London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের ক্ষমা প্রার্থনা প্রসঙ্গে

সঞ্জীব হোসেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেফতারকৃত দুই অধ্যাপক বর্তমানে দ্বিতীয় মেয়াদের রিমান্ড ভোগ করছেনপ্রথমবারের রিমান্ড শেষে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ও অধ্যাপক হারুন অর রশীদকে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নেয়ার অভিপ্রায়ে সিএমএম আদালতে হাজির করা বৃহস্পতিবারসেদিন ম্যাজিস্ট্রেইটের সামনে হাজির করার আগে দুই অধ্যাপককে আদালত-প্রাঙ্গনে হাজির মিডিয়ার সাথে কিছু সময়ের জন্য কথা বলা সুযোগ দেয়া হয়সে-সময় উভয় অধ্যাপক অভিযোগ করেন যে, অজ্ঞাত একটি স্থানে রিমান্ডে রাখা অবস্থায় তাঁদেরকে চূড়ান্ত পর্যায়ের মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছেইতোপূর্বে অধ্যাপক আনোয়ারকে শারীরিকভাবে নির্যাতিত করার কথাও শোনা গিয়েছিলো

বৃহস্পতিবার দুপুরে আদালত-প্রাঙ্গনে মিডিয়ার সামনে অধ্যাপক আনোয়ার যেসব কথা-বার্তা বলেন, তা নিয়ে বাংলাদেশ-সহ প্রবাসী বাঙালীদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা তৈরী হয়সেদিন দুপুর থেকেই ঢাকা ভিত্তিক কয়েকটি সংবাদ-মাধ্যম প্রচার করতে থাকে যে, অধ্যাপক আনোয়ার সেনাবাহিনীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এক্ষেত্রে পূর্বাপর কোন বক্তব্য সম্প্রচার এবং ব্যাখ্যা দেয়া ছাড়াই অধ্যাপক আনোয়ারের বক্তব্যের বিশেষ কিছু অংশ কয়েকটি টিভি চ্যানেলে দেখানো হতে থাকেসেনাবাহিনীর কাছে অধ্যাপক আনোয়ারের ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারটি নিয়ে লন্ডনের বাঙালীদের মধ্যেও তুমুল তর্ক-বির্তকের সূত্রপাত হয়কেউ-কেউ মন্তব্য করেন যে, এভাবে ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়ে অধ্যাপক আনোয়ার আপোষকামিতার পরিচয় দিয়েছেনআবার কারও মতে, এ-ধরণের বক্তব্যের ফলে সেনা-নিয়ন্ত্রিত সরকারের বিরুদ্ধে জনগণ যে- বিক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, তা বিফলে গেছে অন্য আরেক দলের ধারণা, রিমান্ডে রাখা অবস্থায় চাপের মুখে এ-ধরণের বক্তব্য দেয়ার জন্য অধ্যাপক আনোয়ারকে বাধ্য করা হয়েছে খুব ছোট্ট পরিসরে অবশ্য কেউ-কেউ একথাও বলার চেষ্টা করেব যে কী পরিস্থিতিতে ও কোন প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক আনোয়ার এসব কথা-বার্তা বলেছেন, তা টিভি-চ্যানেলগুলোতে সম্প্রচারিত খন্ডিত বক্তব্য থেকে স্পষ্ট নয়

মিডিয়ার প্রচারের বদৌলতে যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তৈরী হয়, তা সপর্শ করে অধ্যাপক আনোয়ারের হোসেনের পুত্র সঞ্জীব হোসেনকে।  সেদিন আদালত প্রাঙ্গনে হাজির টিভি-মিডিয়ার সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ করে অধ্যাপক আনোয়ারের পুরো বক্তব্যটি দেখার ও শোনার সুযোগ পান সঞ্জীবএছাড়া বিচারকের সামনে হাজির করার কিছু সময় আগে পরিবারের অন্যান্য সদস্য-সহ সঞ্জীব নিজেও কথা বলেন তার পিতার সাথে এসব কিছুর ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর কাছে অধ্যাপক আনোয়ারের  ক্ষমা চাওয়া প্রসঙ্গে একটি বক্তব্য তৈরী করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে জনগণের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন সঞ্জীব।  কিন্তু তার বক্তব্য ঢাকার কোন মিডিয়ায় প্রকাশ করা  হয়েছে বলে আমাদের জানা নেইসঞ্জীবের বক্তব্যের একটি কপি এসেছে ইউকেবেঙ্গলীর কাছেপাঠকের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে মূলের প্রতি অনুগত থেকে সঞ্জীবের বক্তব্যের ঈষৎ সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর নীচে প্রকাশ করা হলোঃ  

টেলিভিশনে আমার বাবার বক্তব্য [সেনাবাহিনীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা প্রসঙ্গে] শুনে আমি কিছুটা আশ্চর্য হয়ে যাইতাঁর বক্তব্য শোনার পর থেকে এর পরিণতি সম্পর্কে আমি গভীরভাবে ভাবতে থাকিএছাড়াও তিনি আসলে কী বলতে চেয়েছেন, তা বোঝার চেষ্টা করতে থাকিদুঃখজনক হলেও এটাই সত্যি যে, আমার বাবা যেসব কথাবার্তা বলেছেন, বেশির ভাগ টিভি-চ্যানেল তার একটি 'স্যাবোটাজ' ভার্শন প্রচার করেছেসেদিন [বৃহসপতিবার] রাতে আমি চ্যানেল আই টেলিভিশনের একজন রিপোর্টারের সাথে কথা বলিকেন এ-ধরণের 'স্যাবোটাজ ভার্সন' সম্প্রচার করা হয়েছে, সে-ব্যাপারে অভিযোগ করিকেন 'আনকাট/অরিজিন্যাল' ভার্শনটি সম্প্রচার করা হয়নি, সে-প্রশ্নটিও আমি উত্থাপন করিএতে সমস্যা কোথায় ছিলো? কেন চ্যানেলগুলো দেশবাসীকে ভুল বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছে? উক্ত রিপোর্টার আমাকে উত্তরে জানান যে, তাদের হাত বাধা আছেতাদের কিছুই করার নেইতবে একই সাথে তিনি আমার কাছে আশাবাদও ব্যক্ত করেনতিনি আমাকে বলেন, আবারো সুদিন ফিরে আসবে

চ্যানেল আইয়ের সাংবাদিকের সাথে আলাপের পর আমি একটি ভালো সুযোগ পাইএটিএন বাংলার কাছে [আদালত-প্রাঙ্গনে] আমার বাবা যে-বক্তব্য প্রদান করেছিলেন, তার মূল ভার্শনটি আমার দেখার সুযোগ হয় মূল ভার্শনে তাঁর শেষের কথাগুলো ছিলো এ-রকমঃ

'আমরা জানি যে সেনা বাহিনীর সদস্যদের আত্ম-সম্মানবোধ রয়েছেঅবশ্য আমাদের একথাও ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও আত্ম-সম্মানবোধ আছেআমি আশা করি যে, সেনা বাহিনীর সদস্যবৃন্দ এ-কথাটি স্মরণে রাখবেন এবং ঘটনাটি [ঢাবিতে সেনা-বিরোধী বিক্ষোভ] থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবেন, যাতে করে তাঁদেরকে ভবিষ্যতে আর কখনো এ-রকম ভুল করতে না হয়'

বক্তব্যের এ-পর্যায়ে টিভি-ক্যামেরা সরিয়ে নেয়া হয়এবং আমার বাবাকে আরো কোন কথা বলার সুযোগও দেয়া হয়নিএরপরে [আদালত শুরুর আগে] আমি আদালত-কক্ষের ভেতরে আমার বাবার সাথে কথা বলিতিনি আমাকে জানান যে, তাঁর আরো অনেক কথা বলার ছিলোতিনি বলতে চেয়েছিলেনঃ (১) সময় এগিয়ে এনে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের পরিবর্তে জানুয়ারীতে নির্বাচন দেয়া হোক; (২) জরুরী অবস্থা প্রত্যাহার করা হোক, আর তা সম্তব না হলে ব্যাপকভাবে জরুরী বিধিমালা শিথিল করা হোক; (৩) সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলো জনগণকে ফিরিয়ে দেয়া হোক; (৪) একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক যাতে করে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার যতো তাড়াতাড়ি সম্তব ক্ষমতায় আসতে পারে

আমার বাবা আমাকে জানান, তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, এসব দাবী পূরণ করা হলে দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে এবং বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বীরের মত ব্যারাকে ফিরে যাবেতিনি আরো উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মিশনে ব্যর্থ হলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরী হবেতিনি জানান, সেনাবাহিনীকে ব্যর্থ হতে দেয়া যায় না। কেনো-না, তাঁরা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের স্মারকটি ধারণ করে

মিডিয়ার সামনে আমার বাবাকে কথা বলতে দেয়া প্রসঙ্গে, আরেকটি বিষয় বিবেচনায় রাখা দরকারকোন একজন ব্যক্তিতে রিমান্ডে রাখা অবস্থায় মিডিয়ার সাথে কথা বলতে দেয়াটা সম্পূর্ণ বে-আইনীতিনি যে-চাপের মুখে কথাবার্তা বলছেন না, তারই বা কী নিশ্চয়তা আছে? এ-সমস্ত দিক বিবেচনা করে আপনাদের সবার কাছে আমার আবেদন, আমার বাবা সত্যিকার অর্থে কী বোঝাতে চেয়েছেন তা বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে আমার মনে হয়েছে, সেনাবাহিনীর কাছে 'ক্ষমা-প্রার্থনা' তাঁর বক্তব্যের প্রধান ইস্যু নয়আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, ক্ষমা-প্রার্থনার ব্যাপারটি ঠিক আছেকেনো-না, এটাতো সত্য যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে কৃতকর্মের জন্য সেনাবাহিনী ক্ষমা-প্রার্থনা করেছেতবে তাঁর বক্তব্যের [মূল ভার্শন] যে-অংশটি আমার কাছে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে, তা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-সহ আমাদের দেশবাসীর সম্মান, দৃঢ-চরিত্র ও আত্ম-সম্মানবোধের বিষয়টি স্মরণে রাখার জন্য সেনাবাহিনীর প্রতি আহবানআমার বাবা এই আশাবাদ পোষণ করেছেন যে, সেনাবাহিনী এসব বিষয় স্মরণে রাখবে এবং শিক্ষা নেবে

আমরা অবশ্যই ভুলে যাবো না যে, ১৯৭১ সালে সেনাবাহিনী জনগণের সাথে হাতে-হাত মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেসেনাবাহিনীর প্রতি আমার বাবার বার্তা এই যে, এ-প্রতিষ্ঠানটির ব্যর্থ হওয়া চলবে নাসেনাবাহিনী ব্যর্থ হলে বিপর্যয় নেমে আসবে, যা কারও কাম্য নয়আমি মনে করি একটি বক্তব্যকে বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করার অবকাশ আছেআমি শুধু আমার ব্যাখ্যাটি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করলাম

সঞ্জীব হোসেনঃ অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের পুত্র

আপলৌডঃ ১ সেপ্টেম্বর ২০০৭

 
 
   

অন্যান্য কলাম 8

© 2007 Confidence Services Ltd.