London:

Home

About us

Services

Contact

Archive

অবক্ষয়ের যুগে মূল্যবোধের অনুপ্রেরণা লারমা

দীপায়ন খীসা

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নামটির সাথে দেশের অধিকার সচেতন মানুষ পরিচিত। তবে পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ী মানুষেরা তাঁকে লারমা নামে অধিক চিনেন। ১০ নভেম্বর লারমার ২৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী। ইতিহাসের ক্ষণজম্মা এ-নেতার জম্ম হয়েছিলো বর্তমান রাঙ্গামাটি জেলার অদূরে মহাপ্রুম (মাওরুম) গ্রামে ১৯৩৯ সালে। সেই সময় মাওরুম গ্রামটি ছিলো বৃহত্তর পার্বত্য অঞ্চলে বিদ্যালাভের পীঠস্থান।  গ্রামটি ১৯৬০ এর দশকে কাপ্তাই বাঁধের আগ্রসী জলরাশিতে তলিয়ে যায়। অভিশপ্ত এ-বাঁধের বিরোধিতা করতে গিয়ে লারমা ছাত্রাবস্থায় ১৯৬৩ সালে কারাবরণ করেন।  দীর্ঘ ৩ বৎসর কারাভোগের তিনি ১৯৬৫ সালে মুক্তি পান। পাকিস্তানী শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে লারমার এ-প্রতিবাদ পার্বত্য জনপদের রাজনীতিতে নতুন এক সম্ভাবনা তৈরী করে।

পাহাড়ীদের সামন্তীয় নেতৃত্ব তখন শাসকগোষ্ঠীর কাছে নতজানু হয়ে বন্দনারত। পুরো পাহড়ী জনপদে কোন রাজনৈতিক সংগঠন ছিলো না। সামন্তরা তখন সমাজের নেতৃত্বে আসীন। ঠিক সে-সময়ে ছাত্র লারমার প্রতিবাদ, কারাবরণ পাহাড়ী শিক্ষিত তরুণদের ব্যাপক নাড়া দেয়। ধীরে-ধীরে ছাত্র-তরুণদের জনপ্রিয় নেতা হিসেবে লারমার আবির্ভাব ঘটে। লারমার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে ব্যাপক জনসাধারণের কাছে। অল্পদিনের মধ্যে তিনি হয়ে উঠেন গণ-মানুষের প্রিয় নেতা। ১৯৭০-এর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে লারমা ব্যাপক ভোট পেয়ে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। লারমা শিক্ষিত পাহাড়ী যুবাদেরকে গ্রামে ফিরে যেতে অনুপ্রাণিত করেন। পাহাড়ের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আলোতে গড়ে তুলতে লারমার আহ্বানে শিক্ষিত তরুণরা গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েন।  লারমা স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের প্রাক্কালে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর জাতিগত স্বীকৃতির দাবী তুলেছিলেন।  পার্বত্য অঞ্চলে পৃথক শাসন ব্যবস্থার জন্য লারমা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী ৪ দফা দাবীনামা পেশ করেন। ১৯৭৩-এর প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লারমা আবারও বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। পাহাড়ী জনতার সমর্থন নিয়ে ৪ দফা দাবীর বাস্তবায়নের জন্য সরকারে কাছে বারংবার আহ্বান জানান। উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদের ডামাডোলের মধ্যেই লারমা পার্বত্য অঞ্চলের ১৩ টির অধিক জাতিসত্তাকে জুম্ম জাতীয়তাবাদী চেতনায় সংগঠিত করেন। তিনি একাধারে শিক্ষকতা করেছেন, আইন পেশায় নিয়েজিত ছিলেন এবং পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছিলেন। উপরন্তু সে-জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক আদর্শে সংগঠিত করেছেন এবং সশস্ত্র সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রয়ারী লারমা জুম্ম জনগণের প্রথম রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি গঠন করেন। লারমা ছিলেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। সামন্ত শোষণ ও শাসন ব্যবস্থায় জর্জরিত পশ্চাৎপদ একটি সমাজে লারমা রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি সর্বপ্রথম পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জনগণের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনার জন্ম দেন। তাঁর উত্থাপিত পৃথক স্বশাসনের দাবী ভিন্ন-ভিন্ন ভাষা-ভাষী ১৩টির অধিক জাতিসত্তাকে একই সংগঠনে একত্রিত হতে অনুপ্রাণিত করে। জনসংহতি সমিতি জুম্ম জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী দলে পরিণত হয় লারমার সুদক্ষ সাংগঠনিক প্রতিভার জোরে। এক পর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমান লারমাকে মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করে পাহাড়ীদের দাবী বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিলে লারমা তা প্রত্যাখান করেন। ১৯৭৫ সালের পট-পরিবর্তনের পর লারমা আত্মগোপন করেন। 

আত্মগোপন অবস্থায় জুম্ম জনগণের জন্য স্বায়ত্তশাসনের দাবীতে তিনি সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। লারমা শুধুমাত্র গেরিলাযুদ্ধের নেতা ছিলেন না, তিনি পাহাড়ের সমাজ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনেন। পার্বত্য অঞ্চলে জনসংহতির নেতৃত্বে তিনি পৃথক একটি শাসন কাঠামো তৈরী করতে সক্ষম হন। সেখানে তিনি গ্রাম পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু করেন। পঞ্চায়েতের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়াকে খেটে খাওয়া জুমিয়াদের কাছে নিয়ে যেতে লারমা অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তিনি জুমিয়া নারীদেরকে গেরিলাযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করতে মহিলা সমিতি গঠন করেন। লারমার প্রচেষ্টায় গড়ে উঠে গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য লারমা দুয়ারে-দুয়ারে ঘুরে নারীদের উৎসাহিত করতেন। এভাবে তিনি জুম্ম জনগণের সমাজ ব্যবস্থায় একটি প্রগতিশীল পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেন।

লারমার এ-প্রগতিশীল পথ চলা একটি মহল মানতে পারেনি।  জনসংহতির মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীল একটি গোষ্ঠী লারমার বিরোধিতা করা শুরু করে। ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর বিভেদপন্থী বলে পরিচিত এ-গোষ্ঠীটি  লারমাকে হত্যা করে। লারমা নিছক জাতীয়তাবাদী ছিলেন না। তিনি শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন। একটি গণতান্ত্রিক ও শোষণহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য  জাতীয় সংসদে সোচ্চার কন্ঠে দাবী তুলেছিলেন। সংবিধানে মেহনতি মানুষের মুক্তির ধারা সংযোজনের জন্য তিনি সরব ভূমিকা রেখেছিলেন। লারমার মৃত্যুর দু'যুগ পেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তিনি কিংবা তাঁর চিন্তা অতীত হবার নয়। লারমা সর্বকালের সর্বযুগের। তিনি কালজয়ী। তাঁর কাংখিত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, সকল জাতির সাম্যের এবং শোষণ মুক্ত সমাজ আমরা এখনও প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি।  বর্তমানে সর্বত্রই অবক্ষয়ের ভয়াল আগ্রাসন। সমাজ কিংবা রাজনীতি থেকে মূল্যবোধ উধাও হয়েছে সেই কবে। পুঁজির তেজী স্রোত আমাদের মূল্যবোধকে পণ্য বানিয়ে বিকিকিনি করছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উপস্থিতি এবং অনুপ্রবেশের কারণে মেহনতি ও ক্ষুদ্র জাতিসমূহের রাজনৈতিক সংগ্রাম অনেকাংশে ম্রিয়মান। দাতাগোষ্ঠীর লেবাস লাগিয়ে সাম্রাজ্যবাদী সংস্থাগুলো  জনগণের প্রতিরোধ সংগ্রামকে বিপথে পরিচালিত করার নানান আয়োজন করে যাচ্ছে। তাই বর্তমার প্রেক্ষাপটে লারমাকে আত্মস্থ করা জরুরী হয়ে পড়েছে। তিনি গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাননি। লোভ-লালসা পরিত্যাগ করে সাধারণ জীবন যাপন করতেন। মন্ত্রীত্ব প্রত্যাখানের মতো দৃঢ় চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে আপোষ করেননি বিধায় তাঁকে মরতে হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জণগণের মুক্তির সংগ্রামকে তিনি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে সমর্পিত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। আদর্শ ও নৈতিকতার প্রতি চরম বিশ্বস্ত থাকার কারণে তিনি সাম্রাজ্যবাদী অনুচরদের চক্ষুশূল হন। লারমা সাম্যবাদী দর্শনের সৈনিক ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি মার্কসীয় দর্শনের পাঠ নেয়া শুরু করেন। তিনি সমাজ বদলের স্বপ্ন লালন করতেন।

লারমার সমাজ বদলের স্বপ্ন এখনও সমানভাবে বিরাজমান। নষ্ট সময়কে প্রতিরোধ করতে এবং সময়কে জয়ী করার কঠিন সংগ্রামে লারমা এক অনুপ্রেরণার নাম। লারমার হত্যাকারীদের লক্ষ্য ছিলো জনগণের মুক্তি সংগ্রামকে দুর্বল করে দেওয়া এবং তাঁর চেতনাকে ধ্বংস করে দেয়া। হত্যাকারীদের সে-প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ২৪ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে  লারমাকে স্মরণের আয়োজনে ঘাতকরা একটু ব্যথিত হবেন সন্দেহ নেই। কারণ ঘাতকদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়ে লারমার আদর্শ ও চেতনা এখনও মুক্তিকামী মানুষকে সমান অনুপ্রেরণা দিয়ে চলেছে। লারমা নিপীড়িত মানুষের পথপ্রদর্শক হয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন। তাঁর এ-বেঁচে থাকার মধ্য দিয়েই সমাজ বদলের সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে বর্তমান প্রজম্মকে আগুয়ান হতে হবে। মানব সেবার সুমহান ব্রতের যে-পথ লারমা বাতলে দিয়ে গেছেন, সে-পথে তরুণ সমাজকে হাঁটতে হবে। পরজীবী রাজনীতিকদের পরিহার করতে লারমার আদর্শ অনুসরণ করার সাধনায় অবিচল থাকা বর্তমান সময়ের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। লারমার গ্রামে ফিরে যাওযার ডাক, গ্রামীণ জনগণকে শিক্ষিত করার জন্য তরুণ সমাজের প্রতি তাঁর আহ্বান, জাতিগত আধিপত্য নিরসনের স্বপ্ন, নারীর অধিকারের দাবী এবং শ্রমজীবী মানুষের জন্য একটি কাংখিত রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য সমান প্রাসঙ্গিক। মূল্যবোধকে ধারণ করে অবক্ষয়কে প্রতিরোধ করার  মাঝে লারমা বারে-বারে ফিরে আসেন। লারমার ২৪তম মৃতুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে লারমার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা শপথ নিতে পারি, 'লারমার চেতনার মৃত্যু নেই, লারমা তুমি চিরঞ্জীব'।

লেখকঃ সম্পাদক মাওরুম

 
 
   

অন্যান্য কলাম 8

© 2007 Confidence Services Ltd.