|
মহাপ্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে
বাংলাদেশ
চিররঞ্জন
সরকার
গত ১৫
নভেম্বর দিবাগত
রাতে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে
ধ্বংস হয়ে গিয়েছে সমগ্র উপকূলীয় জনপথ।
বেসরকারী হিসেবে মৃতের
সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ হাজার।
লাশে-লাশে ভরে গিয়েছে
সুন্দরবন-সহ সারা জনপথ।
১৭টি জেলা পরিণত হয়েছে
বিরানভূমিতে।
দক্ষিণের
ঘূর্ণিদুর্গত জনপদ জুড়ে এখন খাদ্যের জন্য হাহাকার।
এক মুঠো চাল কিংবা পেটে
দেয়ার মতো দানা-পানির জন্য লড়ছে মৃত্যু উপত্যকার সর্বস্ব হারানো মানুষ।
হেলিকপ্টার দেখলেই ছুটছে
তাঁরা পঙ্গপালের মতো।
যদি ফেলা হয় খাওয়ার মতো
কিছু।
দানবীয় ঘূর্ণিঝড় সিডরের কয়েক
ঘণ্টার তাণ্ডবে বিপন্ন ১০ লাখ পরিবারের মানুষ গত কয়েক দিনের ক্ষুধার জ্বালায় ভুলে
গেছে স্বজন হারানোর বেদনাও।
সরকারের তরফে দেয়া ত্রাণ
তাঁদের কাছে সিন্ধুর মধ্যে বিন্দুর মতোই।
অপ্রতুল ত্রাণ দিতে গিয়ে
হিমশিম খাচ্ছেন ত্রাণকর্মীরাও।
পাঁচ কেজি চাল দেয়ার
প্রস্তুতি নিয়ে ত্রাণ দেয়া শুরু করলেও ত্রাণ প্রার্থী মানুষের জনস্রোত দেখে অনেক
জায়গায় তার চার ভাগের একভাগ ত্রাণ দিতে হচ্ছে।
অনেক জায়গাতেই এখনও
ত্রাণ পৌঁছেনি।
ওদিকে লাশের পাশাপাশি নিরন্ন
মানুষের মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।
দুর্গত এলাকায় দ্রুত
ছড়িয়ে পড়ছে ডায়রিয়া।
খাবার আর পানির অভাবের
কারণেই এ ডায়রিয়া ভয়াল রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
পত্র-পত্রিকা ও রেডিও-টেলিভিশনে সাইক্লোনের বিপর্যয়ের যে-চিত্র আমরা পাচ্ছি, দুর্গত
এলাকায় আক্রান্তদের জবানীতে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষয়-ক্ষতির কাহিনী শোনা যাচ্ছে।
যাঁরা অনেক প্রতিকূলতা
অতিক্রম করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছুচ্ছেন, তাঁরাও ধ্বংসলীলা দেখে নির্বাক হয়ে
যাচ্ছেন।
এতো ধ্বংস, এতো মৃত্যু, এতো
হাহাকার! দুর্গম চরাঞ্চলে পৌঁছুনো সাংবাদিকদের জবানিতে জানা যায়, এলাকায় কবে পৌঁছবে
ত্রাণ, কবে জুটবে বস্ত্র চোখে-মুখে সে-অনিশ্চয়তা নিয়ে এক-একটি দিন পার করছে উপদ্রুত
এলাকার বিপন্ন মানুষ।
মাত্র এক বেলার আহার ও
তৃষ্ণা নিবারণের জন্য একটু পানি পেলেই তারা প্রাণে বেঁচে যান।
উনুনে চড়েনি হাঁড়ি।
আবার রান্নার
হাঁড়ি-পাতিলও নেই।
ওরা শুধু ভাত চায়।
এক বেলা ভাত।
গণ-কবরের পাশে
হাজার-হাজার অভুক্ত মানুষ।
এক-একটি মানুষ যেনো
দিন-দিন হাড্ডিসার কঙ্কালে পরিণত হচ্ছে।
১৫ নভেম্বর
দুপুর থেকে অনেকের মুখেই
ওঠেনি দানাপানি।
বাড়ীতে যা-ছিলো, সব ভেসে গেছে।
আশপাশে কিনে খাওয়ার জন্য
দোকানও নেই।
আবার কিনবার টাকাই বা কোথায়
পাবেন? কেউ-কেউ এক মুঠো রিলিফের জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা - দাঁড়িয়ে আছেন রিলিফ
কেন্দ্রে।
সবচেয়ে বেশি সমস্যা শিশু
খাদ্যের।
খাদ্যের অভাবে লাখো শিশুর জীবন
বিপন্ন।
ঘূর্ণিদূর্গত মানুষ জানে না কবে
তাঁদের অপেক্ষার শেষ, কবে পূরণ হবে সামান্য এই মৌলিক চাহিদা।
খাওয়ার পানির অভাবে
তৃষ্ণার্ত লোকজন পুকুরের পানি পান করছে।
খাদ্য, পানি, বস্ত্র ও
ওষুধের অভাবে জর্জরিত মানুষেরা এখন বাঁচার আকুতি নিয়ে দৌড়ে ফিরছে দুয়ার থেকে দুয়ারে।
নেই শীত বস্ত্রও।
এক কাপড়ে দিন কাটাচ্ছে
অনেক মানুষ।
উপকূলের লাখ-লাখ মানুষ এখনও
খোলা আকাশের নিচে।
উপদ্রুত
এলাকায় (বরগুনা ও পাথরঘাটা) বসবাসকারী এক সাংবাদিক বন্ধু টেলিফৌনে জানালেন,
সেখানকার মানুষের কথা। খোলা আকাশের নিচে হিম হাওয়ার ঝাপটা খালি গা, পেটে ক্ষুধা,
চোখে স্বজন
হারানোর অশ্রু।
অনেকের চাহিদা আবার
কাফনের কাপড়ের।
আরেকটি চিত্রতো আছেই চারদিকে -
বোবা চাহনি এবং চোখে অশ্রুর ধারা।
লাশ আর লাশ।
খাল-বিল, নদী-নালা এমনকি
পুকুরেও ভেসে আছে লাশ।
গরু-ছাগলের সঙ্গে একাকার
মানুষের লাশ।
চারদিকে শুধু পঁচন ধরা লাশের
গন্ধ।
বঙ্গোসাগরের আকাশে এখন
ক্ষুধার্ত শকুন আর গাঙচিলের আনাগোনা।
আকাশে শকুন; বাতাসে
গন্ধ; পানিতে লাশ।
গাছে-গাছে ঝুলে আছে
মানুষ আর পশু-পাখির লাশ।
ঝুলে আছে আশ্রয় নেয়া
ক্ষুধার্ত মানুষ।
এখনও নিখোঁজ হাজারও মানুষ।
প্রকৃতির তাণ্ডবকে রুখে
জনজীবন বাঁচাতে গিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো ম্যানগ্রৌভ ফরেস্ট সুন্দরবন এখন
ক্ষত-বিক্ষত।
বিধ্বস্ত হয়ে হয়েছে ঘর-বাড়ী;
ভেঙে গেছে গাছপালা; নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ক্ষেতের ফসল।
সরকারী
হিসেবে ৯ লাখ ১১ হাজার ৪৫টি পরিবারের ৩২ লাখ ৭২ হাজার ৫৬২ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুর্গত এলাকাগুলোতে ৩০
হাজার ১৭ একর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
আংশিক ক্ষতি হয়েছে ৮ লাখ
৪১ হাজার ৭৪৯ একর জমির ফসল।
ঘর-বাড়ী সম্পূর্ণ ধ্বংস
হয়েছে ২ লাখ ৮৯ হাজার ৯৮টি এবং আংশিক ক্ষতি হয়েছে ৬ লাখ ১৬ হাজার ১৫৯টির।
২ লাখ ৫০ হাজার ২২২টি
গরু, ছাগল ও হাঁস-মুরগি ধ্বংস হয়ে গেছে।
৭৪০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং ২৫৩টির আংশিক ক্ষতি হয়েছে।
৫৮ কিলোমিটার রাস্তা
সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮৭ হাজার ৯০৮ কিলোমিটার।
৫৭ কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে
গেছে।
এছাড়া ৩ লাখ ৫৩ হাজার ২৫৯টি
বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ধ্বংস হয়েছে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সিডর
মহাঘূর্ণিঝড়ে কী ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটে গেছে, তার অসহনীয় মর্মস্পর্শী চিত্র
ক্রমান্বয়ে আমাদের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে।
এ-ঝড়ের কবলে দক্ষিণাঞ্চলীয় ১৮টি
জেলার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে।
উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকায়
অসংখ্য শিশু-নারী-পুরুষের মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক মৃত্যু, সর্বস্ব হারানোর অসহায়ত্ব
ছাপিয়ে এখন লাখ-লাখ শিশুর অভুক্ত ও নিরাশ্রয়ে থাকা অসংখ্য মানুষের দু'বেলা খাবারের
সংস্থান, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা সবই সর্বোচ্চ জরুরী প্রয়োজন।
এবারকার
সাইক্লৌনের পূর্বাভাস পাওয়া গিয়েছিলো এবং জনগণকে জানানো হয়েছিলো এ-নিশ্চিত বিপদের
কথা, যদিও এ-কাজ ঠিক সময়মতো হয়নি। দু-তিন দিন দেরি হয়েছিলো।
এবার সরকার দুর্যোগ
এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার কিছু ব্যবস্থা করেছিলো, যদিও প্রয়োজনের তুলনায় তা
যথেষ্ট ছিলো না।
তাছাড়া কিছুদিন আগে সুনামির
পূর্বাভাষ ঘোষণা করার পর সুনামি না হওয়ায় এবারের ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাষকে অনেকে
বিশ্বাস করেনি।
তাছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে
বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের কারণে মিডিয়ায় বেশিরভাগ মানুষ সাইক্লৌনের পূর্বাভাষ শুনতে পায়নি।
তারপরও সচেতনতা ও
পূর্বাভাষের কারণেই ১৯৭০ সালে যেখানে পাঁচ-সাত লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিলো, এবার
সে-মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
সরকারী হিসাব অনুযায়ী
এখনো পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা মাত্র চার হাজারের মতো।
তবে দুর্গম ও প্রত্যন্ত
অঞ্চলের যে সামান্য খবর এসে পৌঁছাচ্ছে তাতে, এ-সংখ্যা আরও অনেকগুণ বেশি - লক্ষাধিক
হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কেনো-না, দুর্গম
চরাঞ্চলের খবর এখনও পাওয়া যাচ্ছে না।
লাখ-লাখ গাছপালা উপড়ে
গিয়ে জলোচ্ছ্বাসে ব্রিজ-কালভার্ট-বাঁধ-রাস্তা ধ্বংস হয়ে যাতায়াত ব্যবস্থাও এমন
বিপর্যস্ত হয়েছে, যার ফলে ওসব অঞ্চলে লোক-জনের যাওয়া এখনও সম্ভব হচ্ছে না।
সরকারের
দিক থেকে আত্মপ্রসাদ লক্ষ্য করা গেলেও দুর্যোগ মোকাবেলা ও ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারী
আয়োজন যথেষ্ট নয়।
এটা হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু
থেকেই দেখা যায়।
একথা ঠিক যে, দুর্যোগের সময়
সরকার ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার কিছু চেষ্টা করেছে এবং তার ফলে প্রাণহানি কিছুটা কমেছে।
কিন্তু সরকারের পক্ষে
এটা মোটেই যথেষ্ট নয়।
এখন যে-অবস্থা
দাঁড়িয়েছে, তাতে ঘর-বাড়ী নিশ্চিহ্ন হয়ে, ঘরের খোরাক ও মাঠের ফসল নষ্ট হয়ে, মানুষ
যেভাবে আশ্রয়হীন ও বিপন্ন হয়েছে, তার জন্য বড় আকারে ত্রাণ কাজ সংগঠিত করা প্রয়োজন।
প্রয়োজন বিশাল-ব্যাপক
কর্মযজ্ঞ।
গত বন্যার সময় এ-ক্ষেত্রে
সরকারের ঘাটতি এবং অবহেলার ফলে বহু জায়গায় মানুষ কোনো সাহায্যই পায়নি।
তাছাড়া বেসরকারী ত্রাণ
উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করার ফলে পরিস্থিতি আরও সঙ্কটজনক হয়েছিলো।
এবারও অবস্থা সে-রকমই
দাঁড়িয়েছে।
এবারের
এ-সাইক্লোনের পূর্বাভাস পাওয়া সত্ত্বেও দুর্যোগকবলিত এলাকা থেকে লোক-জন সরিয়ে আনার
জন্য পরিবহন ব্যবস্থা যে-আকারে সংগঠিত করা প্রয়োজন ছিলো, সেটা মোটেই হয়নি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার
জন্য সরকারের মন্ত্রণালয় থাকলেও ব্যাপকভাবে ও ক্ষিপ্রতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা
করার উপযোগী সংগঠন এবং সংস্থান এ মন্ত্রণালয়ের নেই।
কিন্তু আমাদের এ-দেশ ও
এ-অঞ্চল যেহেতু বিশ্বের
প্রধান দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের
একটি,
সে-কারণে এখানে এ-মন্ত্রণালয়কে
এখন শক্তিশালীভাবে সংগঠিত করার প্রয়োজন জরুরী হয়েছে।
কাজেই এর জন্য যে-বিপুল
পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হওয়া দরকার, সে-ব্যবস্থাও জরুরী ভিত্তিতেই করা প্রয়োজন।
আমাদের মতো দরিদ্র দেশে
সামরিক খাতে বিশাল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়।
কিন্তু দুর্যোগ
মোকাবেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ সামান্য থাকার কারণে এখানে উদ্ধারকাজ
পরিচালনা এবং খাদ্য, ওষুধপত্র, পানি ইত্যাদি সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের
অধীনে হেলিকপ্টার নেই, অথচ এক্ষেত্রে প্রয়োজন অনেক হেলিকপ্টারের।
দুর্যোগের সময়
হেলিকপ্টার দুর্গম এলাকার জন্য কতো প্রয়োজনীয়, এটা বুঝিয়ে বলার দরকার হয় না।
শুধু হেলিকপ্টরই নয়,
বাস, ট্রাক, জীপ প্রভৃতির সংখ্যা কম থাকাও একটা কারণ যার জন্য দুর্যোগের সময় লোক-জন
সরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকার যতখানি করতে পারতো, সেটা হয়নি।
অন্য ধরণের জরুরী অবস্থয়
সরকার এ-ধরণের পরিবহন রিকুইজিশন করে থাকে।
কিন্তু সাইক্লৌনের মতো
দুর্যোগের সময় সরকারকে সেধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতেও দেখা যায়নি।
সমুদ্র উপকূলবর্তী
এলাকাগুলোতে কিছুসংখ্যক আশ্রয় কেন্দ্র তৈরো করা হয়েছে।
প্রথমতঃ সেগুলোর সংখ্যা
প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়।
দ্বিতীয়তঃ এখন যে-আশ্রয়
কেন্দ্রগুলো আছে, সেগুলোর অবস্থা শোচনীয় ও ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্যের জন্য
হুমকীস্বরূপ সেখানেও
খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধপত্র ইত্যাদির দারুণ অভাব।
ব্রিটিশ
ও পাকিস্তানী আমলে এবং বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত বন্যা, সাইক্লৌন
ইত্যাদি দুর্যোগের সময় সরকারী ত্রাণ তৎপরতার পাশাপাশি বড়ো আকারে বেসরকারকী তৎপরতা,
বিশেষ করে রাজনৈতিক দল, ছাত্র, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর তৎপরতা দেখা যেত।
গত বন্যার সময় সরকার
নির্দেশ জারী করে কোনো রাজনৈতিক দল তার ব্যানারে ত্রাণ তৎপরতা পরিচালনা করতে পারবে
না।
যেখানে ত্রাণ তৎপরতা দারুণ
জরুরী, যেখানে এ-তৎপরতার ওপর লাখ-লাখ মানুষের জীবন নির্ভরশীল, সেখানে এ-ধরণের
নিষেধাজ্ঞা আরোপ মোটেও কাম্য নয়।
রাজনৈতিক দলগুলো ত্রাণ
তৎপরতায় নিযুক্ত থাকলে কেনো তারা নিজেদের ব্যানার ব্যবহার করতে পারবে না?
এর থেকে অগণতান্ত্রিক ও
নির্যাতনমূলক ব্যাপার আর কী হতে পারে? সরকার যেখানে নিজের তৎপরতা সরকারের নামে
চালাচ্ছে, সেখানে অন্যরা নিজেদের তৎপরতা নিজেদের নামে কেন চালাতে পারবে না? এতে
তাঁদের মূল দায়িত্ব সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান কীভাবে বিঘ্নিত হতে পারে? রাজনৈতিক
দলগুলোকে শুধু চোর-দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিত করে সরকার আত্মপ্রসাদ লাভ করছে।
কিন্তু-চোর-দুর্নীতিবাজরা যে-ত্রাণকাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং এটা করলে
যে, ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্গত মানুষের উপকার হয় এটা অস্বীকার যাবে কি? তাছাড়া রাজনৈতিক
দল তো কেবল চোর-দুর্নীতিবাজদের আখড়া নয়, সেখানে ভালো মানুষও আছে এবং প্রত্যেক দলে
তাদের সংখ্যাই অনেক বেশি।
সরকারের
এক উপদেষ্টা অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক দল ও ছাত্ররা ত্রাণকাজে এগিয়ে আসছে না।
সরকারের লোকজন মুখে একথা
বললেও বাস্তবতা হচ্ছে সরকার বেসরকারী ত্রাণকাজ শুধু নিরুৎসাহিত নয়, বাধাগ্রস্ত করছে।
এ-সরকারি নীতি বাতিল করে
অবিলম্বে সরকারের উচিত রাজনৈতিক দল-সহ অন্যান্য বেসরকারী সংগঠনকে ত্রাণকাজে এগিয়ে
আসার জন্য আহ্বান জানানো এবং এক্ষেত্রে সব ধরণের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও
প্রতিবন্ধকতা দূর করা।
কোনো কারণ, কোনো ছুতো-নাতায়
এমনকি সুসমন্বিত করার
অজুহাতেও দূর্গতদের সাহায্যে এগিয়ে যেতে সময়ক্ষেপণ মোটেই কাম্য নয়।
সমন্বয় ও
শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার নামে ত্রাণ
কাজ থেকে কাউকে দিয়ে সরিয়ে রাখা যাবে না।
সবাইকে ত্রাণ কাজ
চালানোর অবারিত সুযোগ করে দিতে যদি কিছুটা বিশৃঙ্খলাও দেখা দেয়
ঘূর্ণিদুর্গত মানুষের স্বার্থে
তাও মেনে নেয়া উচিত।
আজ দেশে যখন এক ভয়াবহ মানবিক
বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে তখন কোনো অজুহাতে সামর্থ্যবান কারোই হাত গুটিয়ে বসে থাকবার
সুযোগ নেই।
দুর্গতদের বাঁচানোর জন্য
জাতি-ধর্ম-বর্ণ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে খাদ্য-পানি-ওষুধসহ তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
জাতির এই বিপদের দিনে আমরা দলমত
নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ; যাদের সামর্থ্য আছে, শক্তি আছে, তাদের প্রতি আবেদন
জানাই, আসুন আমরা সকলে মিলে বিপদাপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়াই।
ব্যক্তিগতভাবে হোক,
পারিবারিক বা সামাজিক যেভাবে সম্ভব, সেভাবেই ত্রাণ কাজে নেমে পড়া এই সঙ্কটকালের
একমাত্র মানবিক কর্তব্য ও দাবী।
দেশ-বিদেশে যারাই সাহায্যের হাত
প্রসারিত করতে চান, সিভিল প্রশাসন অথবা সেনা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে অথবা
বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা, রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রেডক্রসের মতো ত্রাণ
সংস্থা - এমনকি অসাংগঠনিকভাবে কতিপয় ব্যক্তি উদ্যোগও এখন অত্যন্ত জরুরো ও উপকারী।
ঝড়-ঝঞ্ঝা, বন্যা-খরা ইত্যাদি
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশে নতুন নয়।
ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে
সমবেত প্রচেষ্টায় বিপর্যয় মোকাবিলার শক্তি এ-জাতির রয়েছে।
গোটা জাতির অন্তরের
সমস্ত শুভবোধ জাগ্রত করে মানবিক সংহতির সোপান রচনা করে এক সাথে দাঁড়ালে এ-দুর্যোগ
মোকাবিলা করা মোটেও কঠিন হবে না।
আসুন, মানবিক চেতনায়
উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা হাতে হাত মিলিয়ে দূর্গত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই।
আমাদের যা কিছু আছে,
তা-ই দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দূর্যোগ মোকাবিলা করি।
ঢাকা, ২০ নভেম্বর ২০০৭
chiroranjan@gmail.com
|