London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

বিজয়ের প্রত্যয়, স্থবিরতার সাথে বসবাস

ফকির ইলিয়াস

ডিসেম্বর বাঙালীর বিজয়ের মাসঅর্জনের মাসএকটি জাতির জীবনে এমন উল্ল্যেখযোগ্য সময় কয়েকটি মহাকাল পরেই আসেবাঙালীর জন্য একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশমাতৃকার জন্ম তেমনি অবিস্মরণীয় ঘটনা১৯৭১ থেকে ২০০৭ - ছত্রিশ বছর বয়সী বাংলাদেশএ-বয়সে একটি রাষ্ট্র, একটি জাতি কতোটা পূর্ণতা পেতে পারে, তা নিয়ে কথা চলতে পারে পক্ষে-বিপক্ষেকিন্তু পাওয়ার ঝুড়ি যদি তুলনামূলক শূন্যের কোটায় থাকে, তবে সে-দুঃখবোধ হয়ে পড়ে হৃদয় বিদারকবাংলাদেশের ক্ষেত্রে তেমনটি হয়েছে

তিন যুগ সময়ে বাংলাদেশে প্রধান দুঃখবোধটি হচ্ছে, রাজনৌতিক ব্যর্থতাযার ফলে যে-চেতনা নিয়ে রাষ্ট্রটি বিজয়মাল্য পেয়েছিলো, তা রোদনে পরিণত হয়েছেএকটি রাষ্ট্র কাঠামো উঠে দাঁড়াবার আগেই তার মেরুদন্ড ভেঙে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে অত্যন্ত জঘন্যভাবেবাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মহানুভবতার সুযোগ নিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সেই পরাজিত শক্তির প্রেতাত্মারা

১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গ যারা তুলেন, এটাও তারা খুব ভালো করে জানেন, পাকপন্থী একটি সনাতনী ব্যুরোক্রেসী নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সরকার চারনা ছিলো দুরূহ কাজ সমন্বয়ের অভাব, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের নিষ্পেষণ, দেশী বেনিয়া গোষ্ঠীর তীব্র অসহযোগিতা চুয়াত্তরের মন্বন্তরকে কাগুজে বাঘে রূপান্তরিত করেষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বাসন্তীক 'জাল' পরিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনাম করা হয়যা পরে প্রমাণিত হয়েছে

বাহাত্তর-পরবর্তী সময়ে ঘনীভূত রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরকার বিরোধিতার নামে হটকারী সিদ্ধান্ত পরাজিত রাজাকারদের ভাগ্য ক্রমশঃ খুলে দিতে থাকেপাকপন্থী সেনা-সদস্যদেরকে সংগঠিত করে ঘটানো হয় পঁচাত্তরের নির্মম হত্যাযজ্ঞসপরিবারে নিহত হন জাতির জনক এরপর কারা কীভাবে ক্ষমতায় এসেছে এবং কী করেছে, এরদিকে নজর দিলেই বুঝা সহজ হবে পরাজিত রাজাকারদের প্রধান লক্ষ্য কী ছিলো

পট পরিবর্তনের মাধ্যমে নানা ভেক্‌ ভনিতা করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনে, বহুদলীয় গণতন্ত্রেও লেবাসে তিনি আলবদর রাজাকারদের রাজনৈতিক পুণর্বাসন নিশ্চিত করেনএমন হীন অপকর্ম, তিনি কিছুই বাদ রাখেননিযা তাঁর ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য দরকার ছিলো

সেনা অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হলেও তার জারী করা ফরমানের ফলে রাজাকাররা স্থায়ী আসন গেড়ে নিতে সমর্থ হয় এরপরের সামরিক জান্তাতন্ত্র চলতে থাকে ঐ একই ধারাবাহিকতায়জাতীয়তাবাদে 'বাংলাদেশী' সংস্করণ যা শুধু মাত্র ক্ষমতা দখলের মুখ্যমন্ত্র হিসাবেই কাজে লেগেছিলো, তারই দ্বিতীয় সংস্করণ প্রণয়ন করেন স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদএরপরের দশকটি বাঙালী জাতিকে কাটাতে হয়েছে স্বৈরাচার হঠাবার আন্দোলনেনুর হোসেনকে শহীদ হতে হয়েছে রাজপথে 'স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক' শ্লোগান বুকে-পিঠে লিখেনানাভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে জনগণকে

দুই

সুদীর্ঘ আন্দোলন, ব্যাপক রক্তক্ষয়ের মাধ্যমে নিপাত যায় স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারযৌথ গণতান্ত্রিক উদ্যোগে প্রণীত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ১৯৯১'র নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসেজনগণকে বলা হয়, আমরা গণতন্ত্রেও পথেই এগিয়ে যাচ্ছি১৯৯১-১৯৯৬ সময়ে বাংলাদেশে দুর্নীতি এবং মৌলবাদ গোড়াপত্তন শুরু করেজেঃ জিয়ার রাজাকার পুনর্বাসন প্রকল্পের এক্সটেনশন হিসেবে জঙ্গীতন্ত্রেও বীজ রোপিত হতে থাকে বাংলার নরম মাটিতে গ্রামে গ্রামাঞ্চলে এরা গড়তে থাকে দূর্গ দুর্নীতিবাজদের চরম দাপটের গালে চড় বসিয়ে জনগণ রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন আনে ১৯৯৬ এর নির্বাচনেক্ষমতায় আসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা সবার সাথে ক্ষমতা শেয়ার করার মানসে জাসদ একাংশের আসম আব্দুর রব এবং জাতীয় পার্টির একাংশের আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে মন্ত্রীত্ব দেন

কিন্তু থেমে থাকেনি রাষ্ট্রীয় দুর্নীতিআওয়ামী লীগের ক্ষমতাবানরা দু'-দু'টি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় নিজেদের দখলে চালাতে থাকেন ক্ষমতার ত্রাসতন্ত্র দেশটি শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের তালিকায় পরপর স্থান পেতে থাকেঅন্যদিকে মৌলবাদী জঙ্গীরাও সংগঠিত হতে থাে তলে-তলেআওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতা ঘাতক-রাজাকাদের বিচারের ব্যাপারে পূর্বে সোচ্চার থাকলেও ক্ষমতায় এসে তাঁরা তা বেমালুম ভুলে যানবরং ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জামাতীদের সাথে আওয়ামী পন্থীরা অনেক জয়েন্ট ভ্যান্‌চার ব্যবসা বাণিজ্যও গড়ে তুলেন এসব ফিরিস্তি দেশবাসীর অজানা নয়

ফলে আবারও পত্তন ঘটে আওয়ামী শাসনেরদেশের জনগণ ২০০১ এর নির্বাচনে বিএনপি জামাতের জোটকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে সংসদে নিয়ে আসেতাঁরা ক্ষমতায় বসে২০০১ থেকে ২০০৬ এই সময়টি ছিলো বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম কালো অধ্যায়পুরো দেশটিকেই ক্রিকেট খেলার মাঠে পরিণত করে জোটের নেতা-মন্ত্রীরাপ্রধানমন্ত্রীর ছত্রছায়ায় তার পুত্রদ্বয় হয়ে উঠে দেশের সর্বোচ্চ নেপথ্য নীতি নির্ধারকসবকিছুকে 'ড্যাম কেয়ার' করে গণভবনের আদলে গড়ে উঠে প্যারালাল 'হাওয়া ভবন'দেশ পরিণত হয় জঙ্গীদের লীলাক্ষেত্রে যত্র-তত্র বোমা ফুটতে থাকেআক্রান্ত হতে থাকেন দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবিরাআদালত প্রাঙ্গণ ভেসে যায় রক্তে

এ-নির্মম ঘটনাগুলোর নেপথ্য কান্ডারী ছিলো সেই পরাজিত রাজাকার শক্তিযারা ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ পরিকল্পিতভাবে বরেণ্য বুদ্ধিজীবিদেরকে হত্যা করেছিলোএ-ঘাতকদের উত্তরসূরীরাই কবি শামসুর রাহমান, ডঃ হূমায়ুন আজাদকে আক্রমণ করেছিলো, তা এখন তো নিজেরাই বলছেশুধু ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে তাদের গডফাদার রাজাকার পাষণ্ডরা

এভাবেই বাংলাদেশে একটি ওয়ান ইলেভেনের প্রেক্ষাপট অনিবার্য হয়ে ওঠেদেশে ঘটে যায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের অবকাঠামোলক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে লেভেল প্লেইং ফীল্ড ধারার কথা বলে বিভিন্ন কর্মসূচি শুরু করেবিচারের মাধ্যমে দুই প্রধান জঙ্গী নেতা শায়খ আব্দুর রহমান এবং বাংলাভাইকে ফাঁসি দেওয়া হয়প্রশ্নটি হচ্ছে এ-দুই জঙ্গীকে ফাঁসি দেওয়ার মধ্য দিয়ে জঙ্গীবাদকে কি বাংলার মাটি থেকে সমূলে বিনাশ করা গেছে? তেমন কোনো লক্ষণ আমরা এ-পর্যন্ত দেখছি নাবরং এ-দুই প্রধান জঙ্গীর কাছ থেকে অনেক নেপথ্য গডফাদারের নাম জানার সম্ভাবনা ছিলোযা এখন জাতির সম্পূর্ণ অজানাই থেকে যাচ্ছে

তিনঃ

যে-ধারায় আজকের বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিজয়ের চেতনা নিয়ে কতোটা এগিয়ে যাবে, সে-প্রশ্নটি বার-বারই আসছেদেশে রাজাকার পক্ষ বেশ বড়ো অর্থনৈতিক শক্তি সঞ্চয় করেছেতারা সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতায় যাবার স্বপ্ন দেখছেতারা কটাক্ষ করছে মুক্তিযুদ্ধকে, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদেরকেতারা এমন ধৃষ্টতাও দেখিয়ে বলেছে, মহান মুক্তিযুদ্ধে তিরিশ লাখ বাঙালী শহীদ হননি

এমতাবস্থায় বর্তমান সরকারের কাছে জাতি দাবী জানিয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করারকিন্তু বর্তমান সরকার তা করার কোন উদ্যোগ এ পর্যন্ত নেয়নিযা কল্পনাও করা যেত না - তাও সম্ভব হয়েছে, এ-বাংলাদেশে এগারো জানুয়ারী ২০০৭-এর পরকিন্তু রাজাকারদের ব্যাপারে সরকারের নির্বিকার থাকার রহস্য; জনগণ খুঁজে পাচ্ছে না কোন মতেইমহান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারগণের নেতৃত্বে সেক্টর কমান্ডার ফোরাম গঠিত হয়েছেএ-প্রজন্ম যে-কোন মূল্যে মুক্তিযুদ্ধের ফসল ঘরে তুলতে আজ ঐক্যবদ্ধ

অতীতের অনেক প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অনেক কিছুই পারেনিতার অর্থ এ-নয় যে, এবার কেউ পারবে না কিন্তু সে-লক্ষণ কোথায়? মত প্রকাশের 'অপরাধে' রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন প্রগতিশীল শিক্ষককে দণ্ডিত করেছে রাষ্ট্রপক্ষ মৌলবাদ, ধর্মান্ধদের পৃষ্ঠপোষক মহল তা দেখে মুখ টিপে হাসছেএকটি স্বাধীন দেশে এমনটি কি কাম্য ছিলো? নতুন রাজনৈতিক ট্রেন্ড চালু করতে হলে নিরপেক্ষ, সত্যনিষ্ঠ থাকতে হবেযে-কোন পক্ষপাত সব অর্জন ধ্বংস করে দিতে পারেআমাদের বিজয় ডুবতে বসেছে অর্জনের অধিক আঁধারেঅনেক আমরা পারিনিকিন্তু পারতে হবেনা পারলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় একটি প্রজন্ম স্থবিরতায় বসবাস করতে পারে না -দহন থেকে মুক্তি চাই - এটাই হোক সবার প্রাণের প্রত্যয়

ফকির ইলিয়াসঃ কবি ও কলামিস্ট

আপলৌডঃ ১৪ ডিসেম্বর, ২০০৭

 
 
   

অন্যান্য কলাম 8

© 2007 Confidence Services Ltd.