স্থগিত
রাজনীতি এবং অতঃপর
এমএম আকাশ
বাংলাদেশে
এখন 'রাজনীতিকে' ক্রমশঃ কঠিন করে তোলা হচ্ছে।
অনেক
প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদ বলতে শুরু করেছেন যে, তিনি আর রাজনীতি করবেন না! খবরের কাগজ
থেকে আমরা জানতে পেরেছি, সাবেক মন্ত্রী, বর্তমান আইন উপদেষ্টার ভাই, পশ্চিমা ক্ষমতা
বলয়ের আশীর্বাদ ধন্য হিসাবে সুপরিচিত আনোয়ার হোসেন মঞ্জু টানা দু-দশকের বেশি সময়
রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পর গত ২২ মার্চ অবসর নেয়ার আনুষ্ঠানিক
ঘোষণা দেন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে।
খবরে
প্রকাশ,
স্বল্প
সময়ের মধ্যে আরো দু'জন রাজনীতিবিদ অবসরে যাওয়ার ঘোষণা দেবেন।
এদের
মধ্যে একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি, আরেকজন সাবেক পেশাজীবী মন্ত্রী।
স্বভাবতই
রাজনীতি
করাটা কারো জন্যই বাধ্যতামূলক নয়।
কেউ
একবার রাজনীতিতে যোগদান করলে, তাকে চিরকাল রাজনীতিতে থাকতে হবে একথাও ভাবার কোনো
যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।
রাজনীতিই দেশসেবার একমাত্র পথ এ-কথাও ঠিক নয়।
তবে
প্রশ্ন একটা থেকেই যায়, সেটা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কেন এখন রাজনীতি ছেড়ে
দিচ্ছেন? তিনি কি স্বেচ্ছায় নতুন কোনো মহত্তর কাজে যোগ দেবেন বলে স্থির করেছেন?
নাকি কোনো অনিবার্য অনুল্লেখ্য কারণে রাজনীতি ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন? প্রথম
ব্যাখ্যাটি সত্য হলে রাজনীতি পরিত্যাগের বিষয়টি নিয়ে আমরা মোটেও চিন্তিত হবো না।
কিন্তু
দ্বিতীয়টি সত্য হলে একটু চিন্তিত আমরা হবো এবং নিশ্চয়ই বিস্তৃত ব্যাখ্যা আমরা চাইবো।
এ-কথা
বিশেষ করে লিখছি এ-জন্য যে, শোনা যাচ্ছে আরো অনেক রাজনীতিবিদই না কি রাজনীতি থেকে
অবসর নিতে যাচ্ছেন! বাজারে এমন গুজবও আছে যে প্রাক্তন দুই প্রধানমন্ত্রীও নাকি
সহজে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রত্যাবর্তন করছেন না!
স্বভাবতই
এসব
গুজব ও গুজব-মিশ্রিত সত্যের একটি সুস্পষ্ট গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বর্তমানে যারা
রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকতে চান তাদের জন্য কাম্য।
অতীতে
সর্বপ্রথম 'রাজনীতিকে কঠিন' করে তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন সামরিক বাহিনী থেকে আগত
রাজনীতিবিদ জেনারেল জিয়াউর রহমান।
পাশাপাশি আবার উর্দি ছেড়ে দিয়ে নিজের একটি রাজনৈতিক দলও তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
রাষ্ট্রশক্তি
ব্যবহার করে মূলধারার রাজনীতিবিদদের জন্য তখন রাজনীতি বেশ কঠিন করে তোলা হয়েছিলো।
কিন্তু আবার বিভিন্ন দলের যেসব বিশেষ-বিশেষ রাজনীতিবিদ ভয়ে বা প্রলোভনে পড়ে
জেনারেলের দলে যোগ দিতে রাজি হয়েছিলেন, তাদেরকে কিন্তু নিজস্ব অভয়ারণ্যে স্থান দিতে
জেনারেল জিয়া কোনো কার্পণ্য করেননি।
ভীতি
ও প্রলোভনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল তৈরীর মডেলটি দেশে এভাবেই শুরু হয়েছিলো।
বর্তমান
পরিস্থিতি সম্পর্কে বলা যায় যে, স্খলিত রাজনীতিবিদদের জন্য দলমত নির্বিশেষে
স্বচ্ছতার
সঙ্গে আইন-সঙ্গতভাবে বিচার ও দণ্ড প্রদান করা হলে তার তাৎপর্য হবে শুভ।
কিন্তু
'রাজনীতিকেই' যদি ঠাণ্ডা ঘরে পাঠিয়ে দেয়ার বন্দোবস্ত হয় তাহলে সেটা হবে আরেক রকম
ব্যাপার।
ইচ্ছামতো
বাছাই করে কাউকে লঘু পাপে গুরু দণ্ড বা কাউকে গুরু পাপে লঘু দণ্ড অথবা কৌশলে
রাজনীতিকে আক্রমণ করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উপর থেকে একটি রাজনৈতিক দল তৈরির
পুরনো খেলা জনগণের কাছে আদৌ গ্রহণযোগ্য হবে না।
এ-সরকারকে তার জনপ্রিয়তা রক্ষা করতে হলে এসব প্রতিটি ব্যাপারেই
স্বচ্ছতার
সঙ্গে প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা-সহ জনসমক্ষে উপস্থিত হতে হবে।
সরকারকে জনগণের আশঙ্কাগুলোর অমূলকতা প্রমাণ করতে হবে।
নতুন
তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ফখরুদ্দিন সাহেব স্বয়ং এবং তার
একাধিক উপদেষ্টা দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে একাধিকবার 'জিহাদ' ঘোষণা করেছেন।
আমরা
এ-ধরণের ঘোষণা ও হুঁশিয়ারি অতীতে জিয়া-এরশাদ-হাসিনা-খালেদা আমলে বহুবার শুনেছি
কিন্তু কোনবারই আমরা সেসব ঘোষণার আন্তরিক বাস্তবায়ন প্রত্যক্ষ করতে পারিনি।
জেনারেল
জিয়ার মৃত্যুর পর ফতেহ্ লোহানী সাহেব আমাদেরকে বিটিভিতে ছেঁড়া গেঞ্জি ও ভাঙ্গা
সুটকেসের যে-নিদর্শন দেখিয়েছিলেন, তা এতোদিন পর তার 'স্বনামধন্য'
পুত্রের অবিশ্বাস্য দুর্নীতির কাহিনীর ভিড়ে হারিয়ে গেছে।
অবশ্য টাকা-পয়সার দুর্নীতির বদলে আমরা যদি রাজনৈতিক দুর্নীতির কথা বলি, তাহলে
জেনারেল জিয়াকেও ইতিহাস ক্ষমা করবে না! কারণ তিনিও দুর্নীতিবাজ, গডফাদার ও
রাজাকারদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন এবং তাদেরকে পুনর্বাসিত করে নতুন দল তৈরি করেছিলেন।
উপর
থেকে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে লোভ এবং ভীতি প্রয়োগের মাধ্যমে
অন্যান্য দলে ভাঙ্গন সৃষ্টি তিনিও করেছেন, ক্ষমতায় থেকে হ্যাঁ/না রেফারেন্ডাম
নির্বাচনের ব্যবস্থাও তিনি করেছেন ক্ষমতাকে জায়েজ করার জন্য।
এসব
কৌশল নিকট অতীতে একাধিকবার দেশবাসী স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছে।
এ-দফায় পুনর্বার এরকম কোনো কৌশল দেশবাসী গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়।
জিয়া
পরবর্তীতে এ-দেশে যে সরকার গুলো এসেছে তারা সকলেই লুটেরা পুঁজিবাদের ধারা অনুসরণ
করেছেন এবং সকলেই দুর্নীতিবাজ ও স্বাধীনতার শত্রুদের কম-বেশি প্রশ্রয় দিয়েছেন।
তবে
একথা নিশ্চয়ই সকলে
স্বীকার
করবেন যে সর্বশেষ খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের ব্যাপারটি সকল সীমা অতিক্রম করে
গিয়েছিল।
রিলিফের ঢেউটিন আত্মসাৎ থেকে শুরু করে প্রশাসনের চরম দলীয়করণ, ভূমিদস্যুপনা,
ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট গঠন, পারিবারিক ক্ষমতার দাপট, স্বজনদের অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে
ধনী হওয়া, বিদ্যুৎ কেলেঙ্কারী ইত্যাদি বহু উদাহরণ আমাদের জানা আছে।
ক্ষমতায় এসে দুর্নীতি-বিরোধী অভিযান চালু করেছে বর্তমান সরকার।
বিভিন্ন দলের বেশ বড়ো-বড়ো কয়েকটি রুই-কাতলাকে ধরাও হয়েছে।
তাদেরকে বর্তমানে এক বা একাধিক মাসের কারাদণ্ড দিয়ে বিভিন্ন কারাগারে বন্দী করে
রাখার ব্যবস্থা হয়েছে।
তবে
সংবাদে প্রকাশ সেখানে তারা বেশ রাজার হালেই আছেন।
টেনিস
ও বাস্কেটবল খেলছেন! যেসব রাঘব বোয়াল ধরা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট
চার্জশিট এনে দ্রুত ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে না কেনো - জনমনে স্বভাবতই
এ-প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
যাই হোক এখন
নিঃসন্দেহে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় ফিরে গিয়ে দেশে
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শাসন কায়েম করাই বর্তমান নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া
উচিত।
ক্ষমতা গ্রহণ করার পর বর্তমান সরকার প্রধান ফখরুদ্দীন আহমদ তার প্রথম নীতি
নির্ধারণী বক্তৃতায় নিজেও সে-কথাই ঘোষণা করেছিলেন।
এখনো
পর্যন্ত তিনি তাই বলছেন।
এমনকি জেলায়-জেলায় অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সুধী সমাবেশেও তিনি বলেছেন যে,
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুসংহত করা, আইনের শাসন কায়েম, গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন
অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত সরকার এবং সমাজ গঠনের জন্যই বর্তমান সরকার
নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
এজন্য তিনি সকলের সহযোগিতাও কামনা করেছেন।
বর্তমান
সরকার যদি সত্যই একটি গ্রহণযোগ্য অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে অগ্রসর হতে
চান তাহলে তাকে ন্যূনতম কয়েকটি কাজ খুব ভালোভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
তার
একটি ইতোমধ্যে তারা শুরু করেছেন এবং এখন পর্যন্ত মোটামুটি নিরপেক্ষভাবেই তা সম্পন্ন
করছেন বলে ধারণা করা হয়।
এটি
হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর অবৈধ কালোটাকা উপার্জনকারী ও সন্ত্রাসীদের দমন।
তবে
এক্ষেত্রেও মনে রাখা প্রয়োজন যে, উপরের দিকে রাঘব-বোয়ালদের ধরাটাই হবে আসল
গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
আর
তথাকথিত 'ভারসাম্য রক্ষা' বা 'ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বৃত্তি' বা 'পারিষদ দলের
বাড়াবাড়ির' কারণে যদি নির্দোষ ব্যক্তিরা এ-অভিযানে সাজা পান, বা লঘু পাপে যদি
গুরুদণ্ড প্রদান করা হ্ তাহলে বর্তমান সরকার শীঘ্রই জনপ্রিয়তা হারাবেন।
মনে রাখতে
হবে যে, এ-সরকার সীমিত সময়ের সরকার।
দুর্নীতির উৎস যে-মৌলিক আর্থ-সামাজিক লুটেরা ব্যবস্থা, তা এ-সরকারের সীমিত
সময়-সীমার মধ্যে উচ্ছেদ করা আদৌ সম্ভব নয়।
এ-কথাটি সবসময় মনে রাখলে সরকার ভালো করবেন।
এটি
তাদের কাজও নয়।
একটি
গণআন্দোলন-গণবিপ্লব ছাড়া এই মৌলিক সমস্যার সমাধান সম্ভবও নয়।
উপর
থেকে পদক্ষেপ নিয়ে আগাছার আগা কাটা যাবে, শেকড় উপড়ানো যাবে না।
আরেকটি ব্যাপার - বর্তমান সরকার যদি বিদেশি বিনিয়োগ, পুঁজি বাজারের বিরাষ্ট্রীকরণ,
টিফাসহ অন্যান্য বৈদেশিক চুক্তি অনুমোদন, মহাবন্দর ও ট্রানজিট প্রদানের মত মৌলিক
নীতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন, তাহলে তারা প্রবল বিতর্কে জড়িয়ে
পড়তে বাধ্য হবেন।
সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, এসব ব্যাপক বিষয়ে সিদ্ধান্তের ফলাফল যেহেতু সমগ্র জাতিকে
স্পর্শ করে যায়, সেহেতু এসব বিষয়ে জরুরি আইন বজায় রেখে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার
কোনো ন্যায়-সঙ্গত এখতিয়ার বর্তমান সরকারের নেই।
উন্মুক্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জাতির সকল দল ও মতের সম অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে
ব্যাপক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সর্বোচ্চ জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এসব গুরুত্বপূর্ণ
বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাঞ্ছনীয়।
এসব
বিষয় গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ছেড়ে দেয়াই সমীচীন হবে।
অতীতে
যেভাবে আমরা এসব জন-গুরুত্ব সম্পন্ন বিষয়ে সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠী স্বার্থে বা বিদেশী
চাপের কাছে নতি
স্বীকার
করে জাতীয়
স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছি - তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই উপরোক্ত পন্থায় আমাদের অগ্রসর
হওয়া উচিত।
তাই
এ-সরকারকে আবারো বলবো যে আপনাদের সীমানার পরিধিটি অবশ্য ই স্মরণে
রাখবেন।
লেখকঃ অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আপলৌডঃ ২৮ এপ্রিল ২০০৭
|