London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

অধিপতির নিম্নবর্গ-দরদঃ পুঁজির কন্ঠস্বর

দীপায়ন খীসা

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অধিপতি জাতি বাঙালী।  বাঙালীর আধিপত্যের দাপটে অন্যান্য জাতিসমূহ বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রে প্রান্তিক হয়ে যাচ্ছে।  অধিপতি জাতির আগ্রাসনে তলিয়ে যাচ্ছে অধীনস্থ জাতিসমূহের নৃ-তাত্ত্ব্বিক পরিচিতি, ভাষা ও সংস্কৃতি ।  অধীনস্থ জাতির আবাস, ভূমি, বন, পাহাড়, জলা - সবকিছু অধিপতি জাতির দখলে চলে যাচ্ছে।  নিজ বাসভূম থেকে উচ্ছেদ হওয়া এ-দেশের অধীনস্থ তথা নিম্নবর্গীয় জাতিসমূহের জন্য একটা মামুলি ঘটনা মাত্র।  কখনও উন্নয়ন, আবার কখনও বনায়ন, কখনও পর্যটন, হালের ইকোপার্ক, কখনও নিরাপত্তার নামে রাষ্ট্র নিম্নবর্গীয় জাতিসমূহের ভূমি অধিগ্রহণ করে চলেছে।  রাষ্ট্র নিম্নবর্গীয় জাতিসমূহের ভাষা, কৃষি, জাতিগত স্বকীয়তা স্বীকার করতে নারাজ

হাল নাগাদ এদেশে অধিপতি জাতির মধ্যে একটি বিশেষ বিবেকবান গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁরা নিম্নবর্গীয়দের অধিকার নিয়ে খুবই উচ্চকন্ঠ।  দেশে এখন সভা, সেমিনার, কর্মশালা, বিভিন্ন টক শো, সাংবাদিক সম্মেলনে নানান সব জ্ঞানীরা হাজির হচ্ছেন।  তবে নিম্নবর্গীয়দের বিষয়ে কথা বলাটা একটু যেনো ভিন্ন।  অধিপতি জাতির পন্ডিতেরা যখন নিম্নবর্গীয় বিষয়ক আলোচনায় অংশ নেন, তখন তাঁরা নিজেকে খুবই মহান ভাবেন।  তাঁরা অনেকেই ক্ষমা চান এ-বিষয়ে বেশি কিছূ না জানার জন্য।  কিন্তু যখন বলেন তখন মনে হয় না বক্তাটি কম জানেন

নিম্নবর্গীয়দের নিয়ে আলোচনা করা কিংবা গবেষণা করা বর্তমান সময়ের জন্য একটি ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।  অনেকের জন্য নিম্নবর্গীয়রা আশীর্বাদ স্বরূপ।  তাঁদের কারণে অধিপতি জাতিসমূহের একটি বিশেষ গোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে প্রচুর লাভবান হচ্ছে।  এ-গোষ্ঠীটির অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, মানবাধিকার কর্মী, উন্নয়ন সংগঠক কিংবা গবেষক।  টাকা মূখ্য হলেও এদের লাভের ধরণটি বহুমাত্রিক।  নিম্নবর্গীয়দের পক্ষে কথা বলছে বা কাজ করছে এই কারণে নিজেদের সমাজে তাদের একটা এলিট ভাব তৈরী হয়, মানবতাবাদী হয়ে যান, নিম্নবর্গীয়দের কাছে তারা মহান সাজতে পারেন এব বিনামূল্যে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ তারা পেয়ে যান।  এছাড়াও অনেকে দেশ-বিদেশের  নানা কিসিমের উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে নিম্নবর্গীয় বিষয়ক জ্ঞানের আধার হয়ে যান।  অনেকে আবার এ-সংক্রান্ত লেখক কিংবা সাংবাদিকের তকমা নিজের গায়ে লাগিয়ে থাকেন।  অধুনা তৈরী হওয়া এ-পোশাকী নিম্নবর্গ-দরদীদের হাল হকিকত দেখে অনেকে বিভ্রান্তও হতে পারেন।  বিভিন্ন দিবস ও আলোচনা অনুষ্ঠানে এঁদের দাপুটে উপস্থিতি নিম্নবর্গের অংশগ্রহণকে ম্লান করে দেয়।  আলোচনার বিষয়বস্তু নিম্নবর্গ বিষয়ক হলেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আয়োজক কিংবা বক্তারা সকলে অধিপতি জাতির চেনা কিছু মুখ।  এ-দরদী ব্যক্তিরাই তখন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যাননিম্নবর্গ সেখানে শ্রোতা মাত্র

৩০ জুন সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবসের ১৫২তম বার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকায় নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।  অক্সফাম, একশন এইড-সহ বেশ কিছু সংস্থা এতে আর্থিক সহযোগিতা যুগায়।  আয়োজকদের দেয়া তথ্য মোতাবেক দিবসটি পালনে তারা প্রায় ৮ লক্ষাধিক টাকা আর্থিক অনুদান পেয়েছেন।  তাদের এ-বাণিজ্যের কাঁচামাল হচ্ছে ১৮৫৫ সালে  ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে সাঁওতালদের অসীম বীরত্বের প্রতিরোধ যুদ্ধ।  

দিনাজপুর, রাজশাহী থেকে ৪-৫টি বাস যোগে সাঁওতালদের নিয়ে আসা হয়।  তাদেরকে নিয়ে আসার মূল কারণ হচ্ছে আলোচনায় উপস্থিতি বাড়ানো।  সারারাত বাস ভ্রমণের ক্লান্তি নিয়ে নিম্নবর্গীয় জাতির এ-শ্রোতারা দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের শোভাবর্ধন করলো।  সকালের নাস্তা আর দুপুরের খাওয়া ছিলো তাঁদের পারিশ্রমিক।  

অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর তাঁদেরকে আবার নিজ-নিজ জায়গাতে ফেরত পাঠানো হলো।  আয়োজকরা একটি সফল অনুষ্ঠানের জন্য তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেন।  দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে অর্থিক সহযোগিতা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর কিছু কর্মকর্তা-সহ আধিপতি জাতির বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং অনেক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।  কিন্তু প্রশ্ন থাকে, লক্ষ-লক্ষ টাকা জায়েজ করার জন্য যাদেরকে নিয়ে আসা হলো তারা কতটুকু উপকৃত হলেন?

যে-আলোচকগণ সেদিন জ্ঞানগর্ভ আলোচনার জন্য হাততালি পেলেন এবং নিম্নবর্গীয় মানুষদের কাছে ভালো সাজলেন, সে-সব বিদগ্ধ বক্তাগণ কি আর শোভাবর্ধনকারীদের সাথে যোগাযোগ রাখবেন?  নির্মম সত্য হচ্ছে, যাঁরা সেদিন মহান-মহান বাণী দিলেন, তাদের সাথে আগত নিম্নবর্গীয়দের কোন যোগাযোগ থাকবে না।  

আরও কিছু প্রশ্ন উদয় হয়।  যেমন সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস উদযাপনের যারা মূল উপজীব্য, সেই সাঁওতালরা অনুষ্ঠানের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে ছিল কি?  দিবসটি উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে দেখা গেছে অধিপতি জাতির কয়েকটি মুখ।  যাঁরা নিজেদেরকে আয়োজক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছিলেন।  সাঁওতালদের  যে-দুজন  প্রতিনিধি ছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন আবার আয়োজক সংস্থাটিতে চাকুরী করেন

আরো একটি প্রশ্ন জাগে, লক্ষ-লক্ষ টাকার আর্থিক অনুদান পাওয়া না গেলে অধিপতি জাতির সাঁওতাল-দরদীরা দিবসটি পালনে আগ্রহী হতেন কি? সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস পালন অনেক বিষয় আমাদের সামনে পরিষ্কার করে।  তা হচ্ছে, দিবসটি নিয়ে লাখো-লাখো টাকার লেনদেন হয়।  সাঁওতালদেরকে পণ্য হিসেবে বিকিকিনি করে একটি বিশেষ গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ হাসিল করলো নিম্নবর্গীয় প্রতিরোধ সংগ্রামকে কেনা-বেচার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করার একটি মুনাফাখোর চক্রের পরিচয় সুস্পষ্ট হলো।  এঁরা আবার একটি সিন্ডিকেটও তৈরী করেছে।  কথিত আর্থিক সাহায্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে এ-দরদীগোষ্ঠীটির একটা দুষ্ট চক্র তৈরী হয়েছেএসব প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট কিছু চেনামুখ ছাড়া অন্য কারোর ক্ষেত্রে অর্থ বিনিয়োগ করতে চায় না।  কারণটি অনুমান করা তেমন কঠিন নয় সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে এ-গোষ্ঠীটি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ পরিষ্কারভাবে রক্ষা করছে

ইদানীং আরেকটি বিষয় যোগ হয়েছে।  সেটা হচ্ছে, নিম্নবর্গীয় জাতিসমূহের মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে নিয়ে এসে সংবর্ধনা দান করা।  কথিত সংর্ধনার চিত্রগুলি খুব হাস্যকর।  এ-বছরের ৩ জুলাই  দিনাজপুরে এ-ধরণের  একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখেছি, নিম্নবর্গীয় জাতিসমূহের মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধরে নিয়ে এসে আয়োজকরা একটি নির্ধারিত ক্যাম্পে জড়ো করে রাখেন।  সংবর্ধনার দিন সেখান থেকে তাদেরকে অনুষ্ঠান স্থলে নিয়ে আসা হয়।  তার আগে তাদেরকে সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতা সিধু ও কানুর প্রতিকৃতি অঙ্কিত টি-শার্ট পরানো করা হয়।  উপহাসের বিষয়টি হচ্ছে, যাঁরা সংবর্ধিত হবেন, তাঁদেরকে অনুষ্ঠানস্থলে ভ্যান গাড়ীতে করে নিয়ে আসা হয়।  আর যারা তাঁদেরকে সংবর্ধনা দিবেন, তাঁরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাইক্রোতে করে ঘুরেন।  আয়োজকদের প্রস্তুতির সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছিলেন ঢাকা থেকে যাওয়া বিশেষ কিছু সম্মানিত ব্যক্তি।  নিম্নবর্গীয় জাতি সমূহের মুক্তিযোদ্ধারা সে-অনুষ্ঠানের পণ্য কিংবা শোভাবর্ধনকারী

ঢাকার অতিথিদেরকে বরণ করা হলো নৃত্যের মাধ্যমে ফুল ছিটিয়ে।  কিন্তু মুক্তিযোদ্বারা যখন প্রবেশ করছেন তখন বরণের কোন অনুষ্ঠান নেই।  মূল অনুষ্ঠানের সময় দেখা গেলো আলোচকরা মঞ্চে আর যাদেরকে সংবর্ধনা দেয়া হবে, তারা দর্শকের সারিতে।  সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজনকারীরাও কয়েকটি এনজিওর একটি সমন্বিত মঞ্চ।  মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে নিয়ে এসে তাদেরকে সঙ সাজিয়ে আর যাই হোক সংবর্ধনা হয় না।  সম্মাননা তখন অবমাননা হয়ে যায়।  অভাব-বঞ্চনা যাঁদের নিত্য সঙ্গী, তাঁদের জন্য রজনীগন্ধা ও আর্থিক মূল্যহীন ক্রেস্ট দুটোই সমভাবে অপ্রয়োজনীয়

এ-দুটি ঘটনার বাইরেও অনেক ঘটনা অহরহ ঘটছে।  সে-সব কাহিনী বয়ান করলে চলতি রচনাটি শেষ করা কঠিন হয়ে যাবে।  মোটা দাগে বলা যায়, একটি স্বার্থান্বেষী নিম্নবর্গ-দরদীগোষ্ঠী অধিপতি জাতির মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে।  পোশাকী এ-দরদী মহলটি নিম্নবর্গীয় জাতিসমূহের প্রতিনিধি সেজে নিম্নবর্গীয়দের প্রতিরোধ সংগ্রামকে ছিনতাই করতে চায়।  সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কর্মসূচিকে জায়েজ করানোর জন্য কথিত দরদীগোষ্ঠীটি সক্রিয়।  সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির  লগ্নিকৃত প্রতিষ্ঠানসমূহের আর্থিক প্রলোভনের ফাঁদে জড়িয়ে নিম্নবর্গের সংগঠিত হওয়াকে এ-দরদী মহলটি বিপথে পরিচালিত করতে সুগভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।  এ- পোশাকী দরদীগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে হবে।  তাঁদের প্রদর্শিত আত্ম-হননের পথ থেকে দূরে থাকতে হবে।  রাজনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করা প্রতিটি নিম্নবর্গীয় জাতির জন্য অপরিহার্য।  কর্পোরেট পুঁজির প্রতিনিধিরা প্রতিরোধ সংগ্রামকে গবেষণা, সেমিনার ও আলোচনা অনুষ্ঠানে বন্দী করে রাখার সকল প্রচেষটা চালু রেখেছে

নিম্নবর্গীয়দের নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির আগ্রাসনকে মানবিক লেবাস দিতে নানান সব প্রতিষ্ঠান দাতা সংস্থা নাম ধারণ করে তৎপরতা চালাচ্ছে।  তাদের ভাব দেখে মনে হয়, তারা দারুন দানবীর।  শোষণ কিংবা আগ্রাসন নয়, দান করাই তাদের প্রধান ব্রত।  তাদের এ-দানকে দু'হাত পেতে গ্রহণ করছে দেশীয় কিছু অনুচর।  কর্পোরেট পুঁজির এ-সব দেশীয় অনুচররাই নিম্নবর্গের জন্য ভালবাসা ফেরী করে বেড়াচ্ছে।  

অধিপতি জাতির মধ্যে গজিয়ে উঠা নিম্নবর্গীয় দরদী মহলটি নিম্নবর্গের চেয়ে পুঁজিকে অধিক ভালবাসে।  পুঁজির প্রবাহের জোয়ারে এ-মহলটি নিম্নবর্গের কাছে ভেসে আছে।  তারা শুধু নিজেরা ভাসে না, অন্যকেও ভাসিয়ে নিয়ে যায়।  পুঁজির বাজারী আয়োজনে তারা নিজেরাই পণ্য হয়ে যায়, অন্যকেও পণ্যে পরিণত করে।  আলোচনায়, সেমিনারে কিংবা লেখনীতে অধিপতি জাতির পোশাকী নিম্নবর্গ-দরদীরা যতোই উচ্চস্বরে আওয়াজ তুলুন না কেনো,তাঁদের সে-কন্ঠস্বর নিজের নয়।  হালনাগাদ আবির্ভাব হওয়া অধিপতি জাতির নিম্নবর্গ-দরদীদের এ-আওয়াজ সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিরই কন্ঠস্বর।

দীপায়ন খীসা, সমপাদক মাওরুম

গাস্ট ২০০৭

 
 
   

অন্যান্য কলাম 8

© 2007 Confidence Services Ltd.