|
শহীদ ডাঃ শামসুদ্দীন ও কিছু কথা
ডাঃ জিয়াউদ্দীন আহমেদ

আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ডাঃ শামসুদ্দিন আহমেদ মানুষের কল্যাণে তাঁর জীবন
উৎসর্গ করেছেন।
তাঁর শেষ নিঃশ্বাস
ও শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে।
সিলেট শহর যখন যুদ্ধের
বিভীষিকায়
জনশূণ্য,
সিলেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল তখন পাকিস্তানীদের রাইফেল আর মেশিনগানের
বুলেট-বিদ্ধ সাধারণ
বাঙালী রোগীর আর্তনাদে
পরিপূর্ণ।
সার্জারী বিভাগের প্রধান
অধ্যাপক ডাঃ শামসুদ্দীন সবার অনুরোধ-অনুযোগ উপেক্ষা
করে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে স্থির করলেন,
এটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা।
হাসপাতাল আগলে ধরে রেখে
থাকলেন তিনি।
তাঁর সঙ্গে থাকলেন একজন তরুণ
ইন্টার্নী ডাঃ শ্যামল কান্তি লাল,
এাম্বুলেন্স
ড্রাইভার কোরবান আলী এবং একজন পুরুষ নার্স মাহমুদুর রহমান।
হাসপাতালে আসার আগে তাঁর বৃদ্ধা
মাতা ও সন্তানদের গ্রামে পাঠিয়ে দিলেন।
আমার মা সিলেট মহিলা
কলেজের অধ্যক্ষা বেগম হোসনে আরা আহমেদ বাড়ীতে থেকে গেলেন, কারণ হাসপাতালে যদি কোনো
প্রয়োজন পড়ে,
তাহলে তিনি সাহায্যে করতে যেতে পারবেন।
আমি তখন মুক্তিযুদ্ধে
চলে গিয়েছি।
সিলেট শহরে পাকিস্তানী সৈন্যদের
উপর বিদ্রোহী দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালী সৈন্যরা আক্রমণ চালিয়েছে, তবে
প্রাথমিক পর্যায়ে রসদ ও সৈন্য স্বল্পতার জন্য পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।
পাকিস্তানী সৈন্যরা তখন
সিলেট মেডিক্যাল হাসপাতালে প্রবেশ করে ডাঃ শামসুদ্দীন ও তার সঙ্গী-সহ বেশ কিছু
রোগীদের গুলি করে হত্যা করে।
তিনদিন কারফিউ থাকার পর
আমার বাবার চাচা জনাব মঈনউদ্দীন হুসেন হাসপাতালে খোঁজ করতে যেয়ে তাঁদের মৃতদেহ
হাসপাতালের ভিতরের মাঠে দাফন করেন।
আমার বাবা শহীদ
শামসুদ্দীন
ছোটবেলা থেকেই সর্বক্ষণ মানুষের মঙ্গলের কথা বলতেন।
মানুষের জন্য
তাঁর সমস্ত জীবন ছিলো
উৎসর্গীকৃত।
যখন যেখানে গিয়েছেন,
সেখানেই তাঁর অবদান ছিলো অবিস্মরণীয়।
তিনি ছিলেন
পূর্ব-পাকিস্তান
মেডিক্যাল এসৌসিয়েশনের
অন্যতম স্থপতি ও প্রথম সাধারণ সম্পাদক।
বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে
বদলী হয়ে যাওয়ার জন্য রাজশাহী ও সিলেটে ছিলেন মেডিক্যাল এসৌসিয়েশনের সভাপতি।
সিলেটে থাকার সময় তিনি
প্রতিষ্ঠা
করেছিলেন জালালাবাদ অন্ধ কল্যাণ সমিতি।
পূর্ব-পাকিস্তানে তিনিই
প্রথম বৃহৎ আকারে বিনা পয়সায় গরীব মানুষের জন্য চক্ষু শিবির চালু করেন।
লন্ডন
থেকে প্রবাসীদের আর্থিক
সাহায্য এনে তিনি সিলেট যক্ষ্মা ক্লিনিককে যক্ষ্মা হাসপাতালে রূপান্তরিত করেন।
তিনি আমাদের বলতেন, তোমরা
যে-দেশে জন্মে
পড়াশুনার করার সুযোগ পেয়েছো,
সে-দেশে শুধু নিজের পেশায় থাকলে চলবে না।
যেখানে প্রয়োজন সেখানেই
কাজ করতে হবে।
শিশুদের পড়াশুনা থেকে শুরু করে
রাস্তাঘাট সংস্কার, তরুণদের সমাজসেবা শিক্ষাদান, কৃষকদের সাহায্য, প্রবাসীদের
আর্থিক
বিনিয়োগে
নিশ্চয়তা
দান,
এরকম বহু কর্মকাণ্ডে নিজকে নিয়োজিত
করেছিলেন তিনি।
শহীদ ডাঃ শামসুদ্দীন আমার বাবা
প্রচার-বিমুখ ছিলেন।
তাঁর জীবন ও মৃত্যুর
মহিমা থেকে শিক্ষা নিয়ে
পরবর্তী
প্রজন্ম
একদিন উদ্ভাসিত হবে
এ-আশায় মাঝে-মাঝে তাঁর কথা লিখতে ইচ্ছে করে।
তবে শহীদ পরিবারের
স্বজন হারানোর তীব্রতা
আজ ৩৭ বছর পরও আমাদের স্থবির করে রাখে।
অভিমান হয় যখন রাজনৈতিক
কারণে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক অবদান ও আত্মদানের বহু কাহিনী লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে যায়।
তাছাড়াও রাজধানী ঢাকা
কেন্দ্রিক ঘটনা শুধু প্রচার হওয়ায়
স্বাধীনতার অনেক
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হারিয়ে যায়।
আমাকে অনেকে জিজ্ঞেস
করেন ডাঃ শামসুদ্দীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ মেডিক্যাল অধ্যাপক ও সমাজকর্মী
হয়েও তাঁর
নাম কোন সংবাদপত্রে দেখি না।
আমার উত্তর হয়,
১৪ ডিসেম্বর
বুদ্ধিজীবী হত্যার অনেক আগেই তিনি শহীদ হন।
১৪ ডিসেম্বরের যে-তালিকা
বা ছবি বের হয়, তা শুধু বিজয়ের পূর্বে
হানাদারদের
শেষ
নৃশংসতার
দর্পণ।
তথাপি মনের কোথাও কষ্ট
হয়। তাঁর
জীবনের ঘটনায় কি সাধারণ মানুষ বা প্রজন্মেরা কিছু আহরণ করতে পারে না।
আজ ১০
ডিসেম্বর,
২০০৭ সাল, আমরা কিছু বাঙালী
নিউযার্সীর Kean University
তে বাংলাদেশের গণহত্যার উপর
একটি সেমিনারে যোগ দিতে যাবো।
একজন ইহুদী অধ্যাপক
কোথাও বাংলাদেশে গণহত্যার কথা শুনে এটি আয়োজন করার উদ্যোগ নিয়েছেন।
অনেক বাংলাদেশী
তাঁকে সাহায্য করেছেন,
যাতে এ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের গণহত্যার উপর একটি মাস্টার্স
প্রৌগ্রাম
চালু হয়।
কিছু শহীদ পরিবারের সদস্যকে
আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তাঁদের
স্বজনদের সম্পর্কে কিছু
বলার জন্য।
আমি তাঁদের
বক্তব্য জোগাড় ও সংক্ষিপ্তভাবে লিপিবদ্ধ করে তা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রদান করবো।
হঠাৎ মনে হলো, আমার
কাছের এতো মানুষ যে-মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের
স্বজন হারিয়েছেন, আমি
শহীদের সন্তান হয়েও
তা জানিনি এতোদিন।
শহীদের পরিবারকে এর আগে
কোথাও কেউ কি এভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তাঁদের বুকের গভীর বেদনার কথা, তাঁদের ৩৭
বছরের অভিমানের কথা শুনতে? কেন মনে হয় এটা হয়তো প্রবাসেই সম্ভব।
দেশে বিভিন্ন মতবিরোধ ও
রাজনৈতিক উত্থান-পতনের
হারিয়ে যায় লক্ষ-লক্ষ শহীদ পরিবারের গোপন অশ্রুধারা অথচ মুক্তিযুদ্ধের শহীদের রক্তে
লেখা হয়েছিলো স্বাধীন
বাংলাদেশের নাম।
৩৬
বছর পর শহীদ পরিবারের আর চাওয়ার কিছু নেই।
শুধু একটি অনুরোধ, দেশের
জন্য কিছু করতে না পারলেও
অন্ততঃ দেশের কোন ক্ষতি সাধন করবেন না।
জিয়াউদ্দীন আহমেদঃ
বিশেষজ্ঞ চিকিৎক,
ফিলাডেলফিয়া,
ইউএসএ
।
আপলৌডঃ
১৪ ডিসেম্বর, ২০০৭
|
|
|