|
আগুনের তাপে
পোড়া দেশপ্রেমিকেরা
ফাহমিদুল হক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু
হওয়া ও দেশ-ব্যাপী ছড়িয়ে পড়া ছাত্র-বিক্ষোভকে ঘিরে সরকারের নানা পদক্ষেপ স্পষ্ট করে
তুলেছে যে, এ-সরকার তার জনসমর্থন হারিয়েছে এবং তারা নিজেরাও আর জনসমর্থনের তোয়াক্কা
করছেন না।
অথচ
১১ জানুয়ারীতে
এ-অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হবার সময় জন-সমর্থনই ছিলো তার প্রধান পুঁজি।
নির্বাচনকে ২০০৮ সাল
পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়ে দেশের সমস্ত কিছু নিয়ে শুদ্ধি অভিযানের সাহস এ-জন্যই করতে
পেরেছে যে, রাজনীতিকদের ওপরে বিক্ষুব্ধ জনগণই মনে-মনে এ-অভিযান কামনা করছিলো।
সেই 'অভ্যর্থনাকারী'
জনগণ (ছাত্ররা জনগণেরই সচেতন অংশ) কি হঠাৎই বিগড়ালো? এ-কি কেবলই স্বার্থান্বেষীদের
প্ররোচনায় দুষ্কৃতিদের ঘটানো রাষ্ট্র-বিরোধী কার্যকলাপ?
সেনা-সুশীলসমাজ-ব্যবসায়ী-আমলাদের সরকার এ-ঘটনাটিকে যেভাবে বিচার করলো, তাকে মনে
হয়েছে ক্ষুদ্রবুদ্ধি নিয়ে বৃহৎ কাজে হাত দেয়া লেজে-গোবরে পাকানো হতবুদ্ধি-আনাড়ির
ভয়ঙ্করী ভীমরতি।
সে আগুন
ছড়িয়ে গেল সবখানে
সাম্প্রতিক ছাত্র-আন্দোলনটির
দ্রুত-সম্প্রসারণ দেখে আমি বেশ অবাকই হয়েছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
শিক্ষকতার সুবাদে কয়েকটি ছাত্র-আন্দোলন আমার ভেতরে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।
বিশেষ করে,
শামসুন্নাহার হলে পুলিশী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপরে
হামলাকে ঘিরে আন্দোলনের সময় দেখেছি কীভাবে একটি আন্দোলন বিকশিত হয় ও ছড়িয়ে পড়ে।
আমার পর্যবেক্ষণ হলো,
শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-আন্দোলন নয়, বিগত পাঁচ-ছয় বছরে যতগুলো জন-আন্দোলন
হয়েছে, তার কোনোটিই কোনো রাজনৈতিক দল বা অন্য কোনো গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ঘটেনি।
এসব আন্দোলনের কোনো
পূর্বনির্ধারিত নেতা থাকে না, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কোনো-কোনো নেতার আবির্ভাব ঘটতে
পারে, তবে সবক্ষেত্রে নয়।
কানসাট ও শ্যামপুরে
বিদ্যুতের জন্য আন্দোলন, ফুলবাড়িতে খনি-বিরোধী আন্দোলন, শামসুন্নাহার হল আন্দোলন,
ইত্যাদি কয়েকটি উদাহরণ খেয়াল করলেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়।
এ-আন্দোলনগুলো একেবারেই
জনগণের আন্দোলন। অথচ
এ-আন্দোলনের হোতা হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে পাঁচজন অধ্যাপককে।
এবারের ছাত্র-আন্দোলনটি কীভাবে
দ্রুত ছড়িয়ে গেল, তা অনেকের মতো আমিও অবাক হয়েছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
খেলার মাঠের ঘটনা নিতান্তই অভ্যন্তরীণ বিষয়; তাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কী?
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কী? বুঝা গেলো, ছাত্র-সংগঠন, সাংষ্কৃতিক
প্রতিযোগিতা-বিতর্ক ইত্যাদির মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে এক
ধরণের যোগাযোগ হয়।
কিন্তু এ-আন্দোলনে ঢাকা
কলেজ, তিতুমীর কলেজ, বিএম কলেজ এবং বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো
একদিনের মধ্যে যুক্ত হলো কীভাবে? শামসুন্নাহার হলের ঘটনার সময় তো এভাবে সব
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাঠে নেমে পড়েনি। হয়তো কেবল সমর্থন জানিয়েছে! বাংলাদেশে তো কত
অন্যায়-জুলুমই হয়েছে বিগত কয়েকবছরে। কত খুন-লুটপাট-অত্যাচার হয়েছে। দু'দিনের
মধ্যে এতো লক্ষ মানুষ কি যুক্ত হয়েছে একবারও? তাহলে খেলার মাঠের তুচ্ছ ঘটনাটি
কেবলই একটি ঘটনা নয়, দিয়াশলাইয়ের একটি কাঠি জ্বলেছে কেবল সেদিন।
তারপর সে-আগুন দাউ-দাউ
করে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার পেছনে তাহলে অন্য গুরুতর কারণ রয়েছে? সরকার সে-কারণ
অনুসন্ধান না-করে দুষ্কৃতিদের উস্কানি খুঁজলেন।
দাউ-দাউ করে জ্বলে ওঠা
আগুনকে মনে করলেন গোধূলীর নরম রক্তিমতা, কারফিউয়ের অন্ধকারে দ্রুত তা হারিয়ে যাবে।
রাস্তায় কারফিউ চলছে,
কিন্তু মগজে কারফিউ দেয়া কি এতোই সোজা? ত্রাসনীতি জন-আন্দোলন কতদূর দমন করতে পারে?
ব্লাডি
সিভিলিয়ান
ও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী
আন্দোলনের বিপরীতে
যে-প্রতিক্রিয়া সরকার দেখাচ্ছে, তাতে বুঝা যাচ্ছে সরকারের সামনে থাকা উপদেষ্টাদের
আর কোনো 'স্যে' নেই, সবকিছু এখন সেনাবাহিনী দেখছে।
সিভিল-সোসাইটির লোকেরা
কি আর ব্লাডি সিভিলিয়ানদের ঠাণ্ডা করতে পারে! তাই দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী তাদের
কায়দায় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
দু'জন ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন অধ্যাপককে মধ্যরাতে গ্রেফতার করে দেড়-দিন
হাওয়া করে দেয়া হলো।
এরপর আদালতে এনে চার
দিনের ও দশ দিনের রিমান্ড পাশ করিয়ে নেয়া হলো।
জানা গেলো, ইতোমধ্যেই
তাদের মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে গ্রেফতার করার সময় সেনাবাহিনীর লোকজন অধ্যাপক আনোয়ারের
পুত্রকে বলেছেন, 'চিন্তা করবেন না।
আমরা পাকিস্তানের
সেনাবাহিনী না, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী।
আপনার বাবাও দেশপ্রেমিক,
আমরাও দেশপ্রেমিক।'
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
এবং পূর্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সুযোগে আমি এ-পাঁচজন অধ্যাপকের
প্রত্যেককেই চিনি। সবচেয়ে
বেশি চিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু'জনকে।
একই অনুষদ-ভুক্ত হবার
কারণে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন অধ্যাপক হারুন-অর-রশীদের সঙ্গে একইসঙ্গে নানা
ধরণের কাজ করেছি। তাঁকে
কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।
তিনি একাডেমিক লোক
কিন্তু একইসঙ্গে রাজনীতি-সচেতন।
ইউপিএল থেকে তার কয়েকটি
গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
এশিয়াটিক সোসাইটির
বাংলাদেশের ইতিহাস, বাংলাপিডিয়া-সহ অন্য অনেক প্রকল্পের সঙ্গে তিনি যুক্ত।
বিপুল শিক্ষক-সমর্থন
নিয়ে তিনি ডীন নির্বাচিত হয়েছিলেন।
অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনও
অণুজীববিজ্ঞান অনুষদের ডীন এবং শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক।
'ডীনস্ লেকচার' চালু
করে তিনি শিক্ষদের মধ্যে ধন্যবাদার্হ হয়েছেন এবং শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক
হিসেবে তিনি খুবই সক্রিয়।
এ-দু' অধ্যাপকের মতোই
গ্রেফতারকৃত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরাও প্রগতিশীল মতাদর্শে বিশ্বাসী।
গ্রেফতার হওয়া অধ্যাপক
সাইদুর রহমানকেই উপাচার্য হিসেব পেয়েছিলাম আমার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার
সময়। তাঁদের
গ্রেফতার ও নির্যাতনের খবরে তাই আমি বিমর্ষ, পীড়িত ও ক্ষুব্ধ।
তবে আমার ব্যক্তিগত
বিষাদ সামগ্রিক পরিস্থিতির কাছে খুবই ক্ষুদ্র একটি বিষয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের
অধ্যাপকদের মাঝ-রাতে গ্রেফতার ও ত্রিশ ঘণ্টারও অধিক সময় কোনোরকম খোঁজ-খবর না-দেওয়ার
ঘটনাটি আমাদের পাকিস্তান আমল বা একাত্তরের বিভীষিকাময় সময় কিংবা ১৪
ডিসেম্বরের
কথাই মনে করিয়ে দেয়।
পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর
কথা মনে হবে বলেই হয়তো গ্রেফতারের সময় অফিসারদের প্রয়োজন পড়েছিলো মনে করিয়ে দেবার
যে, তাঁরা পাকিস্তানী নন এবং তাঁরা এতোকিছুর পরেও দেশপ্রেমিক।
হ্যাঁ, একাত্তরের
স্বাধীনতা যুদ্ধে
সেনাবাহিনী দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছিলো।
কিন্তু তার চাইতে অনেক
বেশি দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছিলো সিভিলিয়ানেরা।
একাত্তরের পরে আর কখনোই
সেনাবাহিনীকে দেশপ্রেমের পরীক্ষা দিতে হয়নি, তবু তাঁদের সঙ্গে দেশপ্রেমিক বিশেষণ
চালু থেকেছে। এ-হয়তো
তাঁদের প্রতি সিভিলিয়ানদের ভীতিমাখা সমীহের বহিঃপ্রকাশ।
অস্ত্র আর উর্দির ধারক
হিসেবে তাঁরা সিভিলিয়ানদের কাছ থেকে পাওয়া দেশপ্রেমিক খেতাব উপভোগ করেন। পুনঃ
পুনঃ ব্যবহার করেন, অথচ তাদের কাছে সিভিলিয়ানরা কেবলই 'ব্লাডি' থেকে যান।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের
নামজাদা অধ্যাপক হলে কী হবে, তাঁদের বাসায় হানা দিয়ে গ্রেফতার করতে তাঁদের কোনো
দ্বিধাগ্রস্ততা নেই, গ্রেফতারের পর তাঁদের কী করা হলো, পরিবার বা বিশ্ববিদ্যালয়কে
তা জানানোর কোনো প্রয়োজনও তারা বোধ করেন না।
এ-সরকারে যাঁরা সামনে পেছনে
রয়েছেন, সাধারণভাবে তাঁরা জনবিচ্ছিন্ন কিছু লোক।
উর্দির কারণে রাজনৈতিক
নোংরামিতে তাঁরা হস্তক্ষেপ করতে সমর্থ হয়েছিলেন।
আবার ঘটনাচক্রে
জনসমর্থন পেয়ে তাঁরা জনগণের শাসক হয়েছেন।
আর যখনই তাঁরা জানলেন
যে, জনসমর্থন উঠে গেছে, তখন উর্দির জোর প্রদর্শনে নেমে গেলেন।
তবে উর্দি আর অস্ত্রকে
এদেশের জনগণ বেশিদিন পরোয়া করেনি।
সে-ইতিহাস
উর্দিওয়ালাদের ভুলে গেলে চলবে না।
২৬
অগাস্ট, ২০০৭
লেখক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা
বিভাগের শিক্ষক।
|
|
|