London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পিছু হটতে হলো আইএমএফকে 

চিররঞ্জন সরকার

বহুল আলোচিত পলিসি সাপৌর্ট ইনস্ট্রুমেন্ট (পিএসআই) চুক্তি থেকে শেষ পর্যন্ত আইএমএফকে পিছু হটতে হলোআপাততঃ এ-চুক্তিটি হচ্ছে না আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ৫ই সেপ্টেম্বর থেকে সরকারের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু করেএ-ব্যাপারে সরকারের মনোভাব বুঝতে পেরে সংস্থাটি শেষ পর্যন্ত চুক্তির বিষয়ে পিছু টান দিয়েছেতবে তারা বলছে, তারা দারিদ্র্য বিমোচন তহবিল (পিআরজিএফ)-এর মতো আরো একটি নতুন চুক্তি করতে পারেকয়েক সপ্তাহ ধরে দেশ-জুড়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি-পরিকল্পনায় আইএমএফের এ-অযাচিত পরামর্শ-দান প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে তীব্র জনমত গড়ে ওঠেঅর্থনীতিবিদ, নাগরিক সমাজ, উন্নয়ন-কর্মী, এমনকি ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বার-বার বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বিষয়ে সতর্কতা উচ্চারণ করা হয়এদের পরামর্শকে অধিক গুরুত্ব না দেয়ার জন্য বলা হয়এক পর্যায়ে একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত চুক্তি করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সরকারের প্রতি রুলও জারী করে এসব কারণে শেষ পর্যন্ত আইএমএফকে পিছু হটতে হয়

বস্তুতঃ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পরামর্শের ওপর অধিক মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় দেশের সচেতন মহল থেকে সমালোচনা শুরু হয়এরই মধ্যে আইএমএফ সরকারকে চাপ দিতে থাকে পিএসআই করার জন্যঅথচ এটি হলে বাংলাদেশ কোনো আর্থিক ঋণ বা সহযোগিতা পাবে না, শুধু অর্থনীতি বিষয়ে আইএমএফের বিভিন্ন নির্দেশনা ও পরামর্শ বাংলাদেশকে অনুসরণ করতে হবেএ-ধরণের একটি চুক্তি শুধু-যে ক্ষতিকর তাই নয়, এটা অসম্মানেরও বটেকারণ এ-চুক্তির ফলে অন্য কোনো সাহায্যকারী সংস্থা বা দেশের কাছ থেকে সহযোগিতা পেতেও বাংলাদেশকে পুরোপুরি আইএমএফের মতামতের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে

বর্তমানে সারা বিশ্বেই আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক বৈধতার সঙ্কটে ভূগছেদেশে-দেশে এ-প্রতিষ্ঠানগুলোর Rb¯^v_©-we‡ivax ক্ষতিকর নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ সোচ্চার হচ্ছেউন্নয়নশীল কোন-কোন দেশ দেনা শোধ করে আইএমএফের বলয় থেকে বেরিয়ে আসছেবিশ্বজুড়ে সঙ্কটের মুখে পড়ে এ-আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পিএসআইর মতো চুক্তিকে বিকল্প হিসেবে নিচ্ছে।  আইএমএফের ব্যাপারে আমাদের অবশ্যই নতুন করে ভেবে দেখতে হবেঅতীতে সম্পাদিত বিভিন্ন চুক্তির ফলাফলগুলো মূল্যায়ন করে দেখলেই তাদের সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষতির দিকগুলো আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠেঅতীতের সরকারগুলো, বিশেষতঃ বিগত জোট সরকার, যেভাবে নির্বিচারে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বিভিন্ন পরামর্শ গ্রহণ করেছে, তার ফল শুভ হয়নিএবারও দেশে বন্যার সময় বিশ্বব্যাংক কৃষিঋণের সুদের হার বাড়ানোর জন্য চাপ দিয়েছেতাদের এ-চাপের কোনো ইতিবাচক উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া যায় না

শূন্য হাতে চলে যাওয়া

এটা নিশ্চয়ই একটা তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা অনেক দেন-দরবার করেও সফল হতে পারলো না আইএমএফ প্রতিনিধি দলকাঙ্খিত চুক্তি না করেই তাদের চলে যেতে হলোবাংলাদেশের এ-যাবৎকালে সম্ভবতঃ আইএমএফের এটাই সবচেয়ে বড়ো পরাজয়বাংলাদেশ ছেড়ে যাবার আগে আইএমএফ প্রতিনিধিরা বলেছেন, পিএসআই নয় সরকারের সঙ্গে যে-কোনো একটি চুক্তি করতে তারা আগ্রহী যার মাধ্যমে আর্থিক খাত সংস্কার ও গতিশীল করতে তারা পরামর্শ দিতে পারবে

উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে সরকার আইএমএফের সঙ্গে পিআরজিএফ চুক্তি করেএ- চুক্তির আওতায় তিন বছরে মোট সাত কিস্তিতে বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় দাতা সংস্থাটি তবে চলতি বছরের জুন মাসে চুক্তির মেয়াদ শেষেও শেষ কিস্তির অর্থ এখনও ছাড় করেনি আইএমএফঅন্যদিকে চুক্তি করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকৌর্ট সরকারের প্রতি রুল জারী করেছেএসব কারণে আইএমএফ প্রতিনিধিকে এবার খালি হাতেই ফিরে যেতে হলো

আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের শর্ত সৃষ্ট সঙ্কট

আমাদের দেশের সরকারগুলো অতীতে অকাতরে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বশ্যতা স্বীকার করেছেআর এর ফলে দেশের পরনির্ভরশীলতা ও দারিদ্র্য ক্রমেই আরো বেড়েছেদেখা দিয়েছে নানা সঙ্কটএকের পর এক আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের শর্ত মানতে গিয়ে দেশের প্রতিষ্ঠিত শিল্প ধ্বংস হয়েছেকৃষকের নিরলস প্রচেষ্টা, উদয়াস্ত শ্রম আর দেশের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল বীজে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও ঋণদাতাদের শর্ত পালন করতে গিয়ে সরকারী বিনিয়োগ হ্রাস করা হয়েছেফলে কৃষিতে আরও মন্দাভাব সৃষ্টি করেছে অবশ্য এ-সংস্থাগুলোর বৈশিষ্টই এমন এদের শর্ত পালন করতে অনেক দেশেই দুর্ভিক্ষাবস্থার সৃষ্টি হয়েছেকিন্তু এদের শর্তে মেনে লাভবান হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে

এমন এক সময় ছিলো, যখন বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটের পুরোটাই ঋণ ও অনুদান-নির্ভর ছিলোআশির দশকজুড়ে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি-সহ বিভিন্ন সংস্থার দেওয়া ঋণ ও অনুদান নিয়েই উন্নয়ন বাজেট তৈরী করা হতোকোনো-কোনো বছর, যেমন ১৯৮৮-১৯৮৯ অর্থবছরে, উন্নয়ন বাজেট ছাড়াও রাজস্ব বাজেটের কিছু অংশও বিদেশী সংস্থার ঋণ থেকে সংস্থান করা হয়নব্বই দশকের পর থেকেই পরিমাণ কমতে থাকে১৯৮১-৮২ অর্থ-বছরে প্রাপ্ত বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান মিলে জিডিপির ১৩ দশমিক ২ শতাংশ আর উন্নয়ন বাজেটের প্রায় শতভাগে উঠেছিলোবর্তমানে এর পরিমাণ জিডিপির দুই শতাংশ এবং উন্নয়ন বাজেটের আনুমানিক ৪২ শতাংশের কাছাকাছিতে হ্রাস পেয়েছেকিন্তু ঋণ ও অনুদানের পরিমাণ উল্লে­খযোগ্য হারে কমলেও বাংলাদেশের ওপর খবরদারী কমেনি, বরং পূর্বের তুলনায় আরও বেড়েছে এ-নিয়ে দেশের গবেষক, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ-সহ সুধীমহল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিদেশী সাহায্যের শর্তের ক্ষতিকর প্রভাবের দিক সম্পর্কে সতর্ক করা হলেও নীতি-নির্ধারকরা তেমন আমলে নেয়নিঅনেক সময় বিভিন্ন চুক্তির শর্তাবলী প্রকাশ করা হয় না বলে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনসাধারণ জানতে পারে না কিন্তু অপ্রকাশিত এসব চুক্তি-যে কতো ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা আদমজী, মাগুরছড়া, টেংরাটিলা এবং সর্বশেষ ফুলবাড়ি ধ্বংসযজ্ঞই এর প্রমাণ

অবশ্য ঋণদাতা গোষ্ঠীর সমর্থিত এসব বহুজাতিক কোম্পানী এ-দেশের স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সহযোগিতা ছাড়া এ-ধরণের জাতীয় স্বার্থ-হানিকর কাজে সফল হতে পারতো না নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ উদ্ধারে দেশের নীতি-নির্ধারকদের প্রভাবিত করা ছাড়াও প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির শিকার হওয়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীকেও ভয়-ভীতির পাশাপাশি বিভিন্ন আর্থিক ও লোভনীয় উপহারের নামে ঘুষ-দানের মাধ্যমে দলে ভিড়াতে তৎপর হয়েছে।  ইতিপূর্বে মাগুরছড়ায় হাজার-হাজার কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষ্যে যখন মানুষ আন্দোলন করছে, তখন অক্সিডেন্টাল কোম্পানীকে দানবীর সেজে বিভিন্ন স্কুল, কলেজে কম্পিউটার উপহার দিতে দেখা গেছে তবে ফুলবাড়ির নিরন্ন ভুখা-নাঙ্গা মানুষ সকল প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করে জীবনের বিনিময়ে যেভাবে এশিয়া এনার্জিকে রুখে দিয়েছে, তা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, নিজেদের জাতীয় সম্পদ রক্ষার্থে সংগ্রামরত পৃথিবীর সকল দেশের মানুষের জন্যই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে

আমাদের অর্থনৈতিক নীতি আমাদেরকেই নির্ধারণ করতে হবে

আইএমএফ আপাততঃ বিদায় নিলেও তাদের ভবিষ্যৎ অপ-তৎপরতা বিষয়ে নিঃসংশয় হওয়া যাচ্ছে নাবাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি-নির্ধারণে তারা কোনো একটি ছুঁতো নিয়ে আবারও এসে হাজির হতে পারে।  কিন্তু কোনো মতেই তাদের এ-সুযোগ দেয়া যাবে না

আমলাতন্ত্রিক লুকোছাপায় গোপনে কোনো রকম চুক্তি স্বাক্ষরিত যেনো করা না হয়, এ-ব্যাপারে স্পষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবেআমাদের অর্থনৈতিক নীতি আমাদেরকেই নির্ধারণ করতে হবে এবং তা করতে হবে স্বাধীনভাব। জনগণের কল্যাণের লক্ষ্যে গুরুত্ব দিতে হবে নিজস্ব বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে।  মূল কথা হলো সরকারকে সাহসী হতে হবে আত্ম-মর্যাদাশীল হতে হবেআন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে দাসখত লিখে দেয়ার মানসিকতা ত্যাগ করতে হবেঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে পর-নির্ভরশীল মানসিকতাব্যবস্থা-পত্র দিলেই মানতে হবে - এটা ঠিক নয়দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে ব্যবস্থা নেয়া উচিতথাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, চীন, এমনকি প্রতিবেশী ভারতও দাতা দেশ ও গোষ্ঠীর ফাঁদ থেকে কৌশলে নিজেদের রক্ষা করেছেআইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক এখন আর তাদের প্রেসক্রিপশন দেয় নাবরং তারা উন্নয়নের যোগানদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেবাংলাদেশকে সে-পথেই এগিয়ে যেতে হবে প্রথম-প্রথম একটু ধকল যাবেকিন্তু  দিন শেষে এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবেসবার অগে দরকার মাথা তুলে দাঁড়ানোর সেই শপথ বা অঙ্গীকার

২২ সেপ্টেম্বর, ২০০৭

চিররঞ্জন সরকার, কলামিস্ট

 
 
   

অন্যান্য কলাম 8

© 2007 Confidence Services Ltd.