|
বাঙালী
নারীর পাকিস্তানী সৈন্য প্রীতি
মুনতাসীর
মামুন
বহুদিন
পর ১৯৭১ সালে ঘাতক বা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে বাংলাদেশের মানুষ সোচ্চার হয়ে
উঠেছে।
সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের
মানুষের সঙ্গে-সঙ্গে এই প্রথমবার সব ধরণের [এদের অনেকে যে, আগে এ-দাবী করেননি, তা নয়]
রাজনৈতিক দলও একই দাবী তুলছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার
প্রধান, সেনাপ্রধান ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারও এর যৌক্তিকতা প্রকারান্তরে
স্বীকার করেছেন।
সিভিল সমাজ থেকে যে-সব
দাবী উঠেছে তার সারাংশ হলো -
(১) যুদ্ধাপরাধীদের স্পেশাল ট্রাইবুন্যালে বিচার করতে হবে এবং বাদী হবে
সরকার / রাষ্ট্র;
(২) ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল
ও
রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে;
(৩) যুদ্ধাপরাধীরা নির্বাচন করতে পারবে না।
বিদ্যমান
আইন ও সংবিধানের আলোকেই তা করা যেতে পারে।
সরকারের একটি অংশ
- যার
নেতৃত্বে আইন উপদেষ্টা ব্যারিষ্টার মঈনুল হোসেন
- এটি মানতে নারাজ।
তিনি পরিস্কার ভাষায়
বলেছেন, সরকারের হাতে অনেক কাজ।
সুতরাং বাড়তি এসব
দায়িত্ব সরকার নিতে পারবে না।
অন্যদিকে, তত্ত্বাবধায়ক
সরকার প্রধান কয়েকদিন আগে বলেছিলেন, কেউ সংক্ষুব্ধ হলে আদালতে যেতে পারে।
হয়তো এতে উৎসাহিত হয়ে
একজন মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭১ সালের আল-বদর আলী আহসান মুজাহিদ ও কাদের মোল্লা এবং শাহ
হান্নান নামে প্রাক্তন এক সচিবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করেছেন।
ঐ তিনজন মুক্তিযুদ্ধ
সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য
করেছিলেন।
আদালত তা তদন্তের জন্য
থানায় প্রেরণ করে।
কিন্তু সরকার অনুমতি না
দেয়ায় পুলিশ তা আদালতে ফেরত পাঠায়।
ব্যারিস্টার মইনুল
বলেছেন, ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করতে পারে না।
তাহলে প্রশ্ন, মাত্র
কয়েকদিন আগে এক ব্যক্তি ডঃ
কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করলেন
কীভাবে? এসব আশঙ্কা করেই আমরা দাবী করছি, যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা সরকারকেই
করতে হবে।
তবে, এ-ঘটনা প্রমাণ করে, ডঃ
ফখরুদ্দীন আহমদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হিসেবে যতোটা শক্তিশালী মনে হয়, আসলে
ততোটা শক্তিশালী তিনি নন।
আরও যুক্তি আছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও
জরুরী আইনের বিধান ৩ মাসের জন্য।
কয়েক ৩ মাস চলে গেছে।
সরকারের প্রধান কাজ
নির্বাচন করা।
হাট-বাজার
ভাঙ্গা, উপজেলা নির্বাচন দেয়া, দুই নেত্রীকে গ্রেফতার করা, শিক্ষকদের গ্রেফতার করার
কাজগুলো
কে
চাপালো তাদের কাঁধে? তাঁরা বাড়তি কাজ হাতে নিয়েছেন দেখেই 'বাড়তি' দাবী তোলা হয়েছে।
কর ফাঁকির জন্য গ্রেফতার
করে ৭ থেকে ১০ বছর কারাদন্ড দেয়া যাবে, আর ঘাতকদের কিছু করা যাবে না? এটা কি খুব
হালকা এবং অদ্ভুত যুক্তি হয়ে গেলো না? মঈনুল হোসেন আরও বলেছেন, ৩৬ বছর যাঁরা বিচার
করেনি, তাঁদের বলুন।
ব্যারিস্টার মঈনুল ৩৬
বছর আগে সরকারী দলের এমপি ছিলেন দেখেইতো তাঁর কথা মতো, তাঁর কাছেই দাবী তোলা হচ্ছে।
ঐ একই
ধারায় জামায়াত নেতৃবৃন্দ ও সমর্থকরা বেশ কিছু মন্তব্য করেছেন-
(১) ১৯৭১
সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি, হয়েছিলো গৃহযুদ্ধ
(২)
সুন্দরী নারীর জন্য যুদ্ধ হয়েছিলো
(৩)
ভারতের স্বার্থ
রক্ষায় যুদ্ধ হয়েছিলো
(৪)
মুক্তিযোদ্ধাদেরও বিচার করতে হবে।
জামায়াত
দেশে এষ্টাবলিশমেন্টের সমর্থন পাচ্ছে।
বিদেশেও কেউ-কেউ একই রকম
কথা-বার্তা বলছেন।
অনেকে বলতেন,
পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ১৯৭১ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে এ-সমস্ত কর্মকান্ডের
সমন্বয় ঘটাচ্ছে।
এসব কথা আগে বিশ্বাস করতাম না।
কিন্তু সাম্প্রতিক
বিভিন্ন ঘটনায় সে-বিশ্বাস শিথিল হয়ে গেছে।
বিদেশে
প্রচারের ধরণটা অন্যরকম।
জামায়াত বা জামায়াতের
সমর্থকদের মতো স্থূল নয়।
পাকিস্তানী
নীতি-নির্ধারকরা ১৯৭১ সালের গণহত্যাকে খাটো করে দেখাবার জন্য যে-ধরণের প্রচার করছে,
বিদেশী 'অাকাডেমিশিয়ান'দের
কেউ-কেউ সে-কৌশল নিয়েছেন।
কৌশলটা এরকমঃ কিছু হত্যা
হয়েছিলো; যুদ্ধ হলে অমনটি হয়; তবে গণহত্যা হয়নি।
যুদ্ধকালে এক-আধটু
ধর্ষণ হয়, সেটি ধর্তব্যের মধ্যে
নয়। তবে যে ২-৪ লক্ষ ধর্ষণের কথা বলা হয় তা
'ফ্যাণ্টাসী'। এর সাম্প্রতিক উদারহণ জনৈক গবেষক শর্মিলা বসুর কিছু লেখালেখি।
লন্ডন
থেকে আমার এক তরুণ সহকর্মী জানালেন, পাকিস্তানীরা ডিসেম্বর মাসে লন্ডন স্কুল অফ
ইকনোমিক্স-এ শর্মিলা বসুকে নিয়ে এসেছে আলোচনার জন্য;
কী করা? আমি বললাম,
অনেকে খবর হওয়ার জন্য এগুলো করে।
আগে এসব উপেক্ষা করতাম।
এখন দেখছি, উপেক্ষা করলে
তাদের মিথ্যাচার সত্যে
পরিণত হয়ে যায় - যেভাবে জেনারেল জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক হয়ে
গেলেন।
তাঁকে পরামর্শ দিয়েছি,
নিয়মতান্ত্রিকভাবে এসব মিথ্যাচারের প্রতিবাদ করতে হবে, যেভাবে আমরা করছি বাংলাদেশে।
প্রয়োজন হলে, এসব যারা
বলে ও পৃষ্ঠপোষকতা করে, তাদেরও ত্যাগ করতে হবে সামাজিকভাবে।
শর্মিলা
বসুর প্রবন্ধ আগে দেখিনি।
এখন কৌতূহল হলো।
ইন্টারনেট থেকে তা
সংগ্রহ করলাম।
এটি ছাপা হয়েছিলো মুম্বাইয়ের
বিখ্যাত পত্রিকা ইপিডব্লিউতে।
প্রবন্ধটি পড়ে মনে হলো,
সম্পাদক এটি ছাপলেন কীভাবে? এটি শুধু মিথ্যাচারই নয়, পুরো একটি জাতিকে আঘাত করা।
ইপিডব্লিউর প্রতিষ্ঠাতা
শচীন চৌধুরী বেঁচে থাকলে, এ-অনাচার সম্ভব হতো না।
আগেই বলেছি, আগে হলে এসব
লেখালেখি উপেক্ষা করতাম।
কিন্তু এখন করা যাবে না,
কারণ শর্মিলা বসুর প্রবন্ধ পুরো একটি জাতির বিরুদ্ধে।
গবেষকরা
কোনো প্রবন্ধ পড়ার আগে উৎস দেখেন।
শর্মিলার প্রবন্ধের
ধরণটা অাকাডেমিক।
তাই উৎস দেখলাম।
এখানে বলে রাখা ভালো,
উৎসের দৈর্ঘের ওপর প্রবন্ধের মান নির্ভর করে না।
তাঁর প্রবন্ধের নাম বেশ
দীর্ঘ, ১৪টি শব্দের শিরোনাম।
আজকাল এ-ধরণের একটা
ফ্যাশান হয়েছে, এক্সোটিক সব শিরোনাম ব্যবহার করা।
শিরোনাম দিয়ে একটা
অাকাডেমিক ভাব আনা।
শর্মিলা বোসের প্রবন্ধের
নাম 'লুজিং দা ভিকিটমঃ প্রবলেমস অব ইউজিং উইম্যান অাজ
উইপনস ইন রিকাউন্টিং দি বাংলাদেশ ওয়ার'। উৎসের মধ্যে আছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা
যুদ্ধঃ দলিলপত্রের ৮ম খন্ড, শাহরিয়ার কবির সম্পাদিত একটি সঙ্কলন, শর্মিলার নিজের
একটি প্রবন্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের একজন গবেষকের একটি বই।
লন্ডনের জামায়াত ভিত্তিক
প্রকাশনার একটি বই আর পাকিস্তানের ৩টি।
এর মধ্যে আছে পাকিস্তান
সরকার কর্তৃক ১৯৭১ সালে প্রকাশিত শ্বেতপত্র ও পরাজিত পাকিস্তানী জেনারেল মিধা ও
নিয়াজী, পাকিস্তানী কিছু সেনা অফিসারের সাক্ষাৎকার।
অর্থাৎ শর্মিলা বেশি
গুরুত্ব দিয়েছেন পাকিস্তানী সূত্রের উপর।
এসব সূত্র তাঁর কাছে
বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে।
এ-উৎস বিশ্লেষণ করলে
শর্মিলার উদ্দেশ্য পরিস্কার হয়ে যায়।
১.
শর্মিলার প্রবন্ধের মূল
ফৌকাস ১৯৭১ সালের ধর্ষিতা নারী।
তাঁর বক্তব্য,
বাংলাদেশের লেখক গবেষক ও তাঁদের সমর্থক বিদেশী গবেষক ও লেখকদের মতে, বাংলাদেশের
মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিতা নারীর সংখ্যা ২ থেকে ৪ লাখ।
কিন্তু শর্মিলার [ও
পাকিস্তানীদের] মতে, আসলে সংখ্যা কয়েক হাজার, যার মধ্যে বাঙালী কর্তৃক ধর্ষিত বিহারী
নারীও আছে।
অর্থাৎ ধর্ষিতা বাঙালী নারীর
সংখ্যা আরও কম।
এবং এগুলি যুদ্ধজাত নয়।
তার ভাষায়ঃ
The available evidence
confirms the occurrence of rape but does not support claims of hundreds of
thousands of women raped by the army in East Pakistan in 1971. The seven case studies in Neelima Ibrahim’s book, the opportunistic raped admitted by the army
and the reports of massacre of non Bengali (west Pakistani and Bihari) men,
women and children by Bengalis, suggest that several thousand women may have
been victims of sexual violence in 1971.
২.
বাংলাদেশের লেখালেখিতে যেসব ধর্ষণের বর্ণনা দেয়া হয়েছে, সেগুলো অবাস্তব ও অতিরঞ্জিত।
উদাহরণ হিসেবে রাবেয়া,
ফেরদৌসী, প্রিয়ভাষিণী ও চম্পার নাম উল্লেখ করেছেন শর্মিলা।
শর্মিলার ভাষ্যে মনে
হয়, এঁদের ভাষ্য মিথ্যা এবং প্রিয়ভাষিণী
স্বেচ্ছায় থেকে গেছেন
ধর্ষিত হওয়ার জন্য [কারণ, তিনি পালাননি]।
৩.
পরিকল্পিত ধর্ষণের কোনো নীতি পাকিস্তানী সৈন্যরা গ্রহণ করেনি।
ধর্ষণ কিছু হয়েছে, তবে
সেগুলোর সঙ্গে সবাই জড়িত - পাকিস্তানী সৈন্য, বাঙালী, বিহারী সকলে।
এবং এগুলো হচ্ছে
'opportunistic sexual crimes in times of war'।
শর্র্মিলার লেখা থেকে
মনে হয়, পাকিস্তানীরা সৈন্যরা তো ভদ্রলোক, পেশাদার !
৪.
বাঙালীরা বিহারীদের হত্যা করে 'এথনিক ক্লীনজিং' চালিয়েছিলো।
শর্মিলা
লিখেছেন, ধর্ষণের বিষয়টি রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর। কতো ধর্ষণ হয়েছে সে-সম্পর্কে কোনো
তথ্য-প্রমাণ নেই।
অনেকে চিৎকার করে এসব কথা বলে
'শত্রু 'কে নিন্দিত করতে চায়।
উদ্দেশ্য, 'ভিকটিমহুডকে'
মহীয়ান করা আদর্শের খাতিরে এবং ক্ষতিগ্রস্ত [অর্থাৎ ধর্ষিতা] যারা তাঁদের প্রতি
কোনো 'কনসার্ন' নেই [অর্থাৎ আসল ক্ষতিগ্রস্তরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন]।
সত্যি
বলতে কি, গত ৩৬ বছরে এ-ধরণের প্রবন্ধ এই প্রথম পড়লাম।
পাকিস্তানীরাও এভাবে
নিজেদের পক্ষাবলম্বন করেনি।
১৯৭১ সালের ৩৬ জন
পাকিস্তানী নীতি-নির্ধারকের সঙ্গে আমি কথা বলেছি [উদাহরণ 'সেই সব পাকিস্তানী' ও
'পরাজিত পাকিস্তানী জেনারেলদের চোখে মুক্তিযুদ্ধ']। তাঁরা গণহত্যা ধর্ষণকে নানাভাবে
এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন, কিন্তু এ-ভাষায় লেখেননি।
বরং ছিলেন এপলোজেটিক।
শর্মিলার
বিবরণের কিছু নমুনাও উল্লেখ করতে হয়।
আগাগোড়া মুক্তিযুদ্ধকে
তিনি বলেছেন 'গৃহযুদ্ধ'। লিখেছেন, গৃহযুদ্ধের সময় পূর্ব-পাকিস্তানে লোকসংখ্যা ছিলো
সাড়ে
৭ কোটির মতো।
যুদ্ধের শুরুতে
পূর্ব-পাকিস্তানে পাকিস্তানী সৈন্য সংখ্যা ছিলো ২০ হাজার।
ডিসেম্বর এ-সংখ্যা
দাঁড়ায় ৩৪ হাজারে।
সশস্ত্র সিভিল পুলিশ ও
সৈন্যের সংখ্যা ছিলো ১১ হাজার।
সুতরাং ৩৪ হাজার সৈন্যের
পক্ষে একটি দেশ পরিচালনা করে, যুদ্ধ করে, এতো ধর্ষণ করা সম্ভব নয়।
তাঁর মতে, হামিদুর রহমান
কমিশনারের প্রধান একজন বাঙালী বিচারপতিও তা স্বীকার করেছেন।
শর্মিলা
বাংলাদেশে এসেছিলেন কয়েক বছর আগে।
শুনেছি, তিনি নেতাজি
সুভাষচন্দ্র বসুর পরিবারের কন্যা হওয়ায় অনেকে অতি-আনন্দেও সাথে তাঁর মাঠ পর্যায়ের
গবেষণায় সাহায্য করেছেন।
অনেকের সাক্ষাৎকার তিনি
নিয়েছেন।
তাঁরা যুদ্ধের কথা বলেছেন,
হত্যার কথা বলেছেন কিন্তু ধর্ষণের কথা বলেননি।
তার মানে, পাকিস্তানীরা
মহিলা ও শিশুদের টার্গেট করেনি।
তার ভাষায়,
“...... women were not harmed by the army in
the events except by chance such as in crossfire. The pattern that
emerged from
the incidents was that the Pakistan army targeted adult males while
sparing women and children”।
অবশ্য, তিনি এও স্বীকার করেছেন, অন্যস্থানেও কেউ ধর্ষিত হতে পারে, সৈন্যরা মহিলা ও
শিশুদের ক্ষতি করতে পারে।
বিহারীদের নিশ্চিহ্ন
করার ব্যাপারে পাকিস্তানী শ্বেতপত্রে যা বলা হয়েছে, মাঠ পর্যায়ে
গবেষণায় তার সত্যতা মিলেছে।
পাকিস্তানী সেনা
অফিসাররাও তাঁকে একই কথা বলেছেন।
পাকিস্তানী সৈন্যরা কিছু
ঘটনা ঘটিয়েছে, সঙ্গে-সঙ্গে শাস্তিও পেয়েছে।
শর্মিলার
মতে, ধর্ষিতা রাবেয়া খাতুনের বয়ান শিক্ষিতের।
আখতারুজ্জামান মন্ডল
তাঁর বইতে গণ-ধর্ষণের যে-বর্ণনা দিয়েছেন, তা ঠিক নয়।
ক্যাণ্টনমেন্ট ইত্যাদিতে
কোনো নারীকে [কমফৌর্ট উইমেন] আটকে রাখা হয়নি।
তাঁর ভাষায়,
“The allegation that the army maintained ‘comfort women’ –
even the numbers were nowhere close to Bangladeshi claims is a serious charge
and merits further inquiry”।
শর্মিলা জানিয়েছেন, নীলিমা ইব্রাহিম 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি'তে যাদের কথা আলোচনা
করেছেন তাঁদের অধিকাংশ বাঙালীদের দ্বারা ধর্ষিত, যাঁদের পরে মিলিটারীর
হাতে তুলে দেয়া হয়েছে।
এঁরা অপহৃত হয়েছেন।
পাকিস্তানীরা যদি এদের
কিছু না করে থাকে, তবুও এদের 'ধর্ষিতা' বলা যায়।
ইত্যাদি।
(২)
শর্মিলা
বসুর প্রতিটি লাইনের বিরুদ্ধেই তথ্য-প্রমাণ-সহ প্রতিবাদ করা যায়, কিন্তু আমি তা
না-করে কিছু উদাহরণ দেবো মাত্র।
১৯৭১
সালের ১৬ ডিসেম্বরে
পাকিস্তানী সৈন্য ও তাদের
সহযোগীরা ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
তিন দেশের দলিলপত্রে
আত্মসমর্পণকারী সৈন্যের সংখ্যা উল্লেখিত হয়েছে ৯০,৩৬৮ জন।
শর্মিলা কি বলবেন তাঁর
হিসাবের বাইরে ৬০ হাজার সৈন্য এলো কোথা থেকে? রাজাকার, আলবদর, শান্তি কমিটির সদস্য
সংখ্যা জানা যায়নি।
তবে এদের সংখ্যা ১১
হাজারের বেশি ছিলো এবং এদের অধিকাংশ ছিলেন সশস্ত্র।
১৯৭১-এ সৈন্যরা দেশ
চালায়নি।
চালিয়েছে অবরুদ্ধ দেশের এবং
পাকিস্তানের সিভিল প্রশাসনের মানুষ-জন।
একটি দেশের সবাই যুদ্ধে
যেতে পারে না, বা পালাতেও পারে না।
এ-প্রশাসনের অনেকেই
সক্রিয়ভাবে সাহায্য করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের।
পাকিস্তানী সৈন্যদের
সহযোগী জামায়াত, মুসলিম লীগ বা রাজাকার-আলবদররা ছিলো পাকিস্তানী বাহিনীর সশস্ত্র
সহযোগী।
হত্যা, লুটপাট, ধর্ষণ সবাই মিলে
করেছে।
এর অর্থ এ-নয় যে, এরা সবাই
ধর্ষণ করেছে।
একটি সৈন্য একাধিক জায়গায়
একাধিকবার ধর্ষণ করেছে।
প্রশ্ন, সশস্ত্র
ব্যক্তির সংখ্যা যদি দেড় লাখের মতো হয় তাহলে ২ লক্ষ ধর্ষণ সম্ভব কি-না? রুয়ান্ডাতে
১০০ দিনে আড়াই থেকে পাঁচ লক্ষ ধর্ষিত হলো কীভাবে? এ সংখ্যাতো পাশ্চাত্যের
বিশ্লেষকদের দেয়া।
পাকিস্তানীরা পরিকল্পিত ধর্ষণ করেছিল কি-না বা যত্র-তত্র নারী ধর্ষণে মেতে উঠেছিলো
কি-না, আমি সে-সম্পর্কে কিছু তথ্য দেবো
এবং কোনো বাঙালীর তথ্য ব্যবহার করবো না, কারণ
বাঙালীদের তথ্য শর্মিলা বোসের পছন্দ নয়।
উল্লেখ্য, বোস নিজের
বিশ্লেষণের জন্য নিয়াজীর তথ্য ব্যবহার করেছেন।
নিয়াজী একটি মেমৌতে
লিখেছিলন, 'আমি চাই সব সৈন্য শৃঙ্খলার প্রতীক হবে।
তাঁরা কৌড অব অনার
মানবে, কারণ তাঁরা জেন্টলম্যান 'অান্ড অফিসার্স'। নিয়াজীর একটি মেমৌর উল্লেখ করছি,
যেখানে তিনি
পাকিস্তানী সৈন্যদের ব্যাপক হত্যা, লুট ও ধর্ষণের কথা বলেছেন।
তাঁর ভাষায়,
''Since
my arrival, I
have heard numerous reports of troops indulging in loot and arson,
killing people at random and without reason in areas
cleared of the anti state elements;
of late there have been reports of rape and even the
West Pakistanis are not being spared;
on 12 Apr. two west Pakistani women were raped,
and an attempt was made on two others”।
শুধু তাই নয়, সৈন্যরা ফেরত যাবার সময় লুটের মালও নিয়ে যাচ্ছে এবং এক্ষেত্রে পরস্পর
পরস্পরকে সাহায্য করছে।
তাঁর ভাষায়, ''I
gather that even officers have been suspected of indulging in this shameful
activity and what is worse, that in spite of repeated instructions,
comdos, have so far failed to curb this alarming state of indiscipline. I
suspect that cos and osc units/sub-units are protecting and shielding such
criminals''।
সেনাপতি নিজেই তাঁর সৈন্যদের উচ্ছৃঙ্খল ক্রিমিনাল বলেন, আর শর্মিলা ইঙ্গিত করেন
তারা 'জেন্টেলম্যান'।
শর্মিলা বোস, কোন দেশে
দক্ষ ও পেশাদার বাহিনী সিভিল সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে বছরের পর বছর ক্ষমতা দখল
করে রাখে? বা নিজের দেশের মানুষকে হত্যা করে, শাস্তি দেয়, লুট করে, ধর্ষণ করে?
পরিকল্পিত ধর্ষণ হয়নি, বলেছেন শর্মিলা, কিন্তু মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার
ব্লাডের ৩১ মার্চের টেলিগ্রাম দেখুনঃ 'Six naked female
bodies at Rokeya Hall Dacca U. Feet tied together. Bits of rope hanging from
ceiling fans. Apparently raped,
shot and hung by their heels from fans''।
শর্মিলা যদি
ভারত থেকে
প্রকাশিত পত্র-পত্রিকা
- বিশেষ করে কলকাতা থেকে পত্র-পত্রিকাগুলো
- দেখতেন, তাহলে এ-রকম
অনেক বর্ণনা পেতেন। অবশ্য, কলকাতার পত্রিকাগুলিতো বাঙালীদের;
সেগুলো কি বিশ্বাসযোগ্য
হবে? পাকিস্তানীদের হলে না হয় কথা ছিলো।
আচ্ছা,
পাকিস্তানীদের ভাষায় বর্ণনা করি।
ঐ-সময় আলসদার রাজা ছিলেন
ঢাকার কমিশনার।
তিনি একটি বই লিখেছেন, যাতে
পাকিস্তানী সৈন্যদের অহরহ মানুষ ধরে নিয়ে হত্যার বর্ণনা আছে।
হাম্দুর রহমান কমিশনের
বিবরণ প্রকাশিত হলে তিনি এর বিরুদ্ধে একটি
রিট করে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের
শাস্তি দাবী করেছিলেন।
ইসলামাবাদে এক
সাক্ষাৎকারে তিনি আমাকে বলেছিলেন,
রিটের বয়ানকালে আমি বলছিলাম একটি ঘটনার কথা।
চার সৈনিক হামলা করেছে
এক বাসায়।
বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে।
কন্যাটি অল্প বয়সী, যে
হাতজোড় করে তাদের জানাল যে, সে মুসলমান।
তাকে যেনো তারা বোনের
মতো দেখে।
তারপরও যখন তারা এগিয়ে আসছে, তখন
সে বললো, আমিও তো পাকিস্তানী।
তোমাদের কারও হয়তো আমার
মতো মেয়ে আছে। তাও
তারা মানছে না।
তখন সে বিছানার পাশে কোরান শরীফ
রেখে বললো, আমার যদি কিছু করতে চাও তাহলে এই কোরান ডিঙ্গিয়ে করতে হবে।
তারা কোরান
ডিঙ্গিয়েছিলো।
আমি যখন আদালতে এ-বর্ণনা
দিচ্ছি, তখন সারা আদালত স্তব্ধ।
আর বিচারক আমাকে জিজ্ঞেস
করছেন বারবার, আপনি যা বলছেন, তা তাকি সত্যি? তাঁর চোখে পানি।
কমফৌর্ট
ইউমেনের কথা বলছেন? যুক্তরাষ্ট্রের টাইম পত্রিকা জানিয়েছিলো, অক্টোবরে (২৫ অক্টোবর
১৯৭১) ক্যান্টনমেন্টে ৫৬৩ জন নারীকে আটকে রাখা হয়েছে।
তাঁদের অনেকে গর্ভবতী।
অনেককে গর্ভপাত করানো
হয়েছে।
কাউকে-কাউকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
শর্মিলা অবশ্য এ-বর্ণনা
পড়লে লিখতেন, পাঞ্জাবী সৈন্যরা 'জেন্টলম্যান' দেখেইতো তাদের ছেড়ে দিয়েছে।
টাইমের বয়ানঃ
“One of the most horrible revelations
concerns 563 young Bengali women, some only 18, who have been held captive
inside Dacca’s dingy military cantonments since the first days of the fighting.
Seized from Dacca university and private homes and forced into military
brothel, the girls are all three to five months pregnant. The army is
reported to have enlisted Bengali gynecologists to abort girls held at military
installations. But for those at the Dacca cantonment it is too late for
abortions. The military has began freeing the girls a few at a time, still
carrying the babies of Pakistani soldiers.”
এবার
আসুন ধর্ষণের সংখ্যায়।
ধর্ষিতাদের সাহায্য করতে
তখন অষ্ট্রেলিয়া থেকে এসেছিলেন ডঃ জিওফ্রে ডেভিস।
তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণের
কথা বলেছিলেন, যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭২ সালে 'বাংলার বাণী'তে -
'সিডনীর শল্য চিকিৎসক
ডঃ জিওফ্রে ডেভিস সম্প্রতি লন্ডনে বলেন যে, ন'মাসে পাক বাহিনীদের দ্বারা ধর্ষিতা ৪
লাখ মহিলার বেশির ভাগই সিফিলিস অথবা গনোরিয়া কিংবা উভয় ধরণের রোগের শিকার হয়েছেন।
এঁদের অধিকাংশ ইতোমধ্যেই
ভ্রুণ হত্যাজনিত অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন।
তিনি বলেন, এঁরা বন্ধ্যা
হয়ে যেতে পারেন কিংবা বাকী জীবনভর বারবার রোগে ভুগতে পারেন।'
ডঃ ডেভিস বলেন,
বাংলাদেশে কোন সাহায্য এসে পৌঁছুবার আগেই পাকিস্তানী সৈন্যদের ধর্ষণের ফলে ২ লাখ
অন্তঃসত্ত্বা মহিলার সংখ্যাগরিষ্ঠাংশ স্থানীয় গ্রামীণ ধাত্রী বা হাতুড়ে ডাক্তারের
সাহায্যে গর্ভপাত ঘটিয়েছেন।
তিনি বলেন, ক্লিনিক্যাল
দিক থেকে গর্ভপাত কর্মসূচি সমাপ্ত হয়েছে, কিন্তু
মহিলাদের কঠিন সমস্যা এখনও রয়ে
গেছে।
ডঃ ডেভিস বলেন, আমরা বিরাজমান
সমস্যা সম্পর্কে অবগত হবার আগেই অনির্বার্য ও অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির চাপে ২ লাখ
ধর্ষিতার মধ্যে দেড় লাখ থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার অন্তঃসত্ত্বা মহিলা গর্ভপাত করেছেন।
ডঃ ডেভিসের মতে
দীর্ঘ-মেয়াদী জটিলতা খুবই গুরুতর।
বেশ কিছু সংখ্যক তরুণী
যৌন-মিলনের উপযোগী না হওয়ায় সমস্যা বেশি জটিল হয়েছে।
তিনি বলেন, 'দূর্ভাগা
মহিলারা যদি
রোগের চিকিৎসা লাভে সক্ষমও হন, তবুও তাঁদের বিয়ে করার মতো কোনো একজনকে
খুঁজে পাওয়া খুবই কষ্টকর।'
ধর্ষিতা মহিলারা যখন
কমপক্ষে ১৮ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা, তখন ডাঃ ডেভিস ঢাকা এসে পৌঁছান।
ধর্ষিতাদের চিকিৎসার
জন্যে ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকায় একটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়।
সরকারী কর্মচারীদের
হিসাব মতে, ধর্ষিতা মহিলাদের আনুমানিক সংখ্যা ২ লাখ।
ডঃ ডেভিসের মতে,
এ-সংখ্যা অনেক কম করে অনুমান করা হয়েছে।
তিনি মনে করেন, এ সংখ্যা
৪ লাখ থেকে ৪ লাখ ৩০ হাজারের মধ্যে হতে পারে।
ডঃ ডেভিস বলেন,
অন্তঃসত্ত্বা মহিলার সংখ্যাই ২ লাখ।
অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের
সাহায্য সংক্রান্ত কর্মসূচির শুরু হবার আগেই দেড় লাখ থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার মহিলাদের
গর্ভপাত করেছেন।
অবশিষ্ট ৩০ হাজারের মধ্যে
কেউ-কেউ আত্মহত্যা করেছেন, কেউ-কেউ তাদের শিশুদের নিজের কাছে রাখার সিদ্ধান্ত
নিয়েছেন।
ধর্ষিতা মহিলাদের যে-হিসাব
সরকারীভাবে দেয়া হয়েছে, ডঃ ডেভিসের মতে, তা সঠিক নয়।
সরকারী কর্মকর্তারা
বাংলাদেশের জেলাওয়ারী হিসাব করেছেন।
সারা দেশের ৪৮০টি থানা
২৭০ দিন পাক সেনাদের দখলে ছিলো।
প্রতিদিন গড়ে ২ জন করে
নিখোঁজ মহিলার সংখ্যা অনুসারে লাঞ্ছিত মহিলার সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ।
এই সংখ্যাকে চুড়ান্তভাবে
নির্ভুল অঙ্ক রূপে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
কিন্তু
হানাদার বাহিনী গ্রামে হানা দেবার সময় যেসব তরুণীকে ধর্ষণ করেছে, তার হিসাব রক্ষণে
সরকারী রেকর্ড ব্যর্থ হয়েছে।
পৌনপুনিক লালসা চরিতার্থ
করার জন্যে হানাদার বাহিনী অনেক তরুণীকে তাদের শিবিরে নিয়ে যায়।
এসব রক্ষিত তরুণীর
অন্তঃসত্ত্বার লক্ষণ কিংবা রোগের প্রাদূর্ভাব দেখা দিলে, হয় তাদের পরিত্যাগ করা
হয়েছে, নয়তো হত্যা করা হয়েছে।
কোন-কোন এলাকায় ১২ ও ১৩
বছরের বালিকাদের শাড়ী খুলে নগ্ন করার পর ধর্ষণ করা হয়েছে।
যাতে তাঁরা পালিয়ে যেতে
বা আত্মহত্যা করতে না পারে।
হতভাগা বন্দী নারীদের
যখনই শাড়ী পরতে দেয়া হয়েছে, তখনই তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শাড়ী দিয়ে গলায় ফাঁস
লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে।
ডঃ ডেভিস বলেন, অনেকেই
বুকে পাথর বেঁধে পুলের উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন।
যারা প্রাণে বেঁচে গেছে,
তেমন ধরণের হাজার-হাজার মহিলা তাঁদের পরিবার কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়েছেন।
কারণ তাঁরা ধর্ষিতা,
অন্তঃসত্ত্বা।
বর্তমানে দেখতে 'অপরিচ্ছন্ন'।
এ-ধরণের ঘটনা বড়োই
মর্মান্তিক। ডাঃ
ডেভিস বলেন, 'চট্টগ্রামে আমি একজন মহিলাকে দেখেছি, তিনি বিধবা।
যুদ্ধে তাঁর ঘর-বাড়ী
ধ্বংস হয়ে গেছে।
তাঁর দু'টি সন্তান এবং তিনি
ছ'মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
গর্ভপাত ঘটানোর পর
এ-মহিলার থাকার মতো স্থান নেই।
ছেলে-মেয়েদের আহার
যোগানের কোন সংস্থান নেই।
আরেকজন মহিলার স্বামী
যখন যুদ্ধে গেছেন, তখন তাঁকে হানাদাররা ধর্ষণ করে।
স্বামী এসে স্ত্রীকে
দেখেন গর্ভবতী।
তিনি স্ত্রী এবং দুটি সন্তানকে
ফেলে চলে যান।
এবং বলে যান যে, আর তিনি তাদের
গ্রহণ করবেন না।
আরেকজন তরুণী বয়স ১৯।
অশিক্ষিতা।
সে ছিলো ছয় মাসের
গর্ভবতী।
তার আত্মীয়-স্বজন,
বন্ধু-বান্ধব তাঁকে ত্যাগ
করে চলে যায়।
সে স্বল্পকালের জন্য সাহায্য
কেন্দ্রে আশ্রয় পেয়েছে।
কিন্তু তারপর সে কোথায়
যাবে, কেউ জানে না।।'
ধর্ষণের
কথা কেউ বলেনি, তাই ধর্ষণ হয়নি এবং উল্লিখিত সংখ্যা অতিরঞ্জিত, এ-লজিক খুবই অদ্ভূত।
শর্মিলা কি যুদ্ধকালীন
ধর্ষণ বিষয়টা বোঝেন? যেহেতু [অনুমান করে নিচ্ছি] তিনি যুদ্ধ দেখেননি, তাই যুদ্ধের
চরিত্র তিনি অনুধাবন করতে পারবেন না? তিনি কি বাঙালী? বাঙালী হোন-না-হোন, ধর্ষিতা
নারী কখনই প্রকাশ করতে চান না
তিনি ধর্ষিতা হয়েছেন, তার পরিবারও না।
পশ্চাত্যেও না।
পাশ্চাত্যে যতো ধর্ষণ
হয়, তার কয়টি রিপৌর্ট করা হয়? আর প্রাচ্য, তারপর বাংলাদেশ এবং তাও চার দশক আগের
বাংলাদেশ, যে-সময় নারীরা ঘরের বাইরেই প্রায় যেতো না! যারা কাখনও যুদ্ধ দেখিনি,
সেখানে নারী-পুরুষ কারও বর্ণনায় ধর্ষণের বিষয়টি আসবে না।
সেটি কলঙ্ক মনে করা হয়,
সামাজিক ভাবে।
যে-নীলিমা ইব্রাহিমের বই থেকে
শর্মিলা উদ্ধৃতি দিয়েছেন, সেই নীলিমা ইব্রাহিমের বইতেও এর ইঙ্গিত আছে।
১৯৭২ সালে পাকিস্তানী
যুদ্ধবন্দীরা যখন বাংলাদেশ ছেড়ে যাচ্ছে, তখন নীলিমা খবর পান ৩০/৪০ জন ধর্ষিতা নারীও
চলে যাচ্ছে।
তিনি তাঁদের সঙ্গে দেখা করে দেশ
ত্যাগ না-করার অনুরোধ জানান।
এর মধ্যে ১৪/১৫ বছরের এক
কিশোরীও ছিলো।
নীলিমা তাঁকে বলেন, 'তুমি আমার
বাড়ীতে থাকবে মেয়ের মতো'।
মেয়েটি রাজী হয়নি।
বলেছে, 'আপনি যখন
থাকবেন না, তখন কী হবে? যখন লোকে জানবে পাকিস্তানীরা আমাকে ধর্ষণ করছে, তখন সবাই
আমাকে ঘৃণা করবে।' নীলিমা ইব্রাহিম বলেন, 'তুমি কি জানো পাকিস্তানীরা তোমাকে নিয়ে
কী করবে?' মেয়েটি বলেছিল, 'জানি, ওরা আমাকে বিক্রি করে দেবে।
কিন্তু ওখানে কেউ আমাকে
চিনবে না।'
বছর দুয়েক আগে একজনের লেখায়
পড়লাম [ঠিক এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না] যে, পাকিস্তানের সুদূর চিত্রলে তিনি এরকম একজন
বাঙালী দেখেছিলেন, যিনি বাংলা ভাষা প্রায় ভুলে গিয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিতার সংখ্যা দিয়ে কী বোঝানো হয়? বাঙালীরা বলেন, দু'লক্ষ ধর্ষিতা
হয়েছে। তাতে
পাকিস্তানীদের নিষ্ঠুরতার মাত্রাটা বোঝানো হয়।
শর্মিলা বলেন, হয়তো
দু'হাজার ধর্ষিতা হয়েছে, তাতে যুদ্ধের ব্যাপকতা ও নিষ্ঠুরতা হ্রাস পায়।
শর্মিলাদের উদ্দেশ্যও
তাই, যার সঙ্গে বিবেকবান পাকিস্তানীরাও একমত নন।
বিষয়টিকে অন্যভাবেও
বিবেচনা করা যেতে পারে।
এ-বিবেচনার কথা বলেছিলেন
পাকিস্তানের প্রখ্যাত কলামিষ্ট এমভি নকভী।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানী
বর্বরতার প্রতিবাদ করে তিনি দি ডন পত্রিকায় লিখেছিলেন।
ডন তা ছাপেনি দেখে ডনে
লেখা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
করাচীতে তাঁর সাক্ষাৎকার
নিয়েছিলাম।
'পাকিস্তানী বাহিনী ছিলো', অকম্পিত স্বরে জানান নকভী, 'বিশৃঙ্খল লুটেরা বাহিনী।
এরা লুট করেছে, ধর্ষণ
থেকে শুরু করে সব রকমের অপরাধ করেছে।'
এ-সেনাবাহিনী কতো বোধহীন
ছিলো, তার প্রমাণ জেনারেল টিক্কা খানের মন্তব্য।
ঢাকা থেকে ফেরার পর
সাংবাদিকরা যখন লুট, ধর্ষণ, হত্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন,
ধর্ষণের সংখ্যাটি অতিরঞ্জিত [দেখুন, বেলুচিস্তানের কসাই নামে খ্যাত টিক্কার সঙ্গে
শর্মিলার মতের মিল কতো গভীর], মাত্র তিন হাজার, মাত্র তিন হাজার মহিলা ধর্ষিত হয়েছে।'
নকভী এরপর ক্রোধে-আবেগে
আর কথা বলতে পারছিলেন না।
উল্লেখ্য, গণহত্যার
মাসখানেক পর টিক্কা পাকিস্তানে ফেরেন।
সে-সময়ই সরকারী ভাবে
তিনি ৩ হাজার ধর্ষণের কথা বলেছেন।
নকভী এরপর যা বলেছিলেন
তাহলো, একজনকেও যদি ধর্ষণ করা হয় সেটিও অপরাধ।
তিনি যা বলতে চেয়েছিলেন
তার গূঢ়ার্থ, রাষ্ট্রের রক্ষকতো ধর্ষণ করতে পারে না।
বাঙালী
কর্তৃক প্রবলভাবে বিহারী মহিলা ধর্ষণের উল্লেখ করেছেন শর্মিলা।
২৫ মার্চের [১৯৭১] আগে
পাকিস্তানীদের হয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম-সহ আরও কয়েক জায়গায় বিহারীরা দাঙ্গা শুরু করে।
এ-দাঙ্গায় উভয় পক্ষেই
নিহত হয়।
কিন্তু ব্যাপকভাবে তা ছড়িয়ে
পড়ার আগেই দমিত হয় বাঙালী রাজনীতিবিদদের সাহায্যে।
২৫ মার্চের পর
হানাদারদের সহযোগিতায় বিহারীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালীদের ওপর।
২৬-৩০ মার্চ বিহারীরা
মিরপুরে যা, করেছিলো তার সাক্ষী আমি নিজে।
সৈয়দপুরেও একই কান্ড হয়।
বাঙালীরা কোনো-কোনো
ক্ষেত্রে প্রতিরোধ করে।
সেখানে নিষ্ঠুরতা
ধর্ষণের দুয়েকটা ঘটনাও ঘটতে পারে যা কাম্য ছিলো না।
কিন্তু তখন যুদ্ধ
চলছিলো, নিরস্ত্র বাঙালীরা আত্মরক্ষায় ব্যস্ত ছিল।
ঐ ধরণের ঘটনা যদি ব্যাপক
ঘটতো তাহলে পাকিস্তানী [দুই অংশের] এমনকি বিদেশী পত্র-পত্রিকায়ও ব্যাপকভাবে তা ছাপা
হতো।
কিন্তু বিহারীদের ওপর 'প্রবল'
অত্যাচারের খবর পাওয়া যায় একমাত্র পাকিস্তানী 'শ্বেতপত্র' ও মাসফারেনাসের লেখা
প্রতিবেদনের এক অনুচ্ছেদে।
মুক্তিযোদ্ধাদের
বিরুদ্ধে বিহারীদের বরং পাকিস্তানীরা ব্যবহার করে প্রচারের উদ্দেশ্যে।
আমরা যখন পাকিস্তানী
নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে আলাপ করি, তখন দুয়েকজন জেনারেল ছাড়া বিহারীদের ওপর 'প্রবল'
অত্যাচার ও 'প্রবল ধর্ষণের' কথা কেউ বলেননি।
এবং সে-সব জেনারেলরাও
মৃদুভাবে তা বলেছেন।
১৯৭১ সালে নকভীকে
সাংবাদিক হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়ে ঢাকায়।
হানাদারদের উদ্দেশ্য
ছিলো এটা বোঝানো যে, বিহারীদের ওপর প্রবল অত্যাচার হয়েছে, তাই পাকিস্তানীরা তাদের
জানমাল রক্ষায় ব্যস্ত।
নকভীর ভাষায়, 'আমাদের
তথাকথিত একটি রিফিউজি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো, যেখানে রাখা হয়েছিলো বিহারীদের
[লক্ষ্য করুন, 'তথাকথিত' শব্দটি ]।
একজন পাঠান কর্ণেল ছিলেন
ক্যাম্পের কমান্ডার।
কমান্ডার বললেন, এসব কথা
[বিহারীদের কথাবার্তা] শুনতে-শুনতে যখন আমার রাগ লাগে, ক্লান্তি লাগে, তখন গ্রামে
গিয়ে কিছু মানুষ মেরে আসি।
'চিন্তা করে দেখুন', বললেন নকভী, 'গ্রামের নিরীহ মানুষদের লাইন ধরিয়ে গুলি করে আসে।
এ ধরণের প্রচুর কাহিনী
আছে ।
এরা কি মানুষ, নাকি পশুরও অধম
...'।
আর
বাঙালীরা বাঙালী নারীদের ধর্ষণ করেছে? তাত্ত্বিকভাবে ঠিক।
তবে, বাস্তব হলো
সে-বাঙালীরা ছিলো হানাদার বাহিনীর সহযোগী জামায়াত ইসলামীর ক্যাডার, আলবদর বা
রাজাকার।
শর্মিলা বসুও যেমন হানাদারদের
সাফাই গাইছেন এখন, তেমনি অনেক বাঙালী ছিলো পাকিস্তানীদের সহযোগী।
তবে বাঙালীরা
[মুক্তিযোদ্ধা] পশ্চিম পাকিস্তানী মহিলা ধর্ষণ করেছে এমন বয়ান এ-প্রথম শুনলাম।
পাকিস্তানীরাও তা উল্লেখ
করেনি।
কারণ, এটি অবাস্তবের অবাস্তব।
শর্মিলা নিজেও তো
নিয়াজীর মেমৌর উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
যেখানে জেনারেল নিজেই
লিখেন, পাকিস্তানী সৈন্যরা পশ্চিম পাকিস্তানী মহিলাদের ধর্ষণ করেছে।
শর্মিলা অবশ্য বলতে
পারেন, সে-সব পাকিস্তানীরা বাঙালী ছিলো যারা পালাতে পারেনি, বা কিছু বাঙালী সৈন্য ও
অফিসার যারা ১৯৭১ সালে পুরোটা হানাদার পাকিস্তানীদের সঙ্গে ছিলো।
এ-যুক্তি দিলে অবশ্য
আমার কিছু বলার থাকবে না।
সবশেষে
একটি কথা বলি, শর্মিলা সব সময় মুক্তিযুদ্ধকে 'গৃহযুদ্ধ' বলে উল্লেখ করেছেন।
পাকিস্তানী সৈন্য-প্রেমী
এ-নারীর জ্ঞাতার্থে বলি, যুক্তরাষ্ট্রের পর বাংলাদেশেই বিশ্বের দ্বিতীয় দেশ, যে
স্বাধীনতার
ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ করেছিলো এবং
জয়ী হয়েছিলো।
তাই তাত্ত্বিকভাবেও এটিকে
গৃহযুদ্ধ বলা সমীচিন নয়।
এতে একটি রাষ্ট্রের
জন্মকেই অপমান করা হয়।
পাকিস্তানী সৈন্যরা
পাকিস্তান শুধু ভাঙ্গেইনি পাকিস্তানকেও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
পাকিস্তানী সিভিল সমাজকে
[যাদের অনেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে জেলে
পর্যন্ত গিয়েছিলেন] তারা অস্ত্রের সাহায্যে দমন করে রেখেছে, যেখানে বীরত্বের কিছু
নেই।
নিন্দিত এই সেনাবাহিনী পৃথিবীতে
সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে ভারতকে [তাদের ভাষায় হিন্দুস্থান] এবং হিন্দু সম্প্রদায়কে।
বাঙালী মুসলমান
সম্প্রদায়কেও তারা ভারতের হিন্দুদের সমার্থক মনে করে।
সে-বাহিনীর প্রতি যখন
কোনো বাঙালী নারী গবেষণার মোড়কে তাদের অন্যায়কে খাটো করে দেখার প্রচেষ্টা গ্রহণ
করেন, তখন এটিই অনুধাবন করি - আসলেই আইএসআই খুবই শক্তিশালী, প্রভাবশালী, কর্মক্ষম
আইনী সন্ত্রাসী একটি প্রতিষ্ঠান।
মুনতাসীর
মামুনঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক
আপলৌডঃ
১৪ ডিসেম্বর, ২০০৭
|
|
|