London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

ইতিহাসের রক্তপলাশঃ চৌদ্দ ডিসেম্বর

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

এক বছরের মধ্যে একটা দেশে দু'-দু'বার ব্যাপকভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনা মধ্যযুগের ইতিহাসেও পাওয়া যায় না এ-কালের ইতিহাসেও স্বৈরাচার-শাসিত দেশে - যেমন, হিটলারের জার্মানী, মুসোলিনীর ইতালি, সালাজারের পর্তুগাল, ফ্রাঙ্কোর স্পেইন, মবুতুর কঙ্গো বা পিনোশের চিলিতে - বহু দেশপ্রেমিক স্বাধীনচেতা বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে কিন্তু ১৯৭১ এর বাংলাদেশের মতো একরাতে দলবদ্ধভাবে বুদ্ধিজীবীদের নিজ-নিজ ঘর থেকে তুলে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার নজির বিরল

মুসেলীনির ইতালিতে তার ব্ল্যাকশার্ট গুন্ডাদের ভয়ে আলবার্তো মোরাভিয়ার মতো কথাশিল্পী - রাজনীতির সাথে যাঁর সম্পর্ক ছিলো না - দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন হিটলারের ব্রাউনশার্ট নামধারী গুন্ডারা মনীষী রোঁমা রোঁলাকে ধরে নিয়ে জেলে পুরেছিলো তাঁকে হত্যা করেনি তারা। বাংলাদেশে ঊনিশশো একাত্তর সালে শুধু রাজনীতি-মনস্ক বুদ্ধিজীবীদের নয়, রাজনীতির সাথে যাঁদের সম্পর্ক ছিলো না, এমন বুদ্ধিজীবীদেরও এক সঙ্গে ধরে নিয়ে ভয়ানক নির্যাতনের পর হত্যা করে বধ্যভূমিতে তাঁদের বিকৃত লাশ ফেলে রাখা হয় এ-বুদ্ধিজীবীদের প্রায় সকলের বিকৃত মৃতদেহই আর সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি

এ-নির্যাতন ও নির্মম হত্যাকান্ড থেকে অব্যাহতি পায়নি মহিলা বুদ্ধিজীবীরাও রবীন্দ্রনাথের কবিতায় 'শিশুঘাতী নারীঘাতী বর্বরতার' বিরুদ্ধে কথা আছে এ-বর্বরতা বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে দু'-দু'বার প্রত্যক্ষ করেছে, একবার স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে ২৫ মার্চের রাতে এবং আরেকবার সফল স্বাধীনতা যুদ্ধের একেবারে শেষের মাসের - ডিসেম্বরের - ১৪ তারিখে প্রতিবছর এ-দু'টি দিনেই বাংলার মানুষ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করে - তবে বিশেষভাবে ১৪ ডিসেম্বর তারিখটি চিহ্নিত বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস হিসাবে

বাংলাদেশে এ-বুদ্ধিজীবী হত্যার নৃশংসতায় আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, যেখানে ২৫ মার্চ রাত্রে পাকিস্তানী হানাদারেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘেরাও করে নিজেরাই শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিলো, সেখানে ১৪ ডিসেম্বর রাতে বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ ও হত্যার কাজে হানাদারদের প্রধান সহযোগী ছিলো সাম্প্র্রদায়িক ও মৌলবাদী রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতে ইসলামের তদারকিতে গঠিত আল-বদর, আল-শামস্‌, রাজাকার প্রভৃতি নামের ঘাতক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা এ-কোলাবরেটরেরা নিজ দেশের বুদ্ধিজীবী হত্যায় পাকিস্তানী হানাদারদের চাইতেও বেশি নৃশংসতার পরিচয় দেয়

সবচাইতে বড়ো কথা, জামায়াতীরা নিজেদের ইসলামের খাঁটি অনুসারী বলে পরিচয় দেয়, কিন্তু মিথ্যাচার, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণে হানাদারদের সহায়তা যোগানোর ব্যাপারে তাদের অপরাধের কোনো তুলনা নেই শুধু অমুসলমান নারী নয়, বহু মুসলমান (বাঙালী) কুমারী ও বিবাহিত নারীকে তারা হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে তাদের ভোগ-লালসা পূর্ণ করার জন্য এ-সম্ভ্রম লুন্ঠিত নারীদের অনেককে পরে হত্যা করা হয়

এখানে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলি একাত্তর সালের ডিসেম্বর মাসের গোড়ার দিকে যশোর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয় তাতে মুজিব নগর সরকারের নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা দেন আমি তখন কলকাতায় ছিলাম বাংলাদেশের কয়েকজন সাংবাদিক ও সাহিত্যিকের সঙ্গে মুক্তাঞ্চল যশোর পৌঁছে দেখি, সারা এলাকা লোকে লোকারণ্য মানুষ বিজয়োল্লাসে আর মুক্তির আনন্দে রাস্তায় নেমে এসেছে জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগানে চারদিক মুখরিত

সবচাইতে বেশি ভিড় পরাজিত ও পলায়নপর পাকিস্তানী সৈন্যদের পরিত্যক্ত বাঙ্কারগুলোয় আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ইউনিট ভারতীয় শিখ সেনাদের সঙ্গে বাঙ্কারগুলো থেকে নির্যাতিতা বাঙালী নারীদের উদ্ধারকার্য্যে নিয়োজিত কয়েকটি বাঙ্কার থেকে বেশ কয়েকজন হিন্দু ও মুসলমান তরুণীকে উদ্ধার করা হলো তাঁরা তখন সম্পূর্ণ বিবস্ত্র সর্বাঙ্গে পাশবিক নির্যাতনের চিহ্ন শিখ সৈন্যেরা জীবন গেলেও মাথার পাগড়ি খুলতে চায় না তাতে তাঁদের ধর্মের সম্ভ্রম হানি হয় বলে সম্ভবতঃ মনে করেন তাঁরা কিন্তু পাকিস্তানী সৈন্যদের বাঙ্কার থেকে উদ্ধার করে আনা নারীদের লজ্জায় দিশেহারা উলঙ্গ মূর্তি দেখে তাঁরা মাথার পাগড়ি খুলে বস্ত্রহীনাদের দিকে ছুড়ে দিতে শুরু করেন। ওই পাগড়ি দিয়ে হতভাগ্য মেয়েরা সেদিন তাঁদের লজ্জা নিবারণ করেছিলেন

বহু বছর আগের কথা তবু সেদিনের সে-দৃশ্য এখনও আমার স্মৃতিতে জ্বল-জ্বল করছে এ-উদ্ধার করা বীরাঙ্গনাদের পরিচয় সেদিন আমি নৌট করেছিলাম এঁরা সকলেই কম-বেশি শিক্ষিতা তিনজনতো গ্রাজুয়েইট একজন কলেজের শিক্ষিকা ছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন কেউ কুমারী, কেউ বিবাহিতা, কারও আবার বিয়ের কথা-বার্তা চলছিলো এঁদের অধিকাংশকেই হানাদার সৈন্যেরা সরাসরি অপহরণ করেনি এঁদের খোঁজ নিয়ে হানাদারদের খবর দিয়েছে এবং ধরে আনার সাহায্য যুগিয়েছে জামায়াত, আল-বদর ও রাজাকারদের স্থানীয় বিশিষ্ট নেতা-কর্মীরা

ষোল ডিসেম্বর (১৯৭১) ন'মাস-ব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জিত হয় ঢাকা হয় হানাদার-মুক্ত শহর চারদিকে বাঁধভাঙ্গা বিজয়-উল্লাস দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে নাৎসি জার্মানীর পরাজয়ের পর প্যারিস শহর হানাদার মুক্ত হওয়ায় শহরটিতে যে-বিজয়োল্লাস দেখা দিয়েছিলো, অনেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের হানাদার-মুক্ত ঢাকা শহরের বিজয়োল্লাসকে তার সঙ্গে তুলনা করেন কেবল মুক্ত ঢাকায় সকল মানুষ তখনও জানতো না হানাদারেরা আত্মসমর্পণের মাত্র একদিন আগে রাজাকার, আল-বদরদের সহায়তায় কী নৃশংস হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে শহরটির বুকে কোনো-কোনো বুদ্ধিজীবীর নিখোঁজ হওয়ার খবর জানা গিয়েছিলো অনেকে ধরে নিয়েছিলেন, হানাদারদের পরিত্যক্ত বন্দী শিবির থেকে তাঁদের উদ্ধার করা যাবে কিন্তু নরপিশাচেরা যে-অপহৃত প্রতিটি বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে বধ্যভূমিতে লাশ ফেলে রেখেছে, এ-খবর সকলের জানা থাকলে ষোল ডিসেম্বর বিজয়োল্লাস অনেকটাই ম্লান হয়ে যেতো

সে-কথাই বলেছেন বিখ্যাত ফরাসী লেখক ও দার্শনিক আঁদ্রে মার্লো মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই বাংলাদেশ সফরের সময় তিনি বলেছেন, 'আমি নাৎসি হানাদারদের কবল-মুক্ত প্যারিসের মানুষের বিজয়োল্লাস দেখেছি আবার ঢাকায় বিজয় দিবসের দিনটিতে এসে পৌঁছুতে না পারলেও যখন ঢাকায় এসেছি, তখনও বিজয়োল্লাসের রেশ শেষ হয়ে যায়নি তাই বলতে পারি, আমি বাঙালীর বিজয়োল্লাসও দেখেছি তবে প্যারিস ও ঢাকা দু'শহরের দু'বিজয় উৎসবের মধ্যে পার্থক্য আছে ফ্রান্সে আত্মসমর্পণের আগে নাৎসি হানাদারেরা অথবা তাদের কোলাবরেটরেরা নৃশংসভাবে অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে এক সঙ্গে হত্যা করে যায়নি তাই বাঙালীর ষোল ডিসেম্বর মুক্তি ও বিজয়ের আনন্দকে যেমন বিষাদঘন ও অশ্রুসিক্ত করে তুলেছিলো, একদিন আগে ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড, ফরাসীদের মুক্তি ও বিজয়ের আনন্দে সেই বিশাল বিষাদের ছায়া ছিলো না

মার্লোর কথার সঙ্গে আমার এক লেখায় অনেক পরে আমি একটা কথা যোগ করেছিলাম ১৯৯৪ সালের ২২ জুন তারিখে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রধান দোসর, পাকিস্তানী পাসপোর্টধারী জামায়াত নেতা গোলাম আজমকে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত শাস্তি-দানের পক্ষে সুপারিশ করার পরিবর্তে যখন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়, তখন ঢাকায় একটি কাগজেই আমার এক কলামে লিখেছিলাম, ফ্রান্সের এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী ঘটনার মধ্যে একটা বড়ো পার্থক্য হলো যে, ফরাসীরা মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হওয়ার পর দেশের নাৎসি কোলাবরেটর ও দেশদ্রোহীদের কঠিন হাতে শাস্তি দিয়েছে এ-কোলাবরেটরদের মধ্যে কে কতো বড়ো নেতা বা বিশিষ্ট ব্যক্তি, তা নিয়ে তাঁরা মাথা ঘামায়নি আর আমরা বাংলাদেশে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী, ঘাতক, দালাল ও দেশদ্রোহীদের শুধু শাস্তি থেকেই অব্যহতি দেয়নি, রাষ্ট্রে ও সমাজে তাদের আবার সম্মানিত নাগরিক হিসেবে অধিষ্ঠিত হতে দিয়েছি

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে ফ্রান্সে মার্শাল পেঁতা ছিলেন বীর ও মহানায়ক হিসেবে পরিচিত তাঁকে বলা হতো ভার্দুন বিজয়ী মার্শাল পেঁতা ঐতিহাসিক ভার্দুন যুদ্ধে তিনি ফ্রান্সের জন্য বিজয়ের মুকুট ছিনিয়ে এনে ফরাসীদের মনে শ্রদ্ধা ও সম্মানের আসন লাভ করেছিলেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হিটলারের নাৎসি সৈন্যেরা ফ্রান্স দখল করলে সেই পেঁতা হিটলারের কোলাবরেটর হন এবং প্যারিসে একটি তাঁবেদার সরকার গঠন করেন এ-সরকারকে বলা হত ভিসি সরকার

নাৎসিদের পরাজয়ের পর মার্শাল পেঁতাকে গ্রেফতার করা হয় তাঁর ভার্দুন বিজয়ী খেতাব কেড়ে নেওয়া হয় এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় কয়েক দশক নির্জন কারা কক্ষে থাকার পর পেঁতা যখন নবতিপর বৃদ্ধ এবং মৃত্যুশয্যায় শায়িত, তখন তাঁকে মানবিক কারণে মুক্তি দানের জন্য কেউ-কেউ আবেদন করেছিলেন ফ্রান্সের সরকার এবং উচ্চ আদালত কেউ তাঁকে মুক্তি দিতে সম্মত হননি দেশদ্রোহী এবং নাৎসি কোলাবরেটর পেঁতাকে জেলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়েছে ফ্রান্সে শুধু মার্শাল পেঁতা নন, কোনো নাৎসি কোলাবরেটরই শাস্তি এড়াতে পারেনি

বাংলাদেশে আমরা এর বিপরীত দৃশ্য দেখি। আমরা যদি পাকিস্তানী হানাদারদের ছোট-খাটো কোলাবরেটরদের কথা বাদ দিই, তাহলেও দেখি নেতৃস্থানীয় কোলাবরেটরদেরও বিচার ও শাস্তি হওয়া দূরে থাক, সমাজে তাদের সম্মানিত পুনর্বাসন করা হয়েছে এবং প্রশাসনে ও রাষ্ট্রে তাদের ক্ষমতার ভাগিদার হতে দেওয়া হয়েছে সভ্য দুনিয়ার ইতিহাসে এর উদাহরণ বিরল

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি ছিলাম কলকাতায় ব্যক্তিগত কারণে স্বদেশে ফিরতে দেরি হচ্ছিলো এ-সময় একদিন সন্ধ্যায় কলকাতায় দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা অফিসে বার্তা সম্পাদক অমিতাভ চৌধুরীর কক্ষে বসে আছি এমন সময় তিনি টেলেক্স মেশিনে পাওয়া ঢাকার খবরের কাগজের বান্ডিল হাতে ঘরে ঢুকলেন তাঁর মুখ বিষন্ন। তিনি বললেন, গাফ‌ফার খুবই খারাপ খবর ঢাকায় অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছে আত্মসমর্পণের একদিন আগে হানাদার বাহিনী এবং তাদের কোলাবরেটরেরা এ-কাজটি করেছে নিহতদের নামের তালিকা এসেছে তাঁদের লাশ সনাক্ত করা যায়নি নিখোঁজদের নাম থেকেই এই তালিকা তৈরী করা হয়েছে আমার ভয় হয়, তোমার অনেক বন্ধু বান্ধব এবং পরিচিতজনের নাম হয়তো রয়েছে এ-তালিকায়

কম্পিত হাতে বুদ্ধিজীবীদের নামের তালিকাটি নিয়েছি যা ভয় করেছিলাম, তাই সত্য হলো অধিকাংশ নামই আমার চেনা কেউ ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কেউ শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব মনে আছে অনেক্ষণ কথা বলতে পারিনি নির্বাক বেদনায় শহীদুল্লাহ কায়সার, সিরাজুদ্দীন হোসেন থেকে শুরু করে তখন পর্যন্ত নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের নামের তালিকার দিকে চেয়ে রয়েছি অমিতাভ চৌধুরী বলেছিলেন, তোমাকে সান্তনা দিয়ে লাভ নেই এ-নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের সকলকেই হত্যা করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে যদিও মৃতদেহগুলো এখনও সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি

পরাজয়ের আগে পরাজিত শত্রুরা পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ করে বলে জানি অর্থাৎ, যে-দেশটি থেকে পরাজিত হয়ে তাদের পালাতে হবে, সে-দেশটির রাস্তাঘাট ভেঙ্গে, ঘর-বাড়ী শস্যাগার, দোকানপাট পুড়িয়ে ভস্ম করে রেখে যায় কিন্তু বেছে-বেছে একরাতে দেশটির বুদ্ধিজীবীদের এমনভাবে হত্যা করে, তা আমার জানা ছিলো না বহুদিন আমি ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করেছি বাংলাদেশে হানাদারেরা যে-গণহত্যা চালিয়েছিলো, তার একটা অর্থ আমি বুঝতে পারি অনেক দেশের স্বৈরাচারী শাসকেরা তাদের বিরোধী বুদ্ধিজীবীদের উপর নির্যাতন চালায়, গুপ্ত পুলিশের সাহায্যে যে-হত্যা করে, তার নজীর আছে কিন্তু বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে হানাদার বাহিনী এবং তাদের কোলাবরেটরেরা মিলে দেশর শীর্ষস্থানীয় অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীকে যেভাবে একসঙ্গে হত্যা করেছে, তার নজির সত্যেই বিরল

এর একটা মাত্র উদ্দেশ্য হয়তো ছিলো, যুদ্ধে পরাজিত এবং বাংলাদেশ থেকে বিতারিত হওয়ার আগে পাকিস্তানী হানাদারেরা চেয়েছিলো দেশটির উপর চরম এবং চূড়ান্ত আঘাত হানতে এবং এমন একটি স্থানে আঘাত হানতে যে-আঘাতে বাংলাদেশের জাতীয় মেধা ও মনন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয় এবং দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করলেও দীর্ঘদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে এবং স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে ব্যর্থ হয় পাকিস্তানী হানাদারদের অমানবিক ও হিংস্র প্রতিহিংসাপরায়ণতা থেকেই বুদ্ধিজীবী নিধনের এ-পরিকল্পিত বর্বরতা

গত ছত্রিশ বছরেও বাঙালীর জাতীয় মানসে নৃশংস বুদ্ধিজীবী-হত্যার নীরব রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়েছে তা আমার হয় না হয়তো কালের অমোঘ নিয়মে সে-রক্তক্ষরণের বাহ্যিক বেদনার প্রকাশ প্রশমিত কিন্তু রক্তপলাশের থোকা-থোকা গুচ্ছের মত এ-নামগুলো মার্চ মাস এবং ডিসেম্বর মাস এলেই বাংলাদেশের মানুষের মনে ফুটে ওঠে মাস শেষ হলে ঝরে যায় আবার মাস এলেই ফুটে ওঠে এ-ফোটার কোনো অন্ত নেই অনন্ত এবং অমিতায়ু এ-স্মৃতির শতদল

জাতীয় মানস থেকে এ-নামগুলো মুছে ফেলার অনেক চেষ্টা হয়েছে কারণ এ-নামগুলো শুধু নাম নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সে-স্বাধীনতায় সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রতীক বাংলার লোকায়ত সভ্যতা-সংস্কৃতির অনির্বাণ দীপশিখার মতো এ-নামগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সভ্যতা-সংস্কৃতির শত্রুরা তাই চেয়েছে এ-নামগুলো মুছে ফেলে বাংলাদেশের মানুষের মন থেকে স্বাধীনতার আদর্শ ও মূল্যবোধগুলো মুছে ফেলতে এবং বাঙালীকে একটি আত্মবিস্মৃত জাতিতে পরিণত করতে

এ-চক্রান্ত এখনও চলছে কিন্তু এ-চক্রান্ত সফল হবে এমন কথা ভেবে আমাদের নৈরাশ্য পীড়িত হওয়ার কারণ নেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা সম্ভব হয়েছে কিন্তু তাঁদের দেশপ্রেমের আদর্শকে হত্যা করা সম্ভব হয়নি আর আদর্শকে হত্যা করতে না পারলে ব্যক্তিকে হত্যা করে লাভ নেই প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর আসে আর শহীদ বুদ্ধিজীবীরা আরও শক্তিশালী হয়ে জাতীয় মানসে স্মৃতির পদ্মফুল হয়ে ফুটে ওঠেন অনির্বাণ দীপশিখার মতো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আগুন আবার সকলের মনে জ্বালিয়ে দেন সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যে-অমর নামগুলো খোদিত, এগুলো শুধু নাম নয়, আমাদের জাতীয় বিবেককে জাগ্রত রাখার চিরকালের প্রেরণা এখানেই আমাদের স্বাধীনতার শত্রুদের আসল পরাজয় তারা বার-বার বাংলাদেশের সমাজে, রাজনীতিতে, রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিপর্যয় সৃষ্টি করছে কিন্তু জয়ী হতে পারছে না কারণ, বহু শহীদের রক্তে ভেজা এবং বহু মা-বোনের অশ্রুভেজা চৌদ্দ ডিসেম্বর সব ঝড়-ঝাপটার মুখে এখনও আমাদের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক চেতনার সবচাইতে দূর্ভেদ্য রক্ষাপ্রাচীর

আপলৌডঃ ১৪ ডিসেম্বর, ২০০৭

 
 
   

অন্যান্য কলাম 8

© 2007 Confidence Services Ltd.