত বিশেষ
শাসনব্যবস্থার অস্বীকার
করা বা সংবিধানে জুম্ম জনগণ-সহ
দেশের ৪৫টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীকে বাঙালী হিসেবে আখ্যায়িত করা অথবা পার্বত্য
চট্টগ্রামে কয়েক লক্ষ বাঙালী বসতি-স্থাপনের মাধ্যমে জুম্ম জনগণকে সংখ্যালঘু করার
হুমকি নিঃসন্দেহে অগণতান্ত্রিক ও উগ্র জাতীয়তাবাদেরই বহিঃপ্রকাশ ছিলো।
১৯৭৫
পরবর্তী সময়ে দেখা যায় যে, সংবিধান সংশোধন করে বাতিল করা হয় সংবিধানের
ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে।
কার্যতঃ
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সূচিত হয় সাংবিধানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ চেতনার অবলুপ্তি এবং
রাষ্ট্রযন্ত্রে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ বিকাশের ধারা।
অন্যদিকে রাজনৈতিক
কর্মকান্ড চালানোর সুযোগ দেয়া হয় মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতাকারী ইসলামিক রাজনৈতিক দল
জামায়াতে ইসলামীকে।
ফলে রাজনীতিতে ধর্ম
ব্যবহারের সংস্কৃতি স্বাভাবিকভাবেই
প্রবলতর হয়ে ওঠে।
জাতীয়
জীবনে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী ভাবধারা বিকাশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা
এখানেই থেমে থাকেনি।
পরবর্তীতে
স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদ
ক্ষমতায় এসে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্র-ধর্ম ঘোষণা করেন।
মজার
বিষয় যে, '৭৫ পরবর্তী থেকে বছর খানেক আগে পর্যন্ত অধিকাংশ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো
ধর্মাশ্রয়ী ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে তেমন কোন
সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করেনি।
আর সাম্প্রদায়িকতা ও
মৌলবাদের বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশের বক্তব্যে সোচ্চার হতে দেখা গেলেও তা ছিলো নিছক
রাজনৈতিক বুলি।
বরঞ্চ ক্ষেত্র বিশেষে এসব
রাজনৈতিক দল ধর্মাশ্রয়ী ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে
প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আতাঁত গড়ে তুলতে দেখা গেছে।
এসবের ফলে জাতীয় ও
রাষ্ট্রীয় জীবনে আজ সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদী ভাবধারা একাকার হয়ে পড়েছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থা,
নিরাপত্তা বাহিনী, বিচার-ব্যবস্থা-সহ রাষ্ট্র-প্রশাসনের সকল স্তরে কম-বেশি এর
পরিব্যাপ্তি ঘটেছে।
নাগরিক
সমাজ মনে করে, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এসে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয়
জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দৃঢ় ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্র তৈরী হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা ও ধর্মাশ্রয়ী
রাজনৈতিক দলগুলোকে রেজিষ্ট্রেশন না দেয়া ইত্যাদি দাবী জোরদার হয়েছে।
রাজনৈতিক দল থেকে শুরু
করে সকল পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজ-সহ আপামর দেশবাসী এ-দাবীতে আজ সোচ্চার হয়েছে।
দাবী আদায়ের লক্ষ্যে বীর
মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কম্যান্ডারস ফৌরাম সর্বাত্মক ক্যাম্পেইন
চালিয়ে যাচ্ছেন।
মনে হ চ্ছে, সাম্প্রদায়িকতা ও
ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে দেশের মানুষ আজ একাট্টা হয়েছে।
সাম্প্রদায়িকতা ও
ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গ্রহণের সময় এখনি।
উদ্বেগের বিষয় যে,
বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মধ্যে উদ্যোগ গ্রহণের সেরকম কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে
না।
স্মরণ
করা যেতে পারে, দেশের জাতীয় দৈনিক ও নাগরিক সমাজের সাথে আলোচনার সময় প্রধান
উপদেষ্টা বলেছিলেন, এতোদিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়া অনভিপ্রেত এবং
যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যক্তি বিশেষের উদ্যোগে মামলা করা হলে সরকার সহযোগিতা
করবে।
তাঁর এ-মতামতের ফলে মানুষ
আশান্বিত হয়ে উঠেছিলো।
কিন্তু পরবর্তীতে
জামায়াতী নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হলে, 'ব্যক্তি উদ্যোগে রাষ্ট্র
বিরোধী মামলা করা যায় না' বলে কয়েকদিন আগে অপসারিত উপদেষ্টা মইনুল হোসেন মন্তব্য
করেন।
তিনি আরও বলেছেন,
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা তুলে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চক্রান্ত হচ্ছে।
মইনুল হোসেন উল্টো একটি
প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন।
অতীতে যারা
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেননি, তাদের বিরুদ্ধে কেনো শাস্তি মূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে
না - এরকম একটি প্রশ্ন উত্থাপনের মাধ্যমে তিনি মূল দাবীকে অন্যদিকে টেনে নিয়ে
গিয়েছিলেন। দুর্নীতি
দমন অভিযানে জামায়াতী নেতাদের কেনো গ্রেফতার করা হচ্ছে না, প্রশ্ন করা হলে 'তারা
হয়তো দুর্নীতি করেনি' বলে আরেক প্রভাবশালী উপদেষ্টা সাফাই গেয়েছেন।
ফলে বর্তমান
তত্ত্বাবধায়ক সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে কি-না তা নিয়ে জনমনে সংশয় আরো বেশি
সৃষ্টি হয়েছে।
উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান দীর্ঘ-মেয়াদী সমস্যাটিও জাতিগত নিপীড়ন,
উগ্র সাম্প্রদায়িক ও উগ্র জাতীয়তাবাদী শাসন-শোষণের প্রবনতার সাথে যুক্ত।
এহেন মনোভাবের কারণেই
১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও শাসক-গাষ্ঠী এখনও পর্যন্ত
চুক্তি বাস্তবায়নে গড়িমসি করে চলছে।
ফলে শান্তিচুক্তি
স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও
পার্বত্য চট্টগ্রামে কাঙ্খিত গণতান্ত্রিক শাসন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক
সরকারের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা কমিটির দুয়েকটি বৈঠক
অনুষ্ঠিত হলেও তাতে কোন মূর্ত ফল বেরিয়ে আসেনি।
পক্ষান্তরে অপসারিত
উপদেষ্টা ব্যারিষ্টার মইনুল হোসেন শান্তিচুক্তি-বিরোধী সংগঠন 'পার্বত্য চট্টগ্রাম
সমঅধিকার আন্দোলনের' এক আলোচনায় যোগ দিয়ে শান্তিচুক্তিকে পর্যালোচনা করা দরকার বলে
জানিয়েছেন।
এছাড়াও, গত বছরের অক্টোবরে
শান্তিচুক্তি লঙ্ঘন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বৌর্ডের চেয়ারম্যান পদে
চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসিকে সাময়িক নিয়োগ করা হয়েছে বলে জানা
গেছে,যা দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বেলায় সরকার কি
উল্টো পথে হাঁটছে? কয়েক মাস আগে পার্বত্য শান্তিচুক্তির বিরুদ্ধে একটি মামলাও হয়েছে
হাইকৌর্টে।
এর পেছনে একটি প্রভাবশালী
স্বার্থান্বেষী উগ্র
সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী জড়িত রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গত
ডিসেম্বরে ঢাকায় এক
সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য-চট্টগ্রামের জন-প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন যে, খাগড়াছড়ির
বিভিন্ন এলাকায় এ-সরকারের আমলে সেটেলার বাঙালী কর্তৃক ভূমি জবর-দখল জোরদার হয়েছে।
এসব ঘটনাবলী
শান্তিচুক্তি বিষয়ে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কি অবস্থান তার ইঙ্গিতবহ বলে
অনেকে মনে করছেন।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে অনীহা প্রকাশ করা, দুর্নীতি দমন
অভিযানে জামায়াতী নেতাদের গ্রেফতার না করা, আভাষে জামায়াতীদের পক্ষে সাফাই গাওয়া,
মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী বক্তব্য-দানের পরও জামায়াতী নেতাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না
নেয়া, বিকল্প ব্যবস্থা না করে পাটকল বন্ধ করে দিয়ে খেটে খাওয়া মানুষের মুখের ভাত
কেড়ে নেয়া, প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কারে হাত না দেয়া, সর্বোপরি বিগত এক বছরেও
পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না করা বা প্রকারান্তরে চুক্তি-বিরোধী অবস্থান
নেয়া ইত্যাদি ঘটনা পরস্পর বিচ্ছিছন্ন নয়।
মনে
প্রশ্ন জাগে, বর্তমান শাসকগোষ্ঠীও কি আগেকার শাসকগোষ্ঠীর মতো
সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদ-উগ্র জাতীয়তাবাদের পৃষ্ঠপোষক? বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের
উপর অনেকের প্রত্যাশা অনেক বেশি ছিলো।
অনেকের ধারণা ছিলো, বিগত
রাজনৈতিক সরকারগুলোর মতো সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক
স্বার্থের সীমাবদ্ধতা
এ-তত্ত্বাবধায়ক সরকারের থাকবে না।
কিন্তু তার প্রমাণ মিলছে
কোথায়?
আপামর
দেশবাসীর দাবীতে সামিল হয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার
নিষিদ্ধ করা ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দলগুলোকে রেজিষ্ট্রেশন না দেয়ার মতো কাজগুলো
সরকার এখনও চাইলে শুরু করেত পারে বলে মনে হয়।
মঙ্গল
কুমার চাকমাঃ আদিবাসী লেখক।
১১
জানুয়ারী, ২০০৮
|