London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের এখনই সময়

মানিক মাহমুদ

একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী ও স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, সকল ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেণীর মানুষ মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা পাবে - এরকম স্বপ্ন নিয়েই বাংলাদেশের নারী-পুরুষ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মরণপণ লড়াই করেছিলো কিন্তু এখনও এ-দেশের জনগণের সে-স্বপ্ন পূরণ হয়নি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাত, কাপড়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা হয়নি বাস্তবায়িত হয়নি ৩০ লাখ শহীদের স্বপ্ন - মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠিত হয়নি কার্যকর গণতন্ত্র নারী, দরিদ্র এবং জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী পায়নি সমান মর্যাদা ও অধিকার

যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও পাকিস্তানীদের সহযোগিতা করেছিলো, গণহত্যা ও ধর্ষণের মতো জঘন্যতম অপরাধ করেছিলো, তাদের বিচার না হওয়ায় দিনে-দিনে তারা এদেশের সকল সেক্টরে পুনর্বাসিত হয়েছে ধর্মীয় অনুভূতির যথেচ্ছ ব্যবহার করে এ-প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী কলূষিত করেছে দেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গন নতুন প্রজন্মকে করেছে বিভ্রান্ত মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাকে তারা বারবার বিতর্কে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করেছে যার ফলে, রাষ্ট্র ও সরকার মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা বিরোধীদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে যেজন্য আমরা দেখছি নারী এখনও নির্যাতিত হচ্ছে ফতোয়ার মাধ্যমে বঞ্চিত হচ্ছে পারিবারিক আইন-সহ উত্তরাধিকারে সমানাধিকার থেকে নারীর সমানাধিকার বিরোধী কুসংস্কারাচ্ছন্ন মন-মানসিকতা বার-বার উস্কে উঠছে আর জনগণের বাস্তব জীবনের মৌলিক চাহিদা, তথা অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসা-শিক্ষার প্রসঙ্গ, পেয়েছে নিদারুণ অবহেলা

দিনে-দিনে এ-গোষ্ঠী হাত চালিয়েছে ইতিহাসেও, ঘটিয়েছে যথেচ্ছ বিকৃতি তারা একাত্তরের স্বাধীনতা- ও মানবতা-বিরোধী ভূমিকাকে অস্বীকার করছে লাখ-লাখ বাঙালীকে হত্যা করেও এরা এখন হাতের রক্ত মুছে নিষ্কলূষ সেজে বলছে, 'এদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী ছিলো না এবং এখনও নেই।'

এ-পরিস্থিতিতে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর বাংলাদেশের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে সোচ্চার হয়েছে জাতীয়ভাবে আজ জোরে-শোরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবী উঠেছে এ-দাবী সকল শ্রেণী-পেশা-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গের মানুষের প্রতারক ও মিথ্যুক এ-প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীটি যে, একাত্তরে লাখ-লাখ বাঙালীকে হত্যা করেছে, তার প্রচুর প্রমাণ ছড়িয়ে আছে দেশে ও বিদেশে পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী ও তাদের এ-দেশের দোসরদের ৫৩ ধরণের বিভিন্ন অপরাধ শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ছিলো ১৭ ধরণের যুদ্ধাপরাধ, ১৩ ধরণের মানবতাবিরোধী অপরাধ, ৪ ধরণের গণহত্যা সংক্রান্ত অপরাধ ও অন্যান্য দেশে প্রায় ৫ হাজার বধ্যভূমি তৈরীর খোঁজ জানা গেছে, যার মধ্যে ৯২০টি ইতোমধ্যে শনাক্তও হয়েছে তাছাড়া আন্তর্জাতিকভাবেও ১৯৭১-এ বাংলাদেশে 'জেনোসাইড' বা গণহত্যার বিষয়টি সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে এদেশের বিভিন্ন বয়সী কয়েক লাখ নারী এদের বর্বরতম নির্যাতনের শিকার হয়েছে নির্যাতিত অনেক নারী এখনো বেঁচে আছেন কাজেই আদালতে অপরাধ প্রমাণ করাও অসম্ভব কিছু না

সরকার চাইলে প্রচলিত আইনেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা সম্ভব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ১২১, ১২১ (ক), ১২২ ও ১২৩ (ক) ধারাই যথেষ্ট মুক্তিযুদ্ধের সময় কারা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে সাহায্য করেছে, তার রিপৌর্ট সে-সময় প্রাদেশিক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত ইসলামাবাদে পাঠাতো এসব নথিপত্র দেশের  স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েই রয়েছে এছাড়াও রয়েছে সে-সময়ের সংবাদপত্রের ফাইল ও টেলিভিশনের ফুটেইজ সাক্ষ্য আইনের ১৭ ও ৯০ ধারা অনুযায়ী এসব তথ্য আদালতে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব সুতরাং এটা বলা যায়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য সরকারের সদিচ্ছাটিই যথেষ্ট

উল্লেখ্য, গত ২৭ মার্চ ২০০৭ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে এক চা-চক্রে বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ স্বাধীনতা ৩৬ বছর পরও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি সরকারের কাছে উত্থাপন করা হবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ডঃ এটিএম শামসুল হুদা যুদ্ধাপরাধী ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া বিষয়ে রাজনৈতিক দলসমূহের দাবীর সঙ্গে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করে বলেন, বিষয়টি যেহেতু রাজনৈতিক, এ-বিষয়ে কিছু করতে হলে সরকারকেই তার উদ্যোগ নিতে হবে

আমরা চাই, সরকার এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করুক কারণ ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত রেজুলেশন ২৬০ (৩) এর অধীনে গণহত্যাকে এমন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করা হয়, যা প্রতিরোধে সব রাষ্ট্রই অঙ্গীকারবদ্ধ কাজেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একটি বাধ্য-বাধকতা রয়েছে তাছাড়া একাত্তরে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, যাঁরা বিভিন্নমাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ, শ্রেণী-পেশা ও ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে যাঁরা যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেও যুদ্ধাপরাধের বিচার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব

যুদ্ধাপরাধীদের প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, কে যুদ্ধাপরাধী সেটা নির্ধারণ করা একটি আইনী বিষয় এ-ব্যাপারে উৎসাহী ও সংক্ষুব্ধ যেকোনো নাগরিক আইনের আশ্রয় নিতে পারেন কিন্তু সত্য হলো, পৃথিবীর সব দেশেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি সামষ্টিক বলে এর দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এজন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে দেখা যায় যুদ্ধাপরাধ আসলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ কারণ তারা ব্যক্তিকে নির্যাতন ও হত্যার মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছে তৎকালীন সরকার, বিভিন্ন বাহিনী ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সংক্রান্ত মামলায় বাদী হতে হবে রাষ্ট্রকেই, যেখানে ব্যক্তির ভূমিকা হবে সাক্ষ্যদানের, তারা তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করতে পারে

এ-কথা অনিস্বীকার্য যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করে ইস্যুটিকে ঝুলিয়ে রাখা হলে এটি এদেশের গণতন্ত্রের পরিপূর্ণ বিকাশের পথে একটি বড়োসড়ো অন্তরায় হয়ে থাকবে বারবারই ইস্যুটি জাতীয় বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হবে আর প্রকারান্তরে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের আপামর জনসাধারণ মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা এখনো বাস্তবায়িত না হওয়ায় নানা বাস্তব মৌলিক সঙ্কটে নিপতিত আজ দেশের মানুষ এসব সঙ্কট দূর করে তাদের সুস্থ-সুন্দর জীবন দেয়া সমাজ-রাষ্ট্রের দায়িত্ব কিন্তু এ-বিষয়ে পুরোপুরি মনোযোগী না হয়ে একটি মীমাংসিত ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চালিয়ে যাওয়া শ্রম ও সময়ের কেবলই অপচয় তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করে ইস্যুটাকে একেবারেই নিঃশেষ করা দরকার যে-বিচার প্রতিষ্ঠা করবে, সমগ্র জাতির মর্যাদা ও ন্যায়ের অধিকার

নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য দেশের সব রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে নির্বাচন কমিশন এ-সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মহল থেকে দাবী উঠেছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল, যারা যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত, তাদের একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধিত হতে না দেয়ার ব্যাপারে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও যৌক্তিক দাবী কারণ বিশেষ ক্ষমতা আইন [ধারা ২০(১)[ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক কিংবা ধর্মের নামে রাজনৈতিক দল গঠন করা বেআইনী যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামী নামের দলটি যে, এ-বেআইনী কাজটিই করে চলেছে, তা তাদের দলের গঠনতন্ত্র দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যায় বাংলাদেশের সংবিধানের প্রাণ হিসেবে বিবেচিত ৭ম অনুচ্ছেদে বলা আছে, 'প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এ-সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে'। অর্থাৎ সংবিধানে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক হিসেবে জনগণকে ঘোষণা করা হয়েছে অথচ জামায়াতে ইসলামী-সহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো জনগণের এ মালিকানার সঙ্গে একমত নয় তাছাড়া এরা নারী এবং জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সমানাধিকারে বিশ্বাস করে না এরা প্রতিনিয়ত নারীর সমানাধিকার বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে নারীর ক্ষমতায়নে বাধা সৃষ্টি করে চলেছে কাজেই যে-রাজনৈতিক দল দেশের সংবিধানের প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা রাখে না, সকল নাগরিকের সমান অধিকারে বিশ্বাস করে না, সে-রাজনৈতিক দল জাতীয় নির্বাচন অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারক হিসেবে ভূমিকা রাখবে এটা খুবই লজ্জাজনক

প্রধান নির্বাচন কমিশনার যুদ্ধাপরাধীদের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার ব্যাপারে নীতিগতভাবে একমত প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা নিজেও যুদ্ধাপরাধীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার বিষয়টিকে অনভিপ্রেত বলে জানিয়েছেন দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রতিটি মানুষই চায় এরকম একটি অনভিপ্রেত ঘটনা যেনো না ঘটে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া একটা দেশের নেতৃত্ব কিছুতেই মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-বিরোধীদের হাতে থাকতে পারে না তাছাড়া নির্বাচন কমিশন ধর্মকে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহার করায় নিষেধাজ্ঞা জারী করেছেন সে-অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারেন এবং এর মধ্য দিয়েই ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহারের পথ আইনগতভাবে রুদ্ধ করা সম্ভব

দেশের বিবেকবান সকল মানুষ মনে করে, প্রধান উপদেষ্টা, সেনাপ্রধান, প্রধান নির্বাচন কমিশনার যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে এতোদিন যে-বক্তব্য দিয়েছেন, 'এখনই সময়' তা বাস্তবায়নের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কোনো যুক্তিতেই কম গুরুত্বপূর্ণ কাজ নয় কেনো-না, এ-নরঘাতকেরা দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করেছে, নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছে একাত্তরের শীর্ষ অপরাধী এবং তাদের এ-দেশীয় দোসরদের যারা গণহত্যা সংঘটিত করেছে, নারী নির্যাতন-সহ মানবতা-বিরোধী অন্যান্য অপরাধ করেছে বা, এসব অপকর্মে নানাভাবে সহায়তা করেছে, তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করবার এখনই শ্রেষ্ঠ সময় শান্তির ধর্ম ইসলামের মূল চেতনা ও মর্মবাণীকে বিকৃত করে একটি ওয়াহাবী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর জামায়াতী ইসলামী ও তার অন্যান্য দোসরদের স্বরূপ উন্মোচন করা ও নির্মূল করার কাজে আজ প্রশাসন, প্রচার মাধ্যম, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও দেশপ্রেমিক সকল নাগরিকের সক্রিয় ভূমিকা পালন করা জরুরী লাখো শহীদের আরাধ্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমৃদ্ধ নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে সংশ্লিষ্ট সকলের এ-দায়িত্ব এড়িয়ে যাবার কোনো সুযোগ নেই

মানিক মাহমুদ গবেষক

১৪ ডিসেম্বর, ২০০৭

 
 
   

অন্যান্য কলাম 8

© 2007 Confidence Services Ltd.