|
ভাল কাজ করার জন্য চাতুর্য্যের
প্রয়োজন আছে
কি?
মোহাম্মদ
আলী আকন্দ মামুন
কিংকর্তব্যবিমুঢ় জনগণের মনে একটা খটকা লেগে গিয়েছিলো বেশ আগেই, নির্বাচন কমিশন
তাদের আচরণে সেটা একটু পোক্ত করল কেবল।
বিএনপি'র বিবদমান
(চাপিয়ে দেয়া বিবাদ নয় কি?) দুই অংশের একটিকে আগ বাড়িয়ে বৈধতা দেওয়ার যে-সিদ্ধান্ত
নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছে, তা ঠিক-বেঠিক নির্ণয়ের মানদন্ড বের করা কঠিন হতে
পারে; তবে উদ্দেশ্য না বুঝার মতো নির্বোধ একজন ব্যক্তিও বাংলাদেশে পাওয়া যাবে না।
ভালো কাজ অনেক সময় গায়ের
জোরেই করতে হয়। আর সেটা করাই ভালো। কিন্তু এমন কৌশলী হওয়ার প্রয়োজন নেই, যার
নগ্নতায় সকলের চোখ কপালে ওঠে।
এ-নগ্নতায় যা দিনের আলোর
মতো পরিষ্কার, তা হচ্ছে এ-নির্বাচন কমিশন দিয়ে আর যতো ভাল কাজই হোক, নিরপেক্ষ
নির্বাচন সম্ভব নয় - হতে পারে তারা আইনের দৃষ্টিতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নির্বাচন
অনুষ্ঠান করতে সক্ষম হবেন, কিন্তু তার পরও নয়।
প্রশ্ন
হতে পারে, এটা আবার কেমন কথা?
কিন্তু নির্দয় সত্য
হচ্ছে, এটাই কথা।
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের
ক্ষেত্রে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নাটকীয় সভা অনুষ্ঠান এবং সে-সভায় গৃহীত
সিদ্ধান্তসমূহ একটি বড়ো ভূমিকা রেখেছে বলেই আজ আস্থার সঙ্কটের চেয়ে অনাস্থার বিষয়টি
অনেক বেশি প্রাসঙ্গিকতা পেতে যাচ্ছে।
গুটি কয় প্রশ্নের ফয়সালা
নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে আসলে বিষয়টি আরো খোলাসা হতে পারতো।
কমিশন কেনো বিএনপির মতো একটি বড়ো দলকে আলোচনায় আমন্ত্রণ
জানাতে এতো বেশি সময় নিয়েছে? দলীয় কার্যালয়
খুলে না দেওয়ার সাথে এ-মূলধারাত্ব বন্টনের/বরাদ্দের সম্পর্ক কী? বেগম
জিয়া জেলে যাবার পর থেকে দাওয়াত পত্র দিতে কমিশনকে স্থায়ী কমিটির ঐ বিতর্কিত ও
আস্বাভাবিক সভা পর্যন্ত অপেক্ষা করার পেছনের কারণ কী? নির্বাচন কমিশনের কাছে কি
বিএনপি'র স্থায়ী কমিটির সেই সভাটি প্রত্যাশিত ছিলো? এরকম একটি বিভাজনের প্রয়োজনীয়তা
থেকেই কি নির্বাচন কমিশন এতোদিন বিএপি'র কোনো পক্ষকে চিঠি দেননি? যদি-বা বিভাজনকে
মেনেই নেওয়া হয়, তাহলে উভয় গ্রুপকে দাওয়াত দিতে অনীহা কেনো? বিষয়টি কি এ-জন্য যে,
বিএন[প'র নেতৃত্ব খালেদা জিয়া বা তাঁর অনুসারীদের হাতে রাখা যাবে না? তাহলে আসল
উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তাটা কোথায়? যে-প্রয়োজনীয়তার কথা
স্বয়ং প্রধান নির্বাচন
কমিশনারের কাছ থেকে এসেছে?
নির্বাচন
অনুষ্ঠান নিয়ে অনেকেই সংশয়ের মধ্যে আছেন। তবে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক বিএনপি'র
মালিকানা বন্টনের
প্রক্রিয়া
নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষেই
জোরালো ঈঙ্গিত দেয়।
আর এটাই হচ্ছে আসল
প্রয়োজন।
আগামী সংসদে সংবিধানের আরো কিছু
খোল-নলচে পাল্টাতে হবে, যার মাধ্যমে আমাদের দেশ নতুন নেতৃত্ব খুঁজে পাবে।
তাই, সে-নেতৃত্বকে উপহার
দিতে যে-একদল তোষামোদকারীর প্রয়োজন হবে, সংসদে সে-তোষামোদকারীদের পাশ করাতে তেমনি
একটি জুতসই নির্বাচনী মার্কারও দরকার।
সে-মার্কাটি হবে ধানের
শীষ।
এ-মার্কায় দীর্ঘদিন যাঁরা
নির্বাচন করেছেন, তাঁদের একটা বিরাট অংশ যে-কোন কারণেই হোক, আজ জান বাঁচাতে সদা
ব্যস্ত।
আর সে-তাদেরকে দিয়েই সোনার
বাংলাদেশ আমাদের পরবর্তী নেতা উপহার পেতে যাচ্ছে।
এ-রকমটা না ঘটলে সকলেই
বেজায় খুশী হবে।
কিন্তু যদি ঘটে, তাহলে এ-যে
আমরা প্রতিনিয়ত শুনছি আইনের কথা, সততার ও নিরপেক্ষতার কথা ও স্বচ্ছতার
কথা, তার সাথে সাংঘর্ষিক
হয়ে যায় না? এ-সাংঘর্ষিক রূপটির মূর্ত হওয়ার কদর্য যাত্রা নির্বাচন কমিশনের
বিএনপি'র মূলধারা প্রশ্নে নেওয়া সিদ্ধান্ত দিয়ে কেবল মাত্র শুরু।
প্রবীণ
সাংবাদিক এবিএম মূসা ও জনাব মিজানুর রহমান খান নির্বাচন কমিশনের এ-সিদ্ধান্তের নানা
দিক জাতীয় দৈনিকে আলোচনা করেছেন।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট
রাজনৈতিক দলের বিবাদ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ভারতীয় সুপ্রিম কৌর্টের রায় এবং ভারতীয়
নির্বাচন কমিশনের রায়, প্রথা ও রীতিনীতির প্রসঙ্গ টেনে উভয় পক্ষকে নিজেদের শক্তি
পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার যে-আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে, তা করলে কী ফলাফল আসবে, তা কি
কারো অজানা? যদি অজানাই হবে, তবে বিএনপি'র মালিকানা প্রাপ্ত কমিটিকে পুলিসী প্রহরায়
জিয়ার মাজারে যেতে হয়? এরপরও যদি সত্যি-সত্যি এ-সময়ে এ-নির্বাচন কমিশন ঐ বিবাদ
নিরসনে দু'পক্ষকে শক্তির পরীক্ষা দিতে বলে, তাঁদের বক্তব্য শুনতেও চায়, তাহলে দেখা
যাবে খালেদা পন্থী কেউ নির্বাচন কমিশনে আসেনি।
সেক্ষেত্রে কি প্রমাণ
হবে যে, খালেদা মনোনীত কমিটি আসল কমিটি নয়? তাদের জনসমর্থন দূর্বল?
মোটেও
নয়।
ঘরোয়া রাজনীতি নিষিদ্ধ
থাকা-কালে মান্নান ভূঁইয়ারা মাইক বাজিয়ে দিনের পর দিন সভা-সমাবেশ করলেও জরুরী
অবস্থার অবমাননা হয় না যে-কারণে এবং যে-কারণে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ-কালে
হান্নান শাহ্র বিরুদ্ধে জরুরী বিধিমালার অবমাননার দায়ে নয় অবমাননার উস্কানির
অভিযোগ আনা হয় এবং এর দায়ে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়, ঠিক সে-কারণেই
খালেদাপন্থী কাউকে এ-মূহুর্তে শক্তি পরীক্ষা দিতে নির্বাচন কমিশনে উপস্থিত হতে
খুঁজে না পাওয়ারই কথা।
তাই, সত্যিকার অর্থে
নিরপেক্ষতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পেলে এহেন জটিলতার ফয়সালা হওয়ার নয়।
যদি
উচ্চারিত সততা, নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা আর আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতির মধ্যে কোন
ফাঁক-ফোকর না থাকে, তাহলে এ-কৌশলের কোন প্রয়োজন নেই।
কেনো-না, বাংলাদেশের
জনগণ দেখেছে, মান্নান ভূইয়াদের মতো রাজনীতিবিদরা সংবিধানের দোহাই দিয়ে দেশটাকে
রসাতলে নিয়ে যাওয়ার জন্য কি না করেছে! তখন কি খালেদা জিয়া প্রধান মন্ত্রী ছিলেন যে,
তাঁর ইচ্ছা ও ঈশারার বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা তাদের ছিলো না? মন্ত্রীত্ব চলে যাবে? শুধু
পুনরায় মন্ত্রীত্ব পাওয়ার আশায় যারা নির্লজ্জ উন্মত্ততায় লিপ্ত হতে পারে তারা এখনও
সেটিই করছে।
নিজ সন্তানকে সুবিধা দেওয়ার
জন্য প্রভাব খাটানোর দায়ে খালেদার বিরুদ্ধে মামলা হলে সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে কেন
হবে না? কেন এ-সব ক্ষমতালিপ্সু ও তোষামোদকারী মানুষগুলোকে ব্যবহার করে ও পুনরায়
এদেরকেই ক্ষমতার বলয়ে প্রতিষ্ঠিত করে দেশের জন্য ভালো কিছু করতে হবে? অধ্যাপক ইয়াজ
উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপর সংবিধান রক্ষার নামে সীমাহীন চাপ
তৈরী করলেও আজ কিন্তু ভুলেও সংবিধান নিয়ে কেউ কিছু বলছেন না।
কেন বলছেন না সেদিকে
দৃষ্টি দিয়ে কোন ছল-চাতুরীর আশ্রয় ব্যতিরেকে বলিষ্ঠ পদক্ষেপে সামনে এগুলে জনগণের
সমর্থনের অভাব হবে না।
অন্যথায় জনগণের প্রশ্নের
পাহাড় সত্যিকারের পাহাড় হয়ে আছড়ে পড়বে সংস্কারের প্রবর্তকদের উপর। হয়তো আজ নয়তো কাল।
আর তাই আরো প্রশ্নের
জন্ম না দিয়ে দয়া করে স্বচ্ছতা
নিয়ে পথ চলুন, দেশটাকে
সত্যি রক্ষা করুন - জনগণ অবশ্যই সমর্থন জানাবে, পাশে থাকবে।
লেখক,
সহযোগী
অধ্যাপক
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
(বর্তমানে জাপানের ইয়ামাগুচি)
akond316@yahoo.com
২০/১১/২০০৭
|
|
|