|
দক্ষিণ এশিয়ায় জল জমি ও জঙ্গলের লড়াই
আনু মুহাম্মদ
আমি যখন
দিল্লীর যন্তরমন্তরে মেধা পাটকারদের আয়োজিত সমাবেশে পৌঁছাই তখন কমলা ভাসিন শ্লোগান
ধরেছেন, 'দুনিয়াছে নাড়া - আজাদী', 'গরীব মাঙ্গে - আজাদী', 'জলকে লিয়ে - আজাদী',
'জঙ্গলকে লিয়ে - আজাদী', 'জমিনকে লিয়ে - আজাদী', 'কিষাণ মাঙ্গে - আজাদী', 'মজদুর
মাঙ্গে - আজাদী' ...। মেধা পাটকার তখন পাশের তাঁবুতে মিটিং করছেন, অরুণা রায়ও আছেন।
অনেকগুলো তাঁবু পর-পর।
কয়েক
হাজার নারী-পুরুষ কিষাণ-মজদুর এসেছেন ভারতের নানা প্রান্ত থেকে।
অনেকগুলো
সংগঠন মিলে গঠিত হয়েছে 'একশন ২০০৭' এর হিন্দী করা হয়েছে 'সংঘর্ষ ২০০৭'।
এখন
চলছে ধরনা।
জমি
জল আর জঙ্গল তথা নিজেদের জীবন ও জীবিকার উপর মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য।
এসব জায়গায়
অর্থনীতিবিদদের মতো এলিট ব্যক্তিদের পাওয়া কঠিন।
কেননা অর্থনীতিবিদরা এখন দুনিয়া জুড়ে বিশ্ব-ব্যাংক কিংবা বৃহৎ পুঁজির মতাদর্শিক আর
বৈষয়িক বাক্সে বসবাস করেন স্বাচ্ছন্দে।
জ্ঞান-শাখা হিসেবে অর্থশাস্ত্র এখন প্রতিক্রিয়ার দূর্গ।
বিশেষতঃ
নয়া-ক্লাসিক্যাল ধারার মতাদর্শিক আধিপত্য একে আরও গণ-বিরোধী রূপ দিয়েছে।
কিন্তু
দুর্গের মধ্যেও আছে ফাটল।
তাই
এ-সমাবেশে পেলাম একজন প্রবীণ অর্থনীতিবিদকেও। তাঁর নাম বাংলাদেশেও অনেকের
কাছে পরিচিত -
অমিত
ভাদুড়ী।
আর
কয়েক মাস পরে বিশ্ব-ব্যাংকের বিরুদ্ধে এক ট্রাইব্যুনাল বসতে যাচ্ছে এরকম
ব্যক্তিদের উদ্যোগেই।
যখন এ-ধারণা
চলছে তখনই 'উন্নয়ন', 'দারিদ্র বিমোচন' কিংবা 'সন্ত্রাস দমন' ইত্যাদি ক্ষেত্রে
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার কথাবার্তা নিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে
সার্ক শীর্ষ সম্মেলন।
যেসব
বহুল প্রচলিত কাঠি ব্যবহার করা হয় উন্নয়ন মাপার জন্য, তার কয়েকটিতে বেশ সন্তোষজনক
চেহারাই দেখা যায় অঞ্চলের।
বিশ্বের
গড় হার বিবেচনায় এ-অঞ্চলের দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির হার ভালো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিরাপদ, মুদ্রাস্ফীতি আয়ত্তের মধ্যে, বিশ্ব অর্থনীতির সাথে
যোগাযোগ ভালো, সবগুলো অর্থনীতিই আমদানি-রফতানি উদারীকরণে এগিয়ে, বিনিয়োগ হার
ভালো, ইত্যাদি, ইত্যাদি।
কিন্তু তারপরও পুরো দক্ষিণ এশিয়াতে এখন বিশ্বের চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শতকরা ৪০
ভাগের বাসস্থান, আর যদি দিনপ্রতি আয় ২ ডলার ধরা যায়, তাহলে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী
এ-অঞ্চলের শতকরা ৭৭ জন মানুষই দারিদ্র-সীমার নিচে বাস করে।
শ্রেণীগত, জাতিগত, লিঙ্গীয়, ধর্মীয়, বর্ণগত বৈষম্য নিপীড়নে ক্ষত-বিক্ষত শতকোটি
মানুষ।
প্রচলিত
মানব উন্নয়ন সূচকে শ্রীলংকা ৯৩, ভারত ১২৭, পাকিস্তান ১৩৫, নেপাল ১৩৬, বাংলাদেশ
১৩৯তম স্থানে অবস্থান করছে। এরপরও এ-দেশগুলোতে খুবই ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে বিপুল
ঐশ্বর্যের ছড়াছড়ি, নির্লজ্জ মাত্রার ভোগবিলাস।
চোরাই
অর্থনীতির দাপট।
ভারত
ও পাকিস্তানে শুধু যুদ্ধ উন্মাদনাতেই বিপুল সম্পদ ব্যয় হয়।
দুটো
দেশই এখন পারমাণবিক বোমা বানিয়ে গর্বিত এবং জনগণের মধ্যে এ-গর্ব উন্মাদনা ছড়ানোতে
তৎপর।
দারিদ্রের
পাশাপাশি ঐশ্বর্যের আর ধ্বংস উন্মাদনার এরকম অশ্লীল সহাবস্থান খুব কম অঞ্চলেই আছে।
এই
সহাবস্থান তৈরি হয়েছে যে উন্নয়ন ধারা দিয়ে সার্ক নেতারা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি।
বরং
সে-উন্নয়ন কৌশলকে অঞ্চলব্যাপী জোরদার করে, তার ভিত্তিতে দক্ষিণ এশীয় সংহতি গড়ে
তুলতে তারা তৎপর।
এরকম
উন্নয়ন কোন অঞ্চলে স্থিতি বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
শুধু
জনগণ যে-নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকে তাই নয়, অনিশ্চয়তা, পরস্পর বিবাদ আর
সর্বোপরি জনগণের প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের ভয়ে কম্পিত থাকে শাসক গোষ্ঠীও।
তাই
তাদের দরকার হয় একের পর এক 'নিরাপত্তা আইন' 'নিরাপত্তা ব্যবস্থা', আর দমনমূলক নানা
ব্যবস্থা।
তারপরও
নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
বিশ্বের
সবচাইতে বড়ো সন্ত্রাসী যুক্তরাষ্ট্র এখন দক্ষিণ এশিয়ার শাসকগোষ্ঠীর নিরাপত্তার জন্য
এক নতুন বটিকা হাজির করেছে, অসুখের বীজ আর ওষুধ দুটোই তাদের।
সে
হল 'জঙ্গী'।
এ-অজুহাতে মার্কিন ভারত নিরাপত্তা কর্মসূচি পারমাণবিক সহায়তা পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে।
ভারত
এখন মার্কিন নিরাপত্তা কৌশলের স্থানীয় তরফ।
আর
পাকিস্তান তো তাদের হাতের মুঠোতেই।
বাংলাদেশে
গত সরকার বহু গোপন-প্রকাশ্য চুক্তি করেছে।
এখন
যুক্তরাষ্ট্র তার সম্প্রসারণে অস্থির।
দক্ষিণ এশিয়ায় এখন মার্কিন বলয় পোক্ত করবার নানা আয়োজন তাই জোরদার।
দক্ষিণ এশিয়ায় উন্নয়নের এ-ধরণ নিয়ে প্রশ্ন এ-অঞ্চলের শতকোটি মানুষের শতচ্ছিন্ন আর
ক্ষতবিক্ষত জীবনের মধ্যেই।
শাসকগোষ্ঠীর
ঐক্য গড়ে তোলার পাশাপাশি জনগণের মধ্যেও তাই লড়াই আর নানা উদ্যোগ ক্রমেই দানা বাঁধছে।
বিশ্বব্যাংক,
আইএমএফ বা এডিবি আর দেশি বিদেশি বৃহৎ পুঁজির উন্নয়ন ঝলক এর পেছন থেকে সারি বেঁধে
এগিয়ে আসছেন মানুষ।
বাংলাদেশে
গত তিন দশক ধরে বিশ্বব্যাংক আইএমএফ আর এডিবির কর্তৃত্বে আর লুটেরা শাসকদের
ব্যবস্থাপনায় যেসব 'উন্নয়ন'
হয়েছে তা অনেক জৌলুস তৈরি করেছে।
আর
ভীড় বেড়েছে উন্মুল মানুষের, যাদের বারবার তাড়িয়েও ঢাকা শহর সুন্দর রাখা যায় না।
এসব
সংস্কার রফতানিমুখী খাতের বিকাশ ঘটিয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে বৃহৎ ও মৌলিক শিল্পভিত্তি
ও তার সম্ভাবনা ধ্বংস করেছে, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে তা তছনছ করেছে,
দেশকে আমদানিমুখী করেছে, উৎপাদনমুখিতা থেকে দোকানদারি অর্থনীতির প্রসার ঘটিয়েছে,
শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রকেও বাজারের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে।
চোরাই কোটিপতি তৈরি হয়েছে আর বেড়েছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা।
বাংলাদেশের
অর্থনীতির এই পরিবর্তনের ধরণে সবচাইতে লাভবান হয়েছে ভারতের বৃহৎ পুঁজি।
ভারতের
বৃহৎ পুঁজির ক্রমবর্ধমান আধিপত্য তাই বাংলাদেশের অর্র্থনৈতিক সংস্কার বা বিদ্যমান
উন্নয়ন ধারার অবধারিত ফলাফল।
বাংলাদেশের টাটার বিনিয়োগ প্রস্তাব, করিডোর প্রস্তাবের মতো বিষয়গুলো নিয়ে
সরকারসমূহের কাবু-তৎপরতা বাংলাদেশে ভারতের বৃহৎ পুঁজির ক্রম-বিস্তারমান পরিকল্পনা
নির্দেশ করছে।
এক্ষেত্রে
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবস্থা নাজুক ও অবনত।
এ-নাজুক ও অবনত অবস্থা সীমান্ত বিরোধ, পানিবন্টন, সন্ত্রাস, বাণিজ্য সংলাপ, দক্ষিণ
এশীয় অন্যান্য দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, জ্বালানী সহযোগিতা,
সাফটা-বিমসটেকসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রতিফলিত।
রাষ্ট্র
নির্দেশিত পুঁজিবাদ বিকাশে ভারত একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
এখানে
রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ভূমিকা বেসরকারী খাতে একচেটিয়া গোষ্ঠীর উদ্ভব ঠেকায়নি বরঞ্চ
তাকে সহায়তা করেছে।
পুঁজির
পুঞ্জিভবনের অনিবার্য প্রক্রিয়ায় ভারত রাষ্ট্রটি ক্রমে একচেটিয়া গোষ্ঠীগুলোর প্রধান
পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হয়।
এর
মধ্য দিয়ে ভারতে একটি শক্ত শিল্প-ভিত্তিও নির্মিত হয়।
কিন্তু
পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ বিকাশ ধরণ অনুযায়ী শিল্পখাত ও দক্ষ জনশক্তির বিস্তার হয়েছে
খুবই অসম এবং ভারসাম্যহীন - অঞ্চলগত এবং খাতওয়ারি দু'ভাবেই।
তাছাড়া
এর কেন্দ্রীভবন এমনভাবে ঘটে যার ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদে শিক্ষা-গবেষণার যা কিছু
অগ্রগতি হয় তার সুবিধা বৃহৎ পুঁজিপতি গোষ্ঠীই নিতে সক্ষম হয়।
তার
ফলে ভারতের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী যখন সর্বাধুনিক প্রযুক্তির উপর দখল এনেছে তখন
একই সঙ্গে দুর্বল প্রযুক্তি নির্ভর ক্ষুদ্রশিল্পে আটকে আছে বিশাল জনগোষ্ঠী।
ভারতে একদিকে কৃষিখাতে উচ্চ-প্রযুক্তির ব্যবহার হয়েছে এবং বাণিজ্যকরণ ঘটছে।
অন্যদিকে
অন্যদিকে খরা ও বন্যা-সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জেনেটিক প্রযুক্তির আগ্রাসনে
বিপর্যস্ত হয়েছন বিপুল সংখ্যক কৃষক
।
পানি আর বন,
জমি আর জন-জীবন সবই এখন মুনাফার সন্ধানে পুঁজির আগ্রাসনের মুখে।
বিশ্বব্যাংক
আইএমএফ এর 'সংস্কার কর্মসূচি'র সারকথাই হলো বিরাষ্ট্রীয়করণ, বিদেশী বিনিয়োগ সহজীকরণ
এবং বাণিজ্য উদারীকরণ।
এগুলোর সমর্থক ভারতের ভেতরের বৃহৎ শিল্প ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীও।
কেনো-না,
এর মধ্য দিয়ে অর্থনীতির উপর বৃহৎ বেসরকারি শিল্প ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আধিপত্যই
সমপ্রসারিত হয়।
তবে
আমদানি উদারীকরণ ক্ষেত্রে তাদের দিক থেকে প্রতিরোধও ছিল।
তার
ফলে আমদানি উদারীকরণে বাংলাদেশ যেভাবে নির্বিচার আমদানী বৃদ্ধির পথ নিয়েছে, ভারত
সেরকম উৎসাহ দেখায়নি।
বরঞ্চ বাংলাদেশের নির্বিচার আমদানির পথ ভারতের এসব শিল্প-গোষ্ঠীর জন্য সুবিধাজনক
হয়েছে।
বাংলাদেশে
রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠানসমূহ ভেঙে-চুরে বিলিয়ে দেয়া বা নষ্ট করা যেখানে সরকারের
বরাবরের নীতি সেখানে ভারতে ৯০ দশকে এসব সংস্কারের সময়ও রাষ্ট্রীয় খাত অনেক বেশি
গুরুত্বের সঙ্গে রক্ষা করা হয়।
এ-সময়ে ভারত সরকার ১১টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে নবরত্ন হিসেবে ঘোষণা করে সেগুলোর
নবায়ন ও স্বায়ত্ব-শাসন
দিয়ে
সমপ্রসারণের কর্মসূচি নেয়।
এ-গুলোকে নিজেদের বিনিয়োগ, যৌথ বিনিয়োগ ও অন্যদেশে সাবসিডিয়ারী প্রতিষ্ঠানের
মাধ্যমে বিনিয়োগ ইত্যাদি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্পূর্ণ অধিকার দেয়া হয়।
বাংলাদেশে নানা পশ্চিমা বিনিয়োগেও সহযোগী হিসেবে এখন এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর
নাম শোনা যায়।
ভারতে
নতুনভাবে বিন্যস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত খাত, বেসরকারী খাত, যৌথ বিনিয়োগ, একক বিদেশী,
বিনিয়োগ সবগুলো মিলিয়ে ভারতে দেশী, বৃহৎ পুঁজি, রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত পুঁজি ও
বহুজাতিক পুঁজির যে-মেলবন্ধন তৈরী হয়েছে তার সংবর্ধন, পুঞ্জীভবন এবং সম্প্রসারণের
অনেক বেশি চাপ।
চারপাশের
দুর্বল দেশগুলো অতএব তার সুবিধাজনক ক্ষেত্র।
এর
সাথে খুব সঙ্গতিপূর্ণভাবেই ভারতের সামরিক চিন্তা পুনর্বিন্যস্ত হচ্ছে যেখানে
যুক্তরাষ্ট্র যথারীতি হাজির।
বাংলাদেশে
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবির প্রস্তাবনা বা সুপারিশমালাতে স্পষ্টতই বিভিন্ন
বহুজাতিক সংস্থার প্রবেশাধিকার সহজ করবার ব্যবস্থাই থাকে।
এখন
এ-ক্ষেত্রে ভারত-কেন্দ্রিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতি তাদের পরিষ্কার ঝোঁক বোঝা যায়।
কারণ
এগুলো এখন আর নিছক ভারতীয় বিনিয়োগ নয়, বহুজাতিক বিনিয়োগের বিভিন্ন রূপ।
বিশ্বব্যাংক আর এডিবি টাটা প্রকল্পে আর এশিয়া এনার্জির ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্পে
অর্থ-সংস্থান করতে খুবই আগ্রহী।
এসব
প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং ইউরোপীয় কমিশন, মার্কিন-ব্রিটিশ
দূতাবাস এখনও তাই রীতিমতো চাপ দিয়ে যাচ্ছে।
এসব সংস্থার
মধ্যে ভারতের প্রভাব আমরা বাংলাদেশে প্রতিনিয়তই টের পাই।
কিন্তু
এর অর্থ এটা নয় যে ভারতের এ-প্রভাব সেখানকার জনগণের পক্ষে যায়।
এসব
সংস্থার নানা প্রকল্পের ভারে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণের জীবনও এখন বিপর্যস্ত।
কৃষি, বন, নদী, পানি, শিক্ষা, চিকিৎসা-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক, এডিবির
বিভিন্ন প্রকল্প জনগণের সম্পদ বেসরকারিকরণ ও বানিজ্যিকীকরণের আয়োজন করেছে।
এসব
প্রকল্প ভারতের মানুষকে ছাপিয়ে এখন প্রতিবেশি দেশগুলোর জন্যও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা বাঁধ সবসময়ই একটি মরণ ফাঁদ, আর এর সঙ্গে এখন প্রস্তুতি
চলছে টিপাইমুখ বাঁধ এবং আরও ভয়ঙ্কর নদী সংযোগ প্রকল্পের।
এসব
নানা প্রকল্পের সাথে বিশ্বব্যাংক-এডিবি গোষ্ঠী জড়িত।
বিশ্বব্যাংক
আইএমএফ বা এডিবির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাংলাদেশে একদিকে আর্থিক ভার তৈরী করেছে
অন্যদিকে সাধারণ সম্পত্তিকে মুনাফার ক্ষেত্র হিসেবে পুঁজির বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত
হয়েছে।
এর
ফলে এদের উন্নয়ন প্রকল্পে বনাঞ্চল উজাড় হয়েছে চিংড়ি বা রাবার বা অর্থকরী ফসল করবার
জন্য।
নদীনালা খালবিল মৃতদেহে পরিণত হয়েছে নানা সেচ প্রকল্পের কারণে।
এ-মুহূর্তে
ভবদহ এলাকায় ২০ লাখ মানুষ জলাবদ্ধতায় অবর্ণনীয় জীবন যাপন করছেন এডিবির প্রকল্পের
জন্য।
এ-উন্নয়ন কৌশল পানি, জমি, খাদ্য বিষাক্ত করেছে মুনাফা বাড়ানোর জন্য।
এদের
উন্নয়ন প্রকল্প ধ্বংস করেছে পাট ও স্টীলসহ নানা শিল্প।
শিক্ষা ও চিকিৎসাকে বাজারের পণ্যে পরিণত করেছে।
তেল-গ্যাস-কয়লা
জনগণের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেবার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
রাষ্ট্রীয প্রতিষ্ঠান চুরমার করেছে।
কমিশন
আর লুন্ঠন দেশের শাসকগোষ্ঠীর মূল লক্ষ হওয়ায় এসব কাজ সম্ভব হয়েছে
।
জল জমি
জঙ্গলের মতো মাটির উপর আর নীচের সাধারণ সম্পত্তি দখল আর তার উপর মুনাফার কারখানা
বসানোর বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদে-প্রতিরোধে তৈরী হচ্ছে রক্তের মিছিল।
ফুলবাড়ীতে হয়েছে, হয়েছে কলিঙ্গনগর আর নন্দীগ্রামে।
বাংলাদেশের মধুপুরে চলেশ রিছিল বন রক্ষার আন্দোলন করতে গিয়ে যে ভয়ঙ্কর অত্যাচারে
খুন হলেন, তার বর্ণনা শোনাও একজনের জন্য বড়ো নির্যাতনের।
প্রচলিত
উন্নয়ন দর্শন কীভাবে সিপিএমকেও উন্মাদে পরিণত করতে পারে, তার একটি দৃষ্টান্ত
এ-নান্দীগ্রাম।
অবিশ্বাস্য
বর্বরতা ঘটেছে সেখানে।
কারণ
কী? কারণ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো এখানেও সরকার কৃষক ও কৃষি উচ্ছেদ করে
বিশেষ বিনিয়োগ অঞ্চল করতে চায়।
জনগণ
এর বিরোধী।
সরকার
ও বিনিয়োগকারীরা পুলিশ আর মাস্তান দিয়ে তার জবাব দিয়েছে, ক্ষমতা দেখিয়েছে।
সারা
ভারত জুড়ে এখন একদিকে দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ী সংস্থার জমি জল আর জঙ্গল দখল, উচ্ছেদ বা
বিষাক্ত করে মুনাফা বানানোর নানা প্রকল্প অন্যদিকে তার প্রতিক্রিয়াতেই মানুষের
প্রতিরোধের নতুন-নতুন রূপ।
বাংলাদেশ-সহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও দৃশ্যপট কম-বেশি একই।
ভারতের সজাগ
মানুষেরা বললেন, বাংলাদেশের মানুষ জীবন দিয়ে তাঁদের অনুপ্রাণিত করেছেন।
এখন
থেকে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের লড়াইয়ে এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হবে চারটি রক্তাক্ত নাম
'ফুলবাড়ী কানসাট কলিঙ্গনগর নান্দীগ্রাম'।
২০ এপ্রিল
২০০৭
আনু মুহাম্মদঃ অধ্যাপক,
অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
|