আদালতে জবানবন্দি
আনোয়ার হোসেন
[বুধবার ঢাকার
চীফ মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেইটের আদালতে লিখিত জবানবন্দি পাঠ করেন শোনান ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের কারাবন্দী চার অধ্যাপকের অন্যতম ডঃ আনোয়ার হোসেন।
পাঠকের
সম্ভাব্য আগ্রহের কথা বিবেচনা করে ঈষৎ সংক্ষেপিত আকারে অধ্যাপক আনোয়ারের বক্তব্য
ছাপা হলো
- সম্পাদক।
]
মহামান্য
আদালত,
আপনার এ-বিজ্ঞ
আদালতে শপথবাক্য উচ্চারণ করে আমার বক্তব্য পেশ করছি।
আমার
বক্তব্যের শুরুতেই জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর মৃত্যুর
অব্যবহিত পূর্বে যে-কবিতাটি রচনা করেছিলেন, তার শেষ কয়েকটি চরণ উচ্চারণ করবো।
মৃত্যুর
দুয়ারে দাঁড়িয়ে তিনি লিখেছিলেনঃ
'সত্য যে কঠিন,
কঠিনেরে ভালবাসিলাম
সে কখনও করে
না
বঞ্চনা।'
মহামান্য
আদালত,
আপনার সামনে
আমি নিঃশঙ্ক চিত্তে কিছু কঠিন সত্য উচ্চারণ করব।
কারণ
প্রথমতঃ ও প্রধানতঃ সত্য কখনও বঞ্চনা করে না।
দ্বিতীয়ত আমি নিঃশঙ্ক, কারণ আমি এমন একটি দেশে জন্মগ্রহণ করেছি, যে-দেশের জাতির জনক
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘাতকের বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে নিঃশঙ্ক চিত্তে জীবন
দিয়েছেন।
তৃতীয়তঃ
আমি কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের ভ্রাতা, যিনি ফাঁসির মঞ্চে তাঁর অমর বাণী উচ্চারণ
করেছেন, নিঃশঙ্ক চিত্তের চেয়ে জীবনে আর বড়ো কোনো সম্পদ নেই।
চতুর্থতঃ নিঃশঙ্ক চিত্তে কঠিন সত্য উচ্চারণ করব এ-জন্য যে, আমি ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, যে-বিশ্ববিদ্যালয়কে এ-দেশের মানুষ জাতির বিবেক বলে মনে করে।
এ-ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের কাছ থেকে মানুষ সত্য উচ্চারণ - তা যতই কঠিন হোক - শুনতে
আশা করে।
মহামান্য
আদালত,
আমি প্রথমেই
একটি বিষয় আপনার সুনজরে আনতে চাই,
তা হলো
আমাদের বিরুদ্ধে আনীত এ-মামলা কনো সাধারণ মামলা নয়।
এ-মামলার এ-কাঠগড়ায় আসামী হিসেবে শুধুমাত্র চারজন শিক্ষক ও উপস্থিত ১ জন ছাত্র এবং
অনুপস্থিত ১৪ জন ছাত্র আসামী নয়,
আজ
এ-কাঠগড়ায় আসামী হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে।
কাঠগড়ায়
আসামী করা হয়েছে জাতির বিবেককে।
আপাতঃ
দৃষ্টিতে কাগজে-কলমে শাহবাগ থানার একজন পুলিশ অফিসার এ-মামলার বাদী।
কিন্তু
আমরা জানি, দেশবাসী জানে, জাতির বিবেকের বিরুদ্ধে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে,
এ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আসল প্রতিপক্ষ কারা।
এরা
হচ্ছে সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই। তাই এ-মামলার চার্জ গঠনে মুখ্য ভুমিকা পালন
করেছেন এ-সংস্থার সদস্যরা।
শুধু
তাই নয়, প্রতিনিয়ত তারা উপস্থিত থাকেন এ-আদালতে।
তাই হে
মহামান্য বিচারক, আপনার বিজ্ঞ আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এ-আসামীর বক্তব্য শুধুমাত্র
'আমি নির্দোষ এবং শুধু কেনো নির্দোষ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
মহামান্য
আদালত,
ইতিহাসে একদিন
লেখা হবে, আপনি একটি ঐতিহাসিক মামলায় বিচারিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
যে-মামলায় শুধুমাত্র শিক্ষক কর্তৃক আন্দোলনে ছাত্রদের উস্কানি, তাদের বিক্ষোভ,
ভাংচুর, জরুরী অবস্থা ভঙ্গ, ইত্যাদি মূল বিষয় নয়,
তার
থেকে অনেক গভীরে এ-মামলার তাৎপর্য।
জাতির
বিবেক বিশ্ববিদ্যালয়কে হেয়-প্রতিপন্ন করা এবং দলিত করাই এ-মামলার মূল লক্ষ্য।
সাড়ে
চার মাস ধরে কারাভোগের পর, গত ৯ ডিসেম্বর থেকে আমাদের বিরুদ্ধে এ-মামলা শুরু হয়েছে।
চার্জ
গঠন ছাড়াও, সাক্ষীদের - অসহায় চায়ের দোকানদার, ফেরিওয়ালা, ফুলের দোকানের কর্মচারী,
পিয়ন, ভীত-সন্ত্রস্ত্র কন্সটেবলের - সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে।
আপনি,
বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দ এবং আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনজন ডীন, একজন বিভাগীয়
চেয়ারম্যান ও একজন ছাত্র অনেক ধৈর্য্যে সবকিছু শুনেছি।
তাই
আপনার প্রতি বিনীত অনুরোধ, এ-মামলার মূখ্য আসামী হিসেবে আমার বক্তব্য যদি একটু
দীর্ঘও হয়, তবু তা দয়া করে শুনবেন।
আপনার
সু-বিচেনার প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে বলছি, যদি আমার বক্তব্যের কোন অংশ নথিবদ্ধ করার
প্রয়োজন বোধ নাও করেন, তবুও প্রথম থেকে যে-ধৈর্য্য আপনি দেখিয়েছেন, সেই একই
ধৈর্য্যে আমার বক্তব্য আপনি শুনবেন।
মহামান্য
আদালত,
আমি আজ স্মরণ
করছি ঐতিহাসিক আরেকটি মামলার কথা, যেটি অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ১৯৭৬ সালে জেনারেল জিয়াউর
রহমানের সামরিক শাসন আমলে।
ঢাকা
কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে অনুষ্ঠিত একটি গোপন মামলা।
রাষ্ট্র
বনাম কর্নেল তাহের গং নামে পরিচিত সেই মামলায় কর্নেল তাহের বীর উত্তম-সহ ৩৪ জনের
মধ্যে আমিও একজন আসামী ছিলাম।
কাঁটাতার ঘেরা একটি অপরিসর বেষ্টনিতে হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় আমাদের রাখা হতো।
তার
বাইরে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট বিশেষ ট্রাইবুনাল ও আমাদের আইনজীবীরা বসতেন।
কারাগারের অভ্যন্তরে উদ্যত অস্ত্র হাতে এ-তথাকথিত আদালতের প্রহরায় রাখা হয়েছিলো
আর্মড ব্যাটেলিয়ান।
জেনারেল
জিয়া সেদিন কর্নেল তাহের ও মেজর জলিল-সহ বাকী সকল মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে
এ-ট্রাইবুন্যালের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেছিলেন ব্রিগেডিয়া ইউসুফ হায়দারকে, যে
ব্যক্তিটি ১৯৭১ সালে ঢাকায় অবস্থান করেও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেননি, পাকিস্তানীদের
পক্ষাবলম্বন করেছিলেন।
সে-গোপন
মামলায় কর্নেল তাহের জবানবন্দি দিয়েছিলেন বার-বার ইউসুফ হায়দার কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত
হয়েও।
আমাদের
প্রধান আইনজীবি বাংলার এককালীন মুখ্য মন্ত্রী আতাউর রহমান খান সেদিন বলেছিলেন,
বিজ্ঞ আদালত কর্নেল তাহেরকে বলতে দিন।
তিনি এই
মামলার মুখ্য আসামী।
কি
আশ্চর্য, ১৯৭৬ এর সে-গোপন মামলার ৩১ বছর পর আজকের এ-মামলায় তারই ভ্রাতা এই আমি
মুখ্য আসামী।
কর্নেল তাহের
সেদিন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ইউসুফ হায়দারকে জেনারেল জিয়া ও তার ডিজিএফআই-এর
রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে ন্যায় ও সত্যের পক্ষে অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
উল্লেখ
করেছিলেন, আর একটি ঐতিহাসিক মামলার কথা।
কিউবার
বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো, সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল বাতিস্তার মানকাডা দূর্গে
অভিযান চালিয়েছিলেন।
সে-অভিযান ব্যর্থ হয়েছিলো।
জেনারেল
বাতিস্তা ক্যাস্ট্রোর বিরুদ্ধে গোপন বিচার করেছিলেন।
মামলার
বিচারকের উদ্দেশ্যে ফিদেল তাঁর উদ্দীপ্ত ভাষণে বাতিস্তার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে
ন্যায়ের দন্ড ঊর্ধ্বে তুলে ধরার আহবান জানিয়েছিলেন।
সৌভাগ্য
ক্যাস্ট্রোর, সৌভাগ্য কিউবার জনগণের যে, বিচারক সেদিন সত্যের পক্ষ
অবলম্বন
করেছিলেন।
সসম্মানে মুক্তি দিয়েছিলেন ক্যাস্ট্রোকে।
ফিদেল
ক্যাস্ট্রো ও চে
গুয়েভারার নেতৃত্বে বিপ্লবী বাহিনী বিজয়ীর বেশে হাভানায় প্রবেশ করলে, বাতিস্তা
পলায়ন করেছিলেন।
ক্যাস্ট্রো প্রথম ডিক্রিতে সেই বিচারককে সম্মান জানিয়েছিলেন। তাঁকে কিউবার প্রথম
সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে।
ফিদেল
ক্যাস্ট্রো আজও বেঁচে আছেন শুধুমাত্র ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নয়, বর্তমান
পৃথিবীর উগ্র পরাশক্তি মার্কিন শাসনগোষ্ঠীকে সার্থকভাবে মোকাবেলা করে।
হে মহান
বিপ্লবী ফিদেল, আজ বাংলাদেশের একজন বিবেক, বন্দী শিক্ষক, আপনাকে স্মরণ করে সাহসে
উদ্দীপ্ত হচ্ছে, যে-সাহস আপনি ছড়িয়ে দিয়েছেন শুধু সারা ল্যাটিন আমেরিকাতে নয়, খোদ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ সারা পৃথিবীর তরুণ-তরুণীর মধ্যে।
মহামান্য
আদালত,
কী অপরাধ
করেছিলাম? গত পয়লা জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষকতার ৩৩ বছর পূর্ণ হয়েছে।
শিক্ষক
হয়েও গোপন বিচারে প্রায় পাঁচ বছর কারাগারে কাটিয়েছি।
তারপর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছি।
তা
সম্ভব হয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অর্জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ অধ্যাদেশের
জন্য, যা বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে উপহার দিয়েছিলেন যাতে জাতির বিবেক হিসেবে
আমরা স্বাধীনভাবে
সত্য
উচ্চারণ করতে পারি।
আজ
ভাবতেও অবাক লাগে, যেখানে বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান আরও
স্বাধীনতা
চাইছে, সেখানে
সরকার এবং তথা কথিত কিছু সুশীল সমাজ জাতির বিবেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়ত্বশাসনের
রক্ষাকবচ ১৯৭৩ আদেশ বাতিল করতে চাইছেন।
[এ-পর্যায়ে
অধ্যাপক আনোয়ার তার শিক্ষাগত অর্জন সমূহের বিস্তারিত বিবরণ দেন
-
সমপাদক]।
আমি বিনীতভাবে
উপরের কথাগুলো শুধু এ-কারণে উল্লেখ করছি, যাতে বিজ্ঞ আদালত একজন শিক্ষক ও বিজ্ঞানী
হিসেবে আমার সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করতে পারেন।
কারণ
স্বৈরশাসক এবং তাদের স্তাবকেরা অনেক সময় ঢালাওভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এই
বলে কটাক্ষ করেন যে, আমরা শুধু রাজনীতি করি।
মহামান্য আদালত, আমার গায়ে সেনা ইউনিফর্ম নেই।
আমার
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ আদেশ আমাকে রাজনীতি বিষয়ে অভিমত প্রকাশে বাধা দেয় না।
কিন্তু
[সেনা-প্রধান] ইউনিফরম পরে শুধু দেশে নয়, বিদেশেও রাজনীতি করে বেড়াচ্ছেন।
বিভিন্ন
মন্তব্য করে ভীত-সন্ত্রস্ত এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে জাতিকে ঠেলে দিচ্ছেন।
ট্রাস্ট
ব্যাংকে অনিয়ম করে তিনি অসত্য বক্তব্য রেখেছেন চাকুরী-বিধি লংঘন করে, তা আপনিও
নিশ্চয়ই জানেন।
বিজ্ঞ
বিচারক, আমার শিক্ষকতা জীবনে কোনো একাডেমিক কাজে কোন শৈথিল্য দেখাইনি।
আপনি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, আপনিও জানেন আমরা শিক্ষকেরা ছাত্রদের পিতা ও
অভিভাবকের মতো।
বিপন্ন
ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানোকে আমরা কর্তব্য জ্ঞান করি। এটা নতুন নয়।
১৯৯০ সালে
এরশাদের সামরিক
স্বৈরতন্ত্রের
বিরুদ্ধে
শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সভাপতি ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বে
শুধুমাত্র জরুরী অবস্থা ভঙ্গ নয়, কারফিউ ভেঙ্গে আমরা শিক্ষকেরা ছাত্র-ছাত্রীদের
সাথে রাস্তায় নেমে এসেছিলাম।
বিগত
জোট সরকারের আমলে রাতের অন্ধকারে পুলিশ যখন শামসুন্নাহার হলে ঢুকে যে ১৮ জন
ছাত্রীকে লাঞ্চিত করেছিলো
- যার
মধ্যে আমার বিভাগের একজন ছাত্রীও ছিলো - তাদের গভীর রাতে ধরে নিয়ে রমনা থানার হাজতে
ভরেছিলো, তখনও বিপন্ন ছাত্রী ও তাদের পাশে আন্দোলনরত ছাত্রদের পুলিশী আক্রমণ থেকে
বাঁচানোর জন্য আমরা শিক্ষকেরা রাস্তায় নেমে এসেছিলাম।
সে-সময়
কুখ্যাত পুলিশ অফিসার কোহিনূরের নির্দেশে সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে পুলিশের লাঠির
আঘাতে আমার হাঁটু ভেঙ্গে গিয়েছিলো।
সাড়ে
তিন মাস আমি শয্যাশায়ী ছিলাম।
তখন
সে-ঘটনায় তৎকালীন উপাচার্যকে পদত্যাদ করতে হয়েছিলো।
কোনো
শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয়নি।
গত ২০ আগস্ট
খেলার মাঠে আমাদের ছাত্র আক্রান্ত হয়েছিলো সেনা সদস্যের হাতে।
তারা
অপমানিত হয়েছিলো এবং বিক্ষুদ্ধ হয়েছিলো।
এখানে
বলে রাখি, খেলার মাঠের পাশে জিমনেসিয়াম, যেখানে ১১ জানুয়ারী থেকে ৪৬তম
ইন্ডিপেনডেন্ট ইনফেন্ট্রী ব্রিগেডের একটি ইউনিট অবস্থান করছিলো - সেটি
ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক শিক্ষার জন্য ব্যবহৃত হতো।
সকাল
থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীরা
বাধ্যতামূলকভাবে, একাডেমিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এখানে আসতো।
সেখানেই
তাদের হাজিরাও নেয়া হতো।
কিন্তু
সেনাবাহিনী দীর্ঘ আট মাস ধরে সেখানে অবস্থানের কারণে, ছাত্র-ছাত্রীদের কার্যক্রম
বন্ধ হয়ে যায়।
২০
আগস্টের ঘটনার প্রায় ১ মাস পূর্বে ৪৬তম ইনফেন্ট্রী ব্রিগেড অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার
জেনারেল হাকিমের সাথে আমার দেখা হয়েছিলো খেলার মাঠের গ্যালারীর দোতলায় অফিসার্স
ফীল্ড মেসে।
উপাচার্য-সহ ডীন ও আরও কয়েকজন শিক্ষককে মধ্যাহ্ন ভোজে তাঁরা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
এই
সুযোগে আমি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাকিমকে বলেছিলাম, সেনা ক্যাম্পটি সরিয়ে নিতে।
কারণ
ছাত্র-ছাত্রীরা জিমনেসিয়াম ব্যবহার করতে পারছিলো না বলে তাদের একাডেমিক কর্মসূচিতে
অসুবিধা হচ্ছিলো।
ব্রিগেডিয়ার হাকিম সব শুনে বলেছিলেন, অতি দ্রুত তা তারা সরিয়ে নিবেন।
ভোজন
পরবর্তী তাঁর বক্তৃতায় তা উল্লেখও করেছিলেন তিনি।
কিন্তু
পরিতাপের বিষয়, বর্তমান উপাচার্য তাঁর সমাপনী বক্তৃতায় সেনাক্যাম্প সরাবার কোন
প্রয়োজন নেই বলে মত দিয়েছিলেন।
শুধু
তাই নয়, ২১ ফেব্রুয়ারীতে এই জিমনেসিয়ামটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
গত
একুশে ফেব্রুয়ারীর প্রাক্কালে আমি উপাচর্য-সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কর্মকর্তাকে
বলেছিলাম, তারা যেনো সামরিক উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান, কিন্তু তারা কান
দেননি।
বাস্তব
সত্য হলো, জোট সরকারের ক্রীড়ানক এ-সব পদাধিকারীদের সেনা শাসকদের সামনে বাস্তব
সমস্যাগুলো তুলে ধরার নৈতিক সাহস ছিলো না
।
উপাচার্য
যে-সেনাক্যাম্প অন্যত্র সরিয়ে নিতে বলতে সাহস পাবেন না, একথাও আমি মধ্যাহ্ন ভোজের
দিন ব্রিগেডিয়ার হাকিমকে বলেছিলাম।
মহামান্য
আদালত,
সেনা সদস্যদের
হাতে লাঞ্চিত হওয়ার ঘটনায় ছাত্ররা বিক্ষুদ্ধ হয়েছিলো।
বিক্ষুদ্ধ ছাত্রদের উপর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নগ্ন হামলায় বহু ছাত্র আহত
হয়েছিলো, রক্তাক্ত হয়েছিলো।
আমি-সহ
বহু শিক্ষক ছুটে গিয়েছিলেন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।
আমাদের
ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ইউসুফ হায়দার সেখানে ঘোষণা করেছিলেন, 'এখন বিপন্ন
ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের একমাত্র কর্তব্য।'
পুলিশের হাতে তিনি নিজেও আহত হয়েছিলেন।
এ-ঘটনা
থেকেই বোঝা যায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতো বেপরোয়া আচরণ করেছিলো সেদিন।
আমরা
নানাভাবে চেষ্টা করেছি পরিস্থিতি শান্ত করতে।
আমরা ২১
আগস্ট শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে জরুরী সাধারণ সভা করে সর্ব-সম্মত সিদ্ধান্তের
ভিত্তিতে যে-প্রস্তাবসমূহ গ্রহণ করেছিলাম, তার কোনোটিই সরকার-বিরোধী ছিলো না।
আর
প্রস্তাবগুলো আমার বা কোনো শিক্ষকের ব্যক্তিগত প্রস্তাব ছিলো না।
আমরা
জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার চেয়েছি।
এটিতো
নতুন নয়।
১১
জানুয়ারী সেনা সমর্থিত বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার ১ সপ্তাহের মধ্যে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৯ জন শিক্ষক যৌথ-স্বাক্ষরে অবিলম্বে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার
করে জনগণের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে ৩ মাসের মধ্যে একটি
স্বচ্ছ,
নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করে নির্বাচিত জন-প্রতিনিধিদের হাতে
ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছিলাম।
শিক্ষকদের সেই যৌথ বিবৃতির ১
নম্বরে স্বাক্ষরকারী
ছিলেন প্রবীণ
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।
মহামান্য-আদালত,
আগস্ট ঘটনা
তদন্তে বিচারপতি হাবিবুর রহমান খানকে প্রধান করে একটি উচ্চ-ক্ষমতা সম্পন্ন বিচার
বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিলো।
বিচারপতি হাবিবুর রহমান শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করেছিলেন।
আমরা
অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যে, কারাবন্দী চার শিক্ষকের সাক্ষ্যও তিনি গ্রহণ করেছিলেন।
তদন্ত
কমিশনের রিপৌর্ট তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রদান করে
সর্নিবন্ধ অনুরোধ করেছিলেন, তদন্ত রিপৌর্টটি যেনো অবিলম্বে প্রকাশ করা হয়।
নিতান্ত
পরিতাপের বিষয়, সে-রিপৌর্টটি প্রকাশিত হয়নি।
কেনো
হলো না, কাদের ইঙ্গিতে হলো না, তা আমরা জানতে চাই। কারণ তার সাথে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্রদের ভাগ্য জড়িত।
মাননীয়
বিচারপতি একটি সাংবাদিক
সম্মলনের
মাধ্যমে
রিপৌর্টের মূল বিষয়গুলো তুলে ধরেছিলেন।
বলেছিলেন, ২০ আগস্টের ঘটনা আকস্মিক, ২১ আগস্টের ঘটনা
স্বতঃস্ফূর্ত,
২২ আগস্টের
ক্যাম্পাসের বাইরের ঘটনায় অন্যান্য শক্তির সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।
শিক্ষক-ছাত্রদের বিষয়ে সরকার যেনো সর্বোচ্চ ইতিবাচক দৃষ্টি দিয়ে বিষয়টি দেখেন, তার
জন্য প্রধান উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেছিলেন এবং বলেছিলেন অতি অল্প সময়ের মধ্যে তার শুভ
ফলাফল পাওয়া যাবে।
মহামান্য আদালত, আজ আপনার বিজ্ঞ আদালতে দাবী করছি সেই তদন্ত রিপৌর্ট অনতিবিলম্বে
প্রকাশ করা হোক।
মহামান্য
আদালত,
আগস্টের ঘটনায়
আমরা শিক্ষকেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের বাইরে কোন সমাবেশ বা মিছিলে অংশ
নেইনি।
কিন্তু
আপনি নিজেও তো জানেন, ঢাকার প্রধান সড়কে কতবার কত জঙ্গী মিছিল হয়েছে বর্তমান জরুরী
অবস্থায়।
কাউকে
গ্রেফতার করা হয়নি, মামলা হয়নি।
অন্যদিকে আমাদের শিক্ষক-ছাত্রদের বিরুদ্ধে কেমন বৈষম্যমূলক ও প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা
নেয়া হলো, তা দেশবাসী জানে।
মহামান্য
আদালত,
২২ আগস্ট
কারফিউ জারির পরদিন, ২৩ আগস্ট দুপুরে ডিজিএফআই-এর পক্ষ থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল
আমিন আরও কয়েকজন অফিসার-সহ প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী, ডক্টর
হারুন-অর-রশিদ ও আমার সাথে আলোচনার জন্য এসেছিলেন।
প্রায়
তিন ঘন্টা আলোচনা হলো, কারফিউ জারীর পর থেকে তাঁদের সাথে আলোচনা চলাকালে যৌথ বাহিনী
যেভাবে হলে-হলে এবং ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় এবং আজিজ সুপার মার্কেটে
-যেখানে ছাত্ররা কারফিউর কারণে আশ্রয় নিয়েছিলো -
নির্মম
অত্যাচার চালাচ্ছিলো, সে-বিষয়গুলো তাঁদের কাছে তুলে ধরেছি।
অনুরোধ
করেছি অবিলম্বে তা বন্ধ করতে।
তাদের
বোঝাতে সক্ষম হয়েছি, আমরা ছাত্র-শিক্ষকেরা আন্তরিকভাবে চাই সেনাবাহিনী যেনো আর
ছাত্র-শিক্ষক-জনতার মুখোমুখি না হয়, বিতর্কিত না হয়।
আমরা
একে অন্যের প্রতিপক্ষ নই।
জানিয়েছিলাম, সেনাবাহিনী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেনো কোনভাবেই ব্যর্থ না হয়, কারণ
তাতে দেশের মহা সর্বনাশ হবে।
তারা
সম্পূর্ণভাবে আমাদের সাথে একমত হয়ে আরও উচ্চ-পর্যায়ে আলোচনার আশ্বাস দিয়ে ফিরে যান।
মহামান্য
আদালত,
নিতান্ত
পরিতাপের বিষয় ঐদিন অর্থাৎ ২৩ আগস্ট রাত ১২টার পর-পর যৌথ-বাহিনী হানা দিয়েছিল ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় টাওয়ার ভবনে।
আমরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, দাগী দুস্কৃতী নই।
কিন্তু
সেই গভীর রাতে আমাকে ও আমার সহকর্মী ডঃ হারুন-অর-রশিদকে গ্রেফতার করা হলো,
শাহবাগ
থানায় নেয়ার নাম করে চোখ বেঁধে নেয়া হলো অজ্ঞাত স্থানে, তা আমাকে মনে করিয়ে দিলো
পাকিস্তানী দখলদার সৈনিকদের আচরণের কথা।
এ-প্রসঙ্গে মনে পড়লো সেই একই চন্ডনীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে রাতের বেলা বাড়ী ঘেরাও করে
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে
গ্রেফতারের কথা।
আমরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারাণ সভার সিদ্ধান্তক্রমে ডিজিএফআই-এর
রক্তচক্ষু ও হুমকিকে উপেক্ষা করে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছি।
কারণ
এ-অপ্রয়োজনীয় গ্রেফতারকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধক হিসেবে আমাদের মনে
হয়েছে।
পরে একই
কায়দায় গ্রেফতার করা হয়েছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে।
মহামান্য
আদালত,
গ্রেফতার করে
যে-অজ্ঞাতে স্থানে গভীর রাতে আমাকে নেয়া হয়েছিলো, তা আমার অত্যন্ত পরিচিত।
১৯৭৬
সালে জেনারেল জিয়ার শাসন আমলে আমাকে গ্রেফতার করে সেখানে সাড়ে তিন মাস রাখা হয়েছিলো।
এবারে
রিমান্ডে রাখা হয়েছে সরকারী হিসাবে ৮ দিন, কিন্তু বাস্তবে ১২ দিন।
ডিজিএফআই-এর ঐ নির্যাতন কেন্দ্রে রিমান্ডে নেয়ার পর যখন আবার কৌর্টে হাজির করা হয়,
তখন কী ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক বৈকল্যে ভূক্তভোগী নিপতিত হয়, মহামান্য আদালত তা
আপনারা জানেন।
তথ্য
আদায়ের নামে সেখানে যা-যা করা হয়, তার সবই প্রয়োগ করা হয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
এই শিক্ষকের প্রতি।
প্রথম,
দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ডিগ্রীর নির্যাতনমূলক জিজ্ঞাসাবাদ - তার সবই চালানো হয়েছিলো।
চোখ
বন্ধ অবস্থায় দিন-রাতের হিসাব ছিলো না।
মনে পড়ে
কালো কাপড়ের পট্টিতে চোখ-বাঁধা অবস্থায় আমাকে একজন জিজ্ঞাসা করেছিলেন 'বলুন ব্ল্যাক
হৌল কাকে বলে? আমি পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র নই।
তারপরও
বলেছিলাম আমার জানা-মতে, মহাকাশে এটি সেই কৃষ্ণ গহ্বর যেখানে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এত
বেশি, যা এমনকি আপতঃভরহীন, আলোকে পর্যন্ত শুষে নেয়।
তারা
বলেছিলেন, আপনি সেই ব্ল্যাক হৌলে আছেন।
মহামান্য
আদালত, এই ব্ল্যাক হৌলে শুধুমাত্র চোখ বেঁধে দৃশ্যমান আলো কেড়ে নেয়া হয় না, এখানে
হ্যারি পটার উপাখ্যানের আজকাবান দূর্গের যে-ডিমেন্টরদের কথা বলা হয়েছে, তারা শুষে
নেয় মানুষের আত্মাকে।
কারাগারে থাকার কারণে পড়বার জন্য আমার মেয়ে দিপান্বিতা আমাকে হ্যারি পটারের
উপাখ্যানগুলো পাঠায়।
রচয়িতা
জেকে রওলিং লিখেছেন
'The
dementors suck the hope and happiness. They suck the soul'।
ডিজিএফআই এর ব্ল্যাক হৌলেও সে-চেষ্টা করা হয়েছিলো।
মহামান্য আদালত, আজ শপথ উচ্চারণ করে জানাচ্ছি, তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।
তারা
আমার আশা-ভরসা, সুখ ও স্বপ্নকে শুষে নিতে পারেননি।
পারেননি
আমার আত্মাকে শুষে নিতে।
আমি তাদের
প্রশ্ন করেছি, একটি স্বাধীন দেশের সেনা গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্য আপনারা।
আমাকে
হত্যা করতে পারেন কিন্তু ভাঙ্গতে পারবেন না।
আর সেই
চেষ্টাইবা কেনো করবেন? তাদের বলেছি, দেশের গরীব জনসাধারণের পয়সায় আপনাদের পোষা
হচ্ছে, কিন্তু দেশের কোন উপকারটি করেছেন আপনারা? ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের কালো রাত্রিতে
সেনাবাহিনীর ষড়যন্ত্রকারীরা যখন জাতির জনক দেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা
করেছিলো তার পরিবার পরিজন-সহ, তখন কোথায় ছিলো ডিজিএফআই? কারাগারের অভ্যন্তরে চার
জাতীয় নেতাকে সেনা কুচক্রীরা গুলি ও বেয়নেটে যখন নির্মমভাবে হত্যা করলো, তখন কোথায়
ছিলো ডিজিএফআই? জেনারেল জিয়ার নির্দেশে এই গোয়েন্দা সংস্থা কর্নেল তাহের বীর
উত্তমকে হত্যা করেছিলো বিচারের নামে প্রহসন করে।
প্রশ্ন
করেছি, ২১ আগস্ট যখন জোট আমলে প্রকাশ্য দিবালোকে বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে
হত্যা করার জন্য গ্রেনেইড ও গুলি চালানো হয়েছিলো, তখন কোথায় ছিলেন আপনারা? জঙ্গীরা
বলেছে, তারা শুধু গ্রেনেইড ছুঁড়েছিলো, গুলি করেনি।
গাড়ীতে
এসে গুলি করে দ্রুত করা চলে গেলো, সে রহস্যতো উদঘাটন আজও হলো না।
সেই
নৃশংস নারকীয় ঘটনায় অলৌকিক ভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা।
কিন্তু
আইভি রহমান-সহ ২৪ জন মানুষ করুণ মৃত্যু বরণ করেছিলেন।
তার কোন
কূল-কিনারা আজও হলো না।
তার মূল
রহস্য কোথায়, তা কি সচেতন নাগরিকরা বোঝেন না? ৬৩ জেলায় একযোগে জঙ্গি বোমা বর্ষণ
হলো, কোথায় ছিলো ডিজিএফআই? বিশ্বাস করুন মহামান্য আদালত, তারা আমার কোন প্রশ্নের
উত্তর দিতে পারেনি।
বলেছি,
আমাকে কেনো ধরে এনেছেন? আমিতো সেই পিতা-মাতার সন্তান, যারা তাঁদের ৭ পুত্র ও ২
কন্যাকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন।
এদের
মধ্যে ৪ জন মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বসূচক খেতাব লাভ করেছিলেন।
তাদের
বলেছি, জীবনে জানামতে কোন অন্যায় করিনি, আপনাদের কথিত ষড়যন্ত্রতো দূরের কথা।
মহামান্য
আদালত,
কুসুমেও কীট
থাকে।
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়-সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যে-শিক্ষকেরা নৈতিকভাবে অধঃপতিত
হয়েছেন, দূর্নীতি করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে মলিন করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে
দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে বার-বার দাবী করেছি।
তারাতো
সবাই স্বপদে
বহাল
আছেন। তাদের সাথেই আপনাদের দেন-দরবার।
সাথে-সাথে মহামান্য আদালত, আমি আপনাকে বলবো, দেশে-দেশে যুগে-যুগে চরম প্রতিক্রিয়ার
দূর্গেও অশুভ শক্তির পাশাপাশি শুভ শক্তিও আছে।
তাই
মানব সভ্যতা এখনও টিকে আছে।
সেকারণেই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সুদূর পাকিস্তানের কারাগারে ডিমেন্টররা বঙ্গবন্ধুকে
হত্যা করতে পারেনি।
ডিজিএফআই-এর নির্যাতন কেন্দ্রে তেমন শুভ শুক্তির সন্ধান আমি পেয়েছি।
মধ্য
রাতে কিংবা তারও পরে তারা পরম শ্রদ্ধায় ও সম্ভ্রমে আমার সাথে আলোচনা করেছেন।
আমার
প্রতি যে-নিষ্ঠুর অন্যায় করা হয়েছে, তার জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
জানতে
চেয়েছেন দেশের সমস্যা সমাধানে আমার মতামত।
আমি
তাদের নাম দিয়েছিলাম মধ্যরাতের
স্বপ্নচারী।
হে
স্বপ্নচারীগণ,
এ-জবানবন্দীতে আমি তোমাদের পরম কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছি।
তোমাদের
পরিচয় জানি না, কারণ আমার চোখ বন্ধ ছিলো।
কিন্তু
হে বন্ধুরা আমার, হৃদয়ে তোমাদের স্থান দিয়েছি।
মহামান্য
আদালত,
আরেকটি বিষয়ে
আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
তা হলো
আমার ক্ষমা প্রার্থনা বিষয়ে।
আমি
আগেই বলেছি ২০ আগস্ট ছাত্ররা লাঞ্চিত, অপমানিত ও রক্তাক্ত হয়েছিলো।
ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনচেতা ছাত্র-ছাত্রীদের আত্ম-মর্যাদায় কঠিন
আঘাত করা হয়েছিলো।
তাই
বিক্ষুদ্ধ হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভ করেছে তারা।
ইউনিফর্মধারী সেনা সদস্য লাঞ্চিত হয়েছেন।
একটি
সেনাযান ভস্মীভূত হয়েছে।
সেগুলো
কারা করেছে, তা আমি জানি না।
তারপরও
ছাত্র বিক্ষোভের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যা হয়েছে, ছাত্রদের অভিভাবক হিসেবে সম্মানিত
জোয়ান থেকে শুরু করে সেনাপ্রধান পর্যন্ত সকলের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা
করেছিলাম, সেনা বাহিনীর আহত মর্যাদাবোধের যেনো দ্রুত নিরাময় হয়।
রিমান্ডে থাকাকালে আমি নিজে প্রস্তাব করেছিলাম এ-বিষয়ে আমি কোর্টে বলবো।
তারা
অবাক হয়েছিলো।
আমাকে
অনুরোধ করেছিলেন, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সামনে আমার কথাগুলো বললে সেনাবাহিনীর বড়ো
উপকার হবে।
সারাদেশে সেনা-সদস্যরা তা শুনতে পাবে।
ভুল
বোঝাবুঝির অবসান হবে।
আমি
শর্ত দিয়েছিলাম, আমার মতো করে আমাকে বলতে দিতে হবে।
তারা
কথা দিয়েছিলেন, তারা তা রক্ষা করবেন।
আমার
ক্ষমা প্রার্থনা মিডিয়াতে শুনে দেশবাসী হয়তো ভেবেছেন আমাকে চাপ প্রয়োগ করে বাধ্য
করে তা করানো হয়েছে।
আজ শপথ
করে বলছি, পৃথিবীতে এমন কোন শক্তি জন্মগ্রহণ করেনি, যারা কর্নেল তাহেরের ভাই ডঃ
আনোয়ার হোসেনকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কিছু বলতে বাধ্য করতে পারে।
কিন্তু
মহামান্য আদালত, আমার সাথে প্রতারণা করা হয়েছিলো।
আমার
সম্পূর্ণ বক্তব্য প্রচারে বাধা দেয়া হয়েছিলো।
আমার
সেই উক্তি সেনা-সদস্যদের মতো 'শিক্ষক-ছাত্র-নাগরিক সকলের আত্মমর্যাদা আছে, আর কখনও
যেনো তাতে আঘাত করা না হয়' তা প্রচার করা হয়নি।
আমার
অপর বক্তব্য, 'সেনাবাহিনীর মূল দায়িত্ব ছিলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে দেশে অতি দ্রুত
একটি গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়তা করা, যাতে নির্বাচিত
বেসামরিক সরকারের হাতে দেশের শাসনভার হস্তান্তর করা যায় এবং সেনাবাহিনী গৌরবের সাথে
ব্যারাকে ফিরে যেতে পারে।'
কিন্তু তা বলার পূর্বেই আমাকে ধাক্কা দিয়ে কৌর্টে ঢুকিয়ে দেয়া হয়।
দেশের
মঙ্গলের জন্য সেনাবাহিনী যনো ছাত্র-শিক্ষক-জনতার প্রতিপক্ষ হিসেবে আর অবস্থানে না
আসে, ছাত্ররা যেনো রক্ষা পায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেনো রক্ষা পায়, সে-কারণে কোনো
গ্লানিবোধ না করে একজন শিক্ষকের বিবেক ও সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নীতি-নিষ্ঠ সবল ও
উচ্চতর অবস্থান থেকে আমি সেই ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলাম।
কিন্তু
মহামান্য আদালত, দেশবাসী জানেন, আমার সেই ক্ষমা প্রার্থনাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা হয়েছে,
যদিও আমি জানি সেনা-সদস্যদের হৃদয়ে আমার বক্তব্য গভীর দাগ কেটেছিলো।
আমাকে
রিমান্ডে ফেরত নেয়ার পর অধিকাংশ সেনা-কর্মকর্তার বক্তব্যে আমি তা অনুধাবন করেছি।
তারা
বলেছিলেন,
Sir, you have shown fathomless
magnamity।
আমি গভীরভাবে
বিশ্বাস করি সেনা-সদস্যরা সেভাবেই আমার আন্তরিক আহ্বানকে গ্রহণ করেছিলেন।
কিন্তু
কেউ-কেউ আমাকে উপহাস করেছিলেন, কেনো সাধারণ সেপাহীদের আমি সম্মানিত হিসেবে সম্বোধন
করেছি।
মহামান্য
আদালত,
সিপাহীদের যদি
সম্মানিত না বলি আর কাদের বলবো?
[এ-পর্যায়ে,
১৮৫৭ সালে সিপাই বিদ্রোহ থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশে সিপাহীদের গৌরবময় ভূমিকার
কথা সবিস্তারে উলল্লেখ করেন অধ্যাপক আনোয়ার
-
সম্পাদক]
মহামান্য
আদালত, আরও একটি সত্য আপনার সামনে তুলে ধরতে চাই।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ, কর্নেল হায়দার ও কর্নেল
হুদা অভ্যুত্থানী সিপাহীদের হাতে জীবন দেননি।
তাহেরের
কঠোর নির্দেশ, 'কাউকে হত্যা করা যাবে না' - তা অভ্যুত্থানী সিপাহীরা অক্ষরে-অক্ষরে
পালন করেছিলেন।
কয়েকজন
অফিসার হত্যার ঘটনা ঘটেছিলো, তা ঘটিয়েছিল ষড়যন্ত্রী মুশতাকের সৃষ্ট ঘাতক চক্র যারা
যোগাযোগ রাখছিলো জেনারেল জিয়ার সাথে।
এই
জিয়াউর রহমানের ইঙ্গিতেই তার অনুগত কয়েকজন অফিসারের সরাসরী নেতৃত্বে খালেদ, হুদা ও
হায়দারকে হত্যা করা হয়েছিলো।
এরপর
জিয়াউর রহমান ও জেনারেল মঞ্জুরের হত্যাকান্ডের সাথেও কোন সিপাহী যুক্ত ছিলো না।
আমি
গভীরভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিপাহীরা এবং ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ
অফিসাররা কোন উচ্চাভিলাষীদের হাতিয়ার হিসেবে জনগণের গণতান্ত্রিক শাসনের বিপরীতে কোন
অসাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রে অংশ নেবে না-শুধু নয়, জনতার সাথে মিলে তা
প্রতিহত করবে।
তত্ত্বাবধায়ক
সরকার, সেনাবাহিনী, তথাকথিত সুশীল সমাজ, কাছের এবং দূরের বিদেশী শক্তিধরেরা এতোদিনে
নিশ্চয়ই বাংলাদেশের মানুষের মনের ভাষাটি পড়তে পেরেছেন।
তা হলো,
যত দরিদ্র, অনাহার, দুঃখ-যাতনার মধ্যে থাকুক, এ-দেশের সাধারণ মানুষ প্রকৃত
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়া আর অন্য শাসন তা যত নতুন চমকই আসুক - তা গ্রহণ করবে না।
জাগো
বাংলাদেশের নামে সরকারী প্রচারযন্ত্রে যতো প্রচারণাই চলুক, রাষ্ট্রের পয়সায় যতো
কোটি-কোটি এসএমএস পাঠানো হোক না কেনো, মানুষের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে, তাদের
সরাসরি অংশগ্রহণে গণতান্ত্রিক সমাজ বিনিমার্ণের ধীর কিন্তু টেকসই পথ ছাড়া অন্য কোন
বিকল্প আমাদের সামনে নেই।
মহামান্য
আদালত,
আজ দেশবাসী
সবার মনে একটি প্রশ্ন, আসলে দেশ চালাচ্ছে কারা? মানুষ মনে করে একটি ভৌতিক অবয়বহীন
সরকার দেশ পরিচালনা করছে।
দেশে
চলছে অঘোষিত সামরিক শাসন এবং সেনাবাহিনীর অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ সেনাবাহিনীর নামে তা
করছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার
স্বাধীনভাবে
তাদের
সংবিধান-নির্ধারিত কাজ করতে পারছে না।
তাই গত
এক বছরে দেশের এতো দুর্গতি।
ক্রমাগত
চলছে পেছন যাত্রা।
দেশে
চালানো হচ্ছে ভুল এবং ভয়ের শাসন।
তাই
জনগণের বহু দিনের বহু সংগ্রামের
স্বপ্ন
হিসেবে যে-স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সৃষ্টি হয়েছিলো,
সেগুলোর
কোনটাই বর্তমান জরুরী অবস্থায় ভুল ও ভয়ের শাসনে স্বাধীনভাবে
কাজ
করতে পারছে না।
প্রশ্নবিদ্ধও করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
নির্বাচন কমিশনে কমিশনার
ব্রিগেডিয়ার (অবঃ) সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে সমকাল পত্রিকায় পর-পর দুদিন ধরে
শিরোনাম সংবাদ প্রকাশিত হল, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিঃসহায় আদিবাসীদের জন্য
বরাদ্দকৃত ২০ হাজার টন গম আত্মসাতের খবর।
কিন্তু তিনি জামায়াত
সমর্থক বলে তাঁকে বসিয়ে দেয়া হল এ-গুরুত্বপূর্ণ কমিশনে।
দুদকের চেয়ারম্যান
হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে লেঃ জেঃ (অবঃ) হাসান মশহুদ চৌধুরীকে।
ছাত্র জীবনে ইসলামী
ছাত্র শিবিরের পূর্বসুরি ইসলামী ছাত্র সংঘের কর্মী ছিলেন তিনি।
এ-সেনানায়ক অনেক ভালো
কথা বলেন, কিন্তু টাস্ক ফৌর্সের কথায় তাঁর চলতে হয়।
ফাইল হাতে দেশের প্রধান
বিচারপতির অফিসে তিনি ঢুকে পড়েন।
হাইকোর্টের সব রায়
সুপ্রিম কৌর্টে পাল্টে যাওয়ার সম্পর্কে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অভিযোগ
এবং সে-কারণে বিচার বিভাগ পৃথক হলেও সুবিচার না পাওয়ার আশঙ্কা, কীভাবে অবিশ্বাস
করবে দেশের নাগরিকেরা।
মহামান্য
আদালত,
বিএনপি-জামাত জোট এবং তাদের যুক্ত নানা গোয়েন্দা সংস্থা এবং দলীয়কৃত বেসামরিক
প্রশাসনের নীল-নকশার নির্বাচনের বিরুদ্ধে জীবন দিল কত সাধারণ মানুষ।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪
দল ঘোষণা করল ২৩ দফা সংস্কার কর্মসূচি।
তারপর মহাজোট হলো।
সে-আন্দোলনের ফসল
হিসেবেই এসেছিল ১১ জানুয়ারীর সরকার।
জাতিসংঘের হুঁশিয়ারী
ছিলো সামরিক শাসন জারী হলে শান্তি-মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাজ বন্ধ হয়ে যাবে।
তাই এসেছিলো সামরিক
শাসনের বদলে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
এ-সরকারকে আপামর জনগণ
স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনও জানিয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল
সমর্থন জানিয়েছিলো।
তাই বলা যায়, শুভ
সংস্কার যতটুকু হয়েছে তার প্রধান দাবীদার জনগণ এবং গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল
রাজনৈতিক শক্তি।
এ-সত্য কেউ
অস্বীকার
করতে পারে না।
কিন্তু জনগণ কী দেখলো?
আন্দোলনে জীবন দিল মানুষ।
পুলিশের ট্রাকের নিচে
জীবন প্রদীপ নিভে গেল গরীব মজুরের, আর ক্ষমতায় এসেই সেনা-নায়কেরা নিজেদের কাঁধে
নিজেরাই লাগিয়ে নিলেন মেজর জেনারেল, লেঃ জেনারেল ও জেনারেলের ব্যাজ।
কোন চক্ষু লজ্জাও হলো না
তাদের।
অন্যদিকে ভুল ও ভয়ের শাসনে দেশে
চলছে নীরব দুর্ভিক্ষ।
ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ,
কেউ কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
দূনীর্তিও কমেনি, শুধু
রেইট বেড়ে গেছে।
মনে পড়ে, ১৯৭৬ সালে জিয়ার শাসন
আমলে ডিজিএফআই-এর নির্যাতন কেন্দ্রে আমার অবস্থানকালে প্রকাশনা শিল্পের পথিকৃৎ
সদ্য-প্রয়াত মহাপ্রাণ চিত্তরঞ্জন সাহাকে ধরে নিয়ে আমার পাশের কক্ষে রাখা হয়েছিলো।
অভিযোগ, তিনি ভারতীয় চর।
দিন পনের পর চিত্তদা'
বললেন, প্রফেসর সাহেব, আগামীকাল আমাকে বাসায় রেখে আসবে।
খরচ মোট ৫৬ হাজার।
আমি একজন লেকচারার হলেও
চিত্তদা আমাকে প্রফেসর বলেই
সম্বোধন করতেন।
সেই '৭৬-এ ৫৬ হাজার টাকা
কম ছিলো না।
শুনতে পাই তারই পরিমাণ এখন
পৌঁছেছে কোটি টাকায়।
প্রধান উপদেষ্টার অফিসের প্রায় পাশে, ক্যান্টনমেন্টের অতি
নিকটে রাঙগস ভবন
ভেঙ্গে পড়ে হতভাগ্য গরীব-মজুরদের লাশ দিনের পর দিন ঝুলে থাকলো, আমাদের সেনাবাহিনী
বা সরকারী কোন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব হলো না সে-লাশগুলো উদ্ধার করা।
শেষ পর্যন্ত ঐ গরীব
মানুষদের আত্মীয় স্বজনরা
এসে নিজেরাই সে-সব লাশ উদ্ধার
করে নিয়ে গেলো।
ভেবে দেখুন মহামান্য আদালত, কী
সুশাসনেই না চলছে দেশ।
মহামান্য
আদালত,
আমি
কারাগারে আসার পূর্বে বেশ কয়েকবার একটি কথা উচ্চারণ করেছি। তা হলো, 'বাঘের পিঠে
সওয়ার হলে, তা থেকে আর নামা যায় না' এ-প্রবাদ বাক্যকে আমাদের সেনা নায়কেরা ভুল
প্রমাণ করবেন।
কিন্তু বিটিভিতে এদের অবিরাম
বন্দনা, সারা দেশ থেকে প্যারেড গ্রাউন্ডে জড়ো হওয়া স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের
সম্মেলনে সেনা প্রধান যে-বক্তব্য রেখেছেন এবং একজন ছাত্র বিবিসিতে যেমন বলেছে, ওই
সেনানায়কেরা মনে করে দেশে তারাই একমাত্র সম্পদ ও রক্ষাকর্তা, অন্য কেউ নয়।
রাজনীতিবিদদের ঘরে আবদ্ধ রেখে নিজেরা দেবদূত সেজে রাজনীতি করে বেড়াবেন, তা দেখে ও
শুনে মানুষের মনে নানা আশঙ্কা।
যে-পুরোনো চিত্রের সাথে
এ-দেশবাসী অতি পরিচিত, তারই কি পুনরাবৃত্তি ঘটবে আবার?
এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে,
প্রাকৃতিক সাইক্লৌন সিডরের মহাদুর্যোগে সুন্দরবনের হিংস্র বাঘ পর্যন্ত ঠাঁই
নিয়েছিলো লোকালয়ে নিঃসহায় মানুষের পাশে।
আর এখন যারা বাঘের পিঠে
সওয়ার হয়েছেন, তারা তো আসল বাঘ নয় - কাগুজে বাঘ।
তাই কেউ যেনো ভুল না
করেন। সাইক্লৌন
সিডরের চেয়ে আরও বড়ো গণমানুষের
মহাপ্লাবনের সামনে ভেসে যাওয়ার আগেই তারা যেনো সসম্মানে অবতরণ করেন।
একমাত্র প্রকৃত
গণতান্ত্রিক সরকার সবচাইতে সুষ্ঠুভাবে আমাদের সেনাবাহিনীকে দেশের কাজে এবং কল্যাণ
নিয়োজিত করতে পারবে। সেখানে কোন ভবনের হস্তক্ষেপ থাকবে না।
সেনাবাহিনী হবে জনগণের
সেনাবাহিনী, রাজনীতিতে এবং গণতান্ত্রিক শাসনে তারা কখনই হস্তক্ষেপ করবে না।
মহামান্য
আদালত,
যুদ্ধাপরাধীদের বিশেষ ট্রাইবুনালে বিচারের দাবীতে আজ সারা জাতি ঐক্যবদ্ধ।
কিন্তু ভুতূড়ে সরকার
নির্বিকার।
গত ১ বছরে এ-সব যুদ্ধাপরাধীর
গায়ে আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি।
বিভিন্ন সময়ে সামরিক
সরকার এবং বিশেষ করে বিগত জামাত-বিএনপি জোট সরকারের আমলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন
গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে এরা অবস্থান পাকা করেছে।
তারা সে-সমাবস্থানে
সুরক্ষিতই আছে।
বাংলা ভাইদের মদদদাতা প্রাক্তন
স্বরাষ্ট্র সচিব ওমর
ফারুকের কিছুই হয়নি।
খাদ্য-ত্রাণ ও দুর্যোগ
ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সচিব পদে আছেন আয়ুর মিয়া, যাকে ১৯৭১ সালে
বরিশাল শহরে রাজাকার হিসেবে ঘোরানো হয়েছিলো।
রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির
মতো প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান করা হয়েছে জামায়াতের সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল
বিভাগের অধ্যাপক আব্দুর রবকে।
বিসিএসআইআর-এর
চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান জামায়াতের প্রভাবশালী সদস্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
শুরু করে অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াত সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজ,
নীতিভ্রষ্ট উপাচার্য ও অন্যান্য পদাধিকারীগণ যথাস্থানেই আছেন।
সংবাদপত্র প্রকাশনা
শিল্পের মালিকদের বন্দী করে হাজার-হাজার সাংবাদিকের রুটি-রুজির পথ বন্ধ করে তাদের
শুকিয়ে মারা হচ্ছে।
কিন্তু জামায়াতের কোন
আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যাদের সাথে জঙ্গীদের অর্থ-সহায়তা দানের কথা সবারই জানা, তাদের
বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।
এ-অবস্থায় আজ মনে পড়ছে,
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের অমর ভাষণের সে-কথাগুলোঃ 'আমার অর্থ দিয়ে অস্ত্র কিনেছি,
বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আর সে-অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে আমার দেশের
গরীব দুঃখী মানুষের উপর - তাদের উপর হচ্ছে গুলি।'
বঙ্গবন্ধুর সে-উক্তির
সঙ্গে সুর মিলিয়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ-শিক্ষক আজ উচ্চারণ করছে লক্ষ্য শহীদের
বিনিময়ে গড়েছি বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, আর আজ স্বাধীনতার ৩৬ বছর পর তাকে ব্যবহার করা
হচ্ছে বাংলাদেশের বিবেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দলন করতে আর রক্ষা করতে যুদ্ধাপরাধী ও
জামাত চক্রকে।
আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষকেরা মানুষের অব্যক্ত কথাগুলোকেই তুলে ধরেছি।
আর ভুল করবেন না।
অবিলম্বে যুদ্ধাপরাধীদের
বিচারের জন্য ট্রাইবুন্যাল গঠন করুন।
অবিলম্বে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার করুন।
আগামী ৩ থেকে ৪ মাসের
মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ ঘোষণা করুন।
বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ
হাসিনাকে অন্তত জামিনে মুক্তি দিন।
বেগম খালেদা জিয়াকেও
মুক্তি দিন।
তাঁর
স্বামী জেনারেল জিয়া তার
জীবনদাতা আমার ভাই কর্নেল তাহেরকে হত্যা করেছিলেন।
কিন্তু
স্বামীর অপরাধে আমি
তাঁকে দোষারোপ করবো না।
'৯০-এর গণঅভ্যূত্থানে বেগম খালেদা জিয়া অনমনীয় দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, সে-কারণে তাঁর
প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা আছে।
আমি বিনয়ের সাথে বেগম
খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান রাখবো - কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে আপনি কর্নেল তাহেরের
বিধবা স্ত্রী লুৎফা তাহেরের সাথে দেখা করে
স্বামীর ভুলের জন্য দুঃখ
প্রকাশ করুন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু
দিবস ১৫ আগস্টের কালো দিনে সমারোহে জন্মদিন পালন না করুন।
আর যুদ্ধাপরাধী জামায়েত
ইসলামের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় সামিল হোন।
আজ প্রয়োজন জাতির
বৃহত্তর স্বার্থে
অতীতের ক্ষতগুলো নিরাময়ের, আপনি
নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধার বিধবা স্ত্রী।
২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর
স্বাধীনতা ঘোষণার পর ২৭
মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে মেজর জিয়ার পুনরায়
স্বাধীনতার ঘোষণা সে-সময়
মানুষকে উদ্দীপ্ত করেছিলো।
তার যথাযথ মূল্যায়ন
এদেশবাসী নিশ্চয় করবে।
মহামান্য
আদালত,
আমি আমার
ছাত্রদের বিষয়ে কিছু বলতে চাই।
আমরা শিক্ষকেরা বিপন্ন
ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।
গভীর পরিতাপের বিষয়,
এখনও তারা বিপন্নই আছে।
২০ আগস্ট ঘটনার পরে
প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা ছিল নতুন করে ছাত্রদের গ্রেফতার করা হবে না, নতুন মামলা
দেয়া হবে না।
তারপরও তাদের গ্রেফতারই শুধু
নয়, গত ঈদের আগে কারাগারে বন্দী দু'জন ছাত্রকে রিমান্ডে নিয়ে ঈদের দিনে তাদের উপর
শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। সেনাবাহিনীর গাড়ী পোড়ানোর মামলায় তাদের ইচ্ছার
বিরুদ্ধে ছাত্র-শিক্ষকদের জড়ানোর চেষ্টা হয়েছে।
সবচাইতে ক্ষোভের বিষয়
হলো, ডিজিএফআই-এর অফিসার যার নাম আজ কারাগারে বন্দিদের মুখে-মুখে, তিনি নিজ হাতে
শাহবাগ থানায় এসে ঐ দুজন ছাত্রকে পিটিয়েছেন।
খোলাখুলি হুমকি দিয়েছেন,
তার টেলিফৌনে নির্ধারিত হয় কার কতোদিন রিমান্ড হবে।
স্বাধীন বিচার বিভাগকে
উপহাস করে বলেছেন, বিচারকেরা নন, তার টেলিফৌনে স্থির হবে কার কী সাজা হবে।
মহামান্য আদালত,
এ-স্বাধীন বাংলাদেশে কী ঘটছে? ইতোমধ্যে নতুন করে ২৫ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে মামলাও
হয়েছে।
এ-বিষয়ে আমি জানতে চাই, ২২
আগস্ট কারফিউ জারীর পর নিরাপরাধ ছাত্র-ছাত্রী রিপোর্টার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের
কর্মচারীদের উপর যে-বর্বর নির্যাতন চালিয়েছিলো যৌথ বাহিনী, তাদের বিরুদ্ধে কি কোনো
মামলা রজু হয়েছে? মহামান্য আদালত, আজ পরিষ্কারভাবে সরকারকে জানাতে চাই, ছাত্রদের
বিরুদ্ধে ঐসব মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করুন।
বন্দী ছাত্রদের মুক্তি
দিন।
দেশকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দিবেন
না।
আমাদের ছাত্র-শিক্ষকদের আর
অপমান করবেন না।
[সংক্ষেপিত]
১৬
জানুয়ারী ২০০৮
|