|
জাগো বাহে, কুনঠে
সবাই!
শাহীন রেজানূর
একাত্তরে
বাংলাদেশ গণসমুদ্রের ফেনিল চূড়ায় ভিসুভিয়াসের মতো জ্বলে উঠেছিলো।
যেনো ভিসুভিয়াসের বিপুল
রন্ধ্র দিয়ে তার নাসার বিষ ফুৎকার শুরু হয়েছিলো সেদিন।
অগ্নিবরণ নাগ-নাগিনীর
মতন বাংলার দামাল ছেলেরা তাঁদের সঞ্চিত বিষ ঢেলে দিয়েছিলো হানাদারদের চোখেমুখে।
সে এক আশ্চর্য সময়ই ছিলো
বটে।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, 'এসেছে সে
একদিন/ লক্ষ পরাণে শঙ্কা না জাগে/ না রাখে কাহারও/ জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য/ চিত্ত
ভাবনাহীন।'
মাত্র ছত্রিশ বছর আগে আমরা
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে-সুমহান আদর্শ স্থাপন করেছিলাম, তা ভাবতেও দেহে শিহরণ
জাগে, মনে জাগে পুলক। 'বাঙালীরা
ভীরু' এই দুর্নাম আমরা ঘুছিয়ে দিয়েছিলাম একাত্তরের রণাঙ্গনে।
'অসত্যের
কাছে নত নাহি হবে শির/ ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ লড়ে যায় বীর' চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে গোটা
জাতি সেদিন মহামিলনের এক মোহনায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো।
তাই আমাদের হাজার বছরের
ইতিহাসে এই একাত্তর পর্বটি একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে বৈকি।
অতীতে ১৭৫৭ সালে পলাশীর
প্রান্তরে হেলায় আমরা স্বাধীনতার যে-সূর্যকে হারিয়েছিলাম, বুঝিবা একাত্তরের মহান
মুক্তিযুদ্ধের বদৌলতে তা আবার ফিরে পাই।
এতো গেলো
ভৌগলিক স্বাধীনতার কথা।
কিন্তু গণমানুষের আর সব
স্বাধীনতার বিষয়গুলোর কী পরিণতি হয়েছে আজ।
প্রথমতঃ অবিভক্ত বাংলা
নামক যে-রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠা ছিলো, বাংলার মানুষের একান্ত আকাঙ্খা ও
স্বপ্ন, সাতচল্লিশে
কুচক্রীরা তা হতে দিলো না।
চক্র-চক্রান্তের জাল
বিস্তার করে বাংলাকে দ্বি-খণ্ডিত করার মাধ্যমে এর ভবিষ্যতকে প্রথমেই তমসাচ্ছন্ন করে
দেয়া হয়।
ফলে সাতচল্লিশের বিভাজনের সময়
বাংলা খণ্ডিত হয়ে পাকিস্তান ও ভারতের দুই অংশের দুটি প্রদেশে পরিণত হয়।
আর এতে করেই বাংলার
শক্তি-সামর্থ্য-মেধা ক্রমে যনো ফিকে হয়ে আসতে থাকে।
১৯০৫ সাল অবধি ভারতের
মধ্যে বাংলাই ছিলো চিন্তা-চেতনায় অগ্রসর এবং শক্তি-সামর্থ্যতে অন্যদের চাইতে
প্রাগ্রসর।
সে-বাংলাই কি-না
ক্রমান্বয়ে চিন্তার
রাজ্যে কেমন যেনো দেউলিয়া হয়ে পড়তে থাকে চল্লিশের দশকে এসে।
আর এরই সুযোগ নিয়ে সুযোগ
সন্ধানীরা বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করতে সক্ষম হয়।
দ্বি-জাতিতত্ত্বের
ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রে খণ্ডিত বাংলার একাংশ হলো পূর্ব-পাকিস্তান।
কিন্তু শাসকবর্গ ও
কায়েমী স্বার্থবাদী মহল যখন পাকিস্তানে ইসলামের নামেই শোষণের যাঁতাকল চাপিয়ে দিলো,
কিংবা আমাদের বাঙালীত্ব তথা জাতিসত্তার ওপর খড়গহস্ত হলো, তখনই বাঙালীরা যেনো পুনরায়
সম্বিৎ ফিরে পেতে লাগলো।
হাজার
বছরের ঐতিহ্যে লালিত আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, আমাদের ভাষা-কৃষ্টি-সাহিত্য,
সবই
বুদ্ধিজীবীদের
নিরবিচ্ছিন্ন লেখার মাধ্যমে প্রবল প্রতাপে হাজির হলো আমাদের
সামনে।
আমাদের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা
তাঁদের লেখা এবং সভা-সমিতিতে প্রদত্ত ভাষণের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিতে থাকলেন, আমাদের
জাতিসত্তা, সাংস্কৃতিক গৌরব ও
স্বাতন্ত্রবোধের কথা।
সেই বায়ান্নতে মাতৃভাষা
প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকেই কিন্তু এ-যাত্রার শুরু।
সে-দিন ছাত্ররা মাতৃভাষা
প্রতিষ্ঠার যে-দাবী তুলেছিলেন, তাঁদের সে-দাবীর পেছনে প্রেরণা হয়েছিলো আলাওল,
দৌলত কাজী, আবদুল হাকিম, মোহাম্মদ সগীর, চণ্ডিদাস, বিদ্যাপতি, গোবিন্দ দাস, জ্ঞান
দাস, বিদ্যাসাগর, মধু সুদন, লালন ফকির, পাঞ্চুশাহ, দুদ্দু শাহ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল
প্রমুখ।
আর এ-প্রেরণাকে বাঙালী চেতনায়
পুনর্জাগরণের ঢেউ বইয়ে দিতে প্রধান ভূমিকাটি পালন করেছিলেন
লেখক-কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিকরা।
বিশেষ করে সংবাদপত্রের
ছিলো প্রধান ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
পাকিস্তানী শাসকবর্গের
শোষণ আর অবিচারের কথাগুলো তদানিন্তন পূর্ব-পাকিস্তানের দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক
সংবাদ-সহ
আরও কয়েকটি পত্রিকার পাতায়-পাতায় বিধৃত থাকার সুবাদে এসব বিষয়ে গণমানুষের
চিন্তা-চেতনায় ঘটতে থাকে আমূল পরিবর্তন।
একদিন
মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র ও স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠাকল্পে এ-বাংলার মুসলমানরাই
বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলো।
কিন্তু রাষ্ট্র
প্রতিষ্ঠার অল্পকালের মধ্যেই যখন শাসকবর্গ পূর্ব-পাকিস্তানকে একটি উপনিবেশে পরিণত
করে, শোষণের ও বঞ্চনার চারণক্ষেত্র বানাতে উদ্যত হলো, তখনই পূর্ব-পাকিস্তানবাসীর
মোহভঙ্গ ঘটতে থাকে।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন,
চুয়ান্নর নির্বাচন, ছাপ্পান্নর সংবিধান রচনা, আটান্নর সামরিক শাসন, বাষট্টির শিক্ষা
আন্দোলন, ছেষট্টির ছয়দফা আন্দোলন এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, এই-যে কতকগুলো
পর্ব
সেদিন বাঙালীকে সফলভাবে অতিক্রম করতে হয়েছিলো, এর পশ্চাতে বিপুল প্রেরণারূপে কাজ
করেছে সংবাদপত্রগুলো।
বিশেষতঃ দৈনিক ইত্তেফাকে
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞার প্রতিদিনকার 'রাজনৈতিক মঞ্চ' কলামটি দেশবাসীর রাজনৈতিক
চেতনা ও ধ্যান-ধারণাকে সঠিক ধারায় প্রবাহিত করতে সর্বাধিক ভূমিকা পালন করেছে।
এছাড়াও দৈনিক ইত্তেফাকে
শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেনের রাজনৈতিক প্রতিবেদনসমূহ, শিরোনাম, সংবাদ
নির্বাচন, পরিবেশন ও উপস্থাপনা গণমানুষের স্বজাত্য ও স্বাধিকারবোধকে তাদের প্রত্যয়
এবং প্রতীতিতে রূপান্তর করতে পেরেছিলো।
দৈনিক
ইত্তেফাক ও আওয়ামী লীগ সেদিন এতদঞ্চলের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের পাশে হিমাচলের মতোই
অতন্দ্র প্রহরীরূপে কাজ করেছে।
রাজরোষে ইত্তেফাক একাধিকবার বন্ধ থেকেছে।
সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞার ওপর নেমে এসেছে বার-বার জেল-জুলুম।
সিরাজুদ্দিন হোসেনদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী হয়েছে।
কিন্তু এতদসত্ত্বেও মানুষের হয়ে মানুষের কথা
তারস্বরে
বলে গেছে
ইত্তেফাক।
কোনো
ব্যবসায়িক মুনাফা অর্জন নয়, বঞ্চিত গণমানুষকে তাদের জাতিসত্তা বিষয়ে সম্বিৎ ফিরিয়ে
দিতে, তথা তাদের ন্যায্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে ইত্তেফাক যে-ভূমিকা পালন
করেছে, উপমহাদেশে তো বটেই, এমন কি বিশ্বের সংবাদপত্রের ইতিহাসেও তা এক অনুকরণীয়
অনুপম দৃষ্টান্ত।
আগেই
বলেছি, মাঠে-ময়দানে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ জনসাধারণকে যে-সবক দিতেন, ইত্তেফাক তাতে
প্রাণ-প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একে গণমানুষের দাবীতে রূপান্তরিত করে তুলতো।
আর
এ-কারণেই ইত্তেফাকের অনবদ্য প্রচার কৌশলের কাছে বার-বার হার মানতে বাধ্য হয়েছিল
পাঞ্জাবী কোটারী ও সামরিক জান্তা।
ছয়-দফাকে ইত্তেফাক এমনিভাবেই বাঙালীর 'মুক্তিসনদ'-এ পরিণত করে।
আওয়ামী লীগের 'গাইড অান্ড ফিলোসফার' হয়ে ওঠে ইত্তেফাক।
রাজনীতি সচেতন মুক্তমনা মানুষ সেদিন ইত্তেফাকের মাধ্যমেই নিজেদের আত্মমর্যাদা ও
স্বাজাত্যবোধ ফিরে পায়।
আর
এ-কারণেই পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আমরা আওয়ামী লীগ ও ইত্তেফাককে একই লক্ষ্যাভিসারী হয়ে
দৃপ্তভাবে এগুতে দেখি।
উভয়
প্রতিষ্ঠানের নেতা-কর্মী এবং কর্মচারীদেরকে সীমাহীন জুলুম-নির্যাতনের শিকার হতে
দেখি।
এবং
একই সঙ্গে জনগণের সুখ-দুঃখ বেদনার মধ্যে একাকার হয়ে মিশে যাওয়ার কারণেই সেদিন
ইত্তেফাক জনপ্রিয়তার শীর্ষদেশে আরোহন করেছিলো।
পক্ষান্তরে জনগণের বিপক্ষে অবস্থানকারীরা ইত্তেফাকের এবং জনগণের হয়ে কাজ করে যাওয়া
অন্য কিছু সংবাদপত্রের কর্মী ও আওয়ামী লীগ-সহ সকল প্রগতিশীল গণতন্ত্রমনা রাজনৈতিক
নেতা-কর্মীদেরকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে।
যে
লেখক, সাহিত্যিক, চলচ্চিত্র-নির্মাতা, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সরকারী-বেসরকারী
কর্মকর্তা-কর্মচারী বাঙালী জাতিসত্ত্বায় আস্থা রাখতেন এবং এর প্রসারের জন্য
যাঁর-যাঁর অবস্থান থেকে কিছু কাজ করতেন, তাঁদেরকেও চিহ্নিত করতে ভুলেনি পাকিস্তানী
হানাদারদের এ-দেশীয় দোসর আল বদর-আল শামস ও রাজাকাররা।
তাই
একাত্তর জুড়েই তারা বাঙালী নিধনে মেতে উঠলো।
গণহত্যা
চালিয়ে একটি জাতিকে নির্মূল করে দিতে আর জাতিকে মেধাশূন্য, অচল, অথর্ব করার জন্য
গেস্টাপো কায়দায় একে-একে স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করলো ঘাতকেরা।
লাশের উপত্যকায় পরিণত হলো বাংলাদেশ।
হত্যা, লুন্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নি-সংযোগ করে দেশটাকে ছারখার করে দিতে চাইলো তারা।
কিন্তু আমাদের অকুতোভয় মুক্তি সেনানীদের অদম্য সাহস ও দুর্দমনীয় তেজের কাছেই পরাভব
হলো তারা।
তারপরও পরাজিত গোঁড়া ও ধর্মান্ধরা তাদের ফণা গুটিয়ে নেয়নি।
আমাদের অবিমৃষ্যতার
সুযোগ নিয়ে তারা আবারও ফণা মেলে ধরেছে।
একাত্তরের বুদ্ধিজীবী নিধনের নীল-নকশা বাস্তবায়নের জন্য এই স্বাধীন বাংলাদেশেও
বিভিন্ন ফিকিরে অনেক প্রগতিশীল মুক্তমনা বুদ্ধিজীবীর জীবন তারা কেড়ে নিয়েছে।
আস্তিনের নিচে ছুরি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় তারা।
আবারও বৃদ্ধিজীবী নিধনের জন্য সদা তৎপর ওই ঘৃণ্য অপশক্তি।
একাত্তরে তারা জিসি দেব, জোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, আবুল কালাম আজাদ, মনিরুজ্জামান,
মনির চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সিরাজুদ্দিন হোসেন, শহিদুল্লাহ কায়সার, জহির
রায়হান, ফজলে রাব্বি, আলীম চৌধুরী, গিয়াসউদ্দিন আহমদ, সন্তোষ ভট্টাচার্য ছাড়াও
সারাদেশে শিক্ষক, আইনজীবি, প্রকৌশলী, চিকিৎসক-সহ বিভিন্ন পেশার প্রগতিমনা মানুষকে
হত্যা করেছে।
আবার
ছুরিতে শান দিচ্ছে ওই ঘাতকের দল।
এ-অবস্থায় দেশবাসীর প্রতি একটি আহ্বান আমাদেরঃ জাগো বাহে, কুনঠে সবাই!
শাহীন
রেজানূরঃ
সাংবাদিক।
শহীদ
সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেনের পুত্র
১৪
ডিসেম্বর, ২০০৭
|
|
|