London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

'ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প' ইনকিলাবের অপপ্রচার প্রসঙ্গে

আনু মুহাম্মদ

গত ১৭ মে ২০০৭ দৈনিক ইনকিলাব 'জাপানে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণায় কয়েক এনজিও' শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।  প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য হলো, এ-মাসের শুরুতে কিয়োটোতে অনুষ্ঠিত এডিবি সম্মেলনে বাংলাদেশের কতিপয় ব্যক্তি ও এনজিও বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের বিরোধিতা করে বাংলাদেশের স্বার্থ-বিরোধী প্রচারণা চালিয়েছে।  এর কয়েকদিন আগে মানবজমিন পত্রিকাতেও একই সুরে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিলো

যে 'উন্নয়ন' প্রকল্পের বিরোধিতা নিয়ে পত্রিকা দুটির ক্ষোভ এবং উদ্বেগ, সেটি হলো বাংলাদেশের মানুষের কাছে খুবই পরিচিত 'ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প'।  কিয়োটোর সম্মেলনে এ-প্রকল্প বিষয়ে বাংলাদেশের কোন এনজিও প্রতিনিধি বক্তব্য রাখেননি।  বরঞ্চ বাংলাদেশের কিছু সুবিধাভোগী এনজিও, তার মাধ্যমে কিছু সংখ্যক কনসালট্যান্ট আর সাংবাদিক ফুলবাড়ী প্রকল্পের সুবিধা পাবার আশায় দেশে-বিদেশে এখনও তৎপর আছে এডিবি সম্মেলনের ভেতরে ও বাইরে এ-প্রকল্পের বিরুদ্ধে আমি বক্তব্য রেখেছি, বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে, সমাজ-অর্থনীতি চর্চা শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি হিসেবে এবং রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে গঠিত 'তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা কমিটি'র একজন কর্মী হিসেবে

ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প নিয়ে আমাদের বক্তব্য, ইনকিলাবের ভাষায় 'বাংলাদেশের স্বার্থ-বিরোধী তৎপরতা'।  এহেন প্রচারণা মোটেই নতুন কিছু নয় এবং তা বাংলাদেশের মানুষের কাছে অপরিচিতও নয়।  কিয়োটোতে দেয়া আমার বক্তব্য ইতোমধ্যে গত ১৫ মে ঢাকার নিউএইজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, এছাড়া সেটি কাউন্টার কারেন্ট-সহ নানা আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটেও আছে।  যে-কেউ আগ্রহী হলে তা পড়ে নিতে পারবেন।  উস্কানি দেয়ার জন্য কিছু মিথ্যা তথ্যও দেয়া হয়েছে ইনকিলাবে।  যেমন এডিবি সম্মেলনে গিয়ে বাংলাদেশের সরকার সম্পর্কে কোন কথা আমি বলিনি; এ-সম্পর্কে যা বলার, তা আমি দেশেই বলছি।  সেখানে গিয়ে শুধু এটুকু বলেছি যে, 'এশিয়া এনার্জীর পক্ষে এডিবির ঢাকা অফিসের তৎপরতা থেকে মনে হচ্ছে, তারা বাংলাদেশের জরুরী অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করতে চায়'।

ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প নিয়ে আমার বক্তব্য কিয়োটোতে গিয়ে উপস্থাপনের দরকার হলো কেনো?  দরকার হলো এ-জন্য যে, এ-প্রকল্প একটি বিশ্বজোটের প্রকল্প।  দুর্বৃত্ত বিশ্বজোট যখন দেশে-দেশে জনগণের জীবন ও সম্পদ লুন্ঠন ও বিপর্যস্ত করছে মুনাফা আর আধিপত্য নিশ্চিত করতে হিংস্র হয়ে উঠেছে, তখন জনগণের বিশ্বজোটও গড়ে উঠছে এগুলোর বিরুদ্ধে দুনিয়া জুড়ে আওয়াজ সৃষ্টির জন্য।  ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প যেমনি বিপুল মুনাফার লোভে এশিয়া এনার্জী-সহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মুনাফাখোরদের উন্মাদ করে তুলেছে, তেমনি বিশ্বব্যাপী পরিবেশবাদী, মানবাধিকার কর্মী এবং নতুন দুনিয়ার লড়াইয়ে নিয়োজিত ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোকেও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।  আমি এডিবি সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত এসব সংগঠন ও ব্যক্তিদের সঙ্গেই নিজেকে উপস্থিত করেছি

যুক্তরাষ্ট্র যখন তার নদী ও লেইকের সর্বনাশ হবে বলে শো-শো কিলোমিটার দূরে কানাডার পাহাড়ী অঞ্চলে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের পথে বাঁধা সৃষ্টি করেছে, ঠিক একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত বিশ্বব্যাংক, এডিবির মতো প্রতিষ্ঠানসমূহ বাংলাদেশের একটি ঘনবসতিপূর্ণ, নদীনালা খালবিলে ভরপুর, স্বাদু পানির নরম উর্বরা ভূমিতে  উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের জন্য চাপ তৈরী করছে।  আর এভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যে-কয়লা উত্তোলন করা হবে তাও বাংলাদেশের মানুষের কাজে লাগবে না।  তার শতকরা ৭৫ ভাগ রফতানির নামে পাচার হবে অন্যদেশে।  যার অর্জিত অর্থ যাবে কোম্পানীর হাতে; কেনো-না, পুরো কয়লা খনি তুলে দেয়া হবে এশিয়া এনার্জি নামক এক অখ্যাত-অনভিজ্ঞ এক বছর বয়সী কোম্পানীর হাতে।  এটা লক্ষণীয় ব্যাপার যে, ইনকিলাবের (এবং মানবজমিনের)  প্রতিবেদনগুলো আগাগোড়া ধ্বংসাত্মক ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের পক্ষে দাঁড় করানো হলেও পুরো প্রতিবেদনের কোথাও এই কোম্পানীর নামটি নেই।  কিন্তু কোথাও-কোথাও, অনুপস্থিতি দ্বারাই উপস্থিতি বেশি ধরা পড়ে

বিশ্বজুড়ে দুর্বৃত্ত লুটেরা সংস্থাগুলোর সামান্য কিছু বরাদ্দ থাকে কিছু এনজিও আর কনসালট্যান্ট তৈরী করে দালাল নেটওয়ার্ক তৈরী করার জন্য বরাদ্দখোর ব্যক্তিরা নিজের লোভ আর কিছু সুবিধার বিনিময়ে নিজের বিবেক, দেশ আর জাতির স্বার্থ বিকিয়ে দেয়।  ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের মতো একটি ভয়াবহ প্রকল্পকে 'উন্নয়ন প্রকল্প' হিসেবে অভিহিত করা এদের পক্ষেই সম্ভব।                

এ-প্রকল্প নিয়ে আলোচনার জন্য, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য এডিবি সম্মেলন ছিলো একটি উপযুক্ত উপলক্ষ।  কারণ, এশিয়া এনার্জির সঙ্গে এডিবি এখন নানাভাবে যুক্ত।  এডিবির কাগজপত্রে একটি প্রকল্পে সহায়তা দেবার জন্য নানা শর্ত দেয়া আছে; যেমন, পরিবেশ রক্ষা, জনসম্মতি, বসত-ভিটা রক্ষা, স্বচ্ছতা, আইনী ভিত্তি ইত্যাদি, যার কোন কিছুই ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প রক্ষা করে না।  আসলে বিশ্বব্যাংক আইএমএফ বা এডিবি যেহেতু বিশ্ব পুঁজিরই প্রতিনিধি, সেহেতু তাদের কাগজপত্রে নানা বাগাড়ম্বর থাকলেও এগুলো শেষমেষ এই পুঁজির পক্ষেই দাঁড়ায়।  তারা মুনাফামুখী নানা তৎপরতা দাঁড় করায় 'উন্নয়ন প্রকল্প' বা 'দারিদ্র বিমোচন' এর নামে বাংলাদেশে এডিবি পানি, বন, বিদ্যুৎ এবং জ্বালানী ক্ষেত্রে যেসব অর্থ সংস্থান করেছে তা দেশী-বিদেশী অনেক গোষ্ঠীকে ধনী বানিয়েছে।  কিন্তু এডিবির  অর্থ সংস্থান বাংলাদেশের  পানি দূষিত করেছে, বন উজাড় করেছে আর দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানীর হাতে তুলে দেবার আয়োজন করেছে।  বিদ্যুৎ খাতে সঙ্কট ও নির্ভরশীলতা জটিল আকার নিয়েছে এসব প্রকল্পের কারণেই

এডিবি-সমর্থিত সর্বশেষ প্রকল্প হল 'ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প', যা বাস্তবায়িত হলে শুধু ফুলবাড়ী-সহ ছয়টি থানা নয়, পানি বিষাক্ত ও মরুকরণের মধ্য দিয়ে গোটা উত্তরবঙ্গে এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে।  কয়েক কোটি মানুষ শুধু বর্তমান প্রজন্মে নয়, অনির্দিষ্টকাল ধরে ক্ষত-বিক্ষত হবেন।  কোথায় কীভাবে তাঁরা টিকে থাকবেন, আদৌ টিকে থাকতে পারবেন কি-না তা বলার কোন উপায় নেই।  আর সরাসরি উচ্ছেদ হবেন লক্ষাধিক মানুষ।  বাংলাদেশ পাবে কেবল ৬ শতাংশ রয়্যালটী।  যার শতকরা ১০০ ভাগ মালিক বাংলাদেশের মানুষ, তা কেনো তারা ৬ শতাংশ রয়্যালটীর বিনিময়ে নিয়ে তুলে দেবেন লুটপাট আর মুনাফার জন্য।  উপরন্তু কয়লা রফতানি করতে গিয়ে ফুলবাড়ী থেকে মংলা পর্যন্ত দীর্ঘপথ কয়লা পরিবহন জনিত কারণে  ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সুন্দরবন-সহ খুলনার বিভিন্ন অঞ্চলও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।  যে-প্রকল্প জাতীয় স্বার্থ বিনষ্ট করে, জনগণের জীবন বিপন্ন করে, পুরো দেশের  প্রতিবেশগত ভারসাম্য নিদারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাকে বিরোধিতাই তো একজন মানুষের কর্তব্য দেশের উন্নয়ন, কয়লা সম্পদকে দেশ ও মানুষের কাজে সর্বোচ্চ মাত্রায় ব্যবহার করার জন্য ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের বিরোধিতা ছাড়া আর কী পথ থাকতে পারে?

এডিবি প্রেসিডেন্টকে আমি 'আনসিভিলাইজড' বলেছি এটাকে একটা অভিযোগ আকারে উপস্থিত করা হয়েছে ইনকিলাব প্রতিবেদনে।  তাদের জন্য এটা কী ভয়ংকর কথা!  যা ঘটেছিলো, তা হলোঃ বিভিন্ন দেশের প্রতিবাদী প্রতিনিধি, গবেষকদের মুখোমুখি হয়ে সমালোচনার উত্তরে প্রেসিডেন্ট কুরোদা বলেছিলেন, তিনি পোস্টার, লিফলেট ব্যানার এগুলো অনুমোদন করতে পারেন না, কারণ 'প্রটেস্ট শুড বি সিভিলাইজড'।  এরপর আমি আমার বক্তব্যে বাংলাদেশে এডিবির প্রকল্পগুলো কীভাবে মানুষ ও প্রকৃতির সর্বনাশ করছে; কীভাবে দারিদ্র বাড়াচ্ছে তার তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বলেছিলাম, 'যেখানে বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন পরিবেশ, আইন, জনস্বার্থ, স্বচ্ছতা কোনদিকে থেকেই ফুলবাড়ী প্রকল্প গ্রহণযোগ্য নয়; যেখানে মানুষ জীবন দিয়ে তাদের অসম্মতি জানিয়েছেন, সেখানে এডিবি কেন এ-প্রকল্পে অর্থ সংস্থানের জন্য তোড়জোড় করছে? কেনো এডিবির ঢাকা অফিস এশিয়া এনার্জীর লবীস্ট হিসেবে কাজ করছে, আর এ-সূত্রেই আমি আমার কথা শেষ করেছিলাম এই বলে যে, 'এডিবি শুড বিহেভ ইন এ সিভিলাইজড ওয়ে'।

যখন নানা এনজিও, কনসালট্যান্ট আর আন্তর্জাতিক সংস্থা এ-ধ্বংসাত্মক প্রকল্পকে উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে, তখন বিশ্বের বিভিন্ন পরিবেশবাদী, মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশের মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।  জাপানের একটি পরিবেশবাদী সংগঠন প্রশ্ন তুলেছে, জাপানের জনগণের টাকা নিয়ে এডিবি কীকরে এরকম ধ্বংসাত্মক প্রকল্পে অর্থ দিচ্ছে?  আমি সেখানে গিয়ে জাপানের বিশেষজ্ঞ, সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠনের কাছে এ-বিষয়টিই পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছি।  আমি জানি, এডিবির কাছে লবীং করে এসব প্রকল্প ঠেকানো যায় নাআমি সেখানে লবীং করতেও যাইনি।  আমি গেছি সে-সব দেশের জনগণের শক্তির কাছে, কারণ আমি এও জানি বিশ্বে সর্বত্র জনগণের শক্তি ভিন্ন।  দুষ্ট বিশ্বজোট যখন জনগণের বিরুদ্ধে পুঁজির দাপট তৈরী করছে, তখন জনগণের বিশ্বজোট ক্ষমতা, উন্নয়ন আর প্রগতির নতুন ভাষা তৈরী করছে।  শুধু বাংলাদেশের জনগণ নয়, জনগণের বিশ্বজোট ক্রমেই ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে।  ফুলবাড়ী অঞ্চলের মানুষ রক্ত দিয়ে যে প্রকল্প ঠেকিয়েছেন, সে-প্রকল্প নিয়ে এডিবি-সহ বিশ্বের নানা লুটেরা সংস্থা এখনও সক্রিয়।  এসব অপচেষ্টার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী  প্রতিবাদী মানুষেরাও দাঁড়িয়েছেন, সে-রক্তের প্রতি আর সত্যের প্রতি তাদের দায়বোধ থেকেই

এ-রক্তের প্রতি, আর বাংলাদেশের মাটি পানি ও জনগণের প্রতি, যারা নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থে সাংবাদিকতা বা কনসাল্ট্যান্সীর নামে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন, তাদের জন্য জনগণ কেবল ঘৃণা আর ধিক্কারই জানাতে পারেন

২০ মে ২০০৭     

আনু মুহাম্মদঃ অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 
 
   

অন্যান্য কলাম 8

© 2007 Confidence Services Ltd.