|
অথঃ মওদুদ সমাচার
চিররঞ্জন সরকার
দেশের রাজনীতিতে বহু অঘটনের নায়ক, দলবদলের মাস্টার, সাবেক আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক
মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ অবশেষে গ্রেফতার
হয়েছেন।
মওদুদ
আহমদকে গ্রেফতার করেছে যৌথ বাহিনী।
১১
ঘণ্টা বাসা ঘিরে রাখার পর যৌথ বাহিনী গত ১৩ এপ্রিল সকালে তাকে বাসা থেকে গ্রেফতার
করে।
তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, কর ফাঁকি ও দলীয়করণসহ বহু অভিযোগ রয়েছে।
যৌথ বাহিনী রাতভর মওদুদের বাসায় অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করেছে ২২০ পিস ত্রাণের শাড়ি,
১৬ বোতল বিদেশী মদ ও ৩২ ক্যান বিয়ার।
এছাড়াও
বেশকিছু কাগজপত্র ও ডকুমেন্ট জব্দ করেছে।
মদ
উদ্ধারের ঘটনায় গুলশান থানার এসআই খবিরউদ্দিন বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য আইনের ২৫(খ)
ধারায় মামলা করেছেন।
দলবদলের ঝানু খেলোয়াড়
স্বাধীনতার
আগে ঢাকা কলেজের ছাত্র থাকাকালে শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের নেতৃত্বাধীন কলেজ ছাত্র
সংসদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন মওদুদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থ্থায় এডভোকেট ফরমান উল্লাহ খান প্রতিষ্ঠিত খেলাফত
রব্বানীর ছাত্র সংগঠন ছাত্রশক্তির বিশ্ববিদ্যালয়
শাখার নেতা ছিলেন তিনি।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে লন্ডনে অবস্থানরত ব্যারিস্টার মওদুদকে পৌস্টমাস্টার
জেনারেল নিয়োগ করে মুজিবনগর সরকার।
মুক্তিযুদ্ধ
সংক্রান্ত ডাকটিকিট প্রকাশ ও শুভেচ্ছামূল্য বাবদ অর্থ সংগ্রহের দায়িত্ব্ব নেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের
ডাকটিকিট বিক্রি থেকে সংগ্রহ করা অর্থের মোটা অঙ্ক আত্মসাৎ করার অভিযোগ ছিল তার
বিরুদ্ধে।
১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের সময় ব্যারিস্টার মওদুদের বিরুদ্ধে
বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার চর অভিযোগ এনে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
পল্লীকবি
জসীম উদ্দীনের একান্ত আবেদনে বঙ্গবন্ধু তাকে মুক্তি দিয়েছিলেন।
উল্লেখ্য,
মওদুদ পল্লীকবির জামাতা।
তবে
মওদুদের কাছ থেকে এই মর্মে লিখিত অঙ্গীকারনামা নেওয়া হয় যে, তিনি জীবনে কোনোদিন
রাজনীতি করবেন না।
কিন্তু
সে অঙ্গীকারনামা 'মওদুদনামায়' পরিণত হয়।
পরবর্তী
জীবনে তিনি কখনো কোনো অঙ্গীকার পালনের ধার ধারেননি।
জিয়াউর
রহমান ক্ষমতায় আসার পর ব্যারিস্টার মওদুদকে তার মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে নিয়েছিলেন।
ইস্ট-ওয়েস্ট
ইন্টারকালেক্টর প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে পরে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে অব্যাহতি
দিয়েছিলেন।
মন্ত্রিসভা
থেকে বাদ পড়ার পর জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার শেষভাগে মওদুদ ছিলেন সে-সময়কার বিএনপির
বিদ্রোহী শিবিরে।
১৯৮২
সালে এরশাদের সামরিক শাসনামলে গুলশানের বাড়ি সংক্রান্ত মামলায় মওদুদের বাড়ি
বাজেয়াপ্ত হয়।
তিনি
১২ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন।
অবশ্য
এ-মামলার পরই ১৯৮৩ সালে এরশাদের সামরিক সরকারেরই মন্ত্রী হয়েছিলেন মওদুদ।
দলবদলে সিদ্ধহস্ত এ-নেতা এরশাদ সরকারের
উপ-প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও উপ-রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন
করেন।
এরশাদ
সরকারের পতনের আগ মুহূর্তেও এরশাদের পক্ষে সংবিধান এবং আইন দেখিয়ে আলোচিত হয়েছিলেন
মওদুদ।
পরবর্তী
সময়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ১৯৯১ সালে বিএনপির মন্ত্রিসভায়
যোগ দেন।
সর্বশেষ
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির টিকিটে এমপি হয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক
মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হন।
দেখা
যাচেছ যে মুজিব-জিয়া-এরশাদ-খালেদা সরকারের খেদমত করেছেন দলবদলের রাজনীতির ঝানু
খেলোয়াড় মওদুদ।
বিচার
বিভাগ তছনছ যার
কারণে
বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে বিচার বিভাগকে তছনছ করেছেন ব্যারিস্টার মওদুদ।
আইনের
মারপ্যাঁচে তিনি বিভিন্ন ভাবে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন।
বিচারকদের
বয়স বাড়িয়ে নিজের দলের লোককে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করতে তিনি একটি
আইন পাস করেন।
তার
বুদ্ধিতেই জোট সরকার বিচারপতি এম এ আজিজকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করে।
তিনিই
অযোগ্য লোকদের বিচারপতি নিয়োগ করেন মওদুদ।
তবে
জাল সনদধারী লোককে বিচারপতি নিয়োগ করে ন্যক্করতম ইতিহাসটি সৃষ্টি করেছেন মওদুদ।
তার
কারণেই বিচার বিভাগ স্বাধীন হয়নি বলে দেশের মানুষ মনে করছেন।
আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন বিপুল পরিমাণ অর্থের সন্ধান
মওদুদ আহমদ গ্রেফতারের পর তার দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে।
স্ত্রীর
নামে বিদেশে ফ্ল্যাট কেনা, এমনকি ভুয়া ব্যক্তির নামে বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যাঙ্কে
এফডিআর করেছেন বলেও তথ্য বেরিয়েছে।
এছাড়া
বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকেও তার হিসাবের সন্ধান পাওয়া গেছে।
আইন-শৃঙ্খলা
বাহিনীর সদস্যরা এরই মধ্যে অনুসন্ধানে জানতে পেরেছেন যে দেশের ভেতরে নামে-বেনামে
বিভিন্ন ব্যাঙ্কে বিপুল পরিমান অর্থ গচ্ছিত রেখেছেন মওদুদ।
এ-পর্যন্ত
সন্ধান পাওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা।
এই
টাকা তিনি স্থানীয় কয়েকটি বেসরকারী ও বিদেশী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় গচ্ছিত রেখেছেন।
এছাড়া
ভুয়া ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে তিনি ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর করে
রেখেছেন।
আইন-শৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনী ভূয়া ব্যক্তিদের নাম, ঠিকানা এবং নমুনা স্বাক্ষর সংবলিত কাগজপত্র
উদ্ধার করেছে।
এ ছাড়া ওয়াশিংটন-লন্ডনে অন্তত ৪টি ব্যাংকে মওদুদের হিসাবের সন্ধান পাওয়া গেছে।
এসব
ব্যাংকে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাওয়া বিপুল অর্থের সন্ধান পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা
হচ্ছে।
আইন মন্ত্রণালয়ে কোনো আইনের শাসন ছিলো না
বিএনপি-জামাত জোট সরকারের ৫ বছরের শাসনামলে আইন মন্ত্রণালয়ে কোনো আইনের শাসন ছিলো
না।
ছিলো
ঘুষ দুর্নীতি আর লুটপাটের শাসন।
জোট
সরকারের আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার শাহজাহান
ওমর, সচিব আলাউদ্দিন সরদার এবং ইনসপেক্টর জেনারেল অব রেজিস্ট্রেশন (আইজিআর) মিজানুর
রহমান ৫ বছরে কতো টাকা কামাই করেছেন, তার হিসাব এখন মন্ত্রণালয়ের
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মুখে মুখে।
মন্ত্রী থাকা অবস্থায় মওদুদ আহমদ নিপাট সৎলোক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতেন।
বলতেন,
মন্ত্রিত্ব করে যে-বেতন-ভাতাদি পান তা দিয়ে সংসারই চলে না।
কিন্তু
মন্ত্রিত্ব শেষে ৫ মাস পর কর গোয়েন্দারা মওদুদ আহমদের ব্যাংক একাউন্ট তল্লাশি করে
হিসাব বহির্ভূত ১২ কোটি টাকা পেয়েছেন।
এ-বিপুল
অর্থ ব্যাংক একাউন্টে রাখলেও তিনি আয়কর ফাঁকি দিয়ে আসছিলেন।
মওদুদ
আহমদের দুর্নীতির ব্যাপারে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বের হয়ে আসছে।
জানা
গেছে যে,
বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে
সাব-রেজিস্ট্রার নিয়োগ ও বদলি, বিভিন্ন আদালতে বিচারক নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন, কাজী
নিয়োগ-সহ বিভিন্নভাবে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে প্রতি মাসে
বিপুল
টাকা আয় করতেন মওদুদ।
সবকিছু
ম্যানেজ করে মুখে মিটি মিটি দুষ্ট হাসি আর আইনের কথা বলে যাবতীয় বেআইনী অপতৎপরতা
চালিয়েছেন ব্যারিস্টার মওদুদ।
শেষপর্যন্ত কী হবে
জীবনভর যিনি মানুষকে হাইকোর্ট দেখিয়েছেন, হাসতে-হাসতে কঠিন সব সর্বনাশা সিদ্ধান্ত
নিয়েছেন, সেই মওদুদ সাহেবকে ধরা খেতে হলো মদ রাখা আর ত্রাণের শাড়ি রাখার মতো তুচ্ছ
অভিযোগে! মদ রাখার জন্য তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ পর্যন্ত করা হয়েছে।
অথচ
এই মওদুদ সাহেব জীবনে কতো না মানুষকে কী সব বিচিত্র কায়দায় ঘোল খাইয়েছেন।
সর্বশেষ
এক অর্বাচিনকে দিয়ে মামলা করিয়ে সুকৌশলে আদালতের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী
প্রার্থীদের ৮টি তথ্য জানানোর বাধ্যবাধকতা ওপর স্থগিতাদেশ জারি করিয়েছেন।
সেই
মওদুদ আহমদ এখন জেলে আছেন! তার মিটি মিটি হাসি আর 'আইনমাখানো' নরম-নরম কথা আর শোনা
যাচ্ছে না।
বিধাতা
কী এতোটাই নাচার!
মওদুদ সাহেবের জীবনে অবশ্য দুর্নীতির অভিযোগে জেলে যাওয়া, জেল খাটা নতুন নয়।
এর
আগে তিনি একাধিকবার জেলে গিয়েছেন।
কিছুদিন
জেলে কাটিয়ে তিনি ঠিকই বীরবিক্রমে বেরিয়ে এসেছেন এবং মন্ত্রী হয়েছেন।
আমাদের
এই 'সব সম্ভবের দেশে' তিনি যদি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আবার মন্ত্রী হন, তাহলেও অবাক
হওয়ার কিছু থাকবে না।
আমরা
মওদুদ আহমদকে সালাম জানাই, তার বিরল প্রতিভার জন্য।
এতো
ভদ্রভাবে এতো বেশি মিথ্যাচার, এতো বেশি অনাচার, ভ্রষ্টাচার, এতো বিচিত্র আদর্শের
দলের নেতা হওয়ার, এতোবার মন্ত্রী থাকার কৃতিত্ব পৃথিবীতে অন্য কেউ কখনো দেখাতে
পেরেছিলেন বলে আমাদের জানা নেই।
সালাম
জানাই তাদেরও, যারা সব কিছু জেনেশুনে এই মওদুদ আহমদদেরই বার বার দলে টানেন, নেতা
এবং মন্ত্রী বানান।
সালাম
জানাই তাদের, যারা এই মওদুদদেরই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে সংসদে পাঠান।
ধন্য
আমার দেশ, ধন্য দেশের নেতা।
কবি
ঠিকই বলেছিলেন 'এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি!'
সত্যিই তাই!
চিররঞ্জন
সরকারঃ সাংবাদিক
আপলৌড
২৮
এপ্রিল,
২০০৭
|