London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার রাষ্ট্রের দায়

চিররঞ্জন সরকার

ডিসেম্বর মাস এলেই প্রতিটি বাঙালীর মন আবেগ, উত্তেজনা ও আনন্দ-বেদনায় ভরে ওঠে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনা বাহিনীর দাবীদার নব্বই হাজার পাকিস্তানী সেনাসদস্য ভারত ও বাংলাদেশের যৌথবাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে চরম দাম্ভিকতা ও ঔদ্ধত্য নিয়ে স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী মাত্র ২৬৬ দিনেই তারা চূড়ান্ত জবাব পেয়ে যায় কিন্তু বিজয় দিবসের মাত্র দু'দিন আগে ১৪ ডিসেম্বরে জামাতে ইসলামের অঙ্গ-সংগঠন আল-শামস ও আল-বদর দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ চেয়েছিলো তাদের দোসর পাকিস্তানের শাসক ও দেশীয় দালাল-রাজাকার গোষ্ঠীর মাধ্যমে বাংলাদেশকে চিরদিনের মতো মেধাশূন্য ও নেতৃত্বশূন্য করতে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে হিংস্র প্রতিশোধ নিতে তারা অনেকাংশে সফলও হয়েছে কিন্তু আমরা ১৬ ডিসেম্বরে বিজয়ী হয়েও সেই মানবতার দুশমন নরঘাতক-যুদ্ধাপরাধীদের বিষদাঁত ভেঙ্গে দিতে পারিনি ছিন্ন করতে পারিনি লুটেরা সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের তাঁবেদারদের নাগপাশ তাইতো এ-পরাজিত শক্তি ও তাদের প্রেতাত্মারা এখনো বাঙালী জাতির বিরুদ্ধে তাদের অশুভ তৎপরতরা চালিয়েই যাচ্ছে। 'জাতির পতাকা খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুন' বলে আমাদের দেশের এক অকাল-প্রয়াত তরুণ কবি চিৎকার করে আমাদের সাবধান করলেও আমরা সতর্ক হইনি আমাদের এ-উন্নাসিকতা ও উদাসীনতার সুযোগে এ-শকুনেরা ক্রমেই জোটবদ্ধ হয়েছে, শক্তিশালী হয়েছে এখনও আমরা এ-পুরানো শকুনের ডানা ঝাপটানোর বিভীষিকায় আচ্ছন্ন এ-অপশক্তির কারণেই গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন আমাদের কাছে এখনো সুদূরপরাহত রয়ে গেছে

বাঙালী বীরের জাতি ইতিহাসের পাতায়-পাতায় সাক্ষ্য আছে বাঙালী আত্মঘাতী-দালাল - এমন দৃষ্টান্তও ইতিহাসে বিরল নয় যুগে-যুগে সিরাজের পাশাপাশি মীরজাফরদেরও আমরা সাক্ষাৎ পাই একাত্তরেও আমরা অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধার পাশাপাশি অনেক কুলাঙ্গার রাজাকার-মীরজাফরের অস্তিত্ব লক্ষ্য করেছি বাঙালী জাতি যখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার জন্য মরণপণ যুদ্ধে রত, ঠিক সে-মুহূর্তে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দোসর পাকিস্তানী-জান্তা আমাদের এ-দেশের কিছু দালাল আলবদর, আল-শামস, রাজাকার দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করেছে মুসলিম লীগ, জামায়াত ও নেজামে ইসলামের সৃষ্ট দালাল, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী পাকিস্তানী জান্তাদের পূর্ণ সহযোগিতা করেছে নারী-ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করেছে ওরা মুক্তিযোদ্ধাদের এবং এ-দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে স্বাধীনতা নিশ্চিত জেনেও স্বাধীনতা যেনো টিকে থাকতে না পারে, সে-জন্য বুদ্ধিজীবীদের ধরে-ধরে নির্মমভাবে হত্যা করেছে ওদের কর্মকাণ্ড ও আচরণে প্রমাণিত, আমরা যদি সেদিন পরাজিত হতাম, তাহলে ওরা আমাদের পরিবার-পরিজন-সহ নির্মমভাবে হত্যা করতো কিছুতেই আমাদের বাঁচিয়ে রাখতো না ভারতের চর, দুষ্কৃতকারী হিসেবেই চিহ্নিত হতে হতো আমাদের কিন্তু লাখো শহীদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম আমাদের তেমন কলঙ্কিত পরিণতির হাত থেকে রক্ষা করেছে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত আর অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম মার্কিন সমর্থনপুষ্ট পাক-বাহিনীকে পরাজিত করে ছিনিয়ে এনেছে বিজয়ের লাল পতাকা

কিন্তু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দেশীয় অনুচররা আমাদের এ-বিজয়কে মেনে নিতে পারেনি তৎকালীন নেতৃত্বও স্বাধীনতা-বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে পারেনি তাঁরা জাতীয়-আন্তর্জাতিক চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়ে স্বাধীনতা-বিরোধীদের কৃতকর্মের কথা ভুলে ওদেরই সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার ভুল পথে পা বাড়িয়েছে শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে বলা হয়, স্বাধীন দেশে আর রক্তপাত নয় সবাই মিলেমিশে এ-দেশটাকে গড়তে হবে ঘোষণা করা হয়, সবার সঙ্গেই বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গেই বৈরীভাব নয় এরই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানী  যুদ্ধাপরাধীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয় কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী

তবে কথা ছিলো যারা নারী-ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট করেছে, তাদের ক্ষমা করা যাবে না তারা ক্ষমার অযোগ্য এ-আইনের আওতায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের আগে প্রায় ৩৭ হাজার রাজাকার আলবদর বন্দী ছিলো, সাতশোর অধিক যুদ্ধাপরাধীর বিচার চলছিলো কিন্তু নির্মম পরিহাস, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দোসরদের চক্রান্তে পঁচাত্তরের পট-পরিবর্তনের পর রাজাকার আলবদররা সবাই একে- একে ছাড়া পেয়ে যায় পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর অনেক নাটকীয় ঘটনার শেষে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতা কব্জা করেন ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত জিয়া অনেক যুদ্ধাপরাধীকেই রাজনৈতিকভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং নাগরিকত্ব দেন সামনের কাতারে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার পক্ষের লোক রেখে স্বাধীনতা-বিরোধীদের নিয়েই রাজনৈতিক দল বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মোড়কে পুরো পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকেই তিনি সুকৌশলে চালান করে দেন এরই ধারাবাহিকতায় রাজাকার-আলবদররা সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দাবীদার সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বপ্নে এতোটাই বিভোর হয়ে পড়ে যে, স্বাধীনতা-বিরোধী অপশক্তিদের বিচারের বিষয়টিকে আমলে নেয়ারও প্রয়োজনবোধ করেনি এভাবে বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক লুটেরা স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তারা এখন এতোটাই সংহত যে, ক্ষমতায় নির্বাচিত কিংবা অনির্বাচিত যে-সরকারই থাকুক না কেনো, জামায়াতের প্রভাব-প্রতিপত্তি তাতে কমে না সরকারের মধ্য থেকেই কেউ-না-কেউ জামায়াতের পক্ষে কথা বলে এভাবে পাকিস্তান-আমেরিকার তাঁবেদারদের সহায়তায় এ-দেশকে তারা আবার ক্ষুদে পাকিস্তান বানানোর অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং কোনো-কোনো ক্ষেত্রে সফলও হচ্ছে আজও তারা মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কটাক্ষ করার দুঃসাহস দেখায় কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হয়ে, অনুশোচনা না করে, গর্বের সঙ্গে বলে, তারা যেটা করেছিলো তা ঠিক ছিলো! এরা দম্ভের সঙ্গে বলে, মুক্তিযুদ্ধ ছিলো একটি গৃহযুদ্ধ অথচ আমাদের রাষ্ট্র নায়কেরা এ-যুদ্ধাপরাধী দুরাচারদের বিচারকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না তাদের হাতে নাকি এর চেয়েও আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়ে গেছে!

একাত্তরের পরাজিত শক্তি যুদ্ধাপরাধীদের এ-আস্ফালন দেখে, দুর্নীতিবিরোধী ও ন্যায়ের প্রবক্তাদের তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখে সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন আসেঃ আমরা কি সত্যই বিজয় অর্জন করেছি? বিজয় দেখেছি? একাত্তরে আমাদের রণক্ষেত্রের বিজয় কি এখনও টিকে আছে? অথবা বর্তমানের বিজয় দিবস কাদের বিজয় দিবস? তারা এখন কাদের প্রশ্রয়ে বলতে পারছে বাংলাদেশে কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি? বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই? কারা সগর্বে বলার স্বাধীনতা পাচ্ছে - ১৯৭১-এর যুদ্ধ ছিল পূর্ব-পাকিস্তানে ভারতের আগ্রাসন?

এবারের বিজয় দিবসের প্রাক্কালে এসব প্রশ্নই ঘুরে-ফিরে আসছে বাঙালী জাতিকে এসব প্রশ্নের মোকাবেলা একদিন না একদিন করতেই হবে এসব প্রশ্নের সার্থক মোকাবেলা করা ছাড়া প্রতি বছর বিজয় দিবস উদযাপন হবে অর্থহীন ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস ও ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দিবস আমাদের জীবনে কোনো তাৎপর্য বহন করবে না বিজয় দিবসকে তাৎপর্যপূর্ণ করতে হলে আরেকটি জনযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দোসর দালালরা আমাদের বিজয়কে তাৎপর্যমণ্ডিত হতে দেবে না তাতে তাদের কায়েমী স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটবে সুতরাং লড়াইয়ের কোনো বিকল্প নেই

দুই

প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহম্মেদ সম্প্রতি বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আইনের দরজা খোলা আছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনও নৈতিক সমর্থন জানিয়েছে এখন প্রশ্ন হলো, বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটা কে বাঁধবে কে?

প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, এ-ব্যাপারে উৎসাহী ও সংক্ষুব্ধ যে-কোনোও নাগরিকই আইনের আশ্রয় নিতে পারেন কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? সত্যিই কী সংক্ষুব্ধ যে-কোনোও নাগরিক আইনের আশ্রয় নিয়ে সুবিচার পাবে? এ-ব্যাপারে ঘোরতোর সন্দেহ রয়েছে কেনো-না, অতীতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রত্যাশা করে আদালতে অনেক মামলা হয়েছে উদাহরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদের ছোট বোন ফরিদা বানুর মামলার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে ১৯৯৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরে রমনা থানায় এ-মামলাটি দায়ের করা হয় মামলার অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের তাঁর ভাইকে অপহরণ ও হত্যা করা হয় কিন্তু রমনা থানায় এ-মামলাটি আর দশটি সাধারণ মামলার এফআইআরের মতো করেই গ্রহণ করা হয় (সমকাল, ১৬ ডিসেম্বর, ২০০৬) এ-মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম আর এগোয়নি কেবল ফরিদা বানুই নয়, মামলা আরও অনেকেই করেছেন কিন্তু ফলাফল প্রায় একই রকম যদিও মুক্তিযুদ্ধে নিহত হাজার-হাজার শহীদের জীবিত আপনজনেরা তাঁদের প্রিয়জনের নির্মম হত্যার বিচারের দাবী নিয়ে এখনও অপেক্ষা করছে

বাস্তবতা হচ্ছে, বিচারের দাবী আছে, কিন্তু রাষ্ট্র তা স্বীকার করছে না বলে বিচার হচ্ছে না এর মধ্যে কোনো অস্পষ্টতা নেই যতক্ষণ না রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেবে যে, বিচার হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ-বিষয়ে ব্যক্তির মামলা বেশি দূর এগোবে না দুনিয়ার কোথাও তা হয়নি এ-প্রসঙ্গে গোলাম আযমের মামলার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে এ-মামলার পরিণতি কী হয়েছিলো, তা আমাদের সবারই জানা যুদ্ধাপরাধ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে করা হয় না, করা হয় রাষ্ট্র ও জাতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ একটি জাতিরাষ্ট্র একাত্তরে জামায়াত-সহ ঘাতক দালাল-রাজাকাররা যে-অপরাধ করেছে তা, করেছে বাংলাদেশ কনসেপ্টের বিরুদ্ধে সুতরাং এখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দায়িত্ব বিচারের ব্যবস্থা করা

পৃথিবীর সব দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি সামষ্টিক বলে এর বিচারের দায়িত্বটি সরকারই গ্রহণ করে এ-জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করা হয় কারণ যুদ্ধাপরাধ হচ্ছে বিশেষ ধরণের অপরাধ প্রচলিত আদালতে প্রচলিত আইনে সাধারণতঃ কোনো দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয় না এটা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃত বিষয় সরকার উদ্যোগী না হলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্ভব হয় না যুদ্ধাপরাধের প্রথম ভিকটিম ব্যক্তি হলেও, এ-অপরাধের চূড়ান্ত ভিকটিম আসলে রাষ্ট্র কারণ তারা ব্যক্তিকে নির্যাতন ও হত্যার মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা পালন করেছে তৎকালীন মুজিবনগর সরকার ও স্বাধীনতাকামী বাঙালী জাতি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার জেনেভা কনভেনশন স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য বাধ্যবাধকতা তা না করে যদি কেবল সামাজিক কোন্দলকে উস্কে দেয়ার মতলব থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে এমন ভূমিকা গ্রহণ করা হয় - যাতে সাপও মরে লাঠিও না ভাঙ্গে, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক দুর্নীতিবাজদের বিচার ও সংস্কার ইস্যুর মত এ-ব্যাপারেও যদি মতলবী নীতি গ্রহণ করা হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর জন্য বড়ো বিপদের কারণ হতে পারে

আজ ৩৬ বছর পর রাষ্ট্র না চাইলে কোনো অপরাধীর বিপক্ষেই পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ যোগাড় করা কঠিন এজন্য চাই বিশেষ উদ্যোগ, বিশেষ ট্রাইবুনাল ঘাতকরা চিরকাল জাতীয় শত্রু  হিসেবেই গণ্য হবে কারণ তারা রাষ্ট্র ও জাতির শত্রুতা করেছিলো, তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলো একাত্তরের ২৬ মার্চের পর তাই রাষ্ট্র যতক্ষণ না তাদের বিচারের আয়োজন করছে, ততক্ষণ রাষ্ট্রই অপরাধী থেকে যাবে গণহত্যাকারীদের পৃষ্ঠপোষকতার দায়ে মামলা খুঁজবো অথচ যুদ্ধাপরাধীদের খুঁজবো না এটা কোনো মতেই যুক্তির কথা হতে পারে না ক্ষমতার কুতুব মিনারে বসে সাম্রাজ্যবাদীদের নীল-নকশার পুতুল হয়ে নয়, স্বদেশের ইতিহাস আর স্বাজাতির শরীর থেকে ঝরে পড়া রক্তের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আসল সত্যের দিকে সাহস করে চোখ তুলে তাকাতে হবে

এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ১৯৭২ সালে মার্কিন-সৌদি চাপেই সরকারকে পিছু হঠতে হয়েছিলো এবং নিজামিরা একাত্তরে সিআইএর তালিকা ধরেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিলো আরও মনে রাখা দরকার যে, মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগের কর্মকর্তা রিচার্ড বাউচার বাংলাদেশে এসে জামায়াত সম্পর্কে বলেছিলেন, জামায়াত মুসলিম মডারেট দল এটাই জামায়াত সম্পর্কে তাদের অবস্থান আর বর্তমানে এ-দলটি যে, তাদের বাংলাদেশ বিষয়ক পরিকল্পনার পঞ্চম বাহিনী, এটা বুঝতে বিরাট গবেষক হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।  

সমস্যার শিকড়টা আসলে অন্য জায়গায়কেবল আলোচনা আর ঘৃণার মাহফিল সাজিয়ে বসে থাকলে আখেরে কোনো লাভ হবে না কূটচালগুলো ধরতে হবে, জানতে হবে, জানাতে হবে প্রতিরোধের জন্য তৈরী হতে হবেকারও হাতে যদি ঘাতকের রক্তের দাগ লেগে থাকে তবে তার সময় থাকতেই ক্ষমা চেয়ে সরে যাওয়া উচিত, কূট-তর্কের জাল বিস্তার না করেযারা রক্ত নিয়েছে, তাদের সঙ্গেতো যারা রক্ত দিয়েছে তাদের কোনো আপোষ হতে পারে না

চিররঞ্জন সরকারঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আপলৌডঃ ১৫ ডিসেম্বর, ২০০৭

 
 
   

অন্যান্য কলাম 8

© 2007 Confidence Services Ltd.